কবিজের দেশ, ধুসর মহাপ্রান্তরের কাজাখস্তানে ট্যানের আগমন...


সময়ের হিসাব নেই আমার কাছে, কিন্তু একদিন সকালে তীব্র আলোর ঝলকানিতে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। তড়িঘড়ি করে বাইরে উকি দিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেললাম। সুর্য! কোত্থেকে যেনো এসে হাজির হয়েছে সে ফের আরেকবার। পুরো পৃথিবীকে হাসাচ্ছে। হাত পা নাড়িয়ে এক ঝলক নেচে নিলাম আমি, খুব সম্ভবত ওকে নাচই বলা চলে। গলতে থাকা বরফে পা ডুবিয়ে হেটেছি কতক্ষণ, এবং এরপরে আগুন জ্বালিয়ে বসেছি ডিম ভাজি এবং খিচুড়ি রান্না করতে। পেটপুরে খেয়ে পেটটাকে ঢোল বানিয়ে দুপুর পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে উঠেছি। দুপুরে ফের একবার পেট ভরে খেয়ে ফের আরেকবার গড়িয়ে পড়েছি, এরপর ঘুম ভেঙেছে মধ্যরাতে। চারিদিকের বিস্তীর্ন প্রান্তর ধরে মৃদু এক শব্দ তুলে ছুটে চলেছে বাতাস, ওটা ছাড়া সামান্যতম শব্দ নেই কোথাও। আমার দুই হাটুতে অবশ এক অনুভুতি, গরম শ্বাস পড়ছে বাহুতে। মধ্যরাতের ঘন অন্ধকার তাড়িয়ে আকাশে কোটিখানেক তারা, সম্ভবত মহাকাশের সব তারাগুলো সেরাতে দৃশ্যপটে এসে ধরা দিয়েছে, যা দেখে আমার মনে হচ্ছিলো আমার হাতে এখন এত সময় আছে যে, আমি ওই সবগুলো তারাকে একটি একটি করে গুনে ফেলতে পারবো, ওদের সবাইকে একটা করে নাম দিতে পারবো, আর প্...


কবিজের দেশ, ধুসর মহাপ্রান্তরের কাজাখস্তানে ট্যানের আগমন...



মৃদুমন্দ বাতাসে যখন বিবর্ন ঘাসফুলেদের দল কাত হয়ে দুলছে, আধবোজা দুই চোখ তুলে তাদের সাথে মাথা দুলিয়ে টিটিটাটা করতে ইচ্ছে করে, অমন সময়ে বেরসিক মাতাল হাওয়ার দল এসে ঢেউ খেলিয়ে দিয়ে যায় সেই সীমাহীন, অপুর্ব, বৃক্ষহীন ও তৃণাবৃত সমতল প্রান্তরের সর্বগাত্রে। মাতাল হাওয়ার দল তাদের সাথে কোত্থেকে যেনো নিয়ে আসে নাম না জানা, কখনো না দেখা বুনোফুলেদের প্রাণজুড়ানো সুবাস। মনটা তখন বেদিশা হয়ে যেতে চায়, চুপটি মেরে বসে থাকতে চায়, দুরের খয়েরী পাহাড়চূড়ার মাথার সাদাটে তাজ দেখে শুধু মনে হয় প্রকৃতির এ কি অপুর্ব এক সাজ!

