নভেম্বর '২৪
ভুলুঃ দক্ষিণের সমুদ্রতটে কুড়িয়ে পাওয়া আমাদের চারপেয়ে মুক্তা...
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক সাগরপারে ভুলুর সাথে প্রথম দেখা আমাদের। আলাভোলা কুকুরটা আমার কাধে রাখা ব্যাকপ্যাকে খিচুড়ি আর মাংসের ঘ্রান পেয়েছিলো, ব্যাগটা টেনে নামাতে চেয়েছিলো আমার কাছ থেকে। খুব বিরক্তি নিয়ে ওকে কয়েকটা ঝাড়ি দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিলাম।
পরের একটা ঘন্টা ধরে বেলাভুমি ধরে হেটে এগিয়েছি পূর্ব দিকে। হঠাৎ করে তনু বললো, দেখো, সেই কুকুরটা এখনো আসছে! আমি ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে দেখি, ঠিক বলেছে ও। আড়চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে মাঝেমাঝে, আর ভান ধরছে, ও সৈকত ধরে হেটেহেটে খাবার খুজছে। আমি পাত্তা দিলাম না ব্যাপারটা। তবে একটু পরে দেখা গেলো আসলেই খাবার খুজে পেয়েছে। স্রোতে ভেসে আসা মরা মাছ ছিড়ে খাচ্ছে। একটুপরপরই পাচ্ছে। ওর তো পোয়াবারো! এরপর আমি সাগরে ঝাপ দিয়ে গড়াগড়ি করে উঠলাম বেশ অনেকক্ষণ পরে। দেখি যে একটু দুরেই কুকুরটা আরাম করে বালিতে বসে আমার দিকে চেয়ে আছে।
আমরা হাটলে কুকুরটাও উঠে হাটা শুরু করে, আমরা থেমে গেলেই ও বসে যায়। আমি প্রচন্ড বিরক্ত হলাম। পেট ভরা, তাও আমার ব্যাগের খাবারের লোভ রয়ে গেছে ওর।
কুকুরটা দেখতে অবশ্য বেশ মায়াবী। পাশেপাশে হেটে চলে যখন বেলাভুমি ধরে, নাক এদিকে ওদিকে দিয়ে ছোকছোক করে, গর্ত থেকে বের হওয়া কাকড়ার দিকে ধেয়ে যায়, আমাদের দিকে আড়চোখে তাকায়, আবার মাছ খোজায় ব্যাস্ত হয়ে যায়, যেনো ও বোঝাতে চাইছে, আরে না, আমি তোমার ব্যাগের খাবার চাই না, খাবার তো আমার আছেই, আমি শুধু তোমাদের সাথে হাটতে চাই, আচমকা কিভাবে যেনো মায়াটা লেগেই গেলো। জীবনের এই ধাপে এসে মায়া লাগানোতে আমার অনেক ভয়। সহজে কিছুর উপরেই আর মায়া লাগাতে চাই না। পশুপ্রাণীদের উপর তো একদম ই না, সেই সেদিন থেকে, যেদিন আমার বুকের উপর মাথা রেখে মরে গিয়েছিলো আমার নিনো।
পথে কতগুলো মেয়ে কুকুর এসে ওকে ভজানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভুলু ওদের কোনো পাত্তাই দিলো না। আমরা দাড়ালে একটু যেয়ে শুকেছিলো একবার, কিন্তু আমরা আবার হাটা দেয়াতে ওকে রেখে চলে এলো আবার ত্রস্তপায়ে।
আমি তনুকে বললাম, লাঞ্চ করি! কিন্ত এখন না। সামনে একটা উপসাগরের খাড়ির মত জায়গা আছে, ওইটা পার করে, ওপারের বেলাভুমিতে পৌছে খাবো। নাহলে ভুলু জ্বালাবে। আমাদের অনেক ক্ষুধা লেগেছে তখন। আর যেখানে হাটছি, ওদিকে কোনো খাবারের দোকান ও নেই। খালটা পার হবার জন্য নৌকায় উঠলাম, আর তখন প্রথমবারের মত অবাক করে দিলো আমাদের ভুলু। আমাদের নৌকায় উঠতে দেখে ও চুপ করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। যখন দেখলো নৌকা চলে যাচ্ছে, উপসাগরের মত খালটার তীব্র স্রোতের মাঝে নেমে পড়লো ও, তিন’শ মিটারের মত পথ সাতরে ও আমাদের সাথে চলে এলো। মাঝপথে ভুলুকে নৌকায় ওঠানোর ও অবস্থা ছিলো না। আমরা শুধু অবাক হয়ে বলে যাচ্ছিলাম, কি করিস ভুলু, কি করিস, তুই চলে যা!
