এক কোটি জোনাকি, এবং মণ পাহাড়ের আকাশছোয়া পাথুরে পথ...


সেদিন সকালে ঘুম ভেঙেই আমার মনে পড়লো, আমি শুয়ে আছি মাথাটা মায়ানমারে,পা দুটো ভারতে রেখে, নিজের তাবুতে। কিন্তু শরীরে পেচানো ছালার মত এটা কি? এক মুহুর্ত লাগলো মনে করতে যে, ওটা আসলেই একটা চটের বস্তা। গত মধ্যরাতে আং এর ঘরে অনেক খুজেপেতে, ওটার মধ্যেই ঢুকে পড়েছিলাম ঠান্ডার চোটে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে, খালিপায়ে, সদ্য ঘুম ভাঙা চেহারা নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। উত্তর-পুর্ব ভারতের শেষ রনাংগন, কনইয়াক নাগাদের ঘর, লংগওয়ার সবচে উচু পাহাড়টার চুড়ায় দাড়ানো আমি। ভারত-মায়ানমারের একবিংশ শতাব্দীর বর্ডার ছেদ করে যায় এই গ্রামকে। কনইয়াক দের রাজা, মহান আং, তার ঘরটা বানিয়েছেন এমনভাবে, তার অর্ধেক পড়েছে ভারতে, বাকি অর্ধেক মায়ানমারে। আং এর ঘরের মায়ানমার প্রাংগনটা অপার্থিব। ওপাশে এত উচু পাহাড় দেখা যায়, যার চুড়া দেখা সম্ভব হয়নি মেঘে ঢেকে যাবার কারনে। তবে একদম খাড়া দেহ উঠে গেছে, যা দেখে আন্দাজ করেছিলাম ওটা পাহাড় না, পর্বত। পর্বতের নীচে উপত্যকাটা দেখা যায়। গাঢ় খয়েরী রঙের অনেকগুলো মেঠোপথ একেবেকে চলে গেছে কোন সে দুর্গম অজানায় ! ওখানটায় দাঁড়িয়ে পথগুলোর দিকে তাকিয়ে মেঘগুলোর...


এক কোটি জোনাকি, এবং মণ পাহাড়ের আকাশছোয়া পাথুরে পথ...



সেদিন সকালে ঘুম ভেঙেই আমার মনে পড়লো, আমি শুয়ে আছি মাথাটা মায়ানমারে,পা দুটো ভারতে রেখে, নিজের তাবুতে। কিন্তু শরীরে পেচানো ছালার মত এটা কি?

এক মুহুর্ত লাগলো মনে করতে যে, ওটা আসলেই একটা চটের বস্তা। গত মধ্যরাতে আং এর ঘরে অনেক খুজেপেতে, ওটার মধ্যেই ঢুকে পড়েছিলাম ঠান্ডার চোটে।

ধড়মড়িয়ে উঠে বসে, খালিপায়ে, সদ্য ঘুম ভাঙা চেহারা নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। উত্তর-পুর্ব ভারতের শেষ রনাংগন, কনইয়াক নাগাদের ঘর, লংগওয়ার সবচে উচু পাহাড়টার চুড়ায় দাড়ানো আমি। ভারত-মায়ানমারের একবিংশ শতাব্দীর বর্ডার ছেদ করে যায় এই গ্রামকে। কনইয়াক দের রাজা, মহান আং, তার ঘরটা বানিয়েছেন এমনভাবে, তার অর্ধেক পড়েছে ভারতে, বাকি অর্ধেক মায়ানমারে।

আং এর ঘরের মায়ানমার প্রাংগনটা অপার্থিব। ওপাশে এত উচু পাহাড় দেখা যায়, যার চুড়া দেখা সম্ভব হয়নি মেঘে ঢেকে যাবার কারনে। তবে একদম খাড়া দেহ উঠে গেছে, যা দেখে আন্দাজ করেছিলাম ওটা পাহাড় না, পর্বত। পর্বতের নীচে উপত্যকাটা দেখা যায়। গাঢ় খয়েরী রঙের অনেকগুলো মেঠোপথ একেবেকে চলে গেছে কোন সে দুর্গম অজানায় ! ওখানটায় দাঁড়িয়ে পথগুলোর দিকে তাকিয়ে মেঘগুলোর ভয়ংকর সর্পিল ভঙ্গীতে কুঞ্জলী পাকিয়ে ভেসে বেড়ানো দেখতে দেখতে কেনো যেনো গায়ে কাটা দেয়!

