জানুয়ারী '২৪
দক্ষিণযাত্রার সুচনাঃ পশ্চিমবঙ্গের অচেনা আপনজনেরা...
এইতো, সেদিনের কথা! বেনাপোল সীমানার ৫০০ মিটার আগে আব্বু আম্মু, আর বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, স্যাডলে চেপে বসেছিলাম। এরপর একবারও পিছনে ফিরে তাকানো ছাড়া কেটে গেছে তিনটি সপ্তাহ। বেল্লা আর আমি দক্ষিণ ভারতের হাইওয়ে ধরে পাড়ি দিয়ে ফেলেছি প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার পথ, বাড়ি থেকে ২০০০ কিলোমিটার দুরের অচেনা এক শহরের কোনো এক ডর্মিটরির টপ বাংকে বসে স্মৃতিচারন করছি সেই দিনগুলোর।
দক্ষিণ শব্দটার প্রতি আমার আজন্ম টান। পৃথিবীর দক্ষিণ ও দক্ষিণের জনপদ নিয়ে আমার কল্পনা, আর ফ্যান্টাসির শেষ নেই। বিষুবরেখা বরাবর আমার যাত্রাটা তাই স্বভাবতই এখন পর্যন্ত আমার জীবনের সবচেয়ে এক্সাইটিং ঘটনা। এইযে একথা লিখছি, ডর্মের জানালা দিয়ে বাইরে প্রখর রোদ দেখতে পাচ্ছি। দক্ষিণের অগ্নিঝরা আরেকটি দিন আজ।
যে ট্রিপের কথা বলছি, তার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়ছে প্রায় তিনটি বছর। তিন বছরে আমার জীবনে কত কিছুই না ঘটেছে! কত বিরাট সব পরিবর্তন ই না এসেছে! আমি এমনকি ভালোভাবে লিখতেও পারিনা আজকাল। নিজেকে খুজে পাবার এবারের এই চেষ্টা, আমার দক্ষিণযাত্রা। ওইযে আমি, সেই পুরনো আমি, যে সবকিছু নিয়ে খুব এক্সাইটেড থাকত, তাকে খুজে পাবার চেষ্টা।
শুরুর দিনটিতে ফেরা যাক। ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ এর সকালে আব্বু তার গাড়ীতে করে আমাকে পদ্মা সেতু পার করে দেয়ার বাহানায় গাড়িতে উঠয়ে, একদম বর্ডারেই পৌছে দিয়েছিলো, আমার সব আপত্তি সত্বেও।

ইমিগ্রেশনে দারুন খাতির পেয়েছিলাম, স্বভাবতই। মানুষ সবসময় ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখতে পছন্দ করে। সাইকেলে বিরাট সব ব্যাগ বেধে এক ছোকরা হাফ প্যান্ট আর আউটডোর শার্ট পরে, চোখে স্পোর্টস সানগ্লাস পরে নির্বিকার উত্তেজনার সাথে অপেক্ষা করছে, এটা নিশ্চই অনেক ইন্টারেস্টিং। মানুসের প্রশ্নের শেষ নেই। তবে, ওটা বিরক্তিকর ছিলো না। তবে, আমার জন্য ইন্টারেস্টিং যা ঘটেছিল, তা ছিলো ইমিগ্রেশনেরই একজন কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে কর্মরত এক মহিলা, যিনি আমার ট্রাভেল ট্যাক্স পেপার চেক করবেন, ইংরেজীতে কথা বললেন আমার সাথে, আমি এবার ট্রিপে কোথায় যাচ্ছি, তাই! মাস্ক পরা ছিলাম, খুলে নিয়ে বললাম, আমি তো এখানেরই মানুষ! পরে উনি, আর আশেপাশের কয়েকজন পুলিশ, আর বিজিবি মেম্বার, হেসে ফেললেন। তখন মহিলা কি যেনো কানাঘুষা শুরু করলো, আস্তে আস্তে নিজেরা কথা বললো কিছুক্ষণ আমার পেপার হাতে নিয়ে, পরে বললেন, আপনিইতো সে, তাই না? কার কথা বলছে, বুঝতে পারিনি। আমিই কে? আমি কিছু বলার আগেই আরেকজন বলে উঠলেন, আরে হ্যা, উনিইতো!
তাদের কথা শুনে বুঝলাম, বিখ্যাত কারও কথা ভাবছে তারা আমাকে দেখে৷ আমি হাত বাড়িয়ে বসে আছি, পেপার ফেরত পেতে, কিন্তু তারা কথা বলেই যাচ্ছে, আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে৷ এরপর, আমার নাম জিগ্যেস করা হলো। যাক, বাচা গেলো! নাম শুনলে তাদের ভুল কাটবে তাহলে! তানভীর রেজা অনিক! কি কান্ড। আমি নাম বলার পরে মহিলা একদম শিওর হয়ে গেলেন, আমিই সেই বিখ্যাত ইউটিউবার। আদতে যার ২ সাবস্ক্রাইবার সহ একটা চ্যানেল আছে ইউটিউবে। আমার আর কি করার আছে?
