নভেম্বর '২২
আমিরখান ওমারভঃ ঈগল রাণীর অলংকার
'খুব দুঃখ পেলে তুমি কি করো অনিক ভাই?' জানতে চেয়েছিলো ট্যান।
আমি বলেছিলাম, আমি দুঃখ একদম ই সহ্য করতে পারি না ভাই। হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকি, কাদতে চাই, কিন্তু কান্না আসে না। একদম ই কাদতে পারি না আমি, তাই দুঃখেরা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
'তোমার সাথে আমার অনেক মিল আছে।.....আচ্ছা, তোমাকে কখনো আমিরখান ওমারভের কথা বলেছি? ও হ্যা, বলেছি, অল্প। সেবার রাশিয়ান সীমান্তে ওদের গ্রামে দুই সপ্তাহ কাটিয়েছিলাম আমি। ও বলেছিলো, আলতাই পর্বতের উপত্যকায় 'সোনালী ঈগল উৎসব' এর সময় আমি যেনো থেকেই যাই। হাহ! কি অদ্ভুতভাবে আমাদের নিয়ে খেলে নিয়তি। আমি যদি ওর কথা না শুনতাম, সবকিছু অন্যরকম হতো!'
‘নিয়তি আমাদের নিয়ে খেলে না ট্যান, আমরাই তার হয়ে খেলছি, অনেক বড় কোনো এক ম্যাচের অংশবিশেষ। নিয়তি নিয়ে কখনো দুঃখ কোরো না, কারন ওটা তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না।’
‘বলা সহজ অনিক ভাই, বলা সহজ। যাই হোক, গুগলে সার্চ দিয়ে দেখো একবার, আইশোলপান লিখে, তুমি একটা ছোট্ট মেয়ের কথা জানতে পারবে। ও সেবারের গোল্ডেন ঈগল ফেস্টিভালের টাইটেল গেমের বিজয়ী, ঈগল রানী, ওর আগে আর কোনো মেয়ে কোনোদিন তাতে অংশই নেয়নি, জিতবে কি। আমার বন্ধু আমির, আর ঈগল রানী শৈশবের বন্ধু। ওরা একসাথে মংগোলিয়ার সোনালী প্রান্তর দাবড়ে বেড়াতো। যদিও আমির তখনো পুরোপুরি স্বীকার করেনি সেকথা। সেদিন বিকেলে ও প্রথমবারের মত ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো আমাকে, আর মিস আইশোল আমার ক্যামেরা দেখে দাবী করেছিলো, দক্ষিণের লেক তোলবোর প্রান্তরে সাজপোশাকে তার কিছু ছবি তুলে দিতে। ওর অনেকদিনের শখ নিজের অমন একটা ছবি পাবার। তোমাকে একটা মেইল পাঠিয়েছি অনিক ভাই। দেখো...'
ট্যান কখনো দুঃখ নিয়ে কিছু বলেনি আমাকে। খুবই অবাক হয়েছিলাম, ইরানের ইশফাহান শহরের এক টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করে কথাগুলো বলে যখন অনানুষ্ঠানিকভাবে কলটা কেটে দিয়েছিলো সে। তড়িঘড়ি করে মেইলটা খুলে আমি পেয়েছি নীচের অ্যাটাচমেন্ট। গুগল সার্চ করে সত্যিই খুজে পেয়েছি আইশোলপানকে, কিন্তু ঈগল রানীর বয়সের হিসেবটা যে আমি মিলাতে পারিনি!
-তানভীর রেজা অনিক
__________________________________________________________________________
লালচে একটা ট্রেইল ধরে আমরা চললাম লেক তোলবোর উদ্দেশ্যে। সবার প্রথমে আমিরখান, এরপরে আমি, আর আইশোলের ঘোড়া ছুটছে আমার পাশাপাশি। মেয়েটা আমাকে নিজের কথা শোনালো। পুর্বপুরুষদের নিয়ে সে খুবই গর্বিত। ও নিজেকে নিয়েও খুব গর্বিত, একটা মেয়ে ঈগল হান্টার হবে, তা কেউ কখনো মেনে নেয়ার কথা ভাবেওনি, কিন্তু ওর পরিবারের দারুন সহনশীলতায় ঠিকই তা করে দেখিয়েছে মেয়েটা। আর আজকের ঘটনার পর থেকে ওর সামনে বিরাট দিগন্ত উন্মোচিত হলো। আইশোলের বয়স তখন সবে ষোল। সমবয়েসী ছেলেটা যেভাবে উদভ্রান্ত হয়ে যায়, সে ঠিক তার বিপরীত, ধীরস্থির, শান্ত। ওর পরিপক্কতা আমাকে করলো মুগ্ধ। আইশোলও আমাকে ট্যান ভাই ডেকেছে। ও বলেছে, ট্যান ভাই, তুমি একবার আমিরের বড় বোনকে বলবে দয়া করে আমার কথা? ও আমাকে চেনে, এমন ভাবটা পর্যন্ত করতেও খুব ভয় পায়। মেকী ভঙ্গিতে চোখ রাঙালো সে আমিরখান ওমারভকে।