ওপারে পৌছে ম্যানগ্রোভের ঝাড়ে হাটুগেড়ে বসে আমরা ভুলুকে অফিশিয়ালি আমাদের সঙ্গী স্বীকৃতি দিলাম। ওর সাথে খেলছি, ওকে আদর ও করছি, এবং, ছবি তোলা শুরু করেছি। তখন আমরা লাল কাকড়ার দ্বীপে। অমন বর্ষামুখর দিনে, পুরোটা বংগোপসাগরের উপকুল আমাদের হলো। যত ধরনের বৃষ্টি আছে, সব এলো একে একে। আমরা ভিজলাম, সাগরে ঝাপালাম। জীবনে প্রথম একসাথে বৃষ্টিতে ভিজেছি যখন আমরা, পুরো চরাচর তখন জনশুন্য, অপার্থিব গর্জন তুলে স্রোত আর বর্ষণ ভেঙে পড়া বঙ্গোপসাগরের উপকূল এবং ভুলু, আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলো। আমরা হাটলে ও ছোকছোক করে, আমরা দাড়ালে ও বসে পড়ে। পথে অন্য কুকুরের গ্যাং অচেনা ভুলুকে দেখে তেড়ে আসে, আমি আর বয় তেড়েফুড়ে অদের ভাগিয়ে দেই। ভুল লেজ নাড়ে, আর আমার দিকে চেয়ে থাকে।

যেই খিচুড়ি আর মাংসের গন্ধে ও রয়ে গেছিলো, আমরা খাওয়ার সময় ভুলুও তার ভাগ পেলো।
আমরা সারাটাদিন হাটলাম৷ পুরোটা দিন কেটে গিয়ে সন্ধ্যা এলো। আমাদের শরীরে তখনো ক্লান্তি আসেনি। ১৮ কিলোমিটার পথ হেটে, সেদিনের মত সাগরকে বিদায় জানিয়ে লতাচাপলী গায়ে যাওয়ার জন্য একটা অটোতে চড়ে বসলাম আমরা। বিদায়ের মুহুর্তে হাটু গেড়ে বসে পড়লো তনু, ভুলুকে নরম কন্ঠে গুডবাই জানাচ্ছে। সাবধানে থাকতে বলছে, আর বাড়ি ফেরার পথে ভালো ছেলের মত মারামারি না করতে বলছে। পাশের বাড়ির কয়েকজন মহিলা, আর পিচ্চি ততক্ষণে আমাদের পাশে ভিড় করেছে, ব্যাপারটার অস্বাভাবিকতা টের পেয়ে। তাদেরকে বললাম ভুলুর কাহিনী। ও চোখ বড়বড় করে চেয়ে আছে আমার দিকে। আমরা অটোতে উঠে বসলাম, ভুলুকে টাটা দিলাম। এবং, অটো চলা শুরু করতেও ভুলুও দৌড় দিলো। অটো অনেক জোরে ছুটলো, ভুলু একটু পর হারিয়ে গেলো। প্যাসেঞ্জার শুধু আমরা দুজন, পিছনের জানালা দিয়ে উলটো ঘুরে তাকিয়ে ছিলাম, যতক্ষণ না ওকে শেষবারের মত দেখলাম এক মোড়ের আড়ালে পড়তে।
মিনিট পাচেক টানা ছুটলো অটো। এর পর এক বাড়ির পথের মুখে অটো থামলো সিগ্ন্যাল পেয়ে। আমরা উদ্গ্রীব হয়ে পিছনে তাকালাম। দুই মিনিট পরে কালো একটা ছায়া দেখা গেলো। আড়াই মিনিট পরে ভুলু ছুটে এসে থেমে গেলো আমার পাশে। আমি অটো থেকে নেমে ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছি। ভীষণ হাপাচ্ছে ও। মাঝেমাঝে কুইকুই করে শব্দ করছে। আমি কখনো একটা কুকুরের অমন ডাক শুনিনি। আর কতক্ষণ এভাবে ছুটলে ওর দম ফুরিয়ে যেতো।
কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তনু একবার আমাকে দেখছে, আরেকবার ভুলুকে। অটোওয়ালাকে বিদায় করে দিলাম। এটা জানা সত্বেও, ওই রাস্তায় সন্ধ্যার পর মানুষ চলে কদাচিৎ। আমরা আবার হাটবো। আমাদের সারাপায়ে কাদা। জুতা পরতে পারছিনা। খালিপায়েই খোয়াভরা পথটাতে হাটতে রইলাম। চাপলী গ্রাম আরও ৪ কিলোমিটার। শরীরে লবন, এবং কাদা, পায়ের চামড়া উঠে যাওয়া। সন্ধ্যা ঘনালো। নিকশ কালো অন্ধকার। নির্জন পথটা ধরে বউকে নিয়ে হাটছি বিধ্বস্ত অবস্থায়, আর ওকে আমার কথা বলছি, আর আমাদের পাশে দুলকী চালে ছুটে চলেছে দশাসই এক কুকুর, “আহ, আমার সাথে থাকতে হলে এসবের অভ্যাস করো। আমার সাথে অদ্ভুত ব্যাপার খুব ঘটে, আর, অনেক হাটা লাগে! জানো, সেবার যে শরণখোলায় বৈশাখ মাসের বৃষ্টিতে সুন্দরবনের কাদায় গাড়ছিলাম একবার বেল্লাকে নিয়ে…”
২২ কিলোমিটার পথ হেটেছি সেদিন আমি, তনু, এবং ভুলু। তনুকে নিয়ে আমি যারপরনাই গর্বিত, সেকথা জানাতে এই লাইন আলাদা পারায় লেখা।
আমরা বারেক আংকেলের বাড়িতে পৌছে, আমি পুকুরে দিলাম এক ঝাপ। তনু ঘাটে বসলো পা ঝুলিয়ে, এবং ভুলু, কাছেই। আকাশে তখন অগণিত তারা, আমরা শীতে কাপছি, আর বসে বসে তা গোণার চেষ্টা করছি। এক ঘন্টা সময় আছে আমাদের।
এক ঘন্টা বাদে মোটরবাইকে চড়ে আমরা চলে যাবো। ভুলুও রেডি, বাইকের পিছনে ছুটবে। মারুফকে দায়িত্ব দিয়েছি, ভুলুকে যেভাবে পারে আটকাতে। বাইকওয়ালাকে বললাম টান দিতে! চোখ বন্ধ করে একটু সামনে গিয়ে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি, ভুলু নেই। মারুফ আর ওর ছেলেরা আটকে ফেলেছে। হোটেলে ফিরে খোজ নিয়ে জানলাম, ওদের বাড়িতেই পেট পুরে বিস্কুট আর হাড়গোড় খেয়ে ঘুমাচ্ছে ভুলু।পরদিন দুপুরে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন আংকেল। এবং ওই দাওয়াত না নিলে মার খাওয়ার চান্স আছে। আর, চাপলী গায়ের উপর আমারও ভীষণ টান। তনুকে বললাম, চলো, ভুলুকেও আরেকবার দেখে আসি!