ভোরের প্রথম আলোয় শেষবারের মত সেই দৃশ্য গিলে নিয়ে আমি ফিরলাম ক্যাম্পসাইটে।

তাবুটা গুটিয়ে নিলাম ঝটপট। রাইডের কাপড় চাপিয়ে, জুতোজোড়া পাতে গলিয়ে, চলে গেলাম বিরাট আগুনের চুল্লিতে রান্না করা আমার নাশতা খেতে। গতরাতেই বলে রেখেছিলাম আং এর রান্নাঘরের একজন পরিচারিকাকে, আমাকে যেনো দয়া করে সব্জি, আর ডিম ভাজি করে ভাত খেতে দেয় সকালে! শুয়োর একদম ই খাইনা যে! আমাকে দেখেই এগিয়ে দিলো সে! দ্বিতীয়বারের মত মুগ্ধ হয়ে ভাবতে লাগলাম, সামান্য কাচাপেপে সিদ্ধ, স্টিংক বিন, আর ডিমভাজি দিয়ে মোটাচালের ভাত খেতে কিভাবে অমন সুস্বাদু হয়! নিশ্চই জাদু জানে মহিলা.....ফেরার পথে তার কাছ থেকে একটা অমুল্য সুভ্যেনিয়ার, কনইয়াক যোদ্ধাদের ব্যাবহৃত যুদ্ধসাজের একটা মালা পেয়েছিলাম আমি!

বেশ ঢিলেঢালা ভংগিতে আমি দিনের যাত্রা শুরু করলাম। লংগওয়ার একমাত্র ইটের খোয়া বিছানো পথটার দুপাশে ছোট কয়েকটা প্যান শপ, এখনো খোলেনি। পথেও বিশেষ মানুষ নেই। গুটিকয়েক বাচ্চা বেরিয়ে লাফিয়ে ঝাপিয়ে বেড়াচ্ছে,আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা যত্রতত্র, রাইফেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উপস্থিত সবাই চেয়ে দেখতে লাগলো, পাগলা ছোড়াটার কান্ড। আং এর ঘর থেকে বেশ অনেকখানি দূরে, লংগওয়ার দক্ষিন-পশ্চিমের শেষ সীমানায় একটা ভীষণ খাড়া আপহিল পার হয়ে গ্রামটাকে বিদায় দিতে হয়। সবার উৎসুক নজরের সামনে আমি কিছুতেই স্যাডল থেকে নামবোনা, উঁহু। জিহ্বা বেরিয়ে যাবার দশা হলেও, দাতে দাত চেপে উঠে গেলাম এবড়োথেবড়ো খোয়ার বিশাল সেই ক্লাইম্ব। একদম উপরে উঠে শেষবারের মত পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম লংগওয়া। সামনের ডাউনহিলে আমি একবার নেমে গেলে, জীবনে আর কোনোদিন হয়তো দেখা হবেনা জাদুকরী ওই পাহাড়চূড়ার মোহনীয় গ্রামটাকে। দূরে, অনেক নীচে একগুচ্ছ মেঘ ভেসে রয়েছে। তার নীচে চলে যাবো আমি।

ঠিক তাইই করলাম আমি। বুকের মাঝে শুন্য একটা অনুভুতি হচ্ছে, গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে। আমার দুপাশের অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য কোনো প্রভাব ফেলছেনা অনুভুতিতে। একটা সময় সকল অনুভুতির স্রোত এসে বিরাট এক ধাক্কা দিলো। ছবির এই উপত্যকাটার সামনে এসে। সবকিছুই অর্থহীন বলে মনে হলো, নিজের উপর উঠলো প্রচন্ড জিদ। নিজেকে স্বাধীন বলে দাবি করা আমি নিজের সকল ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেড়ে চলে যাচ্ছি একটা জনপদ, যেখানে আমার অবাধ্য, স্বাধীনচেতা মনটা সারাটাজীবন কাটিয়ে দিতে চায়!