আমাকে বেস্ট অফ লাক বলে দিলো, আমি থ্যাংকিউ বলে চলে এলাম।
ভারতীয় ইমিগ্রেশনের লোকেরা বেশ সহায়তা করলো আমাকে। আমার বড় বড় ব্যাগগুলো কিভাবে স্ক্যান করা যায়, সে ব্যাপারে ইন্সট্রাকশন দিয়ে, আমাকে অতিরিক্ত সময় ও দেয়া হলো। সব কাজ শেষ করে আমি যখন ভারতে চলে এলাম, তখন সন্ধ্যা ঘনাতে খুব বেশী বাকি নেই। আমার সেদিনের গন্তব্য, পেট্রোপোল সীমানা থেকে ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, ঠাকুরনগরে, সত্যদার বাড়িতে। আমি একটা ভারতীয় সিম কার্ড বাংলাদেশ থেকেই ম্যানেজ করে নিয়ে এসেছিলাম, ওতে রিচার্জ করা হলো, সত্যদার সাথেও যোগাযোগ হলো, আব্বু আম্মুকেও জানানো হলো আমি এসেছি ঠিকঠাক, কিন্তু তনুকে জানানো
হলো না! আমি জানতাম সেদিন বিকেলটাতে ওকে খুজে পাওয়া যাবে না কিন্তু তাও! কিছু একটার অভাব বোধ করতে করতেই আমার আর বেল্লার দক্ষিণযাত্রা শূরু হলো। অন্ধকারে, কোনো হেডলাইট ছাড়াই, আমি অন্ধকারে বেশ ভালো চোখে দেখি। রাস্তার গর্ত, ব্রেকার, এমনকি ফেলে রাখা ময়লাও দেখি।
সেদিন বেশ শীত পড়েছিলো। আমি হাফ প্যান্ট পরে ভুল করলাম কিনা ভাবতে ভাবতে, একটু পরেই শরীর যথেস্ট গরম হয়ে গেলো! গাছে ঢাকা যশোর রোড ধরে চলতে চলতে প্রথম যা খেয়াল হলো, তা হলো, উৎসবমুখর এক দেশে চলে এসেছি। কোনো কারন ছাড়াই কিছুক্ষণ পরপর র্যানডম জায়গা থেকে গানের বাজনা, আর অনেক আলোকছটা, আর মানুষের সমাগম দেখতে পেতে লাগলাম। জায়গায় জায়গায় মেলা বসেছে! মেলার রাজ্য ছাড়িয়ে সত্যদার গ্রামের নির্জন পথে নেমে গেছি, তখন তনুর ফোনকলে আমার সব অপুর্নতা মিটলো। আমি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হাজির হয়ে গেলাম ঠাকুরনগর। আরিব্বাস, ওখানেই দেখি মেলা। ঠাকুরনগর মেলার মাঠে ১২ মাস মেলা লেগে থাকে! আমরা সেরাতে মেলায় হেটেছি, আমি কিছু সদাই করেছি, যেমন ফোনের চার্জার, টুথপেস্ট, সাবান, আর শ্যাম্পু! এরপর বাজার থেকে দম বিরিয়ানি খেয়ে নিয়ে, সেরাতে দুর্দান্ত এক ঘুম দিয়েছিলাম নিরিবিলি সেই বাড়িটাতে।

সত্যদার নিরিবিলি বাড়ি...
পরের দুটিদিন আমার জন্য যুদ্ধ। কলকাতা শহর পেরিয়ে যেতে হবে, কারন, ওখান থেকে আমার অ্যাকশন ক্যামেরার ব্যাটারি কিনতে হবে! বড় শহর আমার মোটেও পছন্দ না। ওই একটা কারনে আমার মনের উপর অনেক অত্যাচার গেলো। সুতরাং, আমি সেসব কথা লিখতেও চাই না।
দুইদিন পর, শুরু করলাম সোজা দক্ষিণে নামা। বরাবরের মতই, আমি কোনো নির্দিস্ট রুট বানিয়ে নিয়ে আসিনি। আমার মন, আর তখনকার পরিবেশ- পরিস্থিতি অনুযায়ী পথ বেছে নেই। এবার যা হয়েছে আমার মনের সাথে, তা একটু ঘেটে দেখা যাক।