মনের এক কোনে আশা করছিলাম, ভুলু চলে গেছে কোথাও। আবার মনে হচ্ছিলো, ওকে দেখতে পেলে খারাপ হতো না! আংকেলের বাড়িতে পৌছলাম, ভুলুর সাড়া নেই! একটু এদিক ওদিক তাকালাম, বসে রইলাম ফ্যানের নীচে, এরপর পুকুরপারে যেতেই দেখা গেলো ভুলু মিয়া হাজির। যেনো কিছুই হয়নি, মাঝে একটা দিন কেটে যায়নি। অলস ভংগিতে আড়মোড়া ভেঙে, আমার কাছে এসে বুকের উপর সামনের দুই পা তুলে, জিভ বের করে হ্যা হ্যা করতে লাগলো। আচ্ছা যন্ত্রণা তো! মুচকি হাসলাম আমি।
খাওয়াদাওয়া, এবং একটু চুপ করে বসে থাকার পর আমি আর তনু রওনা হলাম সাগরপারে। পা টিপে টিপে ঘর ছাড়লাম। পিছনের পুকুরপারে ঘুমাচ্ছে ভুলু। তনুকে বললাম, শব্দ না করে আমার পিছনে আসতে। আমি একবারও পিছু ফিরছি না। দাতে দাত চেপে এগোচ্ছি, ভুলু এসে জুটলে আর গাড়িতে উঠতে পারবো না। দশ কদম চলার পরে তনুর হাসি ভেসে গেলো কানে। যা বোঝার বুঝে ফেললাম। দুই হাত উল্টে হাল ছাড়ার ভঙ্গি করে আলগোছে হাটা ধরলাম এবার। দিনের বেলা। যে-ই দেখছে, অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। এই বিদেশী পোলামাইয়া দুইটা কুত্তাও নিয়ে আসছে নাকি সাথে? আহ। বাজারে গিয়ে অটোর জন্য অপেক্ষা করছি। ভুলু হাটু গেড়ে বসা। ইচ্ছা করছে ঝেড়ে দৌড় দেই। কিন্তু…কুকুরের সাথে কি আর দৌড়ে পারা যায়! অটোই ভরসা। অটো এলো। কিন্তু ওটা সাগরপারের গ্রাম পর্যন্ত যাবেনা। সামনের বাজারে নামিয়ে দেবে, এই শর্তে উঠে, যখন নেমে গেলাম, রাস্তার মোড়ে ভুলু নেই। পিছনে পড়ে গেছে। কিন্তু আমরা জানি, ও এই রাস্তা ধরেই ছুটতে ছুটতে আসছে। ঠিক। “ ওইযে আসছে” বিড়বিড় করলো বউ। ইতিউতি তাকালাম আমি। এরপর তনুকে কিছু না বলেই আমি দিলাম দৌড়। পিছনে ফিরে দেখি তনুও দৌড়াচ্ছে। আহ। কতক্ষণ দৌড়াবে? হ্যাচকা এক টান দিয়ে ওকে নিয়ে রাস্তার পাশের এক সেলুনে ঢুকে পড়লাম। চুপ করে বসে আয়নায় দেখি ভুলু আসছে, হেলেদুলে। নিশ্চিত ভঙ্গিতে, সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ডানেবায়ে তাকাচ্ছে না। আমাদের কয়েক ফুট দূর দিয়ে সোজা চলে গেলো। হয়তো সেলুনের অতশত কেমিকেল, কিংবা চুলটুলের গন্ধে আমাদের গায়ের গন্ধ পায়নি ও। সোজা যাচ্ছে, চলে গেলো। ৩ মিনিট পর আরেকটা অটোতে উঠে বসলাম আমরা। এটা সাগরপারে যাবে। একটু সামনে থেকেই হাতের বায়ে ঢুকে যাবো আমরা। অবশেষে ফুরসত মিললো দুষ্টু কুত্তাটা থেকে।
অটোতে উঠলাম। “ভালোই হলো, ও থাকলে কিছুই করতে পারতাম না, তাইনা তনু?” “হুম” পুরো বাংলাদেশে আমার সবচে প্রিয় বেলাভুমিতে, প্রিয় শরতের বিকেলে আমরা হাটবো। বায়ে ঘোরার সময়ে চট করে দেখা গেলো, আমাদের না যাওয়া পথে সোজা এগিয়ে যাচ্ছে তখনো ভুলু। নিশ্চিত ভঙ্গিতে।
অটো বায়ে ঘুরলো। ভুলু সোজা চলে গেছে। বউ মন খারাপ করে বসে আছে। আমি মাথা চুলকাচ্ছি।
“মামা, একটু ঘুরাবেন? একটা জরুরী জিনিস ফেলে আসছি”
“পিছনে?”