অনেকক্ষণ বেশ খিটিখিটে মেজাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ঠায়। শা শা করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে। বাতাসের ঐ গর্জন ছাড়া সামান্যতম শব্দ নেই সারা ধরায়। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও বেশ উচুস্বরের বলে মনে হলো। ওভাবে রইতে রইতেই খানিক বাদে মেজাজ খারাপের অনুভুতিটা পরিবর্তিত হয়ে গেলো নিখাদ আবেগে। রাস্তার পাশে বসে পড়ে কাঁদতে শুরু করলাম আমি। শুধু বলার জন্য না, সে ছিলো সত্যিকারের অশ্রু বর্ষণ।

নিজের সাথে জোর খাটিয়ে না পেরেও, একটা সময় সটান উঠে দাঁড়িয়ে সাইকেল চালানো শুরু করলাম। কানে একটা হেডফোন গুজে দিয়ে বাতাসের গর্জনটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে, আমি নামতে শুরু করলাম ১৮ কিলোমিটারের একটা নুড়িপাথরের ডাউনহিল ধরে। আর একটাবার ও পথ থেকে ডানে বায়ে তাকাইনি ঐ পুরোটা সময়। ফের যেবার থামলাম, তা ছিলো একটা পাহাড়ী নদীর পারে। দুইটা ছেলে হাটুপানির খরস্রোতে দাঁড়িয়ে জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে সেখানে।

ঢাকায়, আমার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করা প্রয়োজন, হঠাত ই মাথায় এসেছিলো। আমার নতুন সেমিস্টারের কোর্স অ্যাডভাইজিং চলছে। আমার অনুপস্থিতিতে কাজটা করছে সে। খবর দিলো আমাকে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে কোনো সেকশন পাওয়া যাচ্ছেনা, তাই কম্পিউটার গ্রাফিক্স দিয়ে দিলাম। আচ্ছা, দাও। জীবনের সবচে দীর্ঘঃশ্বাস টা ফেলে ভাবলাম তখন। কোথায় আছি এখন,আর কোথায় ফিরে যাচ্ছি……

দ্বীর্ঘশ্বাস শেষ হতে দিয়ে, এক প্যাকেট পাইনঅ্যাপেল ফ্লেভারের বিস্কুট চিবিয়ে নিতে নিতে ছেলেদুটার মাছ ধরতে গলদ্গধর্ম হওয়া দেখলাম। বাতাসে চুল উড়ছে। পরনের জামাটাও। বাড়ি থেকে হাজার মাইল দুরের ওই দুর্গম উপত্যকা,পরিষ্কার নীল আকাশটার অনেক বড় একটা অংশ ঢেকে গেছে বিরাট এক পাহাড়সারির আড়ালে,পানির গর্জন ছাপিয়ে আমি প্রকৃতির অন্যরকম এক সংগীত শুনতে লাগলাম।

আমার সামনে তখন বেশ বড়, প্রায় ৮ কিলোমিটারের একটা চড়াই। রাস্তার পেভমেন্ট বলতে কিছু না থাকায়, ওটা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের সবচে টাফেস্ট ক্লাইম্ব ছিলো। কিন্তু কিভাবে যেনো সেদিন শরীরে অসুরের শক্তি এসে ভর করেছিলো। দাপিয়ে উঠে গেলাম সেই খাড়ায়। যাবার দিন জেনেছিলাম, এই পথে এক উত্তর ভারতীয় তরুণী, আমার সপ্তাহখানেক আগে সাইক্লিং করে গেছে। আপহিলটাতে সে উঠতে পারেনি। ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে নাকি হতাশ হয়ে বসেছিলো পথের মাঝে, তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ঘাটি-পমচিং- থেকে টহলে বের হওয়া একটা পেট্রোলের এসকর্ট পায় সে। গাড়ীর পিছনে উঠিয়ে উপরে নিয়ে এসে ছেড়ে দিয়েছিলো। মেয়েটা একা ছিলো, আমার মতই। কে জানে, ওটাই আমার মোটিভেশন ছিলো কিনা সেদিন, ওকে হারানো!