প্রায় তিন বছর আগে আমি আর বেল্লা শেষ ঘর ছেড়েছিলাম। গত তিন বছরে, বাড়ির প্রতি মায়া আমার বেশ বেড়েছে। পরিবার, এবং তাদের প্রতি আমার দায়িত্ববোধ তৈরী হয়েছে। আগে যা কখনোই হয়নি, অমন সব পিছুটান এসেছে। এবং সবচে বড় কথা, টানা তিনটি বছর ঘরে কাটিয়ে, আমি পথের জীবনের কাছে অচেনা হয়ে গিয়েছিলাম। সবকিছু সেই নতুনের মত। যেই টাকাগুলো খরচ করছি, বারবার শুধু মনে হচ্ছে, আমার তা এখানে খরচ করা ঠিক হচ্ছে না। আমার দায়িত্বগুলো প্রথমে। প্রতিটি টাকা খরচ করার সময়েই আব্বুর চেহারাটা ভেসে ঠছিলো চোখের সামনে। প্রতিবার। ভয়ানক কোনো দুঃস্বপ্নের মত, নিজের উপর প্রচন্ড ক্ষোভ হচ্ছিলো। পরিবারের প্রতি আমার সকল ঋন, বা ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়ার সময় আমার। এমন নয় যে ট্রিপে বেরিয়ে আমি এসব ব্যাপারে ভেবেছি। তার অনেক আগে থেকেই নিজের সাথে আমার এই মানসিক দ্বন্দ। হৃদয়ের সকল প্রশ্ন, আর তার উত্তর খুজেপেতে আমার প্রচন্ড এক অসহায়ত্ব। যেই জীবনের স্বপ্ন এতদিন বাচিয়ে রেখেছে আমাকে, তা কি নিতান্ত স্বপ্নই রয়ে যাবে? জীবনের সব বিপরীতমুখী স্বপ্নগুলো আমাকে যে বাস্তব করতেই হবে!কিন্তু, কিভাবে? আমার ধারনা, এই প্রশ্নের উত্তর আমি পাবো সেই দক্ষিণে, পিছু হটে নয়। গোয়ারের মত দক্ষিণে এগিয়ে যাচ্ছি। সাইকেল চালানোর সময়, অধিকাংশ সময় মথায় চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে আমার। তাতে আপত্তি নেই। কিছুক্ষণের জন্য হলেও সব ভুলে থাকতে পারছি। ওটাও কম কি।
এই অবস্থা নিয়েই প্রথম দিনগুলো কেটে যেতে লাগলো। ঘোরের মাঝে এগিয়ে যাচ্ছি, তারমাঝে, প্রথম দুইদিন ছিলো আমার জন্য দুর্দান্ত সুন্দর। প্রথম দিনটির কথা বলি।
কলকাতা ছেড়ে আলমপুরের কাছে গিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৬ তে উঠেছিলাম। তখনও জানতাম না, ১৬’র সাথে আমার লম্বা প্রেম কাহিনী অপেক্ষমান! প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে গিয়ে, হাইওয়ের প্যারালাল একটা পথ ধরি, যেটা ছিলো মোস্টলি মেঠোপথ। মাঝে একটা খাল বয়ে গেছে একেবেকে, তার দুইপাশ দিয়ে দুইটি পথ। আমি খালটাকে হাতের বায়ে রেখে চালানো শুরু করলাম। সেদিন সকালে এক ফলের দোকান থেকে এক প্যাকেট খেজুর, একটা বড় আমসত্বের টুকরো, আর ৩০০ গ্রাম চেরী ফল কিনে নিয়েছিলাম। কলকাতা থেকে নিয়েছিলাম এক বয়াম ড্রাই ফ্রুটস মিক্স। ইচ্ছা- এবার যত কম সম্ভব টাকা খরচ করে, এনার্জি ব্রেশী প্রিজার্ভ করা। তো, তখন পর্যন্ত, আমি সেদিন কোনো হোটেল থেকে কুকড ফুড খাইনি। মাথার মধ্যে চিন্তাটা এমনঃ আমি যত বেশী সম্ভব টাকা বাচাবো। ফর ব্যাক হোম, আমি একভাবে থাকলেই হলো। যত কম সম্ভব, যত কম সম্ভব।
তবে শেষ বিকেলে ভয়ানক ক্ষুধা পেলো, ওই ছোট রাস্তায়। পনেরো কিলোমিটারের মাঝে কোনো বড় বাজার নেই, অমন এক পরিস্থিতিতে আমার সামনে পড়েছিলেন এক পানিপুরিওয়ালা। ওহ! কি দারুন খুশী যে হয়েছিলাম তাকে দেখে! গপগপ করে কতগুলো যেনো খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু, তাও হিসাব করে! এখন বলে রাখি, সেদিন সারাদিন, আমি ৪৬ রুপি খরচ করেছিলাম।


সেই পানিপুরিওয়ালা, আর ছোট পথ..
