ভোর ৫ টা ৩২। তাবুর সাথে লাগোয়া যে নৌকাটা ছিলো, ওটা ঠেলে সমুদ্রে নামিয়েছেন চাচারা দুই ভাই। আমি সবসময় শুধু ভাবতাম, কিভাবে নৌকাগুলোর নীচে চাকা দিয়ে গড়িয়ে নেয়া সম্ভব, চাকাটা কেনো পিছলে বেরিয়ে আসেনা, একটা সময়তো তাই হবার কথা? আসেনা, কারন ওটা পিউর ফিজিক্স, ওই চাচারা ওস্তাদ লোক। গড়গড় করে নৌকা সাগরে, আমি চোখ বড় বড় করে দেখলাম। খুব লোভ হচ্ছিলো তাদের সাথে করে চড়ে বসতে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা নিজচোখে দেখার আমার কত যে শখ!

একদিন পূরন করবো ওটা ইনশাআল্লাহ। লাগলে ফরেস্ট গাম্পের মত নিজেই একটা বোট কিনে মাছ মারতে যাবো ভারত মহভিমুখে।ক্যাপশন

খোলভর্তি ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরছে জেলে নৌকাগুলো। শেষবিকালের উদাসী বাতাসে অলস ভংগিতে বসে বসে এই ব্যাস্ততা দেখা ভীষণ আনন্দের এক ব্যাপার। একদিন একটা মাছধরা নৌকার মালিক হবার ইচ্ছেটা শতগুনে বেড়ে গেছে আমার এখন।

আরো আনন্দের একটা ব্যাপার আজ আবিষ্কার করেছি। বেলাভুমি ধরে হাটার সংগী হিসেবে দুটি বালক অনবদ্য। ওরা আবোলতাবোল বকতে থাকে, আর নোনা বাতাস গায়ে মেখে পড়ন্ত সুর্যের দিকে তাকিয়ে থেকে কেবল হুম, হ্যা করতে থাকা যায়।

একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে শোনা যায় ওদের বিষয়বস্তু। মৎসকন্যার রঞ্জিত কাহিনী, তিমির প্রকান্ডতা, হাঙর কিভাবে মানুষ খায়, ইত্যাদি। কিন্তু ওরাও বোঝে, সমুদ্র কত বিশাল, অন্তহীন, কত অজানা সৃস্টি মানুষের অজান্তে লুকিয়ে আছে, পৃথিবীর দুর্বোধ্যতম রহস্্যাপশন

বলেশ্বর নদী!

নামের মতই বল আছে এই নদীর। ফরিদপুরের সদরপুরের কাছে সৃস্ট পদ্মার শাখা নদী আড়িয়াল খা'র শাখা নদ কুমার টেকেরহাটের কাছে নাম পালটে কালিগংগা হয়ে পুরো গোপালগঞ্জ চক্কর কেটে পিরোজপুরের শ্রীরামকাঠির কাছে জন্ম দেয় বলেশ্বরের।

এরপর সে একেবেকে পুরো পিরোজপুর অতিক্রম করে দক্ষিণযাত্রায় একই জেলার জিয়ানগরের কাছে কচা নদীর সাথে মিলিত হয়ে প্রমত্তা হয়ে এগিয়েছে আরো দক্ষিণে।

বাগেরহাটের সন্যাসী মোহনায় সেই বলেশ্বরের সাথে উত্তর-পশ্চিম থেকে মোংলা নদীর ধারাবহনকারী পানগুচিও যখন যোগ দেয়, বলেশ্বর তার সমস্ত গ্লামার নিয়ে বরগুনার হরিনঘাটায় বংগোপসাগরে পড়িপড়ি করছে, এর কিছু আগে তার উপরে এসে পড়ে আরেকজন, সুন্দরবনের ভোলা নদী। ওখানে বলেশ্বর কেমন প্রমত্তা, আর চওড়া, তা বলাই বাহুল্য!

নদী! আহা, কি এক যাত্রা বলেশ্বর নদীর! ছবির এখানটা ভোলা নদী এসে পড়ার বেশ উত্তরে।

অদ্ভুত, ভীষণ অদ্ভুত!

বানিয়াশান্তার দিগন্তজোড়া খোলা প্রান্তরের এই মায়ার কথা বলছি। কেনো যেনো খুব কথা বলতে ইচ্ছা করে ওখানে। কত মানুষের সাথেযে কত ধরনের কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো, কোনো উপায় না থাকায় নিজের সাথেই আবোলতাবোল বকেছি! আবার কখনো ওপথে ফিরবো আমি, সাথে নিয়ে আসবো আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে, যার সাথে আমি যেকোনো কথা বলতে পারবো, যে আমার সবকিছু জানবে, আর আমি তার।

বাংলাদেশে আমার সবচেয়ে প্রিয় পথ সেদিন থেকে অফিশিয়ালি, শান্তা-কালীনগরের মায়ায় ভরা, জাদুতে ঠাসা মেঠোপথ, সামহোয়্যার ইন সুন্দরবন!