একজন অশীতিপর বৃদ্ধের সবচে পুরনো স্মৃতিতে বেচে থাকা প্রবীনতম লোকটির চাইতেও বহুশতাব্দী পুরনো সুরের কল, কবিজের উন্মাদ সুরের মত উন্মাতাল মনটা তখন চাইতো, আহা, জীবন টা যদি রইতো অনন্তকাল ধরে! কাজাখ লোকেরা বলে, অজানা কোনো এক সময়ে করকিট নামে এমন এক লোক ছিলো এই বিরানপ্রান্তরের দেশে, যে কোনোদিন মরতে চায়নি। চিরজীবনের খোজে সে ছেড়ে চলে গেলো তার সমাজকে, পথে পথে ঘুরে সন্ধান করতে রইলো অমরত্বের উপায়ের। কিন্তু সে দেখলো, প্রকৃতির কোনো প্রাণই চিরদিন থাকতে পারে না, বহু শতাব্দীপ্রাচীণ তিমিটি থেকে সহস্রবছরের বৃক্ষ, সবার দিন একদিন ঠিকই ফুরিয়ে যায়। সে তার বেপরোয়া হৃদয় নিয়ে তখন আস্ত এক কাঠের টুকরো কুদে তাতে দুটি তার জুড়ে দিয়ে তৈরী করলো এক নতুন ধরনের বাদ্যযন্ত্র। ওটা এমন সুর তুলতে পারে, যা কেউ কোনোদিন শোনেনি। তার নাম সে দিলো কবিজ! দৈববাণীতে একদিন জানলো করকিট, কবিজে সুর তোলা যেদিন থামিয়ে দেবে, সেদিন তার মৃত্যু হবে, এবং তার মৃত্যু হবে ডাঙায়।

করকিট সেদিনই একটি ভেলা তৈরী করে ভেসে পড়লো আরাল সাগরে, এরপরের সারাটিজীবন সে কাটালো পানিতে ভেসে, ভীষণ প্রয়োজন না হলে সে ডাঙায় পা রাখে না, আর ডাঙায় নামা থেকে ফের ভেলায় ওঠা অবধি সে অন্তহীনভাবে কবিজে সুর তুলে যায়। এভাবেই, বিরান প্রান্তরের এই দেশে সুর ছড়াতে রইলো সে, পাগল করা সেই সুর, সেদিন পর্যন্ত, যেদিন নিতান্ত অসাবধানতাবশত একটি সাপের কামড়ে সে ত্যাগ করলো প্রিয় জীবনটাকে। কিন্তু করকিটের স্বপ্ন পূরণ হলো, যদিও তা সে দেখতে পারেনি। তার মৃত্যুর পর অজানা কতশত বছর পেরিয়ে গেলেও, রয়ে গেলো তার কবিজ, এবং তার সুর। অমর হয়ে গেলো করকিট, অন্তত তার নামটি। কবিজে যে সুর ওঠে, তা মানুষকে নেশাগ্রস্থ করে অ্যালকোহলের মত করেই।

কবিজের দেশ কাজাখস্তানের ধুসর, অবারিত এই প্রান্তর যেনো সর্বক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে। চারিদিকে রৌদ্রজ্জ্বল, নিঃসীম নির্জনতা, বাতাসের একটানা শব্দ ছাড়া সামান্যতম আওয়াজ নেই কোথাও। পিছনে ফেলে আসা পাহাড়সারি তার সম্মুখের বিবর্ন ঘাসের প্রান্তরকে এনে দিয়েছে আরও কতটা বিষণ্ণতা, দুপুরের কড়া রোদে সামনে তাকালে মনে হয় ওটা যেনো ধুসর এক সমুদ্র। দা গ্রেট স্টেপস! সেমিপালাটিন্সক। নামগুলো শিহরণ দেয়। তবু আমাকে শিহরিত করে এই প্রান্তরের নির্জনতা নয়, বরং এই প্রান্তর, এবং তার সীমানা ছাড়িয়ে চলতে থাকা মানুষের ধ্বংসের নেশা, নিজ নিজ মতাদর্শ জিইয়ে রাখতে চাওয়ার তুমুল আকাঙ্ক্ষার প্রতিবিম্বে চলতে থাকা অনাচারী প্রাণসংহারের ইতিহাসেরা। কত হাজার বছর আগে প্রথমবার কোনো মানুষ তার নিজ জ্ঞাতিভাইকে হত্যা করেছিলো নিজ স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে? সেকথা জানা যায় না। প্রকৃতভাবে কখনোই জানা যায় না, পৃথিবীর বুকে কত বিলিয়ন স্বপ্নের অকাল পরিনতি হয়েছে কোনো নাম, চিহ্নহীন কবরে, অথবা মিশে গেছে বায়ুমন্ডলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার সামান্য এক প্রতিচ্ছবি এই সেমিপালাটিন্সক।