আমির যেকথা লুকিয়েছে, তা হচ্ছে, ও আইশোলদের গ্রামে গিয়েছে, দুজনে প্রতিমাসে দুইবার করে একসাথে শিকারে যায়, পূর্বের অবারিত প্রান্তরে। রুক্ষ পাহাড় থেকে হাটুজলের নদী, ঘেসোপ্রান্তর মাড়িয়ে দাপিয়ে বেড়ায়, আর শুধু ছুটে বেড়ায়, আমির এতটাই মগ্ন থাকে আইশোলে, ঈগলের রাণীর কাছ থেকে সে ঈগলের ব্যাপারে কিছুই শিখতে পারেনি, কেবল নির্বোধের মত হাসে সেকথা শুনলে। আইশোল আরও বলেছে, আমিরখান ওমারভ ভীষণ নির্বোধ এক কিশোর, যার নেই কোনো দায়িত্বজ্ঞান, ওর উপর প্রায় সবসময়েই রেগে থাকতে মন চায় তার, কিন্তু আমার কাজাখ বন্ধুটির এক মুহুর্তের বিরহভরা দৃষ্টি, অথবা কোনো এক অদ্ভুত মুহুর্তের এক টুকরো হাসি তাকে সব ভুলিয়ে দেয়। এইতো কিছুদিন আগের কথা, মিস আইশোলপান তার শহুরে এক বন্ধুকে ঈগল ধরতে নিয়ে গেলো উত্তরের তৃণভুমি পেরিয়ে, ‘বোকা ছেলে’ আমিরখান ঈর্ষায় এক সপ্তাহ ঠিকমত খায়নি, মায়ের অজান্তে নিজের খাবার বাইরে যেয়ে ফেলে দিয়ে এসেছে, আর এই কথা অনেক অভিমান ভরা এক চিঠি পাঠিয়ে সে জানিয়েছে খোদ আইশোলপানকেই। ঈগল-রানীর তখন খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো হাদা ছোড়াটার কানদুটো ধরে ইচ্ছেমত মলাই করে দিতে, কিন্তু সে তবু তা করেনি। পরের সপ্তাহে আমির তার কাছ থেকে একটা রুমাল উপহার পেলো, নিজহাতে সেলাই করেছে ওটা কাজাখ-মংগোল কিশোরী। শেষবার শিকারে বেরিয়ে যখন আইশোলের ডানপায়ের কব্জিটা মচকে গেলো, আমিরখান কি করেছে? ওর যেখানে আইশোল-পানের ঘোড়াটার লাগাম নিজের ঘোড়ার সাথে বেধে নিয়ে, মেয়েটাকে তার ঘোড়ায় চড়িয়ে ওলগিয়াই শহরে ফিরিয়ে নেয়া উচিত ছিলো, ও তখন প্রায় নিজের সমান ওজনের মেয়েটাকে কাধে ঝুলিয়ে এক মানুষ চওড়া এক ভীষণ সরু গিরিখাতের ট্রেইল পেরিয়ে কোন এক বিরান প্রান্তরের মাঝে এক কুড়েঘরে নিয়ে গিয়ে ভয়ালদর্শন এক বুড়োর কাছে সপে দিলো, আর বৃদ্ধ জাদুকর ডাক্তার লোকটা আইশোলকে প্রাথমিক পথ্য দিয়ে সুস্থ করে বাড়ি ফেরত পাঠালো, একা, আমির কিন্তু তার সাথে ফেরত যাবার সৌজন্যবোধটাও দেখায়নি। এর কারন কি? কারন আমিরখানের বাবা সেদিন ওলগিয়াই যাবেন, ওই ট্রেইলে মেয়েটাকে সাথে নিয়ে ছেলেটা কিছুতেই ফিরতে পারেনা! কিসের এত ভয় আমিরের? আইশোল-পান তো কোনো ক্ষতিকর জিনিস নয়! কিন্তু সমস্যা তো সত্যিই একটা আছে, ওরা মনে করুক, আর না করুক!
ওদের মাঝে আছে ধর্মের ব্যাবধান! কাজাখ মুসলমান আমিরখান ওমারভের জীবনযাত্রার সাথে আকাশ-পাতাল ফারাক কাজাখ-মংগোল যাযাবর আইশোলপান নামক মেয়েটির। দুর্গম এই প্রান্তরে ওটা যে দুস্তর, দুর্লংঘ্য এক দুরত্ব! যদিও ওরা দুজন খুবই সাহসী ছেলেমেয়ে, এবং অমন মানুষ, যারা সামান্য বিব্রতও বোধ করেনা নিজেদের পরিচয়ে, নিজেদের অজান্তে আজন্ম সময় পূর্বে সৃষ্ট এক দেয়ালের বাধা নিয়ে, কিন্তু তবুও অবুঝ দুই মন কিছুতেই অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যতের কাছে নিজেদের ধরা দিতে চায় না। আমিরখান ওমারভের যে চরিত্র, সে হাল ছেড়ে দেবে, তাই-ই স্বাভাবিক! কিশোরসুলভ হাজার অভিমান, ক্ষনিকের উত্তেজনা মাখা কথাবার্তাও সে বলে, যখন কোনো দিশা খুজে পায় না, সে তখন শুধু খুজে পায় আইশোলপানের সুনিশ্চিত প্রশ্রয়। এই বিরান প্রান্তরে, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন দুনিয়ার এক চপল কিশোরের আবেগের সাথে সামান্যতম তফাত নেই পৃথিবীর অন্যতম ব্যাস্ত শহরে বেড়ে ওঠা একসময়ের কিশোর আমার। এই বিরান প্রান্তরে, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন দুনিয়ার এক কিশোরীও তার চঞ্চলা নদীর মত হৃদয়কে একজন দুর্দান্ত সহিসের অভ্যস্ত হাতে লাগাম টানার মত করে যেভাবে নিয়ন্ত্রন করে, পাহাড়ী ঝর্নার মত অনুভূতিপ্রবণ তার কিশোর বন্ধুটির সকল ছেলেমানুষিকে পরম যত্নে প্রশ্রয় দেয়, অবলম্বন দেয় হাজারো নিতান্ত অর্থহীন আবেগের, তার সাথে তফাত নেই পৃথিবীর অন্যতম ব্যাস্ত শহরে বেড়ে ওঠা আমার একসময়ের কিশোরী বান্ধবীটির। কয়েক মুহুর্তের জন্য আমি যেনো ফিরে গেলাম ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি কোনও গলিতে, চৈত্রের কোনো এক ঘুমে ভরা দুপুরে।