“হ্যা”
অটো ঘুরিয়ে মেইনরোডে আনলাম।
“বায়ে যেয়েন”
“আপনারা তো ডাইনের তে আইছেন”
“জানি, কিন্তু জিনিস বায়ে গেছে”
“ও”
বায়ে উঠলো গাড়ি। এক মিনিটের বেশি সময় ধরে চলছে।
“ও তনু! এতক্ষণে ওকে পেয়ে যাওয়ার কথা না?”
“হ্যা”
“আরেহ, গেলো কই” আরও এক মিনিট পর, ঘেমে গেছি আমি”
“ওওওওওই যে!” “মামা, রাখেন এইখানে” অটো ব্রেক করামাত্র আমি নেমে জোরপায়ে হাটা শুরু করলাম। শরম লাগছে দৌড়াতে। আহ। হাতের বায়ে একটা ছোট মাটির রাস্তা ঢুকে গেছে। ভুলু কি মনে করে ওই রাস্তায় ঢুকেছে। ওই রাস্তায় কয়েকজন মুরুব্বি, আর দুই তিনটা পিচ্চি বসে আছে। আমাকে দেখে কৌতুহলী হলো। আমি গলিতে ঢুকে জোরে হাটছি। কিন্তু ভুলু হেলেদুলে ছুটছে। ধরা যাচ্ছেনা। আচমকা দিলাম এক দৌড়। ওই ব্যাটাও কেনো যেনো গতি বাড়িয়েছে।
“ভুলুউউউ”
সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করলো কুকুরটা। আমি যেনো কানে শুনতে পেলাম ঘ্যাঁচ করে এক শব্দ। পিছনের দুই পা আগে স্টেবল করে, পরে পা ঘুরিয়ে নয়, চারপায়ে একবারে লাফ দিয়ে উলটো ঘুরলো ভুলু। চোখদুটো জ্বলছে। জিহ্বা পুরোটা বেরিয়ে। মাথা নিচু করে পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে এসে আমার বুকে দুই পা তুলে দিয়ে গালমুখ চেটে দেয়ার অনেক চেষ্টা করলো কুত্তাটা।
পিচ্চি ছেলে দুইটা হইহই রইরই করছে তখন। ওদের স্বপ্ন এরকম একটা কুত্তাকে ট্রেইন করা।
“ভাই, আপনার কুত্তা?”