শেষবিকেলে গন্তব্য আমার ২৮ কিলোমিটার অফরোড দুরত্বে, সেই পথের দুরন্ত বাতাস অসুরের শক্তি এনে দিলো আমার মাঝে, দুইদিন গোসল করতে পারিনি, আজ আমার একটা হোটেলরুম লাগবেই! অবিশ্বাস্যভাবে, ১ ঘন্টা ১৯ মিনিটে বানিয়াশান্তার বেড়িবাধ পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যা ঘনাতেই আমি মংলা বন্দরের আলো দেখতে পেয়েছিলাম।

সারাদিন দুইটা বিস্কুট, চারটা বাতাসা, আর টন টন পানি খেয়ে কাটিয়েছি। হোটেলের তিনতলা কামরায় ব্যাগ উঠিয়েছি টানতে টানতে, এরপরে সুরেশ্বর হোটেলে যেয়ে খেয়েছি কাচ্চি বিরিয়ানি, আর তার সাথে এক জগ পানি।


চর কুকরি মুকরি।

এক বাজার থেকে দুই প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমি ক্যাম্পসাইট খুজতে শুরু করি বেড়িবাঁধ ধরে। দারুন এক মেঠোপানির পুকুরপার, তার পাড় ঘেসে বয়ে যায় হাটুজলের এক খাল, তার ওপাশে কেওড়া এবং গোলপাতার ম্যানগ্রোভ বন, এবং সেই খালে একটা পরিত্যাক্ত মাছধরা নৌকা নোঙর করা দেখে আমার ফয়সালা, ওখানেই ক্যাম্প করবো। কোত্থেকে দুই পিচ্চি ছেলে এসে আমাকে সাহায্য শুরু করলো।

তখন খালের আরো বেশ ভাটি থেকে হাটতে হাটতে এলেন ইমন ভাই। ওখানে তাদের মাছধরা ট্রলার নোঙর করেছেন, সেই সাতক্ষীরা থেকে সমুদ্র ধরে এখান পর্যন্ত এসেছেন, মাছ ধরতে ধরতে, এখন প্রপেলার ভেঙে বসে আছেন তারা ৯ জন, সবার বাড়ি আশাশুনী।

এমন মায়া তাদের কথায়! আমার কাছ থেকে গল্প শুনবেন বলে ধরে নিয়ে গেলেন। পুকুরটায় ডুবিয়ে এসে ট্রলারের ছাদে বসে সদ্য ধরা সাগরের কতপদের মাছ দিয়ে এক ডিশ ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম আমি। অথচ বিস্কুট কিনে রেখেছিলাম আমি খেতে। সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত এক স্ক্রিপ্ট এই মানবজীবন, কখন, কিভাবে যে কি ঘটে!

রাতে পাশের ম্যানগ্রোভ থেকে শেয়ালের ডাক শুনে আমি ভেবছিলাম ওখানে একা তাবু গেড়ে রইলে কেমন লাগতো তখন!

সকালে ট্রলারের বাবুর্চি ডাল রান্নায় ব্যাস্ত, আমি ঢুকেছিলাম ম্যানগ্রোভে। যদি একটা হরিণ, বা শেয়াল দেখতে পাই...

বংগোপসাগরে ভেসেছিলাম আজ, জীবনে প্রথমবার সত্যি সত্যি চারিদিকে অন্তহীন জলরাশি দেখার অভিজ্ঞতা এটা আমার। পাক্কা ৯ ঘন্টা ভেসে হাতিয়া থেকে চট্টগ্রামে আসে এমভি মুনিরুল হক। প্রথম দুই ঘন্টা উত্তেজনার চোটে আমি বসিইনি, চারিদিকে ইতিউতি তাকিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। এরপরে ক্যাপ্টেনের কেবিনের পাশে বসে সাগর দেখতে দেখতে আমার সবচে প্রিয় উপন্যাসগুলোর একটি- "দ্যা আয়রন মিস্ট্রেস" পড়েছি। অবিশ্বাস্য এক কম্বিনেশন। ক্যাপ্টেন আংকেল একমনে এক ছোকরাকে বই পড়তে দেখে বেরিয়ে এসে কথা বলে গেছেন কয়েকবার। নাবিকদের জীবন সম্পর্কে বেশ কিছু শিখেছি।