আমি কথা দিলাম, আমিরের বাবাকেই বলবো আমি ওদের দস্যি বন্ধুত্বের কথা, মনের কথা। অবশ্যই বলবো! তুমি কোনো চিন্তা কোরোনা আমিরখান, তুমিও কোনো চিন্তা কোরো না আইশোলপান! তোমাদের ট্যান ভাই তার সবটুকু বুদ্ধি খাটিয়ে একটা সমাধান তোমাদের দিয়েই যাবে।
লেকের পানি সবুজ রঙের! সে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। ভীষণ স্বচ্ছ পানির আঁধারটি চারকুলে সৃষ্টি করেছে সোনালী বালুকাভুমি। বালুকাভুমির তিনদিকে এক অভিন্ন পর্বতসারি ছোয়ার পথ দ্বীর্ঘায়িত হয়েছে দিগন্তবিস্তৃত ঢেউখেলানো সমতলভুমিতে, শুধু উত্তর-পশ্চিমের উজ্জ্বল সাদাটে পাহাড়সারি মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে একদম নিকটে। ওই পাহাড়সারির দিকে তাকিয়ে থাকলে শুধু মনে হয়, আহা, মৃত্যুর পর আমার দেহটা যদি এমন কোনো শুভ্র পাহাড়চুড়ায় কবর দিয়ে দিতো কেউ একটু দয়া করে, আমার তখনই মরতে কোনো আপত্তি থাকবেনা! পাহাড় আজীবন আমাকে দারুনভাবে প্রভাবিত করে।
ওই পাহাড়ে আমার কবর হওয়া সম্ভব না হলেও, আমিরখান ওমারভের বহুদিনের এক ইচ্ছে পূরণ হলো ওখানেই। মিস আইশোল-পানের সাথে ছবি তুললো সে, ওটা হাতে পেয়েই সে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিলো। আইশোলপানের ইচ্ছাও পুরণ হলো। পাহাড়ের সবচে উচু পাথরটার উপর দাঁড়িয়ে ওর বিরাট, রাজকীয় হোয়াইটফেদার কে শিস দিয়ে নীচে এনে নিজের বাহুতে বসালো। ওকে বলেছিলাম, সত্যিকার রানীর মত রাজসিকভাবে হাসতে। কিন্তু ও ভুল করে এক রাজকন্যার মত লাজুক হাসি হেসে ফেললো, ওই একই মুহুর্তে হোয়াইট ফেদার তার ধৈর্য্য হারিয়ে উড়ে যেতে চাইলো। ঠিক তখন আমার ক্যামেরায় আমার জীবনে তোলা সবচে দামী ছবিটি উঠলো। যদিও সেদিন অনেক মানুষ ওর ছবি তুলেছে, কিন্তু মেয়েটা চেয়ে নিতে পারে, এমন কেউই ছিলোনা তাদের মাঝে। সে এতই খুশী হয়েছিলো ওটা দেখে, খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারেনি। তখন বিকাল হয়ে এসেছে। সুর্যের কোমল রশ্নিরা অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারনা করেছে আলতাইয়ের উপত্যকায়, আমার চারিপাশটা সোনালী! চোখে ধাধা লেগে যাওয়ার মত। তখন, বৃস্টির গন্ধ পেলাম আমি।
বললাম আমিরকে সেকথা। ওরাও বুঝতে পেরেছে! আইশোল এবং আমির নিজেরা ফিসফাস করে কি যেনো বলাবলি করলো, এরপর বললো, আমরা ফেরার পথে একটা আড়াআড়ি পথ ধরবো। ওটা আমির আর আইশোলের গোপন পথ, আমাকে দেখালে কোনো সমস্যা নেই বলে ঠিক করেছে ওরা! তোলবো লেকের পূর্ব প্রান্ত থেকে চিহ্নহীন এক পথ ধরে আমরা তখন সবে পশ্চিমে রওনা হবো, লেকের দক্ষিন-তীর ধরে, ঠিক সেই মুহুর্তে গায়ে এসে লাগলো ঠান্ডা বাতাসের হলকা। হঠাত করেই চলে গেছে আলো, চারিদিকে এখন লালচে ধুসরতা, আর বাতাসের উদাস করা সোঁদা গন্ধ!
‘তোমরা বৃষ্টি পছন্দ করো?’ বিরাআট এক শ্বাস নিয়ে দরাজ গলায় বলে উঠলাম আমি। গান গাইতে মন চাইছে, কি সুন্দর এক আবহাওয়া এটা!
‘অ্যাঁ? বৃষ্টি আবার পছন্দ করার জিনিস হলো না কি! ট্যান ভাই কি যে বলো’ আইশোলের দিকে গাম্ভীর্য্য নিয়ে তাকালো আমার কাজাখ বন্ধুটি ‘ট্যান ভাই অদ্ভুত সব কথা বলে! একদিন এসো আমাদের আইশা দাদীর আড্ডায়…’
‘হ্যা, আসবে, আসবে’ মুচকি হাসলাম আমি ‘বৃষ্টিতে ভিজতে না চাইলে জোরসে ঘোড়া ছোটাও!’
‘কিন্তু ট্যান ভাই’ কথা বললো এবার মিস আইশোল ‘আমরা একটা গিরিপথ পেরিয়ে যাবো, ওখানে যে একটু দেখে পথ চলতে হবে’
‘তোমরা পাহাড়ী ছাগলের মত বাইতে পারো, চিন্তা কিসের! আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেয়ো শুধু!’
