বেলুনের কারাগার ও ভণ্ডামীর দিনে: বঞ্চিত লাঞ্ছিতদের রাজত্বের স্বপ্ন!


রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষভাবে খুন করার ক্ষমতা নেই। তাকে খুনী বানিয়ে দেয় ওইসব লোকেরা, যারা ভীষণ অলস, লোভী, এবং অকৃতজ্ঞ। এবং দেশচালনায় যারাই যায়, তারাই যেনো এমন হয়ে যায়! এখানেই আসছে কাহিনীর মুল মোচড়। যেই সমাজে জ্ঞানের চর্চা হতো, সেই সমাজের সোনালী দিনের এক বাসিন্দা অ্যারিস্টটল যুগের পর যুগ ধরে মানুষ, সমাজ, এবং রাজনীতি বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন দেশ চালানোর জন্য আমাদের দরকার বোকা, কোনো বুদ্ধিমান মানুষ না। কারন, আমাদের সমাজ মানুষের দেহের মত - সেই সমাজের নেতারা মস্তিস্ক নয়, তারা হচ্ছে হৃদয়। আর হৃদয়ের কাজ পুরো তন্ত্রকে একসাথে রাখা, নাকি মাথা খাটানো। দুনিয়ার অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই স্থুল মস্তিষ্ক, এবং ছোট মনের, তারা দিলদরিয়া হতে পারে না। তারা জনগনের আকাংখাকে দেখতে পায় না, বরং, মুখোশ পরে থাকতে পারে তাদের সবচে ভালো বন্ধুর, নিজের স্বার্থের, এবং দলীয় মতাদর্শের প্রতি সর্বদা অনুগত, সর্বদা একপাক্ষীক, তাতেই তাদের স্বার্থকতা। মাথা খাটাবে তারা, যারা কথা বলতে পটু নয়, পটু আসল কাজে। দেশগঠনে, দেশপ্রেমে। সরকার? সে তো শুধু এক মাধ্যম মাত্র। জনতাই শক্ত...


বেলুনের কারাগার ও ভণ্ডামীর দিনে: বঞ্চিত লাঞ্ছিতদের রাজত্বের স্বপ্ন!



বঞ্চিত-লাঞ্চিতদের জন্য মনটা ছটফট করে সবসময়। স্বপ্ন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্বীয় দুর্দশা, ব্যাক্তিগত দায়িত্বের ফর্দ চাপা পড়ে যায় মানবজাতির অসহায়ত্ব, সীমাহীন লোভ ও জীবনের অপচয়ের পর্যবেক্ষণে। নিজেকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলি, ঘুমের মাঝে প্রায় পুরোটা সময়ই সেসব নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকি, আমার মানসিক স্থিতিশীলতা এমন এক সুক্ষ্ম রেখায় এসে দাড়িয়েছে যে নির্দিষ্ট পরিবেশ, ঘটনার ক্রম, এবং চিন্তার মানচিত্রের গতিপথ আমাকে মানুষ ঘৃণাকারী, একজন ম্যানিয়াকের মত ভাবতে দিতে পারে৷

সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছুক্ষণ কাটালেই আমি যাবতীয় হুজুগ দেখতে পাই৷ ভীষণ সার্বজনীন একটা ধরন মেনে চলে সবকিছু। যখন কোনো মানুষের, অথবা মানুষগোষ্টীর অত্যাচার অথবা মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়, সবাই খুব করে সেসব অত্যাচারিত অথবা মৃতদের দু:খের গল্প খুজে বের করে দু:খপ্রকাশ করতে থাকে৷ একটা ফুলতে থাকা বেলুনের মত এর পরিধি বিপদজনকভাবে বাড়তে থাকে, এবং আচমকা অন্য কোনো ঘটনা, তা হতে পারে একইরকম বা আরো বেশী হৃদয়বিদারক, অথবা এর চরম বিপরীত, প্রচন্ড তুচ্ছতম কোনো ঘটনা প্রচারিত হতে শুরু করে সেই বেলুন ফুটিয়ে দেয়৷ তখন দু:খে থাকা মানুষগুলো চরম ছ্যাবলার মত আচরণ করছে বলে মনে হয়। আবার নিয়মিত ছন্দে আধুনিক বেশ্যাদের নাচের ছোট ভিডিও, কোনো উপলক্ষ নেই - কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া মাতাতে কোনো হারামখোর সাংবাদিকের সৃষ্ট কোনো অখাদ্য বিষয়বস্তু, অপ্রয়োজনীয় লোকেদের এবং ঘটনা নিয়ে মেতে ওঠা, নিদেনপক্ষে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারনা, এবং তা নিয়ে চর্চা চলতে থাকে। কারন তা চলতেই হবে। 

