জুন '২১
ফ্যান্টাসির দক্ষিণ আমেরিকা
কর্ডিয়েরা ব্লাংকার উত্তর, ও দক্ষিণের লোকেরা স্প্যানিশে বলে, স্প্যানিশে ভাবে। তাদের গতিহীন নির্ভার জীবনের গল্পগুলো নিয়ে স্প্যানিশে গান লেখে, বুনো আলপাকাদের সাথে গা ছেড়ে আড্ডা দেয়, মায়াবী এক সুর তাদের কন্ঠে। আন্দিজ পর্বতমালার স্প্যানিশ নামের চুড়াগুলোতে যখন শেষ বিকেলের সুর্যরশ্নি এসে একটুখানি বসে, সেই রাঙা আভায় তাদের মেয়েরা বালির তৈরী ইটের আঙিনায় বসে রাধে পুকা পিকান্তে - আলু আর মাংস দিয়ে টকটকে লাল রঙের তরকারী রাধতে পারে কেবল সেই ৭৭ ডিগ্রী লংগিটিউডের মায়াচোখের অধিকারীরা!
ব্লাংকার পূর্বগাত্রের ঢাল বেয়ে ঠিক একশ মাইল চোখ ধাধানো সাদাটে পর্বতচুড়া, শ্যামলিমার গাঢ়় সবুজ, আর এক আকাশ অপার্থিব নীল পেরিয়ে তিংগো মারিয়ার জনাকীর্ন এক কফি শপে বসে স্প্যানিশ স্বাদের এক মগ অ্যারাবিকা পান করে হুয়াইয়াগা নদীর এসপ্রেসোর মত ঘোলাটে স্রোতের পানে নির্বাক চেয়ে থেকে একবুক লম্বা নিশ্বাসের সাথে অনুভব করা যায় হাজার মাইল উত্তরে তার ফেলে আসা মা, মহাপরাক্রমশালী আমাজন নদীর মাতাল করা, নেশাধরানো উষ্ণ সুবাস। প্লাজা দে আরমাস দে তিংগো মারিয়ার ঘাসে ল্যাটকা দিয়ে বসে থেকে অদুরের বেঞ্চিটাতে বসা কোনো এক প্রেমময় যুগলের ন্যাকামি দেখে শেষে আলস্য ভেঙে রওনা করা যায় সুদুর দক্ষিনের পথে। কানে তখন বাজতে পারে হৃদয় তোলপাড় করা এক সুর তুলে দেয়া কোনো স্প্যানিশ সঙ্গীত।
সদ্য কৈশোর পেরুনো চপল হৃদয়ের চঞ্চলতা বুকে নিয়ে, নিয়ত আদ্র চোখে প্রকৃতি মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, যাবতীয় পিছুটান, এবং অনুভুতির বাধন ছাড়িয়ে, ব্যাতিব্যাস্ত দুটো হাটুর সকল অবশতার সাথে সখ্য করে নিয়ে দ্বীপ্তিভরা দিনের পর দিন, এক আকাশ তারাভরা রাতের পর রাত হেটে, বুনো আলপাকা, আর তাদের রাখালদের সাথে স্প্যানিশে ভালোবাসার লেনদেন করে হেটে চলা যায় মায়াভরা এই পৃথিবীর কাদামাটি সারাগায়ে মেখে।
সৃস্টিকর্তাকে জীবনটা দান করার জন্য আরেকটাবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মধ্য-পুর্ব পেরুর সান্তা রোজা নামে মিষ্টি কোনো জেলেগ্রাম থেকে গতর খেটে একটা একগাছি, সরু, দ্রুতগতির ক্যানু বানিয়ে নিয়ে ভেসে পড়া যায় আমাজনের প্রধান ধারাবহনকারী উকাইয়ালির বুকে!! সান্তা রোজা থেকে দক্ষিণে আলাদা দুটি মোড় নিয়েছে উকাইয়ালি পুর্ব ও পশ্চিমে মুখ করে- তামবো, এবং উরুবামবা নাম নিয়ে তারা দুজনেই আচমকা বাক নিয়ে চলে যায় দিগন্তের ওপারে। ক্ষুদ্র মানবচোখের অগোচরে ঘন-কালো, ভয়ংকর সুন্দর সবুজের রাজ্য, বাকে বাকে যার শিহরন, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য চোখদুটো শক্ত করে চেপে ধরে রেখে বড় বড় দৃষ্টি মেলে চেয়ে থেকে পরে মাথাঝাকি দিয়ে অশ্রুশিক্ত নজরে দেখা সেই অপার্থিব রাজ্যের প্রতিটি লোকালয়ের বিস্ময়চোখের লোকেরা স্প্যানিশে বলে, স্প্যানিশে ভাবে।