একদল তাড়া খাওয়া হাসের মত আমরা এগোতে রইলাম পাহাড়ী পথটা ধরে। সামনে মাথা উচু করে আছে বিরাট এক পাহাড়, ওটা পেরিয়ে নামতে হবে ওপারের প্রান্তরে, পথিমধ্যেই পড়বে আইশোলের উল্লিখিত সেই গিরিখাত। ততক্ষণে অদ্ভুতরকম গরম হয়ে উঠেছে বৃষ্টিস্নাত পরিবেশটা। আমি আগে কোনোদিন অমন কিছু দেখিনি। আমির আর আইশোল চুপ হয়ে গেছে। ওরা কেমন দিগভ্রান্ত, সম্ভবত সামান্য ঘাবড়ে গেছে। ঝড়বৃষ্টি এত বেশী ভয় পায় এদিকের মানুষ!
‘ট্যান ভাই, দক্ষিণে দেখো’ শুকনো কন্ঠে হঠাত বলে উঠলো আমির।
দক্ষিণে? দক্ষিণে কি হয়েছে? প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। ভীষণ অন্ধকার চারিদিক, তার মাঝে বিরাট এক দানবের মত মনে হচ্ছে দক্ষিণের আকাশজুড়ে আরও কালো মেঘেদের। আপাতদৃস্টিতে স্থির মনে হলেও, কালো রেখাটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। বড় হচ্ছে না আসলে, ওটা এগিয়ে আসছে। তখন কালো মেঘেদের আর কালো বলে মনে হলো না, ধীরে ধীরে তারা লালচে রঙে পরিণত হলো। চকিতে মনে পড়ে গেলো আমার! গোবী মরুভুমির ভয়ানক উষ্ণতা, আর আলতাইয়ের ঠান্ডার মাঝে স্যান্ডউইচের মত এই প্রান্তরে বাতাসের অযাচিত আচরণে ধেয়ে আসে বিরাট সব ধুলিঝড়, সামান্যতম পুর্ব-সতর্কতা ছাড়া, তখন মঙ্গোলিয়ার খোলা প্রান্তরের মাঝে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে দেয় অবাধে এগোতে থাকা সেই ঘুর্নিবত, আলতাইয়ের সুবিশাল কোলে বিরাট এক ধাক্কা খেয়ে অবশেষে থেমে যায়।
‘জলদি করো, আগামী বিশ মিনিটের মধ্যেই পৌছে যাবে ওটা’ আমির বললো, ইতোমধ্যে বাতাসের গর্জন তীব্র হয়ে উঠেছে ‘গিরিখাতে পৌছতে পারলে আমরা এই খোলা জায়গা থেকে অনেক বেশী নিরাপদ থাকবো, ওখানে একটা সুড়ঙ্গমত জায়গা আছে। এসো…আইশোল, তুমি ভয় পেয়ো না’
‘আমি ভয় পাচ্ছি না’ নিস্কম্প কন্ঠে বললো ঈগল-রাণী।
‘আমিও না’ বললাম আমি ‘ওখানে পৌছতে কতক্ষণ লাগবে, আমির?’
‘পৌছে যেতে পারবো আশা করছি, ওটা আসার আগেই’ চিৎকার করে কথা বলছি আমরা। কয়েক মুহুর্তের মাঝে বাতাসের গর্জন বহুগুন বেড়ে গেছে।
‘আমরা গিরিপথ টা এড়িয়ে যেতে পারি না আমির? আইশোল বলেছিলো জায়গাটা বেশী সুবিধার না। ঝড়ের মাঝে ওটা পেরুনো ঠিক হবে?’
‘এখন পিছনে ফিরলে সোজা আমাদের উপর এসে পড়বে ওটা ট্যান ভাই, পিছনে চেয়ে দেখো, একটা ঝোপ পর্যন্ত নেই আড়াল নেয়ার জন্য!’
‘আগে কখনো ধুলিঝড়ে আটকেছো?’
‘বহুবার! কিন্তু এমন বিচ্ছিরি জায়গায় এই প্রথম’
আমিরের দিকে তাকালাম। ভীত মনে হচ্ছে না ওকে। শুধু মনে হচ্ছে, সামান্য দিশাহারা। ঝুলিঝড় সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান আছে আমার, কিন্তু ওগুলো পুথিগত। আমিরের উপর পুরোপুরি আস্থা রাখছি আমি, এই প্রকৃতির কিশোরকে আমার কোনো উপদেশ দেয়া সাজে না। বেড়ে চলেছে হাওয়ার দমক। আমরা নিজেদের চোখ ছাড়া শরীরের আর কোনো অংশই খোলা রাখিনি। বাতাসের গর্জন বেড়ে যখন নিজেদের আর কোনো কথা ই শোনা সম্ভব হচ্ছিলোনা, অমন সময়ে সামনে উদয় হলো ভয়ঙ্করদর্শন এক পথ। সেই অভিশপ্ত গিরিপথ।
সুর্য ডুবে গেছে কি না জানি না, আমাদের চারিদিকে ঝাপি ফেলে দেয়ার মত অন্ধকার ঘনিয়েছে তখন। ওটাকে ঠিক অন্ধকার না বলে, লালচে রুপকথার দুনিয়া বললে বেশী মানাবে, কিন্তু সেই রুপকথা নিরানন্দ। পাথুরে পথ টা উপরে উঠছিলো কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত, এই মুহুর্তে ওটা সমতল, বিরাট সোনালী পাহাড়টার এক পাশ ঘেঁষে এগিয়ে গেছে ওটা, না, কেউ কেটে বানায়নি, প্রাকৃতিক গিরিপথ। একটা ঘোড়া হেটে যাবার পর তার বাম পাশ ঘেঁষে সর্বোচ্চ ফুটখানেক দুরত্বে শুরু হয়েছে খাড়াই, নীচে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কিছু ই! প্রথম দর্শনেই আমার পিলে চমকে গেলো। জিগ্যেস করে জানার উপায় নেই, ওই পথ কত লম্বা। আমির ইশারা করছে তখন, আমি যা বুঝলাম, ও আশ্রয়ের কথা বলছে। কিছুদুর সামনে গিরিপথের একটা মোড় ঘুরে একটা আড়াল পাওয়া যাবে দক্ষিণের এই তান্ডব থেকে, কিছু টের ই পাবো না আমরা।