ইউরোপ থেকে তখনো বহুদুরে আমি, কিন্তু তাতে কি! সোভিয়েত রাশিয়ার পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষার আতুড়ঘরে বাধা পড়ে আছি। বেশ টুরিস্টি এলাকা, কারন এক কালে এখানে পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা হতো। কি অদ্ভুত! কত অদ্ভুত সব কারনে মানুষ কোনোকিছুর উপর আকর্ষিত হতে পারে! তাতে অবশ্য আমার বেশী কিছু এসে যায় না। আজীবন টুরিস্ট এড়িয়ে চলতে অভ্যস্ত আমি, নিজের জন্য নিভৃত এক কোন খুজে নিতে পারি। যদিও আমি আমার সারাজীবনের ভ্রমণে নতুন নতুন মানবসংগকেই সবচে আরাধ্য বলে মনে করেছি, কিন্তু ওই সময়কালটা ছিলো বড়ই কঠিন। আমাকে জীবনের সবচে নিঃসঙ্গ, এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সেই নিঃসঙ্গতার সময়গুলো কাটানোর জন্য নিজেকে একের পর এক দিয়ে চলা প্রবোধগুলো দূর থেকে দেখতে যতই অর্থহীন বলে মনে হয়, বাস্তবে তা ছিলো এর ঠিক বিপরীত। শেষ কতগুলো মাসে আমি যতগুলো মানুষের সান্নিধ্যে এসে ভালোবেসেছি, তাদের প্রত্যেকের সাথে ঘটা কষ্টসাধ্য বিচ্ছেদগুলোর অসহ্য বিরহ আমার অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রন করছিলো, সযত্নে সে এড়িয়ে চলছিলো মানুষ এবং মানুষের বসতি। হয়তো মাসে একবার আমি কোনো বাজারে গিয়ে কতগুলো আলু কিনে নিতাম, আর রাশিয়ান সীমানা পেরিয়ে কাজাখস্তান প্রবেশের দিন কয়েক বাদে এক ছোট নাম না জানা মফস্বল থেকে কিনেছিলাম একটা স্লিপিং ব্যাগ, নামমাত্র দামে। টাকা তখন আমার কাছে সোনার হরিণ, আমি যে কিভাবে বেঁচে ছিলাম সেই দিনগুলোতে, তা মনে করে আজ আসলে ঠিক হিসাব মেলাতে পারিনা, কিভাবে কি ঘটেছিলো! তবে আমি নিশ্চিতভাবেই বেঁচে ছিলাম, বেশ ভালোভাবেই ছিলাম!

সেবছর ফেব্রুয়ারী মাসে আমি সেমিপালাটিন্সকের দিগন্তজোড়া বিবর্ন ঘাসের প্রান্তর পেরিয়ে চলেছি কাজাখস্তানের বিশ্ববিখ্যাত গ্রেট স্টেপ পাড়ি দিয়ে, দক্ষিনের শুকিয়ে যাওয়া আরাল সাগরের অবশিষ্ট মাড়িয়ে পশ্চিমের কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে, যেখানে ছোট্ট কোনো এক জেলেগ্রামে অনেক বছর আগের একদিন আইশা দাদীর জন্ম হয়েছিলো। ইরতিশ নদীর তীর ধরে বুনো আর পাহাড়ি ট্রেইল খুজে খুজে আমি চলেছি, আরাল সাগর থেকে পনের’শ কিলোমিটার পথ উত্তর-পূর্বে, অমনই এক দিনের কথা। বহুদিন পর সেদিন কোনো এক শহরে থামলাম আমি। শহরে পৌছেছিলাম অবশ্য নিজের অজান্তেই, হঠাত এক ডাউনহিল ধরে নামতে নামতে শহরের মেইন স্কয়ারে! একটা প্যান শপের পাশে ঘ্যাচ করে ব্রেক করতেই মায়াবী এক সুর কানে এসে পৌছুলো আমার! অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য সেই সুর, যা এক পলকে টান দিয়ে খসিয়ে নিতে পারে যাবতীয় মানবীয় অনুভুতির খোলস, মনটা কে করে দিতে পারে নগ্ন, যখন সে সংস্পর্শে আসে নিয়ত প্রসন্নতার, কোনো এক জাদুবলে ভিন্ন কোনো জগতে পৌছে যায়, ভেবে চলে কত কি আরাধ্য! নিজের অজান্তেই হাত নাড়ছিলাম, চোখদুটো ছোট করে দিগন্তে কোথায় যে মেলে দিয়েছিলাম তার সীমা!