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে দেশে এটাই চলছে। আসলে তা নয়। ওটা চলছে মানুষজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, এবং সবচেয়ে ভয়ানক অপসম্প্রচার যন্ত্র: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ আপনি জানলে অবাক হবেন, প্রত্যেকের জন্য একটি বেলুন তৈরী করে রাখা আছে: আপনার অনলাইন দুনিয়া, আপনাকে তারা বিশ্বাস করিয়েই ছাড়বে, যা তারা চায় আপনি বিশ্বাস করুন! দুনিয়ার যেকোনো স্বৈরশাসকের অপপ্রচার থেকেও বেশী ভয়ংকর এই ধাধা। একটা তথাকথিত জনপ্রিয় ভিডিও কত মানুষ দেখে? ওই বেলুনের জগতের সবাই দেখে। কিন্তু, পুরো জাতীর বাস্তবতায়, তা অতি নগন্য। আমার বাপ বারান্দায় বসে বসে যেসব ভিডিও দেখে, আমি জীবনেও সেসব দেখি না। এমন একজন, যে নিজের সময়কে অনেক দাম দেয়, সে যেই বেলুনের অন্তর্গত, একজন অলস মানুষ কখনোই সেই বেলুনের জিনিস দেখবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার যারা স্রষ্টা, তাদের কোনো নীতিশাস্ত্র নেই, নেই বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব, তাদের দরকার শুধু টাকা, এবং প্রভাব, বিনিময়ে তারা পুরো দুনিয়া বলি দিতে প্রস্তুত। 

আজ বাংলাদেশে দু:খ, অভিযোগ, এবং সরকারকে গালিগালাজ চলছে। ছ্যাচা খেয়ে মরে যাওয়া লোকটার বউ বাচ্চাকে দেখে সবাই আফসোস করবে, এবং তার ফেসবুকের পোস্টগুলো ঘেটে আরও একচোট আফসোস করবে। নানান "আহারে" গল্পে সয়লাব হয়ে যাবে, এবং দুইবার ঘুম থেকে উঠে তৃতীয়দিন দুপুর থেকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় মেতে উঠবে কোন রাজনৈতিক দল মাঠ মাতাচ্ছে, বা কোন কিশোরী বেশী পেকে গেছে কারণ ওর বাপ মা মানুষ না৷ তারপরেও, দেশে এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরেও আমার বাপ একইভাবে ভোরে উঠে তার কাজে যাবে। আমার মা আমার সাথে সেইসব বিষয়েই কথা বলবে, যা সে আজীবন বলে। আমার বাস্তব জীবনের ঘটনাগুলো মহাবিশ্বের সাপেক্ষে ঘটবে। এরপর, আবার কোনো একদিন, এইদেশে রাষ্ট্রীয় খুন হবে। আজ যেই লোকটা ছ্যাচা খেয়ে মরে গেছে, তাকে খুন করেছে রাষ্ট্র। 

রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষভাবে খুন করার ক্ষমতা নেই। তাকে খুনী বানিয়ে দেয় ওইসব লোকেরা, যারা ভীষণ অলস, লোভী, এবং অকৃতজ্ঞ। এবং দেশচালনায় যারাই যায়, তারাই যেনো এমন হয়ে যায়! এখানেই আসছে কাহিনীর মুল মোচড়। যেই সমাজে জ্ঞানের চর্চা হতো, সেই সমাজের সোনালী দিনের এক বাসিন্দা অ্যারিস্টটল যুগের পর যুগ ধরে মানুষ, সমাজ, এবং রাজনীতি বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন দেশ চালানোর জন্য আমাদের দরকার বোকা, কোনো বুদ্ধিমান মানুষ না। কারন, আমাদের সমাজ মানুষের দেহের মত - সেই সমাজের নেতারা মস্তিস্ক নয়, তারা হচ্ছে হৃদয়। আর হৃদয়ের কাজ পুরো তন্ত্রকে একসাথে রাখা, নাকি মাথা খাটানো। দুনিয়ার অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই স্থুল মস্তিষ্ক, এবং ছোট মনের, তারা দিলদরিয়া হতে পারে না। তারা জনগনের আকাংখাকে দেখতে পায় না, বরং, মুখোশ পরে থাকতে পারে তাদের সবচে ভালো বন্ধুর, নিজের স্বার্থের, এবং দলীয় মতাদর্শের প্রতি সর্বদা অনুগত, সর্বদা একপাক্ষীক, তাতেই তাদের স্বার্থকতা। মাথা খাটাবে তারা, যারা কথা বলতে পটু নয়, পটু আসল কাজে। দেশগঠনে, দেশপ্রেমে। সরকার? সে তো শুধু এক মাধ্যম মাত্র। জনতাই শক্তি, জনতাই রাষ্ট্র।

তবে আমাদের মত দেশের বাসিন্দাদের অনেক বড় সমস্যা হয়ে গিয়েছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিটি বেলুনের কারাগারে আটকে রেখেছে লোকেদের বিশ্বাস, জীবনধারা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, দায়িত্ব পালনের আকাঙ্ক্ষা, ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে তাদের জাতীয়তাবোধ। যেই লোক যেই দলের বেলুনে বন্দি, তারা দেশকে দেখছে তাদের নিজস্ব আঙ্গিকে, এবং একইভাবে প্রতিটি দলের পুজারীরা - যা দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় হতাশার কথা। বেলুন ভেঙে কেউ বেরোতে পারলেও, দলপূজা, রাজনৈতিক নেতাদের মত বোকাদের দেশের রক্ষক, এবং কর্তা ভাবা, নিজেদের সকল ক্ষমতাকে বোতলে পুরে তাদের জুতোয় পুরে দেয়া এই জাতির রক্তে মিশেছে, যুগের পর যুগ ধরে।   

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ করে, উচু কন্ঠে ভাষণবাজি করে নিজের বেলুনের লোকেদের সহমর্মিতা আদায় করা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে আসলে কি উপকার হচ্ছে? আমি যদি বলি, আপনি আয়নাটা পরিস্কার করুণ, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমাকে অপছন্দ করা শুরু করবেন। সত্যি যদি দেশের ভালো চান - সেই পরিবর্তনটা আনুন, যা আপনি দেখতে চান। অন্য কারো দিকে আঙ্গুল না তুলে, নিজের দায়িত্ব পালন করুন। বাচ্চাদের স্কুল-কলেজে কি পড়াচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করুন, যদি মনে হয় যা ওয়াদা করা হচ্ছিলো - বাচ্চাদের মানুষের মত মানুষ হবার মত জ্ঞান দেয়া হচ্ছে না - তাহলে প্রতিবাদ করুন, আপনি যদি নেতার গুনাবলী ধারন করেন, তাহলে দলবেধে প্রতিবাদ করুন, যদি সাহসী হোন, তাহলে একাই প্রতিবাদ করুন, কিসের ভয়? এই দেশে বাস করে এখনো যদি আপনি মরার ভয় করেন, তাহলে, আপনার বেলুন মনে হয় রাজা বেলুন! 