যদিও আমি তখন বেশ টের পাচ্ছি, কি হচ্ছে, মনে হচ্ছে, আমি চিত হয়ে শুয়ে আছি, কিন্তু আদতে বসে আছি। পিছন থেকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে বাতাস, ওটাকে প্রতিহত করতে বাতাসের ধাবমান দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি ঘোড়ার পিঠে। এই বাতাসের মাঝে আমাদের ঘোড়াগুলো সত্যি ওই পথ পেরিয়ে যেতে পারবে, বিশ্বাস হতে চাইলো না আমার। ইতিমধ্যে অনেক সাহস দেখিয়েছে ওরা। মংগোলিয়ান ঘোড়ারা অনেক বেশী সাহসী, ওরা যোদ্ধা। আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বললে, ওখানেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তাম তিনজনে। কিন্তু ঘোড়াদের কোনো কাভার থাকতো না। মংগোলিয়ান রা নিজেদের ঘোড়াকে জীবনের সমান ভালোবাসে। আমিরখান ওমারভ, আর আইশোলপান, কারও সামান্যতম দ্বিধা নেই, ঘোড়াগুলোকে নিয়ে পর্বতের আড়ালে গিয়েই আশ্রয় নেবে ওরা। সম্ভবত আমাকে বেশ ঘাবড়ে যেতে দেখেছিলো ওরা। আমিরখান জড়িয়ে ধরলো আমাকে। কানের কাছে চিৎকার করে যা বললো, তার দুয়েকটা শব্দ যদি ঠিক শুনে থাকি, তাহলে ও বলেছে, ও আমাকে ভালোবাসে।
আর কি দ্বিধা করতে পারি? কাজাখ বন্ধুটির দিকে তাকিয়ে হাসলাম আমি। ডান হাত মুঠি পাকিয়ে নিজের বুকের বাম পাশে দুইবার আঘাত করলাম, এরপর আমিরের কাধ চাপড়ে দিলাম জোরেশোরে।
সবার প্রথমে গেলো আইশোলপান। আমিরের অনেক অভিযোগ ছিলো, কিন্তু তাকে পাত্তা দেয়নি ঈগল রাণী। এই পথ তার দুই হাতের তালুর মত চেনা । আমাকে থাকতে হলো মিস আইশোলের পিছনে। আমির সবার শেষে, আমাদের দেখে রাখবে সে। আইশোলের ঘোড়াটা একটা স্ট্যালিয়ন। খয়েরী রঙের রাজকীয় ঘোড়াটার চোখে কোনো অনুভুতি নেই, পদক্ষেপে নেই দ্বিধা। ধুলোর আবরনে আবৃত হয়ে, কয়েক মিটার দৃস্টিসীমা নিয়ে সে এগোলো খাড়াইটা ধরে। প্রথম দশ মিটার পথ সবচেয়ে ঝুকিপুর্ন। বাতাস সরাসরি আঘাত করছে, এবং ভয়ের কথা এই যে, যে কোনো মুহুর্তে তার দিক পরিবর্তন হতে পারে। তাহলে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে কিছুতেই ঘোড়াগুলো দিক সামলে নিতে পারবেনা, আমি সে ব্যাপারে নিশ্চিত। চরম অকৃতজ্ঞের মত চুড়ান্ত বিপদের মুখে পড়েই আমি কেবল সৃস্টিকর্তার কথা মনে করলাম, আরও অনেক পুরনোবারের মত। এবারও নির্লজ্জের মত আশা করে নিলাম, তিনি সাহায্য করবেন, নিশ্চই। সত্যি বলতে, আমি চোখ সরু করে চেয়ে ছিলাম। পরের কয়েক মুহুর্তে কি কি ঘটেছিলো, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে, আইশোলপানের ঘোড়ার লেজটা আমার চোখের সামনে থেকে একবার গায়েব হচ্ছে, নিমেষেই আবার এসে হাজির হচ্ছে।
একটানা শাআআ শব্দের সাথে যোগ হয়েছে আলগা পাথরের ইতস্তত ছোটাছুটির ভয়ানক শব্দ। আমার মাথায়ই আসেনি, অমন একটা বড় পাথর গড়িয়ে এসে পড়লে কি ঘটবে। আমাদের গা ঘেঁষে ডানে পাহাড়ের পাথুরে ঢালটা কোথাও খাড়া উঠে গেছে আকাশছোয়া উচ্চতায়, কোথাও আনুভুমিক ঢাল তৈরী করে আছে রুক্ষ পাথুরে প্রান্তর। প্রান্তরের প্রায় কিছুই দৃশ্যমান ছিলো না, শুধু ওখানের লালচে ধুলো ঘুর্নিবতের তান্ডব ছাড়া। কিন্তু প্রকৃতির কিশোর আমিরখান ওমারভ ভোলেনি নিজের সত্বাকে। স্প্রিঙের মত রিফ্লেক্স নিয়ে এসে মাপা পদক্ষেপে এগোচ্ছিলো তার বাদামী ঘোড়াটাকে নিয়ে। অমন কোনো ঢাল ঘেঁষে এগোনোর কোনো এক অশুভ মুহুর্তে আমার কানে যেনো একটা আর্তচিতকার ভেসে এলো। পিছন থেকে। কিন্তু পিছনে ফিরে তাকাতে গেলে আমি কিছুতেই ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে পারবোনা, ইতিমধ্যে আমার হাত অবশ হয়ে আছে, এবং সম্ভবত কাপছেও। তারপর আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা বিরাট ধাক্কা অনুভব করলাম আমি, কেউ যেনো সজোরে ধাক্কা দিলো, আর নিজেকে আবিস্কার করলাম ভাসমান অবস্থায়। সত্যি? কোথায় ভাসছি আমি, সেকথা ভাবতে শুরু করার আগেই পাথুরে ঢালটার উপর ধপাস করে আছড়ে পড়লাম আমি, বুক থেকে বেরিয়ে গেলো সবটুকু হাওয়া। একই মুহুর্তে আবছাভাবে আমার পাশ দিয়ে বিদ্যুতচমকের মত একটা ঘোড়া ছুটে যেতে দেখলাম যেনো। কিন্তু ঘোড়ার পিঠে একজন আরোহী আছে। ঘোড়াটা ছুটছে, আর বাতাসের বিকট শব্দ ভেদ করে কোনো দানবীয় রেলগাড়ির গড়িয়ে চলার মত একটা শব্দে ভরে গেলো পুরোটা পৃথিবী! স্বপ্নের ঘোরেই যেনো দেখতে পেলাম, বিরাট এক ধুলিসার, পাথুরে ছায়া এসে আমার দৃশপট থেকে গায়েব করে দিলো ঘোড়সওয়ারকে, ভয়াবহ গতিতে আমার দুই মিটার দূরে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়লো সেই দানব, গিরিপথের একদম কিনারে আঘাত হেনে সে বিচুর্ন করে দিলো হাজার বছর পুরনো সেই ট্রেইলের বিরাট এক অংশ, এরপর যেভাবে এসেছিলো, ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গেলো নীচের বিরাট, শুন্য গহ্বরে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে উপরিউল্লেখিত ঘটনাগুলো ঘটে গেলো, প্রায় একসাথে।