পানিপুরি খাওয়া হতেই, প্রাণ ফিরে পেলাম ধড়ে। এবং অতক্ষণে সন্ধ্যা ঘনাতে বসেছে। শীতকালে এই এক সমস্যা। ঝপাস করে ঝাপি ফেলে দেয় সুর্য্যিমামা, শেষবেলায় একটু অপেক্ষাও করে না। তাবু করার জন্য জায়গা খুজছি, অমন সময় এক্কটা মন্দির চোখে পড়লো! মন্দিরের নাম দেখে ওই এলাকায় ক্যাম্পিং এর শখ চলে গেলো আমার। ‘মা মনসার মন্দির’। সাপের চেয়ে বেশী ভয় আমি আর কিছুকে পাইনা সম্ভবত।
মন্দির ফেলে আরও প্রায় দুই কিলোমিটার সামনে পৌছে একটা ব্রিজ পড়লো, ছোট্ট কালভার্ট, পথ চলে গেছে তিনদিকে। ওখানে দাঁড়িয়ে ম্যাপ খুললাম, আর ঠিক তখনই, কানে মধুর বর্ষণের মত শোনালো সেদিনের মাগরীবের আজান। কি ভীষণ খুশী যে হলাম! আমি তখনই সাইকেলের মুখ সেদিকে ঘুরিয়ে দিলাম। কাছাকাছি গিয়ে দেখেছিলাম, ওটা একটা বিরাট বড় মাদ্রাসা। আমি মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে হাফ প্যান্ট পরেই ঢুকে গেলাম যখন, ততক্ষণে মাগরীবের নামাজ শুরু হয়ে গেছে, আর, আমার খেয়াল এলো, আমি এখানে এই কাপড়ে থাকতে পারিনা আর এক মুহুর্ত ও।
তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে ফুল প্যান্ট বের করে পরলাম, এরপর, অপেক্ষায় রইলাম। আমি জানিনা, কি ঘটবে। কারন, ভারতের মসজিদ মাদ্রাসাগুলোতে দুই ধরনের ঘটনা ঘটে- অনাহুত অতিথিকে অবিশ্বাস্য ভালোভাবে আপ্যায়ন করা হয়, আর দুইঃ খুব ভালোভাবে সম্ভাষণ, অভ্যর্থনা জানানো হলেও, রাতে থাকতে দেয়া হয়না, নিরাপত্তার কথা ভেবে। এই ক্ষেত্রে কোনটা হবে? ইতিমধ্যে একটা লোকের সাথে কথা হলো আমার। ছোটখাটো, গোলগাল চেহারার, টুপি পরা, সুন্দর দাড়িওয়ালা মানুষটা একটু দ্বিধা করে বললেন, প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলতে। আমি তাই করলাম। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম মুরুব্বিদের দিকে। তাদের কথা শুনে বিরাট এক স্বস্তির শ্বাস ফেলছি দেখে হাসলেন। তারা, আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইলেন, আমি ওটা দেখাতে, একজন পরামর্শ দিলেন, আমি যেনো কাছের থানায় গিয়ে, আমার উপস্থিতির কথা রিপোর্ট করে আসি, ওতে দুই পক্ষের জন্যই ভালো। আমি একমত হলাম। টুক করে মাগরীবের নামাজটা পড়ে নিয়ে, ল্যাপটপটা বের করলাম ব্যাগ থেকে, আর টুকুর টুকুর করে টাইপ করে নিলাম, আমার এবার ভারত ভ্রমনের উদ্দেশ্য, আর রুট সম্পর্কে। এরপর, জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে, সেই প্রথম দেখা ছোটখাটো মানুষটার সাথে এগিয়ে গেলাম একটা মোটরবাইকের দিকে। উনি, আমি, আর, যেই লোকটা পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ স্টেশন যাবার, আমরা তিনজন চেপে বসলাম সেই বাইকে। আমি বললাম, আমিতো সবচে হালকা পাতলা, আমি শেষে উঠি! একথা শূনে হাসলেন ওনারা! শেষে তাই হলো। কিন্তু, দেখা গেলো, বাইকে বেশী তেল নেই। ওকে, একটু ঘুরপথে যেতে হবে তাহলে, ফিলিং স্টেশন হয়ে। তারও আগে, আমার টাইপ করা পেপারটা প্রিন্ট করার জন্য পাশের বাজারের এক প্রিন্টের দোকানে থামা হলো। প্রিন্টের কাজ চলতে থাকাকালে আমরা বসে রইলাম না। কত কথা হতে রইলো, যেনো, বহুদিনের পুরনো কোনো বন্ধু। আমি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছি, যতবারই ভারতের কোনো মসজিদ/মাদ্রাসায় আমি গিয়েছি। প্রিন্টের দোকানের পাশেই একটা কাবাবের দোকান। গোলগাল লোকটা, আমাদের জন্য বিফ কাবাব রোল, আর চা অর্ডার করলেন। হুট করেই আমার মনে পড়লো, আমার কি প্রচন্ড ক্ষুধা লেগে আছে! খুব তৃপ্তি করে খেলাম। আর, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ওই প্রথম ভারতে চা খেয়েছিলাম আমি।
এই পর্ব শেষে আবার মোটরবাইক রাইড। প্রচন্ড ঠান্ডায় কান জমে গেলো! তবে আমরা পুলিশ স্টেশন পৌছুলাম। এই অজপাড়া গায়ের পুলিশম্যানটিকে যদিও আমি বোঝাতে ব্যার্থ হলাম সামগ্রিক পরিস্থিতি, তবে, উনি আমার পাসপোর্টে পেজ স্ক্যান করে রাখলেন, মাদ্রাসার লোকদের আমাকে রাখার অনুমতিও দিলেন, তবে, কিছুতেই উনি আমার ওই পেপারে তার থানার স্ট্যাম্প দিয়ে সীল মারবেন না, আমি আমার আগের ট্রিপের প্রায় ২০ টি ভারতীয় পুলিশ স্টেশনের সীল দেখানোর পরেও তার যুক্তি- আমি সাইকেল অ্যাক্সিডেন্টে মরে গেলে পরে ওনার কি হবে? ওনাকে এসে যদি ধরে বাংলাদেশ সরকার? আমার নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না ঠিকই, তবে, হাসিমুখে বিদায় নিলাম ওখান থেকে।
প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরের মাদ্রাসায় ফেরত এসে, আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। ছাত্রদের এখন অবসর সময়। আর ওই মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা ১১০০+! এবং, আমার যার সাথেই দেখা হচ্ছে, সেখানে কিছুক্ষণের মাঝেই ভীড় জমে যাচ্ছে, আমি তাদের কারো সাথে কখনোই কথা বলিনি, কিন্তু তারা কিভাবে যেনো খবর পেয়ে গেছে, আমি বাংলাদেশ থেকে সাইকেল চালিয়ে এসেছি, অমুক জায়গায় যাবো, আর আজ রাতে ওদের সাথেই থাকবো! আমি এখনো ভেবে পাইনি, খবরটা ছড়ালো কিভাবে! আমি ওই কথাটা পুরো মাদ্রাসার শূধু তিনজনকে বলেছি!