আপনি যখন বাসে ওঠেন, ড্রাইভার আইন অমান্য করলে তার ব্যাবস্থা করুন, নরম, অথবা কঠোর, যখন যা হওয়া লাগে সেভাবে। যত্রতত্র বাস থামিয়ে কেউ উঠলে তাকে অপমান করুন, প্রতিরোধ করুন। প্রতিটি রাস্তার চৌরাস্তা বন্ধ করে রেখে যখন ফাকা রিকশা, লেগুনা, সি এন জি দাঁড়িয়ে থেকে কৃত্রিম যানজট তৈরী করে, তার প্রতিবাদ করুন, নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে বাধ্য করুন তাদের জরিমানা করতে। ট্রাফিক সিগন্যালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাসগুলোকে লাথি মেরে সামনে আগানোর ব্যাবস্থা করুন। একা কি করবেন? জানেন কি, গণনা কিভাবে করা হয়? ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫… এভাবে। শুন্য থেকে শুরু হয়, এরপর এক। আপনি কি সেকথা জানতেন? আপনি করলে, সাথে যদি আরও একজন করে, তারপর একজন, তারপর আরও একজন?

সরকারী বেসরকারী দপ্তর, অফিস, হাসপাতালে যখনই কোনো অনিয়ম চোখে পড়বে, কর্তৃত্বের সাথে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধ্য করুন, তাতে যদি আপনার স্বার্থেও আঘাত লাগে, তাও করুন, সৃস্টিকর্তা আপনাকে মানুষ বানিয়ে পাঠিয়েছে, আর মানুষই পারে স্বার্থহীন আচরণ করতে। আপনার ভিতরেও তা আছে, একবার চেস্টা করে দেখুন তাকে বের করে আনার। যেকোনো মুহুর্তেই মৃত্যু হতে পারে আপনার, মৃত্যুকে এত ভয় পেয়ে ছোট জীবনটাকে আরও ছোট করে ফেলবেন না। আপনার পরিবার? পরিবারকে নিয়ে নরকে থাকার চেয়ে, পরিবারের ভালোর জন্য যুদ্ধ করে মরা ভালো, এটা আপনার মনে করা উচিত, কারন আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিকই হুংকার দিচ্ছেন। কার উদ্দেশ্যে দিচ্ছেন? কেউ শুনছে না তা। বাস্তব জীবনে তা করতে না পারলে আপনি ভণ্ড। তবে, জেনে রাখুন, আমিও ভণ্ড। আমরা সবাই ভণ্ড। তবে কিছু কিছু সময় অন্তত যদি ভন্ডামী ছেড়ে দিতে পারি আপনি,আমি, আমরা, দেশের জনগন, তাহলেই দেশ বাচবে বাচার মত করে। কোনো রাজনৈতিক নেতা, বা কোনো সরকারের ক্ষমতা নাই বিশ-বাইশ কোটী জনসংখ্যার এই বিশাল দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করে।   

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনি একটু নতুন বেলুন তৈরী করুন, একদম নতুন, যেই বেলুনে জ্ঞান - বিজ্ঞান, সাহিত্য, পৃথিবীর ইতিহাস, যুদ্ধ, শাসক, জগদ্বিখ্যাত দার্শনিকদের দর্শন নিয়ে চর্চা করুন, আপনি নিজেই শুরু করে দেখুন, ফেসবুক গুতাতে থাকার চেয়ে অনেক বেশী ডোপামিন হরমোন নির্গত হয় সেসব কাজেঃ সেকথা আপনাকে কখনো জানতে দেয়া হয়নি। 

বাঙালী জাতির ভরাডুবি ঠেকাতে পারে কেবল একটি, এবং একটিমাত্র জিনিস।

 শিক্ষা। শিক্ষা। শিক্ষা।

২৬ অক্টোবর ২০২৫

ঢাকা, বাংলাদেশ।