আগস্ট '২৫
চাপল্যের শেষ যুগঃ সব শুরুর দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে দেখা এখনই থেমে যাওয়া জীবন
এই পৃথিবীতে বহুবছর ধরে বেঁচে আছি আমি।
এমন একটি দেশে আমি এতগুলো বছর ধরে বেঁচে আছি, যেখানে নগন্য কারনে মানুষ মরে যায়। আমি তাও বেঁচে আছি, তারমানে এটাই ছিলো নিয়তি। আর নিয়তি চাইলে এই লেখা শেষ হবার আগেই আমি মরেও যেতে পারি। তবে তাতে বহু কথা রয়ে যাবে না-বলা।
তারমাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন যা, তা হলো, মৃত্যূ নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত ফিলোসফি। আমি পরকালে, এবং স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস করি। আমি চাই না, আমার মৃতদেহের সামনে কেউ কান্না করুক। আমার খুব ভালো লাগবে, পৃথিবীর আলো থেকে আমাকে আধারে পাঠানো যদি হয় হাসিমুখে। আমি বিশ্বাস করি, এই বিচ্ছেদ সাময়িক। অতি নগন্য সময়ের জন্য। যারা আমাকে আবার দেখতে চায়, এবং চায় সেই দেখাটা হোক স্বর্গে, তাহলে সে যেনো সৃস্টিকর্তার কাছে আমার জন্য দোয়া করে, আমার ভুলগুলো মাফ করে দেয়ার প্রার্থনা করে, এবং নিজে এত ভালো একটা জীবন কাটাক, যাতে সে-ও সেখানে পৌঁছতে পারে।
আমার স্বপ্নগুলো বিলীন হবে কোথায়, আমি ঠিক নিশ্চিত নই। এখনই আমার মৃত্যু হলে, আন্দিজ পর্বতের কোনো এক মায়ামাখা স্প্যানিশ নামের উপত্যকায় গিয়ে এই নশ্বর দেহখানিকে পৌঁছানো হবে না, সেই ছোট এক শহরতলীর নিরিবিলি এক ক্যাফে, যার কাউন্টার থেকে খড়খড়ে রেডিও থেকে স্প্যানিশ সঙ্গীতের সুর ভেসে আসা আমি শুনতে পাই, বড় মধুর কিছু মুহুর্তে, চোখ সরু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে। আমার সারাজীবনের সবচে বড় স্বপ্ন সেটি।
গত কয়েকমাস ধরে দিব্য চোখে দেখছি আমি একটি লাল রঙের গ্রাভেল বাইকের ড্রপবারে হাটু আটকে দিয়ে কায়দা করে দাঁড়িয়ে আছি, আমার চারিপাশে দুর্দান্ত আলোকচ্ছটা। জ্বলন্ত নীল আকাশ, এবং সাদা পেজা তুলোর মত মেঘেরা স্লথের গতিতে উড়ছে। তীব্র নেশাধরানো এক শব্দে ঝিরঝিরে ট্রপিকাল বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আমার ঢোলা ফুলস্লিভ শার্টের হাতা উড়ছে। দিগন্তের যেদিকেই তাকানো যাক না কেনো, আকাশের চেয়েও গাঢ়, ভয়ংকর সুন্দর জলরাশি বাতাসে নোনা গন্ধ বয়ে আনছে! নোনা বাতাসের, আর সর্পিল সবুজে মোড়ানো প্রান্তর ধরে সোজা এগিয়ে যাওয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় সেই পথটি ইন্দোনেশিয়ার উত্তর-পূর্বের কোনো মেঠোপথ, নাকি সে-ই সে চিলিয়ান পাতাগোনিয়ার রোমাঞ্চকর দক্ষিণের পথটি, তা নিশ্চিত না হতে পারলেও, মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। এত বাস্তব সেই স্বপ্ন! কতটা কাছে! এত কাছে, কখনও মনে হয়, চোখ বন্ধ করে চারিপাশ থেকে আর সামান্য একটু বিচ্ছিন্ন হতে পারলে আমি হুট করে স্বপ্ন এবং বাস্তবতার দেয়াল পেরিয়ে চলে যাবো সেই নীল চরাচরে…
স্বপ্নগুলোতে হ্যান্ডব্রেক, এঞ্জিনব্রেক, এবং পার্কিংব্রেক একসাথে লেগে যাবে আমি কাল মরে গেলে। সে যাক। দুঃখ বোধ করার মত বোধ ই তো রইবেনা। তবে, দুঃখ পাবে আমার স্মৃতি আচমকা মনে পড়বে যেসব মানুষের, যারা রয়ে যাবে, এবং আমাকে মনে রাখবে।