লালচে রূপকথার দুনিয়ায় আমি আর বেশীকিছু দেখতে পাইনি। দম পুনরায় ফেরত পাবার আগেই চোখে পড়লো আইশোলপান। কালো, অন্ধকারের মাঝে লালচে ধুলোর রাজ্যে আধিভৌতিক এক অপসৃয়মান ছায়ার মত, আমার মতই হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, পাহাড়ী গিরিপথটা যেখানে বিরাট এক গর্তে রূপ নিয়েছে, তার ওপারে। কিন্তু সে তার স্যাডল থেকে পড়ে যায়নি। পড়ে যায়নি, কিন্তু লাফ দিয়ে পরমুহুর্তেই স্যাডল ছাড়লো সে, একবার এক লাফ দিয়ে আমার দিকে আসতে চাইলো। ঠিক তার পরের পদক্ষেপ সে উল্টোদিকে ফেললো, গিরিখাতের একদম কিনারে গিয়ে নীচের দিকে চেয়ে রইলো, তার দুই হাত ঝুলে পড়েছে অস্বাভাবিকভাবে, একদৃষ্টিতে নীচের দিকে চেয়ে আছে, মাথার পালকটা খুলে গিয়ে তার লম্বা, বাদামী চুলগুলো গলায়, মুখে পেঁচিয়েও তার গুমরানো থামায়নি, মাতাল হাওয়ার দমকে ছিড়ে যেতে চাইছে, আঘাত হানছে ঈগল রানীর চোখেমুখে। কিন্তু তবু সে নিশ্চল। আমি ঠিক চার সেকেন্ড পরে উঠে দাড়ালাম। ডান হাতের মাংসপেশীতে যেনো কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিচ্ছে, অমন এক অনুভুতির সাথে বাতাসের ধাক্কায় প্রায় উড়ে গিয়ে পড়লাম উড়ে আসা পাথরের চাইটার পথ অনুসরন করে। নখ দিয়ে পাথুরে মাটি খামচে ধরে হাচড়ে পাচড়ে উঠে দাড়ালাম। আমার ঘোড়াটাকে দেখতে পাচ্ছি না কোথাও। আমিরের সবচে প্রিয় ঘোড়া, সে আমাকে চড়তে দিয়েছিলো। আইশোলের ঘোড়াটা ভীতু বিড়ালের মত কাপছে। আমিরের ঘোড়াটা কোথায়? আর আমির? আমির কোথায়?
বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠলো আমার, দুই হাটুর সমস্ত শক্তি হারিয়ে আমি আরেকবার আছড়ে পড়লাম আলতাই পর্বতের সেই গিরিপথের কিনারা খামচে ধরে। ঢোক গিলতে গিয়ে বোধ হলো, গলার মাঝে যেনো বোয়াল মাছের কাটা গেথে দিয়েছে কেউ। আরেকটাবার হাচড়ে পাচড়ে উঠে সবটুকু শক্তি খরচ করে আমি আইশোলপানের কাছে গেলাম। মেয়েটা তখনো নির্বাক তাকিয়ে আছে নীচের খাদে, দুই হাত ঝুলছে, প্রবল বাতাসের মাঝে যেনো এক পাথরের মুর্তি সে, শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো উড়ছে।
প্রাণবন্ত, প্রশান্ত, উচ্ছল, মিষ্টি ছেলেটা, আমার কাজাখ বন্ধুটি, দুই সপ্তাহের ব্যাবধানে দ্বিতীয়বার আমার জীবন বাচিয়েছে জীবনের সবটুকু আনন্দ নিয়ে বেচে থাকা যেই কিশোরটি, আলতাইয়ের ঐ উপত্যকায় চিরতরে হারিয়ে গেছে সে, আমার চোখের সামনে দিয়ে, সামান্যতম সুযোগ ও না দিয়ে, যেনো সেই একই পথে হারিয়ে যেতে না পারে তার প্রিয় ট্যান ভাই, তার প্রিয়তমা আইশোল-পান।
বুকের মাঝে আমার তখন পাগলা ঘোড়ার মত ছুটছে হৃদপিন্ড, সটান শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে প্রকৃতির দুর্দান্ত তান্ডবের মাঝে, অথচ আমি যা করেছিলাম, তা হলো, শক্ত খুটির মত নির্বাক আইশোল-পান কে প্রায় টানতে টানতে পাথুরে দেয়ালটার কাছে নিয়ে এলাম, যেখানে দাঁড়িয়ে এখনো কাপছে মেয়েটার রাজকীয় স্ট্যালিয়ন। আইশোল তখন নড়লো। আমার হাতের মুঠি থেকে পিছলে গিয়ে হাটুমুড়ে বসে পড়লো পাহাড়ি দেয়ালটায় হেলান দিয়ে, দেয়ালে অসহায়ভাবে খামচি দিচ্ছে সে, আর দুইচোখ দিয়ে বইয়ে দিয়েছে অশ্রুবন্যা। আমি ওর দিকে আর তাকাইনি। মেয়েটাকে আড়াল করে দুই পা ছড়িয়ে বসে চেয়ে রইলাম ক্রমাগত গর্জনরত ধুলিধুসরিত মংগোলিয়ান উপত্যকার পানে। হৃদয় নিংড়ানো কান্নার মত গর্জন করছে তখনো বাতাস, কিন্তু তখন তাতে মিশে আছে কেমন অদ্ভুত এক হাহাকার, কখন যেনো বাতাসের শব্দ ভেদ করে আমার কানে বাজতে লাগলো, দুইটা মাত্র শব্দ। ট্যান ভাই!