আরও দক্ষিণের পানে সবুজের চাঁদরে ঘেরা, রোমাঞ্চকর ঘোলাপানির স্রোতের আকেবাকে ঘর তুলে যারা থাকে, সেই মাশ্চো পিরোদের নদীর নাম সৃস্টিকর্তার মা। রিও মাদ্রে দে দিওসের অববাহিকা পৃথিবীর যেখানটায়, সেথায় কান পেতে শুনতে পাওয়া যায় সাক্ষাৎ রোমাঞ্চকে, তার নিরন্তর ফিসফিস শব্দটা তোলে পৃথিবীর বৃহত্তম চিরহরিৎ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভুমির দুর্দান্ত অধিবাসীদের প্রশ্বাসের সমষ্টিরা। কোনো এক জ্বলন্তচোখা জাগুয়ার, অথবা চতুরচোখা অ্যানাকোন্ডা যখন লুকোচুরি খেলছে কোনো এক সরুচোখা আর্মাডিলো, এবং আদুরেচোখা ক্যাপিবারার সাথে, বুকের মাঝে নিয়ত কম্পনের সাথে একগাছি সরু ক্যানুটার আশ্রয়ে ভেসে চলা যায় দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম শিকারীদের চারনভুমি ধরে, দুইবেলা পেটের যোগান দিতে খেলা যায় আমাজনের শিকারীদের শিকারতন্ত্রের সাথে বাজি, জীবনটাকে ফিরিয়ে নেয়া যায় সহস্রশতাব্দী পিছিয়ে সমগ্র মানবজাতির পুর্বপুরুষদের অন্ধকার, একাকী, নির্জন, নিঃশব্দ রাতগুলোতে, যে রাতের অন্তরীক্ষে ছায়াপথের ঔজ্জল্যে তাকে মনে হতো জানালা দিয়ে দেখা শরতের প্রভাতের প্রভাকরের প্রথম রশ্নি!
সৃষ্টিকর্তার মায়ের পুরোটা গাত্র বেয়ে দক্ষিণের সাতশ মাইল আমাজন রেইনফরেস্ট পাড়ি দিয়ে স্প্যানিশ না বলা, সভ্যতা হতে বিচ্ছিন্ন সব ভোলাচোখের লোকেদের লোকালয় শেষ হয়ে একদিন ফের হাজির হতে শুরু করবে সাদাটে বরফের সাথে নীলচে আকাশের সেই অপার্থিব রঙের ক্যানভাসগুলো! কর্ডিয়েরা ব্লাংকার দক্ষিনতম সেই স্প্যানিশ নামের জনপদগুলোর স্প্যানিশ বলা মায়াচোখের অধিকারীরা রোকোতো নামের রঙিন গোল মরিচের বোটা কেটে ফাপা দেহে শুকানো গোশত, জলপাই, রসুন, পেয়াজ, কিশমিশ ঠেসে দিয়ে দুধ আর ডিম মেশানো মশলা দিয়ে রাধে রোকোতো রেইয়্যানোঁ। প্রথম কামড়ে চিৎকার করে ওঠার মত ঝাঝালো, অনুভুতিপ্রবন সেই গোলকটা খেয়ে শেষে স্প্যানিশে লেখা মানচিত্র ধরে খুজে ফেরা যায় ইনকা সভ্যতার জন্মভূমি, তাবৎ দুনিয়ার উচ্চতম নাব্য জলাধার, দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম লেক, লেক তিতিকাকা, যেই হ্রদের উজ্জল সাদাটে, বিখ্যাতভাবে নিশ্চল, আয়নার মত পটভূমিতে প্রতিফলিত হয় আন্দিজ পর্বতের স্প্যানিশ নামের চুড়াগুলো।
আমার প্রিয় ইতি, দক্ষিণযাত্রার সেই তো কেবল শুরু! তুমি আমার কাছে দক্ষিণ আমেরিকার গল্প শুনতে চাও? চলো, দুই মগ এসপ্রেসো হাতে নিয়ে, এই ঢাকা শহরের কোনো এক ঘিঞ্জি গলি থেকেই বসন্তের এই বিকেলে সাই করে উড়ে যাই আমরা আন্দিজের কোনো এক স্প্যানিশ নামের উপত্যকায়....