একবার পমচিং চড়ে যাবার পরে আমার আর পিছনে ফেরা নেই। সামনে এখন বেশ ভালো পেভড রাস্তা। আকাশে আবার মেঘের ঘনঘটা। যে কোনো মুহুর্তে নামবে। বৃষ্টি যখন নামলো, তখন আমি মন শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে। শেষ একটা ক্লাইম্বে, ঘন জংগলের মাঝে ঘেমে, শরীরের সাথে শার্ট টা লেপটে গেছে। মাথার চুল বেয়ে সমানে নাকের উপর দিয়ে বেয়ে মুখে ঢুকতে চাইছে ঘাম। কিন্তু আমি তো তা গিলতে চাইনা! তাই প্রতিবার যখন ঘামের বিন্দুটা নাকের একদম শেষপ্রান্তে এসে ঝুলে পড়ে, ওই মুহুর্তে মাথাটা একটা ঝাকি দিতে হচ্ছে ডানে বায়ে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।

বৃষ্টি নামতেই ভীষণ খুশী হয়ে উঠলাম, এবার সব ধুয়ে যাবে!

এই অবস্থায় যখন মন অ্যাপ্রোচ করলাম, শরীরের, আর আবহাওয়ার অবস্থা দেখে ঘড়ির দিকে তাকালাম। সবে দুপুর দুইটা বাজে। আমি কিন্তু চাইলে আজ মন না থেকে, ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশিমে, আসামের সোনারী চলে যেতে পারি! ৫০ কিলো পথের মাঝে টানা ২৬ কিলোমিটারের একটা ডাউনহিল আছে।

ততক্ষনে আমার স্টকে থাকা খাবারের মাঝে একটা মাত্র ছোট বিস্কুটের প্যাকেট আছে। মন না ফিরলে কোনো দোকান ও নেই। মন ফিরতে ৪ কিলো ক্লাইম্ব! ওরে! ঠিক করলাম, এই বিস্কুটের প্যাকেট দিয়েই বাকি ৫০ কিলো চলে যাবো। ২৬ কিলো ডাউনহিলটা মন-সোনারি রোডের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। সুতরাং, আমাকে আরো বেশ ক্লাইম্ব করতে হবে।

ধীরগতির, বিরক্তিকর, কিন্তু দারুন আনন্দের সেই ক্লাইমবটা শেষ হয় লংসা হিল নামে এক চুড়ায় যেয়ে।

লংসাতে আপহিলের শেষ প্যাডালটা শেষ করে, আমি শুধু স্যাডলের উপর শুয়ে পড়বো, ২৬ কিলোমিটার বাদে, আসাম বর্ডারের কাছে যেয়ে আবার উঠে বসবো, এই হচ্ছে পরিকল্পনা! ওতে সামান্য বাদ সাধলো বৃষ্টি। ওহ, সে কি বৃষ্টি! উপুড় হয়ে থাকা আমার পিঠের উপরে যেনো একটি করে মুগুরের আঘাত পড়ছিলো প্রতি ন্যানোসেকেন্ডে! ওর মধ্যেই আমি ফর্কটা লক করে, ম্যাক্সিমাম গিয়ার কম্বিনেশন রেখে, দুই কানে ইয়ারফোন গুজে, প্রিয় একটা রোম্যান্টিক গান রিপিটে দিয়ে, ব্রেক থেকে দুইহাত সরিয়ে বারএন্ডে রেখে, চোখ দুটি সরু করে, তীক্ষ্ণ নজরটা পথের উপর ফেলে, উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম আমার সবচে প্রিয় স্যাডল পজিশনে। কেউ যদি আমার আয়ু এক ঘন্টা করে দিয়ে বলে আমি পরবর্তী ৬০ মিনিট কি করতে চাই, এই হচ্ছে সেই ঘন্টা। যার প্রতিটি সেকেন্ডে আমি বেচেছিলাম। প্রতিটি সেকেন্ড আমি রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম, বোধ করছিলাম জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

কাকতালীয় ঘটনাই সম্ভবত, যখন আমার ডাউনহিল চড়া শুরু হয়েছিলো, ঠিক তখন শুরু হওয়া বৃষ্টি, নামা শেষ হওয়ার মুহুর্তেই থেমে গিয়েছিলো। কি আশ্চর্য্য! নিজেকে দেখতে কেমন লাগছিলো জানিনা, কিন্তু বুকের মধ্যে কম্পন নিয়ে আমি স্যাডল থেকে নেমে একটা সামোসার দোকানে যেয়ে সামোসা, আর মিষ্টি খেলাম। তখনও ঘোড়ার মত লাফাচ্ছে হার্টবিট। আশেপাশের সবকিছু ধোঁয়াটে লাগছে। দোকানি আসামিজ, বাংলা জানে। কি কথোপকথন হলো আমাদের, তা আর মনে নেই যদিও। তবে সে বিশ্বাস করেনি আমি লংগওয়া থেকে আসছি!