খুব ইচ্ছা ছিলো, এমন একটা জীবন কাটানোর, যে জীবন চলে গেলেও রেখে যাবে কিছু। ছোটবেলা থেকে দেশের ন্যাওটা। এই সেদিন, বুড়ো বয়েসে, বউয়ের সামনে হাউমাউ করে কান্না করে ফেলেছিলাম বেচারী দেশটার কথা বলতে বলতে। অপরূপ সুন্দর এই দেশটার অভাগা ভালো মানুষদের জন্য করার সংকল্প ছিলো অনেককিছু। নিকট অতীতে, অনেকগুলো রাত জেগে কাটিয়েছি তার করুন হাল দেখে। মনটা ভীষণ অশান্ত হয়ে ওঠে…
টাকা উপার্জন করতে পারলে, ইচ্ছা ছিলো দুনিয়ার গরীব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। টাকা খরচ করা আমার খুবই প্রিয় কাজ, যখন সেই কাজশেষে কোনো প্রাণ হাসে। আমার বেঁচে থাকার জন্য খুব সামান্যই টাকার প্রয়োজন। সেকথা আমি বুঝতে পারি, যখন আমি আমার সাইকেলটা নিয়ে দেশ-বিদেশে চরতে বের হই। কোনোদিন ই পয়সার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না, তবে আমার প্রচুর টাকার দরকার হয়েছিলো। অনেক বেশী টাকা হলে, বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে পাবলিক লাইব্রেরী করতাম।
জীবনে কারো সাথেই ঠিক অমন আচরন করতে পারিনি, যেমনটা আমি আসলেই চেয়েছিলাম। আমার বাপ-মা তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। যদি দ্রুতই মারা পড়ি, তাহলে সবচেয়ে বড় দুঃখটা রয়ে যাবে এই আচরনগত ব্যাপারটাই যে, কেউ কোনোদিন বুঝতে পারবে না আমি তাদের কতটা ভালোবেসেছিলাম। উপরোক্ত দুজনের সাথে আর যেই নামটাই কেবল নিতে পারি, সে আমার দাদী। বেচারী জানেনা, আমি প্রতিমাসে অন্তত একবার তাকে স্বপ্ন দেখে মাঝরাতে ঘেমেটেমে জেগে উঠি। কিন্তু, সেকথা তার বোঝার কোনো উপায় আমি রাখিনি, কেনো সে আমার স্বপ্নে আসে, কি সেই উদ্বেগ। তা লেখাটাও হয়তো যুক্তিযুক্ত হবে না।
ট্যানের উপন্যাসটা শেষ করা হবে না। ও আমাকে যেসব গল্প শুনিয়েছে, সব আমি টুকে রেখেছি গুগল ডকসে। নাম তার ট্যানভেঞ্চার। কেবলমাত্র আমার পুরো নামে যেই জি-মেইল, তাতে লগিন করলেই পাওয়া যাবে! সঠিক কেউ তা খুললেই বুঝতে পারবে, ট্যানের সঙ্গে যোগাযোগের উপায়। অনুরোধ রইলো, কেউ যেনো সেই কাজটা করে।
আমার বইগুলো ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু। আমাকে অমানুষ হতে দেয়নি ওরা। একইসাথে, আমাকে পৃথিবীর মাতাল করা সব জনপদের নাম শুনিয়ে করেছে পাড় মাতাল। আমার দ্বিতীয় সেরা বন্ধু ছিলো কম্পিউটার। দুনিয়াসেরা সিনেমা, ডকুমেন্টারী দেখেছি ওতে, খেলেছি দুনিয়াসেরা ভিডিও গেম। পৃথিবী দেখেছি। দেখা পেয়েছিলাম গুরু ইয়োহান জর্জিয়েভের। সেসব ছিলো সোনালী সময়। দুরন্ত কৈশোর। যৌবনের শুরু থেকে আমার সেরা বন্ধু হয়েছে বেল্লা। ও আমাকে নানা জাতের মানুষের কাছে নিয়ে গেছে, তাদের গল্প শুনিয়েছে, আর শুনিয়েছে প্রকৃতির গান, যা প্রতিনিয়ত আমার অশান্ত মনকে শান্ত করেছে।
আমার বইগুলো, আমার কম্পিউটার, আর আমার বেল্লা। আমি না থাকলে ওদের কি হবে, সেকথা ভাবলে উত্তর সহজ। আমার বাপ যদ্দিন থাকবে, আগলে রাখবে। এরপর জানি না কি হবে৷
স্ত্রীকে জিগ্যেস করেছি, সে কি করবে আমি আচমকা মরে গেলে। ওর উত্তর সন্তোষজনক না। বরং ঘাড়েপিঠে কতগুলো শক্ত কিল পড়েছে৷