আমাকে ওভাবে চোখে পড়তেই সম্ভবত, এক আগন্তুক হেসে কাজাখ ভাষায় বললো, ‘ঠিক, এমনই জাদু এই গানের! তুমি কাজাখ জানো নাকি বন্ধু? একটা ড্রিংক হয়ে যাক?’

ফিরে তাকালাম আমি। মাঝবয়েসী এক লোক,আমাকে বন্ধু বলছে!

অমায়িক হাসলাম আমি, এবং এক নিমেষে রাজী হলাম তার সাথে পান করতে, শুধু, রৌদ্রজ্জ্বল সেই ক্যাফের টেবিলে হাটুমুড়ে বসে আমি খুজে নিলাম আমার প্রিয় কোকাকোলা, এবং সে...সেও এক ক্যান কোক, কারন লোকটা যথেষ্ট অমায়িক, অতটা, যাতে সে আমাকে বিব্রত করতে চায়নি এই বলে যে তার ধর্মে মদ খাওয়া বারন, তবে আমি চাইলে খেতে পারি! প্যান শপের ভিতরে ঢুকে যাওয়ায় গানটা খুব মন দিয়ে শুনতে লাগলাম আমি! নিখাদ দরিয়া গলায় কোনো এক কাজাখ তরুনী গাইছেঃ

আমি জানি তুমি আমার প্রেমে পড়েছো,
আমি দেখি তোমার চোখে, তোমার কথায়,
কিন্তু সামনে যখন আসো আমার, তুমি লাজুক,
তুমি কেপে চলো, উড়তে থাকা পাতার মত…’


‘মিস্টার, সুরটা বুকে যেয়ে লাগছে! তোমাদের শহরের নাম টা কি, বলবে আমায়? কোনোদিন ভুলবো না তোমাকে, আর তোমাদের এই প্যান শপটাকে..’

দরাজ গলায় হাসলো আমার মাঝবয়েসী বন্ধু ‘কাসকাবুলাকে তোমাকে স্বাগতম, বিদেশী যুবক’ এরপর গোফে তা দিতে দিতে বলতে লাগলো ‘আমি জানি তুমি পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছো, আর কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। তোমার বিশ্রাম দরকার। আমি দেখি তোমার চোখে, তোমার কথায়…’

‘তুমি জ্ঞানী লোক, কাসকাবুলাকের চাচা’ এবার সত্যি আন্তরিকভাবে হাসলাম আমি ‘তোমার আন্তরিকতার বিনিময়ে তোমাকে আমি পৃথিবীর সবচে সুন্দর প্রেমের গানটার কথা বলে যাবো। গানটাতে বলা হয় বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে, দিওয়ানা বানাইছে...!’

সাথে সাথে নিজের স্মার্টফোন বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলো সে। বহুদিন পর ওই জিনিস হাতে নিয়ে আমি বাউল আব্দুল করিমের দুর্ধর্ষ গানটা আমার কাজাখ বন্ধুকে খুজে বের করে শোনালাম।

‘দুনিয়াতে একটাই প্রেমের গান থাকতে পারে, ওটা হচ্ছে- বন্দে মায়া লাগাইছে। হৃদয়ের সব বলা না বলা, জানা অজানা অনুভুতির প্রকাশ ঘটায় ওটা, একটা বিস্ফোরণের মত। এই গান হৃদয় তোলপাড় করে দিতে পারে, এই গান ব্যাকুল করতে পারে, এই গান জীবনের প্রতিচ্ছবি, অন্য কোনো গান শোনার দরকারই পড়বেনা তার, যার কানে একবার অন্তত পৌঁছেছে সেই অপার্থিব সুরের মায়া!’

আমি যখন নেশার মত চেয়ে আছি কাজাখস্তানের খোলা নীল আকাশের দিকে চেয়ে, আর বলে যাচ্ছি সেইসব, যা আমি সচেতনভাবে কখনো বলতে পারতাম না, ওর মধ্যেই আমার কাজাখ বন্ধুটি আমার হাতের পাশে রাখা ক্যামেরাটা ঘাটছিলো। তার পরের যে কথাটি আমার মনে পড়ে তা হচ্ছে,

‘টাকা পয়সা কেমন আছে হাতে, বন্ধু?’