সে যাই হোক, ছেলেগুলোর কথা, আর নির্লোভ, ইনোসেন্ট প্রশ্নগুলো শুনলে, যেকারো মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। আমি খুব হাসিমুখে ওদের সব কৌতুহল পুরন করলাম। আমার, কি যে ভালো লাগছিলো, তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না। ভীড় এড়িয়ে, আমি, আর গোলগাল লোকটা, যার নাম আমি এখন জানি, মন্তাজ ভাই, প্রিন্সিপালের রুপে গেলাম আমাদের থানার অভিজ্ঞতা জানাতে। হুজুর সব শুনলেন, এরপর হাসিমুখে বললেন, মন্তাজ ভাইয়ের রুমেই যেনো আমাকে থাকতে দেয়া হয়, আর, রাতে যেনো খাবার ও খাওয়ানো হয়! এবার সত্যি ভীষণ আবেগাপ্লুত হলাম আমি। তাবু করার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম, আর, খাওয়ার জায়গা কোথায় আছে জিগ্যেস করবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম পরের কথাতেই। তা আর হলো কই। মন্তাজ ভাই অলিগলি ঘুরিয়ে আমাকে পুরো মাদ্রাসার একটা টুর দিলেন। ১১০০ মানুষের খাবার যেখানে রান্না হয়, সেই জায়গা দেখালেন। রান্না হয়ে গেছে। পুরো এলাকা ম ম করছে সুবাসে। আমার আরেক বার মনে এলো, আমি ক্ষুধার্ত! ঘুরতে ঘুরতে মন্তাজ ভাইয়ের রুমে এসে আমি আমার বিছানা বুঝে নিলাম। এরপর, এশার নামাজ শেষে, মন্তাজ ভাইকে বলে, আমি বসলাম আমার ল্যাপটপ নিয়ে, এবার ওটাতে আমার আয়-রোজগার সামলাবার পালা প্রায় দুই ঘন্টা মাদ্রাসার উঠানের এক কোনে পেতে রাখা টেবিল চেয়ারে বসে কাজ করলাম বটে, তবে, ছেলেপেলেদের আগ্রহ, আর কৌতুহল মেটাতে গিয়ে, কাজে অত মন বসলো না। তার মাঝেই আরও কতগুলো হুজুর এলেন, আমার ওয়াটসঅ্যাপেও অ্যাড হয়ে গেলেন তারা। বাড়ি নিয়ে, বাংলাদেশ নিয়ে, কত কথাই না তাদের সাথে হলো! এর মাঝে মন্তাজ ভাই এসে ডাক দিলেন, বাজারে যাবো নাকি, তার একটা কাজ আছে। তার সাথে আরেকবার বাজার ঘুরে এলাম। এরপর, বাড়িতে ফোন দিয়ে, আমার ভালোবাসার মানুষদের নিজের অবস্থার কথা জানিয়ে নিয়ে, আমরা বসলাম রাতের খাবার খেতে। মন্তাজ ভাইয়ের কামরাতে, তিনজনের খাবার দিয়ে যাওয়া হয়েছে আজ। আমি, মন্তাজ ভাই, আর আরেকটা ছাত্র, যার বাড়ি বিহারে, তিনজনে একসাথে, একটা বড় থালায় ভাত আর তরকারি ঢেলে নিয়ে বসলাম খেতে ফ্লোরে আসন গেড়ে। ওহো! তরকারী বলতে, গরুর মাংস ভুনা, তার যে পরিমান, তারচেয়ে ভাত কম! আক্ষরিক অর্থেই ভাতের চেয়ে বেশী মাংস, আর মন্তাজ ভাই বললেন, আবার কবে খেতে পাবো না পাবো, তার তো ঠিক নেই, আল্লাহ যেহেতু আজকে আমাকে সুযোগ দিয়েছেন, আমি যেনো প্রাণভরে খেয়ে নেই। উনি ঠিকই বলেছিলেন, সেদিনের পর থেকে আজ প্রায় তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও, আমি গরুর মাংস খেতে পাইনি। আমি সেদিন অত বেশি খেয়েছিলাম, যে, এখনও আমার বিশ্বাস হতে চায় না!