প্রকৃতির নিয়মে একসময় ইহজগতের সবকিছুর মত স্তিমিত হয়ে এলো খোদ সেই প্রকৃতি। টের পাইনি কখন যে অদ্ভুতরকম শান্ত হয়ে গেছে আমাদের চারিপাশ। শান্ত, কিন্তু তবু যেনো কানে এসে আঘাত করছে হাহাকারেরা। আকাশে অসংখ্য তারকারাজি, চাঁদটা কত বড় হয়ে উঠেছে সে রাতে! বাতাসে কেমন এক নেশাধরানো সোঁদাগন্ধ। সেই গন্ধ নাকে যেতে সেদিন প্রথম, ও শেষবারের মত কেদে ফেললাম আমি। আমি কাদলে মুখের কোনো পেশী সংকুচিত হয় না। কিভাবে যেনো ফোয়ারার মত গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। বুকের মাঝে বিদীর্ন হয়ে যাবার এক অনুভুতি...
‘ট্যান ভাই’ আচ্ছন্ন এক স্বরে আমার অতি প্রিয় এক সম্বোধন শুনে ভীষণ চমকে উঠলাম। আমার কাধে হাত দিয়ে ঠেলছে, আইশোলপান ‘আমিরকে খুজে বের করতে হবে না ট্যান ভাই?’ স্বাভাবিক স্বরে কথাটা শুরু করে ডুকরে উঠে শেষ করলো মেয়েটা।
‘হবে তো’ নিজেকে ভুলে হতোদ্যম হয়ে মেয়েটাকে টেনে ওঠালাম আমি ‘আমিরখান ওমারভ পৃথিবীর সবচে সাহসী ছেলে, মিস আইশোল, তোমার বন্ধু। আমার যে ওকে নিয়ে কত গর্ব!’
‘সবসময় ও শুধু গালগল্প করতো ট্যান ভাই’ জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকালো ঈগল রানী ‘এখন সেই সব কিছু বিশ্বাস না করে উপায় আছে, বলো?’
গিরিখাতের দক্ষিণে, অনেক উচু একটা পাহাড়চূড়া। ওখান থেকে চারিপাশের বহুদুর চলে যায় দৃষ্টি । এমনকি বহুদুরের সেই সোনালী প্রান্তরের উতসবের আলোকচ্ছটা অনেক কাছে বলে মনে হয়, খুব ভালোমত দক্ষিন-পুর্বে তাকালে সাগান-গোলের অস্তিত্বও চোখে পড়ে। আর নীচের গিরিখাতটা ওখান থেকে পুরোটা দৃশ্যমান। দুই ঘন্টা পর যখন লোকারণ্য হয়ে উঠলো নির্জন, অভিশপ্ত সেই গিরিপথ, আমি তখন সেই পাহাড়ের চুড়ায়, একাকী বসে ছিলাম। আইশোল আর আমি সাগান-গোল যাওয়ার সাহস পাইনি, ঘুরঘুর করছিলাম গ্রামের পাশের উপত্যকায়। সেখানেই আমিরখানের শহুরে চাচাতো ভাইকে ভাগ্যক্রমে খুজেপেতে, ওকে দিয়েই আইশা দাদীর কাছে খবর পাঠিয়েছিলাম আমি। এরপর যখন গ্রাম থেকে প্রায় প্রতিটি লোক উর্ধশ্বাসে ছুটে এলো, চলতে শুরু করলো আইশোলপানের দেখানো পথে, সবার অজান্তে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সাগান-গোল থেকে, চিরতরে।
আমার কাজাখ বন্ধুটির ছিন্নভিন্ন দেহটা ওরা যখন খুজে বের করলো অনেক নীচের এক পাহাড়ী নদী থেকে, তখন প্রায় ভোর। রাতের প্রতিটা মুহুর্ত আমি হৃদয় ভেঙে দুই টুকরো হবার অনুভুতি নিয়ে পাথরের মত বসে রইলাম সেই পাহাড়চুড়াতে। প্রানবন্ত সেই কিশোরটিকে ওরা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে, তারই একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রওনা হলো সাগান-গোল অভিমুখে। আলীচাচাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ক্রমেই ছোট থেকে আরও ছোট হতে থাকা তার ছায়ামুর্তির মুখচ্ছবি কল্পনা করে আমার নিজের বাবার কথা মনে পড়লো। তিন তিনটি বোনের একমাত্র আদরের ছোট ভাইটি সে। নিজেকে ভীষণ বড় এক অপরাধী হিসেবে নিজেকেই ঘোষণা করেছি আমি, সে তো বহু আগেই, এখন শুধু মনে হচ্ছে- আর কখনো আগের মত ভাবতে পারবো কি আমি? নিজেকে প্রকৃতির মত উদার ভাবতে আমার কত ই না ইচ্ছে!