‘অ্যাঁ?’ ঝট করে তাকালাম তার দিকে ’ও, টাকা! নেই! আমার কাছে টাকা নেই’

‘দরকার ও নেই?’

‘ভীষণ দরকার!’

‘কি করছো তার জন্য?’

‘কিছু...করছি না!’

‘তাহলে টাকা আসবে কোত্থেকে?’

‘মনে হয় আসবে না!’

‘তাহলে তোমার চলবে কিভাবে?’

‘চলে যাবেই...চলে তো যাবেই, চাচা!’

‘যদি চলে না যায়?’

‘তাহলে...চলে যাবে!’ দাত বের করে হাসলাম আমি!

‘তুমি পাগল!’

‘বলোতো ওটা স্প্যানিশে কি হবে?’

‘জানি না’

‘উন পোকো লোকো’

আমার হাত থেকে কোকের ক্যানটা থাবা দিয়ে নিয়ে নিলো সে।

‘পাগলদের জন্য সৃস্টিকর্তা বিশেষ সুবিধা রেখে দিয়েছেন দুনিয়া জুড়ে’

‘তাই নাকি?!’ ক্যানটা ফের টেনে নিলাম আমি।

‘ঠিক। একদম ঠিক’ উচু হয়ে গেলো আমার কাজাখ বন্ধুর কন্ঠ! ‘তোমার ছবিগুলো আমার দেখারও কথা ছিলোনা, কিন্তু...। সোনালী ঈগল উৎসবে ছবি তুলেছো তুমি, ঠিক?’

‘ঠিক!’

‘তেরো বছর বয়েসী এক মেয়ে এবার জিতেছে ওটা, ঠিক?’

‘ঠিক’

‘এই শহরে একটা...থাক, তুমি ক্লান্ত মানুষ, তোমার অত কথা শুনে কাজ নেই। ছবিগুলো ডেভেলপ করে দাও। আমি তোমাকে টাকা দেবো’

‘সত্যি বলছো? না চাইতেই টাকা পেয়ে যাবো আমি?’

‘উহু, চাইতে হবে’

‘চাইবো?…’

‘না, তুমি এখানে বসে কোকাকোলা গিলতে থাকো..’ পরমুহুর্তেই বললো ‘না, আমার বাড়িতে চলো। একটা দিন থেকেই যাও বন্ধু!’

‘কিন্তু আগে বলোতো, তুমি ছবির কথা জানলে কখন?’

‘এইতো মাত্র!’

আমার কাজাখ বন্ধুর বাড়িতে একটা দিন রয়েই যাবো ঠিক করলাম আমি। তার বাড়ি শহরের একদম দক্ষিণে, যার দক্ষিণে আর একটা বাড়িও নেই, আছে শুধু একটা মোটর গ্যারেজ, সেই গ্যারেজের সামনের শাটারটা নামানো, জং ধরা, দেখে মনে হয় বহুযুগ ওটা কেউ খোলেনি, গ্যারেজটাকে প্রায় নিজের আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে রেখছে বিরাট একটা বটগাছসদৃশ গাছ, যার নাম আমি জানিনা। বাড়িটা টিপিকাল কাজাখ ঘরানার, গ্রামের লোকেরা গারের আদলে বাড়ি বানালেও, আমার শহুরে বন্ধুটির বাড়িতে টালির ছাত, এবং রঙিন দেয়াল। ওই বাড়িতে বসে আমি শুধু টেলিভিশন দেখলাম, কারন আমার কাজাখ বন্ধুটির বসবাস যে একটিমাত্র মানুষের সাথে সে তার স্ত্রী নয়, পনেরো বছর বয়েসী ছেলে, এবং যে ফুটবল খেলা দেখতে ভীষণ পছন্দ করে, এবং যখন কোনোমতে যখন সে জানলো আমি ইউরোপিয়ান এবং লাতিন ফুটবল সম্পর্কে বেশ জানি, আমাকে নিয়েই মেতে রইলো সে, সেদিন ছিলো শনিবার, ইংলিশ, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, জার্মান আর টার্কিশ লীগের খেলা দেখে গেলাম আমরা একের পর এক, নিরলসভাবে। তার মায়ের কথা আমি অনুমান করে নিয়ে আর কিছু জিগ্যেস করিনি, কিন্তু পরে জানতে পেরেছিলাম আমার অনুমান ভুল ছিলো, সে মারা যায়নি, অন্য কাউকে বিয়ে করে চলে গেছে ওদের ছেড়ে, তা বেশীদিন আগের কথা নয়।