তখন প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আসাম সীমানা আর ৭ কিলোমিটার, সোনারী ১১। যে কখনো পাহাড়ি রাস্তা থেকে নেমে ফ্ল্যাটে চালিয়েছে, সে ছাড়া কেউ বুঝবেনা, কতটা অসহ্য এই কাজ। তবে ভাগ্যিস, একদম ফ্ল্যাট ছিলোনা, মাঝেমাঝেই চড়াই, উৎরাই পাওয়া যাচ্ছিলো। আঁধার নামার মুহুর্তে আমি নাগাল্যান্ড-আসাম সীমানায় তৈরী সুন্দর একটা তোরনের সামনে চলে এসে হাপ ছাড়লাম।

এক ভেল্কীতে আমার সামনে দুনিয়া পালটে গেলো। এতক্ষন ছিলাম খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকায়, সাডেনলি হিন্দু প্রধান আসাম। বাড়িঘরের কাঠামো, মানুষের চামড়ার রঙ, দৈহিক গড়ন, ভাষা সব দুই মেরুর। ল্যান্ডস্কেপ ও। পাহাড় গায়েব হয়ে গেছে। পিছনে তাকালেও আর দেখা যায়না। এখন দোকানপাট ঘন ঘন, লোকবসতী ও ঘন। রাস্তায় বেশি যানবাহন, শোরগোল চারিদিকে। সবার পরনের কাপড়গুলো রঙিন। মানে, বলে শেষ করা যাবেনা, এত তফাৎ! ১০ মিটার আগে আর পরে।

ওই বাজারে দাড়িয়ে আমি পানিপুরি খেলাম। পেট ভরা, তবুও। কারন আমার নাগাল্যান্ড ট্রিপে যতবার সামনে পানিপুরি পড়েছে, আমি খেয়েছি, কারন জিনিসটা খুব মজার, আর আমি কিছুতেই মিস করতে চাইনা পুরো ব্যাপারটা। লোকটা আমার হাতে ছোট্ট একটা বাটি ধরিয়ে দিয়ে, বানিয়ে দিতে থাকলো একটা করে পুরি, টকস্বাদের পানি উপচে পড়ে তা থেকে। গালে পুরে চিবানো শেষ হবার আগেই পরেরটা এসে হাজির। এই লোকের কাছ থেকেই যাবার দিন ও খেয়ে গিয়েছিলাম, আর বলেছিলাম, লংগওয়া যাচ্ছি। শুভকামনা জানিয়েছিলো। ফেরার পথে তাই আমি নাগাল্যান্ড গেট পার করেই ব্যাস্তচোখে তাকে খুজছিলাম। তার দোকানের সামনে ঘ্যাচ করে ব্রেক করতেই সাদর অভ্যর্থনা জানালো ”আ ভি গায়া আপ!” আশেপাশের মানুষ ডেকে জড়ো করে সে শোনালো আমার অ্যাডভেঞ্চারের কথা। আসামের একদল বৃদ্ধ, কিশোর, যুবকদের সাথে দারুন আন্তরিক কিছু মুহুর্তে পার করেছিলাম সেখানে।

পানিপুরি খেয়ে শেষ ১০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে তৈরি আমি।সারাদিনে কতগুলো ভীষণ খাড়াই চড়েছি? হিসেবটা মাথায় এলোমেলো পাকিয়ে যাচ্ছিলো। অন্ধকার জেকে বসার সাথে সাথেই, ভীষণ ডিপ্রেসড হয়ে গেলাম। বাইকট্রিপগুলোর সময়, ডেসটিনেশনে পৌঁছার আগে আঁধার দেখলেই আমার ভীষণ মন খারাপ হয়, কেমন যেনো অসহ্য লাগে। আমার ব্যাগে লাইট আছে। কিন্তু তা বের করে পাওয়ার ব্যাংক সেট আপ করাটাও আমার গ্রাহ্য হলোনা। দুপাশে চা বাগান, ভীষণ সরু একটা পথ, প্রায় কিছুই দেখা যায়না, যাবার দিনের সুবাদে, খানিকটা চেনা সে পথে আধারেই এগোতে রইলাম।

