ট্যানকে যেবার প্রথম দেখেছিলাম, ওর সারা গায়ে ধুলো, কাদার ছোপ, ছন্নছাড়া এক ভংগি যেনো তার চেহারায় গিল্টি করে দেয়া হয়েছে, ওর সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে আফতাবনগরের একটা সাকো পার হচ্ছে, মুখে লেগে আছে বোকার মত এক টুকরো হাসি, সর্বক্ষণ, চোখদুটোতে কি যেনো একটা অনুভুতি ফুটে আছে। ওই চোখে কেউ ভালো করে তাকালে বুঝতে পারবে, আকাশপাতাল সব ভাবনারা তার মাথায় ঘোরে সারাক্ষণ, যা অনেকের কাছেই বোধগম্য হবেনা, মনে হবে নিতান্ত কিশোরসুলভ বেয়াড়া ভাবনার দল বলে। আর ও সেসব ভাবনা সবাইকে শোনাতেও খুব পছন্দ করতো। ওর সাথে কোনো এক উপলক্ষে কথা হয়েছিলো। ওই একবারই। তার বেশ কিছুদিন পর জানতে পেরেছিলাম, বিশ বছর বয়েসী সেই যুবক তার ওই সাইকেলটা, যার নাম দিয়েছিলো সে 'এসপেরানজা', যার বাংলা অর্থ আশা, ওর আশাকে সাথে নিয়ে কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে, বলে যায়নি সে কাউকেই, কিছু। পরিবারের একমাত্র ছেলে সে, সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কি হয়েছিলো ট্যানের?আজ অবধি আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারেনি তার কথা। ট্যানের সাথে আমার বন্ধুত্বটা অমন এক পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছে গত তিন মাসে, সেদিন বিকেলের পর থেকে, যেদিন আমি একটা উড়োচিঠি পেয়েছিলাম- উড়ো ইমেইল আসলে- যে ও আমাকে ভাই বলে ডেকেছে। ট্যান যাকে ভাই সম্বোধন করে, তার সাথে ওর আত্মার সম্পর্ক, কখনোই তা ছিন্ন হবার নয়। আমি সে কথা জানি। ট্যানকে আমি বাধ্য করেছি, ওর নিরন্তর যাত্রার সকল বর্ননা আমাকে লিখে পাঠাতে। ও রাজীও হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ছেলেটা ঠিক করেছে, কোনো ক্রমের ধার ধারবেনা সে, যখন যা ইচ্ছে করে, লিখে পাঠাবে। আর হ্যা, ঠিক, আমি, তানভীর রেজা অনিক, মিস্টার ট্যানের অকৃত্তিম বন্ধু, ঠিক করেছি ওর যাত্রার ইতিবৃত্ত জোড়াতালি দিয়ে একটা 'উপন্যাস' তৈরী করে ফেলবো। উপন্যাস শব্দের উপর আমার টান। উপন্যাস শব্দের উপর আমার অনেক দুর্বলতা। দেখা ই যাক, কি ঘটতে চলেছে!
________________________________________________________________________________
________________________________________________________________________________
নাশতার টেবিলে মার্গারিতাকে বললাম, আমরা একটু বাইরে যাবো। 'কোথায় যাবো?' বড় এক টুকরো রুটি কামড়ে নিয়ে জিগ্যেস করলো ও নিরাসক্ত ভংগিতে। বুড়োর দিকে তাকালাম একবার। এরপর মার্গোর দিকে ফিরে বললাম 'হাটগাল' ' কি?' চিবানো বন্ধ হয়ে গেছে ওর। 'হাটগাল যাবো আমরা দুজন, ভেড়াদের জন্য শিয়ারিং মেশিন কিনতে, আর র্যাঞ্চের বেড়ার জন্য কাঠ অর্ডার করতে' বুড়োর দিকে একবার তাকালো মার্গারিতা। এরপরে দুই কামড়ে ওর বাকি খাবারটুকু গিলে নিয়ে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলার চেস্টা করলো 'তাহলে উঠছো না ক্যানো! হাটগাল কতদুর, কিছু জানো তুমি?' বলেই চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে উঠে ছুটে গেলো বাইরে। তিরিশ সেকেন্ড পরেই ফিরে আসলো এটো বাসনকোসনের কথা মনে পড়ায়। প্রতিদিন খাবার শেষে বেশ সময় নিয়ে আইরাগ খাই আমি৷ মার্গারিতা তাই সেদিন ওই জিনিস বেরই করলোনা। বললো, আজ বানানো হয়নি আইরাগ। মু...