সেদিন সারাদিন ওখানেই কাটিয়েছিলাম আমি। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত নেমে এলো, রাতে যখন ভীষণ ঠান্ডা অস্থিমজ্জা কাপিয়ে দিলো, আমি কিছু বোধ করিনি। ক্ষুধা? ঘুম? ওই দুটো জিনিস হারিয়েছিলাম আরও বহু আগে। শেষ আমার পেটে যা পড়েছিলো, তা হচ্ছে এক ক্যান কোকাকোলা, আমির আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো সেটা, তখন আলতাইয়ের সোনালি উপত্যকায় কাজাখ ভাষার মিষ্টি গানের সুর ভাসছিলো।
সেদিন মধ্যরাতে, অবশেষে উঠে দাড়ালাম আমি। পাহাড়ের দক্ষিণ উপত্যকা ধরে প্রায় দুই ঘন্টা হেটে, নীচের খোলা প্রান্তরে, একটা ঝোপের মাঝে রাখা আমার 'আশা'য় চড়ে রওনা হলাম সোজা সাগান-গোল মুখী। চাদের আলোয় বিস্তীর্ন পথ ধরে পেরিয়ে এলাম লেক তোলবো।
প্রায় ভোররাতে, সাগান-গোলের উপকন্ঠে এসে হাজির হলাম আমি। আমার ধারনা ছিলো ওরা আমিরকে কোথায় কবর দেবে। গ্রামের পাশের দারুন সুন্দর এক ফুলেল প্রান্তর, সবুজ, ঢালু উপত্যকায় সাগান-গোলের বুকে মৃত্যুবরণ করা প্রথম মানুষটি থেকে, শেষজন, আমার বন্ধু আমিরখান ওমারভকে, ওখানেই রাখা হয়েছে। কোনো কবরের উপরে সদ্য তোলা আলগা মাটির স্তুপ দেখে বুকের মাঝে ধ্বক করে ওঠে না, এমন কোনো মানুষ কি পৃথিবীতে আছে? আর, এই আলগা মাটির স্তুপটির নীচে যে ঘুমিয়ে আছে, সে মাত্র একদিন আগে জীবনের শেষ কথাটি উচ্চারন করেছিলো আমার উদ্দেশ্যে, সেকথা ভেবে সে কি ভীষণ অসহায়মাখা আক্ষেপ আমার, যেই আক্ষেপ আমি কোনোদিন ভুলিনি।
অনেকক্ষণ আমিরের কবরের পাশে কাটিয়েছি আমি। কতকিছু বলবো বলে ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু তখন কিচ্ছু মনে এলো না। ওর উদ্দেশ্যে শেষবারের মত বিড়বিড় করে বলেছি শুধু, আমিও তোমাকে ভালোবাসি, আমিরখান ওমারভ, তুমি আমাকে তৃতীয় যে জীবনটি দিয়েছো, সেই জীবনের প্রতিটি ক্ষণ আমি তোমার প্রতি ঋণী হিসেবে কাটাবো। একদিন আবার দেখা হবে তো, সেদিন তোমাকে আমার সারাজীবনের সব গল্প শোনাবো, তখন ওটা হবে পরিপুর্ন।
আমার কাছে কোনো কাগজ ছিলো না ঐ মুহুর্তে, হয়তো গ্রামে একটা চিরকুট রেখে যেতাম। আইশা দাদী আমার কথা ভাববে হয়তো, হয়তো অবাক হবে ভীষণ, কেনো আমি আর ফিরে এলাম না। আলীচাচা, চাচী, বোনেদের কাছে আজীবন ছোট হয়ে রইলাম আমি, তারা নিজের অজান্তেই হয়তো আজীবন আমাকে আমিরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করবে। কিন্তু আমি জানি, তারা কেউই মন থেকে আমাকে ঘৃণা করবে না। হয়তো শুধু এতটুকু অভিমান রয়ে যাবে, আমার হাত ধরে কেদেকেটে হয়তো একটু হলেও দুঃখের ওজন কমাতে পারতেন নিজেদের। কিন্তু, দুঃখ, আল্লাহ আমাকে ওইভাবে তৈরী করেননি। অদ্ভুত, রুক্ষ এক মানবচরিত্রের উপরে মেকী শিষ্টাচার, উদারতা, মহত্ব, এবং আবেগের প্রলেপ মিশিয়ে আমি নিজের চরিত্রকে গর্বিত করে উপস্থাপন করি নিজের কাছে, এবং সুযোগ পেলেই অন্যের কাছে। এটা অমন এক মুহুর্ত, যখন নিজের সত্যিকার নিকৃষ্টতা অনুধাবন করে মনটা কে ভিন্নপথে সরিয়ে স্ব-চরিত্রের সম্মানহানি থেকে রক্ষার সর্বশেষ প্রচেষ্টা করে মানুষ।আমিরের জন্য নিজের জানা সবগুলো দোয়া চেয়ে নিলাম সৃস্টিকর্তার কাছে। সবশেষে ওর কবরের দিকে ফিরে ডান হাত মুঠি পাকিয়ে নিজের বুকের বাম পাশে দুইবার আঘাত করলাম। এরপর উল্টোঘুরে আর একবারও পিছনে ফিরে না তাকিয়ে, পুর্বমুখী রাশিয়ান সীমান্ত অভিমুখে ছুটতে শুরু করলাম। আকাশছোয়া আলতাই পর্বত। দিগন্তবিস্তৃত সোনালী উপত্যকা। উদাসী বাতাসের প্রান্তর পেরিয়ে...