সোনারী আর বাকি ৫ কিলোমিটার, উলটো সাইড থেকে আসা একটা প্রাইভেটকারের হেডলাইটে চোখ ধাধিয়ে গেলো। একদম কিছুই না দেখে, ২৫ কিলোমিটার পার আওয়ারে একটা গর্তে ফ্রন্ট হুইল চলে গিয়ে, মুখ থুবড়ে পড়লাম। আমি সচরাচর ক্রাশ করিনা, খুবই সাবাধানী রাইডার। ওটা আমার জীবনে দ্বীতিয়, ও এখন অবধি শেষবার সাইকেল নিয়ে উলটে পড়া। গাড়িটা পার হয়ে চলে গেলো, কিন্তু পিছন থেকে এক পথচারী হাক দিলো। তার বলা কথাগুলো কোনোদিন ভুলবোনা। আঞ্চলিক হিন্দিতে দারুন আন্তরিকভাবে সে আমাকে জিগ্যেস করলো, হেডলাইটের কারনে দেখিনি গর্ত, তাইনা? বাড়ি কোথায়?

“মেরা ঘর বহুত দূর হ্যায় ভাইসাব, আপ নেহি জানতে হো গে উসকো”

“যানা কিধার?”

“সোনারি”

সে সামান্যতম কৌতুহল দেখালোনা আমার বাড়ির ব্যাপারে। শুধু বললো, সাবধানে যেতে, সোনারি কাছেই।

লোকটার কাছ থেকে বিদায় নিলাম, কেমন যেনো এক প্রশান্তির অনুভুতির সাথে। এখন আর মেজাজটা খিটিখিটে লাগছেনা। দুপাশে চা বাগান। সরু রাস্তা। ভীষণ অন্ধকার। ঝিঝিপোকার কলরবে কান পাতা দায়। ওই মুহুর্তে!

ঠিক ঐ মুহুর্তে আমি আমার জীবনের সবচে সুন্দর, এবং অপার্থিব দৃশ্যটি দেখলাম। একটা টিলা পেরিয়ে ওপারে নামতেই অন্ধকার ফুড়ে আমার দুপাশ হঠাত ভীষণ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। চমকে উঠলাম আমি, পিলে চমকে যাবার মতই ছিলো দৃশ্যটা। বজ্রপাতের মত একটা বিজলির মত আঁধার চিরে দিয়েই নিভে গেলো সেই আলো। আমি ঠাওর করে উঠতে পারার আগেই আবার জ্বলে উঠলো তারা, দৃশ্যমান হয়ে উঠলো ঢেউ খেলানো চা গাছের উপত্যকা। লক্ষ, কমপক্ষে কয়েক লক্ষ জোনাকি পোকা একসাথে সিংক্রোনাইজড ভাবে মিটিমিটি করে জ্বলছে। আমি নিশ্চিত, পৃথিবীর খুব কম মানুষ ই অমন দৃশ্য নিজচোখে দেখতে পেরেছে। দিগন্তবিস্তৃত সেই চা বাগানে আলো-আধারের অবিশ্বাস্য খেলায় মেতে উঠলো তারা। আকাশের চাঁদ ছাড়াও যে কোনো রাত অমন উজ্জ্বল হতে পারে, আমি কি কোনোদিন কল্পনা করতে পেরেছিলাম? আমি আঁধারেই সাইকেল চালাতে রইলাম, ধীরে, যেনো আমি সামান্য একটু আওয়াজ করলেই পালাবে সব জোনাইপোকা। এতক্ষনের সব তাড়া কোথায় পালালো! আমি নির্বাক হয়ে দেখেছিলাম সেই সন্ধ্যায়, প্রকৃতির এক দুর্দান্ত সৃষ্টি।

সোনারি পৌছে আমি সোজা সোনারি জামে মসজিদে চলে গেলাম। এই মসজিদে যাবার কারন আরেকটা বিশাল ইতিবৃত্ত, যা কিনা ভিন্ন আরেকটি গল্প। শুধু বলি, লংগওয়া যাবার পথে সোনারিতে এসে আমি কোনো হোটেল না পেয়ে এই মসজিদটায় ছিলাম। মসজিদের ইমাম কি অবিশ্বাস্য একজন মানুষ, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখেনা!