জীবনে সবসময় মনে রাখি, এমন কিছু লাইন উল্লেখ করি। দুই হাজার ষোল ইংরেজী সালে ফরেস্ট গাম্পের কাছে শিখেছিলাম, “জীবন ঘটনাবহুল, কিছুতেই থেমে থাকা যাবে না”, দুই হাজার বিশ সালে আর্থার মরগানের কাছে শিখেছিলামঃ “বদলা নেওয়া বোকাদের খেলা”, “যা হয়ে গেছে, আমরা তা বদলাতে পারি না, আমরা কেবল এগিয়ে যেতে পারি”। আরও আগে কিশোর পাশা বলেছিলো “যদি নতুন কোনোকিছু পাওয়ার, এবং তোমার যা আছে তা হারানোর সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি হয়, তাহলে কখনো সেই সুযোগ নিওনা”। অ্যালান কোয়াটারমেইন উপলব্ধি করিয়েছিলেন, “সভ্যতা হচ্ছে রুপোর গিলটি করা বর্বরতা মাত্র”। ভিক্তর হুগোর অমর বানী “জীবনের সর্বোচ্চ সুখ হলো এই নিশ্চয়তা যে তুমি ভালোবাসা পাচ্ছ; তোমার শত ত্রুটিসত্ত্বেও, তোমার জন্য পাওয়া তোমার ভালোবাসা” - আমাকে করছিলো ভালোবাসার কাঙ্গাল। পাওলো কোয়েলহো আমার ভয় ভাঙিয়েছেন ছোট্ট এক লাইনেঃ "তোমার হৃদয়কে বলো, কষ্ট পাওয়ার ভয় আসলে কষ্টের চেয়েও বড়। আর যে হৃদয় স্বপ্নের খোঁজে বের হয়, তা কখনই প্রকৃত কষ্ট পায় না।" লেভ তলস্তয়ের প্রজ্ঞা থেকে শিখেছিলামঃ "সমস্ত যোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো - সময় এবং ধৈর্য।"
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের উচিত সবসময় অভিজ্ঞতার দাম দেয়া। সবার কথা শোনা। মানুষের জীবনে অভিজ্ঞতার চেয়ে দামী আর কিছুই নেই। যারা প্রমাণিত জ্ঞানীগুণী মানুষ, তাদের কথা, লেখা আমাদের উচিত মন দিয়ে শোনা, পড়া। উপলব্ধি করা। জীবন একটা পাজল, যার মাত্র কয়েকটি টুকরো জায়গামত বসিয়ে দিতে পারলে, খুব সুন্দরভাবে বাচা যায়। নিজে খেটেখুটে তা বের করার চেয়ে এই পন্থা অধিকাংশ সময়েই অনেক বেশি সহজ। সেই কয়েকটি টুকরো দ্রুত খুজে বের করতে পারার জন্য আমাদের বাবা-মায়ের উচিত, সন্তানদের যথাসাধ্য সাহায্য করা। দুঃখের কথা এই যে, জীবনের পাজলগুলো একাধিক স্থানে স্থাপনযোগ্য। ভুল টুকরোটি ভুল স্থানে জোড়া দিয়ে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তার অধিকাংশ সময় আধারে কাটায়।
আমি জীবনের সবগুলো পাজল মেলাতে পারিনি অবশ্যই। ভুল জায়গায় বসিয়েছিও কিছু, কিছু আবার তুলে নিয়েছি। তবে আমি চেষ্টা করেছি। এই চেষ্টা চলবে যতদিন বেঁচে থাকবো।
হয়তো বহুবছর পর আমার ইতি আর আমি মিলে কোনো এক রোদতপ্ত সমুত্রতীরে বসে এই লেখাটার কথা বলার সুযোগ আমি পাবো। অথবা কোনোদিন ই একটা মেয়ের বাপ হতে পারবো না।
মনে হচ্ছিলো অনেক কথা। কিন্তু আদতে অত বেশী কিছুই নেই।
অদ্যাবধি যাপিত জীবনের শেষাংশে এসে কেবল গতি খুজে পাচ্ছিলাম। এমন সময়ে মরে যাওয়া, আমার জন্য হবার কথা ট্র্যাজিক! তবে...
যেই মুহুর্তেই আমি নিঃশ্চল হই না কেনো, সবাই যেনো জানে, সোনালী দুয়ার পেরিয়ে গিয়েছিলাম আমি হাসিমুখে। পৃথিবীতে যতগুলো দিন কাটিয়েছি, তার প্রতিটি ছিলো একটি অ্যাডভেঞ্চার। আমি পরিপূর্ণভাবে বেঁচেছি।
যদি সম্ভব হয়, আমার কবরে যেনো অনেক রঙের ঝোপজাতীয় ফুলগাছ লাগানো হয়! খুবই আরামদায়ক এক অনুভুতি হয় সেকথা ভাবলে।
৩ আগস্ট ২০২৫, ঢাকা, বাংলাদেশ।