“হ, এডা আমার কুত্তা” দরাজ কন্ঠে ঘোষণা করলাম।
ওদের ঈর্ষাভরা চোখের সামনে, রাজকীয় কুকুরটাকে আমার পাশে রেখে পুরো রাস্তাজুড়ে হাটা শুরু করলাম আমরা। পথের মোড়ে বসা মুরুব্বি চাচাগুলো হাসছে। অমলিন হাসি।
ফিরে এসে দেখি তনুও হাসছে। চাচাদের হাসি কই যায় সেই হাসির কাছে! আমার মনে তখন খুশী ধরে না।

ভুলু, এবং তনুকে নিয়ে লাল চর গঙ্গামতি এসে পৌছি আমি যখন, ওটা আমার সারাজীবনের মিষ্টিতম বিকাল। বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে হেটেছি আমি আর বউ, ভুলু আমাদের ছায়াসঙ্গী হয়ে ছোটাছুটি করেছে। শেষ বিকেলে আমরা যখন লালচে আকাশের পটভূমিতে বিরাট সব স্রোতেদের সাথে মাতাল হয়ে লাফালাফি করছি, ভুলু তীরে বসে আমাদের ব্যাগ, আর জুতা পাহারা দিয়েছে। পুরোটা সময় ও আমাদের দিকে অপলক চেয়ে থেকেছে।
ফেরার পথে ফের একবার ভুলুকে খসানোর চেষ্টা করলাম আমি। তনুকে বললাম, তুমি ওর সাথে কথা বলতে থাকো, আমি দৌড় দেই। ওকে এখানে রেখে যেতে পারলে, ও বাড়ী ফিরে যাবে হয়তো। আমি এক কিলোমিটার দৌড়ার আগে পিছু ফিরলাম না। পিছনে ফিরে, কপালে হাত তুলে সুর্যটাকে আড়াল করে দিগন্তে দেখার চেষ্টা করছি। ছোট্ট একটা ছায়ামুর্তি দেখা যাচ্ছে। খুব ভালোমত চোখ ছোট করে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এলোমেলো বড় চুল তার। পড়ন্ত বাতাসে উড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে সেই ছায়ামুর্তি। আরও খানিক বাদে, তার পিছনে দেখা গেলো অন্য আরেক ছায়া। দৃঢ় পায়ে সেই ছায়ামানবীকে অনুসরণ করছে সৃষ্টির অন্যতম অনুগত সেই প্রাণী। বিনা কারনে ভালোবাসে ওরা। কুত্তা।
আমাকে দেখতে পেয়ে জিহ্বা বের করে আবার দৌড় দিলো ভুলু। হেসে ফেলা ছাড়া কি করার আছে আমার?
অদ্ভুত সুন্দর একটা লবনাক্ত জলের খাল পেরিয়ে উঠতে হয় গংগামতির মেঠো পথে। ওখানে একটা অটো বসে আছে, ফাকা। সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে তখন। আমাদের হাতে বেশী সময় নেই। গতদিনের মত হেটে যাওয়া আজ একদমই সম্ভব না। ঠিক করলাম, ভুলুকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য, চাপলী যাবো আমরা ভেঙে ভেঙে। মাঝপথে এক বাজারে নেমে যাবো, ভুলু ঠিকই আমাদের খুজে নেবে। সেই অটোর পিছনের সিটে বসে, আমি আর তনু পুরো সময় পিছনে চেয়ে রইলাম। তনুই শেষবার দেখেছিলো ভুলুকে। একটা মোটরসাইকেল কুত্তাটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তার পিলিয়ন ওকে লাথি হাকিয়েছে, তনুর ভাষ্যমতে- ভুলু তা দুর্দান্তভাবে এড়িয়ে গিয়ে, আবার ছুটতে শুরু করে।
অন্ধকার পথে, নির্জন এক বাজারে নেমে গেলাম আমি আর তনু। চারিদিকে পীনপতন নীরবতা। বাতাসে কেমন এক নেশাধরানো দক্ষিণের সুবাস। অবসন্ন দেহমন। নিকশ কালো অন্ধকার চারিদিকে। আমরা কান পেতে রইলাম, ঝরাপাতায় ছাওয়া মেঠপথ ধরে চলা চারপায়ের ছুটন্ত পদক্ষেপের শব্দের আশায়। তা এলো না যখন, আধারেই হাটা শুরু করলাম আমরা পায়ে পায়ে। অনেকদুর চলে গেলাম আমরা। ক্ষণিক পর চিৎকার করতে শুরু করলাম আমিঃ ভুলুউউউউউউ। ভুলুউউউউউউউউউউ…