সেরাতে ঘুমিয়েছিলাম আমরা প্রায় রাত ১১ টায়। সব ইলেকট্রিক ডিভাইস ফুললি রেডি করে, সকালে মন্তাজ ভাইকে দিয়ে আমার একটা ছবি তুলিয়ে, আমি যখন যাত্রা শুরু করি আবার, ফেলে আসা রাতটাকে অনেক বেশী বড় মনে হচ্ছিলো, এবং, ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে ছাত্রদের উতসুক উকিঝুকির দিকে একটু তাকিয়ে মুচকি হেসে নিয়ে, আমি অনাড়ম্বড়ভাবে বেরিয়ে গেলাম পাশকুড়ার ওই মাদ্রাসা ছেড়ে।
তবে, সেই রাতটার কথা আমি ভুলবোনা কখনোই।


মন্তাজ ভাই, বিদায়ের সময়

সেদিনটা ছিলো একদম অন্যরকম। আমি হাইওয়ে ছেড়ে চলে যাবো যাবো করছি। প্রথম সুযোগেই নেমে গেলাম একটা আঞ্চলিক পথে। কিন্তু…ভীষণ অদ্ভুতভাবে, দুই কিলোমিটার পথ ওই রাস্তায় এগোনর পর, আমার আচমকা মনে হলো, আমি আসলে ন্যাশোনাল হাইওয়ে ১৬ অনেক বেশী মিস করছি। হাইওয়ের বিচিত্র, বিরাট দানবীয় সব ট্রাকগুলো আমি মিস করছি, কারন ট্রাক ড্রাইভারদের জীবন আমার ভীষণ রোমাঞ্চকর বলে মনে হয়, বিশেস করে ভারতের মত বিরাট দেশের বিরাট সব ট্রাক ড্রাইভার, যারা ট্রাক থামিয়ে রান্না করে খায়, ট্রাক থামিয়ে ঘুমিয়ে প্পড়ে ককপিটটাকে বিছানা বানিয়ে, নতুন নতুন পথের পাশ বিচিরর ভারতের নানা এলাকার, নানা ধরনের ধাবাতে, কত ধরনের খাবার তারা খায়! আমার নিজেকে তাদের জায়গায় বসিয়ে ভাবতে খুব ভালো লাগে, আর আমি ওটা খুব মিস করছি।
আর মিস করছি ধাবাগুলো,। ওগুলো ভীষণ মায়াবী, আর অনেক বেশী আপন বলে মনে হয়।
আর মিস করছি ভারতীয় এক্সপ্রেসওয়ের দুর্দান্ত রাজসিক দেখতে আচমকা আবির্ভাব হওয়া সারপ্রাইজিং সেই মোড়গুলো, যেখানে দাঁড়িয়ে, চারিদিকের দিগন্ত দেখা যায়,যেখানে দাঁড়িয়ে এলোমেলো বাতাসে চুল উড়তে থাকাটাকে ভীষণ উপভোগ করে, মনের আয়নার দিকে একটাবার তাকানো যায়।
আর মিস করছি হাইওয়ের প্রানচঞ্চলতা।
আমি তখনই হুট করে ঘুরিয়ে নিলাম সাইকেল। একদম ইউটার্ন। যেখান থেকে ছেড়ে গেছিলাম ১৬ কে, ওখান দিয়েই আবার উঠে গেলাম। মাইলের পর মাইল, বিস্তীর্ন প্রান্তর পাড়ি দিয়ে গেলাম, আর জীবনে প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম,ওপেন হাইওয়ে কাকে বলে ওই হাইওয়ের মাইলপোস্টে হাজার মাইল দুরের জনপদের নাম লেখা থাকে! আমি ওই হাজার মাইল দুরের জনপদটাতেই সত্যি একদিন পৌছে যাবো, সেকথা ভাবার যে শিহরন, ওটাও আমার ওই প্রথম!
সুতরাং, দক্ষিনযাত্রা পুর্নবেগে শূরু হলো।
আমি তখন অনুভব করলাম, আর আর চাইলেও এই পথ ছেড়ে যেতে পারবো না।



সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাবার পরেও সাইকেল চালাচ্ছিলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কোথায় থাকবো। তখন আচমকা মনে এলো, ফিলিং স্টেশনে তাবু করতে পারি। হাইওয়েতে এটা সবসময়েই পাওয়া সম্ভব। ভাবনাটা আসার প্রায় ১০ মিনিট পর আমার সামনে আবির্ভুত হলো, বালাজি ফিলিং স্টেশন। আমি যতটা জড়তা নিয়ে জিগ্যেস করলাম, যে আমি আজ রাতে ওই প্রাঙ্গনে তাবু ফেলতে পারবো কিনা, ততটাই সহজভাবে ভাইটা বলে দিলেন, হ্যা, নিশ্চই! আমি ভীষণ খুশি হয়ে গেলাম। আমার বাড়িগুলোতে কল দিলাম। ওই ঠান্ডার মাঝেই, ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলাম। সে, ঠান্ডা যতই হোক, আর গোসলের ব্যাবস্থা যেমনই হোক, রাইড শেষে গোসল না করলে আমার ঘুম হয়না সেরাতে! আর, বালাজি ফিলিং এর গোসল করার জায়গাটাও ছিলো দুর্দান্ত। চনমনে মন নিয়ে হাটতে হাটতে কাছের একটা ধাবাতে গেলাম আমি, ওখানে গিয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম! সবজি ভাতের থালি, আর পাপড়। অযথাই অনেকক্ষণ বসে ছিলাম, খাওয়া শেষে মিস্টিও খেয়েছিয়াম। রসগোল্লা। যতটা আশা করেছিলাম, তারচেয়ে মজাই ছিলো! কিছুক্ষণ বসে বসে টিভিতে চলতে থাকা সিনেমাও দেখতে লাগলাম!