স্বন্দীপ যাওয়া হয়নি। গতকাল সকালে আমার সামনে নোঙর তুলে ছেড়ে গেছে ওই দ্বীপের বোট, উলটো ঘোরা অশুভ, এমন এক সংস্কারের দরুন, দিনের একমাত্র বোট মিস করি আমি। আরেকটু কমবয়েসী আমি হলে হতাশ হতাম খুব। কিন্তু ওটা পাত্তাই দেইনি। আফাজিয়া বাজারে এসে চায়ের দোকানে খোজ লাগালাম বিকল্প। ভাসান চরের বোট আছে, কিন্তু সারেং বললো চরে আমার আত্মীয় না থাকলে নামতে পারবোনা, আর্মি খেদিয়ে দেবে, কারন ওখানে এখন রোহিংগা নিবাস। নোয়াখালী যেতে পারি, কিন্তু ওতে আমার লক্ষচ্যুতি হবে, মেইনল্যান্ড ছোয়া যাবেনা চট্টগ্রামের আগে। তো, বাকি অপশন আবার কাল, অর্থ্যাত আজ। সন্দীপের ট্রলার আর চিটাগং এর জাহাজ আছে।

একটা সরাইখানায় কামরা নিয়ে ঘুম দিয়ে বিকালে উঠে বংগোপসাগরের তীর ধরে হেটেছি। সন্ধ্যার আলোআধারীতে তখনই এমভি মনিরুলকে পোর্টে দেখেছিলাম। খুব লোভ হলো আমার। কল্পনার রঙ চড়িয়ে আমি ভাবলাম, ওটা বিরাট এক কার্গো শিপ, আমি বসে আছি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে, ওটা যাবে সেই আমেরিকার সুদুর উত্তরের নুনাভাট বন্দরে, কুলে আছড়ে পড়া ঢেউ ভাঙার ক্রমাগত শব্দে সত্যিই কিছু মুহুর্তের জন্য ওটা বিশ্বাস হয়ে গেছিল আমার। ওটাতে চড়তেই হবে, ঠিক করলাম। সত্যি সত্যি একটা জাহাজ ওটা!

সকালে তাই নিজেকে এক তিমিশিকারী কল্পনা করেছি, কয়েক বছরের জন্য চলে যাচ্ছি পলিনেশিয়ায়। থুড়ি, একরাতের জন্য চট্টগ্রামে। আমার বন্ধু ইমন ছাড়া চট্টগ্রাম একদম ভিন্ন। মিসড ইউ, মেইট।

একদিন এরকম আরেকটা ছবি তুলবো আমি। ওটাতে চট্টগ্রামের বদলে আমেরিকা মহাদেশের সর্বউত্তরর নুনাভাট হবে। ইনশাআল্লাহ।ক্যাপশন

পৃথিবীটা যদি এক স্বপ্নের দেশ হতো, আমি টেকনাফ রোড ধরে সোজা দক্ষিণে যেতে চাইতাম। নাফ নদী পেরিয়ে সীমাহীন পৃথিবীর বার্মিজ রাজ্যের তটরেখা ধরে বংগোপসাগরের সীমানা পেরিয়ে পৌছুতাম আন্দামান সাগরের তীরে। আমি পেরিয়ে যেতাম মালাক্কা প্রণালী, স্বপ্নের দেশ ইন্দোনেশিয়ায়, জাভা সাগরের দ্বীপে দ্বীপে ঘুরতাম কয়েক যুগ। আমার গায়ের রঙ যখন গাঢ় তামাটে হয়ে যেতো, তখন আমার যেতে মন চাইতো সলোমন সাগরে, কতগুলো বছর ঘুরেফিরে বেড়াতাম নিউ গিনির বনে জংগলে, পাহাড়ে, সাগরে! যখন সাগর আবার ডাকতো, ভেসে পড়তাম সলোমন সাগরে, ভাসতাম দক্ষিণে, একদিন পৌছে যেতাম তাসমান সাগরের পারে! না, অস্ট্রেলিয়া আমি যেতাম না, আমি যেতে চাইতাম আরো দক্ষিণে...আমার কতদিনের শখ, সোনারঙা পলিনেশিয়ানদের সাথে সখ্যতা করার, নারকেল খেতে খেতে বিরক্ত হতে হতে ছোট ভেলায় চড়ে ভেসে বেড়াতাম প্রশান্ত মহাসাগরে...যখন জীবন একটু কঠিন হয়ে যেতো, করতাম মুক্তাশিকার, প্যাসিফিকের তলদেশ থেকে হাতিয়ে আনতাম মুক্তা....আমি আর ফিরতে চাইতাম না কোনোদিন, কোনো এক পলিনেশিয়ান সাগরের হাসিকে নিয়ে ঘর বাধতাম উদাসী দ্বীপের রাজ্যে!

×