ঐ মসজিদের স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে আমার! দ্বীতল একটা ভবনের দোতলায় চৌকো একটা কামরা, যেখানে তিনটা সিলিং ফ্যানের নীচে তিনটা খাটে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে, শুধুমাত্র কোনো অনাহূত অতিথিদের রাতে জায়গা দেয়ার জন্যই! আমি তিনটা খাটেই ভাগাভাগি করে ছিলাম সারারাত! ছেলেমানুষি আরকি!

দারুন একটা গোসল শেসে হাটতে বের হলাম আমি প্রিয় সোনারি। হাটলাম আর স্ট্রিট ফুড খেলাম। ট্রিপে থাকাকালীন এটা আমার সবচেয়ে আনন্দের কাজ-সন্ধ্যায় পুরো জনপদ পায়ে হেটে বেড়ানো। খেলাম মিস্টি আর জুস। আর মোমো। জীবনে প্রথমবারের মত মোমো খাই আমি এই সোনারিতে। কি যে বলবো, একদম মুখে লেগে গেলো ধোয়া উঠতে থাকা দুর্দান্ত ওই খাবারটার স্বাদ।

এশার নামাজ পড়তে যখন ফিরে আসি মসজিদে, বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সে কি বৃষ্টি! অমন স্বর্গীয় একটা পরিবেশে নামাজ পড়াটা একটা অনবদ্য অভিজ্ঞতাই বটে! নামাজ শেষ হলো, আর চমক টা এলো আমার জন্য! কি করে যেনো মসজিদের ৪০ জন মুসল্লির সবাই জেনে গেছে, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সাইকেল চালিয়ে মন গিয়েছিলাম! চোখে পানি এনে দেয়ার মত আন্তরিক অভ্যর্থনা, আর প্রশংসাবাক্যে উড়ে গিয়েছিলাম মুরুব্বি লোকগুলোর। আমাকে জিগ্যেস করলো খেয়েছি কিনা। লাজুক হেসে বললাম- “ থোড়া বহুত মোমো খায়াথা শামকো! “ দাবড়ি দিয়ে হেসে উঠলেন কয়েকজন! সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে, কোথায় খাওয়ানো যায় আমাকে, কোথায় খাওয়ানো যায় এই বৃস্টির মধ্যে! তখন এগিয়ে এলো সুসান্ত সিং রাজপুত! ও আচ্ছা, এম এস ধোনীর বড় ভক্ত হওয়ায় ওই লোককে আমি চিনি! কিন্তু সে সোনারীর মসজিদে কি করবে তাইনা? কসম, ছেলেটা দেখতে একদম তার মত।

এবং সবচে বড় কথা, ওই ছেলেটার কন্ঠ একদম, একদম হুবহু সিনেমার নায়কটির মতই! তার কথা বলার ধরন ও অমন! আমার দুই চোখ বড়বড় করে দিয়ে সে বললো, “আমার সেলুনে আমার সাথে একটু যাবেন? একটা ছোট্ট ভিডিওক্লিপ বানাবো আপনার সাথে! “ ছেলেটা মসজিদের পাশের সেলুনের নরসুন্দর। ওখানে নিয়ে আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে তার ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে, আমার মাথার পিছনে তার মাথাটা কায়দা করে বসিয়ে হেসে দিয়ে বললো আসাম, এবং ভারত সম্পর্কে আমি যেনো কিছু কথা বলি! আমিও কি সুন্দর বকবক করে গেলাম কতক্ষন। কি যে বলেছিলাম, কে জানে!

এরপরে ও আমাকে নিয়ে পুরো সোনারীর রেস্টুরেন্টগুলো খুজতে বের হলো, সেলুন থেকে টান দিয়ে তার ছাতাটা বের করে। বিধি বাম! সব বন্ধ। মসজিদের সামনে আবার ফেরত এসেছি, তখন সেই মুরুব্বিদের একজন বললেন, ছাতাটা দে, আমি নিয়ে যাচ্ছি। বৃস্টিভেজা ওই রাতে আমাকে কোন না কোন পথে হাটিয়ে উনি পুরো জনপদের শেষ খোলা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে ভাত তরকারী মাছ খাইয়ে দিয়ে চলে গেলেন তার বাসায়। ছাতাটা আমি সকালে সুসান্তকে ফেরত দিয়ে যাবো বলে দেরী করে ঘুম থেকে উঠেছিলাম.........