এরপর, ফিরে এসে যখন তাবু ফেলতে যাবো, তখন একসাথে দুটি ঘটনা ঘটলো। একঃ একজন একজন করে, তিনজন মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। তাদের মাঝে একজন আমি গোসল করার সময় আমাকে সাহায্য করেছিলেন বালতি, আর মগ খুজেপেতে। তারা বলাবলি করছেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আস্তে আস্তে আমার সাথেও কথা বলা শুরু করলেন কিন্তু, দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা, আমাকে তখন স্তব্ধ করে দিয়েছে। এবার তখন পর্যন্ত তাবু ব্যাবহার করতে হয়নি আমার। তাবু খুলে দেখা গেলো, যেই খুটিগুলো তাবুর মেরুদন্ড, ওদের দড়ি ছিড়ে গেছে। এক কথায়, আমার পক্ষে আর তাবু ফেলা সম্ভব না তখন। ঘামা শুরু করলাম আমি রীতিমত, আর, ভাবতে শুরু করলাম, তাবু কিনতে কত টাকা লাগবে তাহলে? কোত্থেকে কিনবো? আমার অন্তত পনেরো-বিশ দিন চলার মত পয়সা খরচ হয়ে যাবে তাহলে।
মনের মাঝে ঝড় চলছে, আর আমি দড়িগুলো জোড়া দেয়ার চেষ্টা করছি, একইসাথে, ওই তিনজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু, কাজটা ভীষণ কঠিন। আমি শূধু হু হা করে যাচ্ছিলাম। তারা অনেক কথা বলছিলো, অন্য সময় হলে, আমি খুব উপভোগ করতে পারতাম তাদের সঙ্গ। হঠাত করে তাদের কারও হুশ হলো, আমার সাথে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। জিগ্যেস করে জেনে নিলেন, আর বুঝলেন, আমার আজ রাতে খোলা আকাশের নীচে থাকা লাগবে, পরে কি হবে, তাতে আর কি আসে যায়!
আস্তে আস্তে তারাও উদ্বিগ্ন হতে শূরু করলেন। যদিও, আমাকে স্বান্তনা দিয়ে যাচ্ছেন, যে, আমি একটা উপায় বের করেই ফেলবো। এরমাঝে, তারা বলাবলি করছেন, তাবু না হলে আমি কোথায় থাকতে পারি? ফিলিং স্টেশনের ওরা কি বিছানা দেবে? আর না থাকলে? কোথায় যাবো? তারা তো তিনজনেই আমার মত পথচারী, তারা আমার জন্য সর্বোচ্চ কি করতে পারেন? তখন কানুদাস ভাই বললেন, দাড়াও, তোমারে এরকম চিকন দড়ি যোগাড় করে দিলে হচ্ছে? আমি তখনও বেশ ঘোরের মাঝে, তাই ঠিকমত বুঝতে উঠতে পারছিলাম না, আসলেই কি যেকোনো দড়ি হলে, তাবু করা সম্ভব কি না। আসলে, আমি একটু বেশী প্যানিক করেছিলাম, এখন পিছনে তাকিয়ে তাইই মনে হচ্ছে। তার কারন হলো ওইযে – পথের সাথে আমার সেই দুরত্ব…
প্রায় আধাঘন্টা ওভাবে এটা ওটা ভাবা, আর আমার দড়ি জোড়া দেয়ার চেষ্টা ব্যার্থ হবার পর, আমি হাল ছেড়ে দিলাম, আর তারা তিনজন অ্যাকশনে এলেন। কানুদাস ভাই তার মোটরবাইকে করে আমাকে নিয়ে চললেন কাছের বাজারে। বললেন, চেষ্টা তো করা দরকার, চলো দেখি কি হয়। প্রচন্ড শীতের রাতে আরেকটা বাইক রাইড। কিন্তু আমার সেদিন ঠান্ডা লাগছে না। বাজারে গিয়ে, অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ঘটলো, অধিকাংশ দোকান ই বন্ধ হয়ে গেছে। আমি তা আগেই জানতাম। কানুদাস ভাই তাতে কিছু মনে করলো না। শূধু বলে যাচ্ছে, আরে, তোমার ঘুমের ব্যাবস্থা না করে আমরা যাচ্ছি না। কথাটায় যতটা ভরসা পাওয়া যায়, ততটা পেলাম না আমি! আসলে, নতুন তাবু কিনতে হবে, সেই চিন্তাটা আমার কাছে বিরাট ভীতিকর ছিলো। একটা দোকানে দাড়ালেন ঘ্যাচ কএ ব্রেক কষে। না, এটা তো দড়ির দোকান না। উনি এক প্যাকেট বড় চানাচুর কিনে দিলেন। ব্যাগের মাঝে অতবড় প্যাকেট কোথায় রাখবো ভেবে যখন মানা করলাম যে ভাই লাগবে না লাগবে না, উনি দুঃখ দুঃখ ভংগি করে বললেন, এতকিছু নিছো, এদ্দুর একটা জিনিস আটবে না? আমি ওই অবস্থাতেও হেসে ফেললাম। নিলাম প্যাকেট টা। উনি বললেন, একদিন ওনার কথা ভুলে যাবো, কিন্তু, এই চানাচুরটা যতদিন আমার কাছে থাকবে, অতদিন তার কথা ভুলবো না। খাওয়ার সময় মনে পড়বে। এই, একটু কিছুদিন যাতে মনে থাকে, সেজন্যই তার অত চিন্তা। ওই মুহুর্তে, আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হলো। নিজের সমস্যা নিয়ে এত বেশি চিন্তা করি আমি, এতক্ষণ ধরে এই মানুষগুলো আমার জন্য আটকে আছে, আমি তাদের সাথে ঠিকমত কথাই বলছি না!