Read More________________________________________________________________________________
________________________________________________________________________________
তোমাকে কখনো মার্গারিতা আলভারেজের কথা বলেছি? ওইযে দস্যি স্প্যানিশ মেয়েটা, মঙ্গোলিয়ার খোলা প্রান্তরে ঘোড়ার পিঠে চেপে যেতো অজানা প্রান্তর মাড়িয়ে, গ্রীষ্মের বিকেলে ভেড়ার খোয়াড়ে বসে চরম আলস্যে শিয়ার করতো যে, কনকনে উত্তুরে শীতের রাতে চিলেকোঠায় কম্বলমুড়ি দিয়ে গরম আইরাগে চুমুক দিতে দিতে দাদুর কাছে মংগোলিয়ার রূপকথা শুনতো যেই মেয়েটা! দাদু, আর মার্গারিতার রুপকথার গল্পে আমিও জড়ালাম সেবার। ওদের নিস্বংগ র্যাঞ্চে আমাকে ফোরম্যানের চাকরি দিলো মেয়েটা। কিন্তু ওটা যে শুধু কথার কথা ছিলো! আমি ফোরম্যান ছিলাম না, আমি ছিলাম ওই বৃদ্ধের একমাত্র ছেলে, আর ওই মেয়েটার হাজারো দস্যিপনার সঙ্গী! ছটফটে ওই মেয়েটাকে ভালোবাসি আমি। কিন্তু...কিন্তু...তুমি জানো, কিন্তু কি! আমি যে কাউকে কোনোদিন বাধনে জড়াতে পারবোনা! সেবার বসন্তে র্যাঞ্চের পশ্চিমের দুই বিঘা ক্ষে...
Read More________________________________________________________________________________
________________________________________________________________________________
'খুব দুঃখ পেলে তুমি কি করো অনিক ভাই?' জানতে চেয়েছিলো ট্যান। আমি বলেছিলাম, আমি দুঃখ একদম ই সহ্য করতে পারি না ভাই। হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকি, কাদতে চাই, কিন্তু কান্না আসে না। একদম ই কাদতে পারি না আমি, তাই দুঃখেরা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। 'তোমার সাথে আমার অনেক মিল আছে।.....আচ্ছা, তোমাকে কখনো আমিরখান ওমারভের কথা বলেছি? ও হ্যা, বলেছি, অল্প। সেবার রাশিয়ান সীমান্তে ওদের গ্রামে দুই সপ্তাহ কাটিয়েছিলাম আমি। ও বলেছিলো, আলতাই পর্বতের উপত্যকায় 'সোনালী ঈগল উৎসব' এর সময় আমি যেনো থেকেই যাই। হাহ! কি অদ্ভুতভাবে আমাদের নিয়ে খেলে নিয়তি। আমি যদি ওর কথা না শুনতাম, সবকিছু অন্যরকম হতো!' ‘নিয়তি আমাদের নিয়ে খেলে না ট্যান, আমরাই তার হয়ে খেলছি, অনেক বড় কোনো এক ম্যাচের অংশবিশেষ। নিয়তি নিয়ে কখনো দুঃখ কোরো না, কারন ওটা তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না।’ ‘বলা সহজ অনিক...
Read More________________________________________________________________________________
________________________________________________________________________________
শহর বলতে খুব বেশী কিছু নেই মংগোলিয়াতে। পৃথিবীর সবচেয়ে কম ঘনবসতিপুর্ণ দেশ বলে কথা! আর তাদের গ্রামগুলোও বিচ্ছিন্নতার সমার্থক শব্দ। কতসব রোমাঞ্চকর গিরিখাত, উপত্যকা, আর রুপকথার মত খোলা প্রান্তর চারিদিকে! কোন একটা গ্রামের গোড়াপত্তন যখন হতো, হয়তো শত শত বছর আগে, যখন দুনিয়ার বুকে হেটে বেড়াতেন দা গ্রেট খান, ওইসব দিনে গড়ে ওঠা সেসব গ্রামের জন্য বেছে নেয়া হত সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর কোনো পাহাড়ী ঝর্না বা হাটুজলের নদীর পার! নদীটা একেবেকে বয়ে গেছে সবুজ ঘাসে ছাওয়া দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর মাড়িয়ে, যেখানে চারিদিকের দিগন্ত শেষ হয়েছে কোনো না কোনো সাদাটে সবুজ, অথবা সোনারঙ্গা সবজে পাহাড়ের ঢালের চুড়ায় মেঘের আবছায়ায়, আর ঢালের গোড়ায় চরে বেড়ানো অসংখ্যা ইয়াক, ঘোড়া, ভেড়া আর গাধার দংগলে! মংগোলিয়াতে মানুষের চেয়ে কয়েকগুন বেশী ভেড়ার জনসংখ্যা আছে, এব...
Read More