ফিরে এসে কানুদাস ভাই আমাকে নামিয়ে দিলেন। আমি বললাম, ওনারা যাতে চলে যায় এখন, অনেক রাত হয়ে গেছে। আমাকে পাত্তা না দিয়ে তিনজনের দ্বিতীয়জন, বললেন, কোনো একটা জায়গার কথা, যেখানে গেলে, দড়ি পাওয়া যাবে। কোনো এক দোকানদারের বাড়ি, যে তাদের পরিচিত। তাই হোক তবে। কানুদাস ভাই একা গেলেন এবার। আর, আমাকে তারা বারবার বলে যাচ্ছেন, আমি আরাম করে ঘুমাবো, বাড়িতে কল দিয়ে কথা বলবো, এটা না দেখে তারা যাচ্ছেন না।
কানুদাস ভাই যখন ফের এলেন মিনিট দশেক পর, তার হাতে চিকন নায়লনের দড়ি। আমি তখন সব চিন্তা ভুলে গেছি। যা হচ্ছে, ওই ঘটনার সাথে মিশে গেলাম। আমি ক্রাফটসম্যানশিপে মোটেও ভালো না। দড়িটা দিয়ে কিভাবে তাবুটা ঠিক করা যায়, আমার তাবু হওয়া সত্বেও আমার চেয়ে বেশি ভালো বুঝে ফেললেন ওনারা। তিনজনে মিলে হাত দিলেন এবার, একটা করে ক্ল্যাম্প দড়িতে গাথা হচ্ছে, আর অনেক খুশীতে চিয়ার করে উঠছেন তারা। একপাশেরটা হয়ে গেলো, আমি তাবুর এক স্ট্যান্ড দাড়া করে ফেললাম। দ্বিতীয়টা হয়ে গেলো যেনো দেখতে দেখতেই, তারা তিনজন এখন প্রফেশনাল! কানুদাস ভাই দড়ি নিয়ে আসার ২০ মিনিট পরে কিভাবে যেনো দেখা গেলো, আমার তাবুটা রেডি, আমি এখন ওর মাঝে গিয়ে ঘুমাতে পারি! চানাচুরের প্যাকেটটা খুলে অনেকখানি মুখে দিলাম। পানি খেলাম ঢকঢক করে। তাদের তিনজনের মুখে প্রশান্তির হাসি। ব্যাস, এইতো! আমার পুরো ট্রিপটা বেচে গেলো আসলে, ব্যাপারটা যতই নগন্য মনে হোক। কারন, আমি নিশ্চিত, তারা না থাকলে, আমি কখনোই তাবুটা ঠিক করতে পারতাম না, আমি কোনোভাবে হাতে দড়ি পেয়ে গেলেও। অনেক কারিকুরি তারা করেছেন, যা আমি শিখে নিয়েছি। আর কোনোদিন ভুলবোনা। গত তিন সপ্তাহ আমি টুটে যাওয়া তাবুটা যেভাবে ব্যাবহার করছি, নিজেকে তাবু বিশেষজ্ঞ বলে মনে হয়, আর মনে হয়, যে কোনো সমস্যাই হোক না কেনো, আমিই ঠিক করে নিতে পারবো তা। নিজেকে অনেক বেশী স্বাবলম্বী মনে হয়, অনেক বেশী। সেটা শুধু তাবুর জন্য না। প্রতিটি ক্ষেত্রে, ওটা ছিলো আমার জন্য একটা কিক।
রাত প্রায় সোয়া এগারোটা, তারা তিনজন যখন বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে তাদেরকে আমার জীবনের সবচেয়ে উষ্ণ আন্তরিকতার সাথে সম্ভবত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলাম। আর অবশ্যই, তাদের সাথে ছবি তুলে রাখতেও ভুলিনি। কানুদাস ভাইয়ের বয়স ৩২। মিলন দাস ভাইয়ের ৩৪, এবং কৃষ্ণদাস ভাইয়ের বয়স ৩৬। আমি তাদেরকে কখনোই ভুলে যাবো না। তারা তিনজন, যারা আমি আরাম করে ঘুমাচ্ছি, তা না দেখে বাড়ি ফেরেননি সেরাতে।


বাম থেকে কানুদাস ভাই, আমি, মিলন ভাই, আর কৃষ্ণ ভাই
পশ্চিমবঙ্গের গল্প প্রায় শেষ। তারপর আর মাত্র ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণেই ছিল উড়িষ্যা সীমানা। তবে, উড়িষ্যাতে পৌছে প্রথম রাতেই এসেছিলো চরম অনাহুত সেই রাত…সেরাতের গল্প, এবং আরও কত দুরন্ত রাত, আজ তবে তোলা রইলো!