আমি যখন টেলিভিশনে ডুবে আছি, আমার মাঝবয়েসী কাজাখ বন্ধু তখন কোত্থেকে কোথায় ঘুরে বেড়ালো কে জানে, কিন্তু সেদিন থেকে দুই রাত, এক দিন পর সকালে সে আমাকে ভোজবাজির মত বেশ কিছু টাকা সাধলো, বললো ওগুলো নাকি আমার, পরিমানে বেশ ভালো ছিলো, কিন্তু কত, তা আর এখন মনে পড়ে না। কোনো এক সাংস্কৃতিক ম্যাগাজিন ওগুলো, আর গোল্ডেন ঈগল ফেস্টিভাল নিয়ে লেখা আমার আর্টিকেলটা নাকি টাকা দিয়ে কিনে নিলো, যখন, যতবার খুশী ওগুলো ব্যাবহার করতে পারবে তারা, যাতে নিশ্চই আমার আপত্তি নেই কোনো! নিশ্চই নেই!

আমার পনেরো বছর বয়েসী কাজাখ বন্ধুটি বেশ ভালো রান্না জানে, সে আমাকে শেখালো কিভাবে ঝাল বেশী না দিয়েও মানতি রান্না করা যায়। যদিও ঝাল কম দেয়ার আসল উদ্দেশ্য, সে ঝাল সহ্য করতে পারে না, কিন্তু ও এমনভাবে ব্যাপারটা উপস্থাপন করলো যে আমি আর বলতে পারলাম না, ঝালছাড়া মানতি সুরুয়া ছাড়া রসের চিতই! বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলাম আমরা সেরাতে।

তারও দুটি দিন পর, সমগ্র কাজাখ ভাষার যাবতীয় প্রেমের গানের উপর বিরাট বিশাল জ্ঞানের নতুন এক ভান্ডার, এবং তাদের ডিজিটাল ফাইল আমার অডিও প্লেয়ারের মেমরি কার্ডে ঢুকিয়ে নিয়ে, আমার পনেরো বছর বয়েসী কাজাখ বন্ধুটির উপহার দেয়া কাজাখস্তান ফুটবল দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আমি যখন কাসকাবুলাক শহর ছেড়ে চলে যাই, আমার মাঝবয়েসী কাজাখ বন্ধুটির গোফে তা দেয়া হাসিখানা জীবনে শেষবারের মত দেখি আমি।

কাসকাবুলাক শহর আমি কোনোদিন ভুলবোনা, হয়তো অসংখ্য হৃদয় হরণকারী প্রেমের গানের সুরেরাই তার একমাত্র কারন নয়। ওই প্রথম জেনেছিলাম, পাগলদের জন্য সৃস্টিকর্তা বিশেষ সুবিধা রেখে দিয়েছেন দুনিয়া জুড়ে।

তখন আমার পকেটে অনেক টাকা। পথের অন্য এক বড়সড় গ্রামের বাজার থেকে বিরাট এক সদাইপর্ব শেষে আমি যখন ফের গ্রেট স্টেপের অজানা ট্রেইলগুলোতে হারিয়ে গেলাম, আমি ঝাড়া হাত পা, একদম নিশ্চিন্ত, আরাল সাগর পর্যন্ত আর একটাবারও আমার সভ্যতা মাড়াতে হবে না। দিনগুলো ছিলো লম্বা, এবং রাতগুলো ছিলো ভীষণ ছোট, কারন আমি তখন থাকতাম ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ঠিক যেমনটি আমি চাইতাম। অমনই কোনো রাত হয়ে উঠতো বিরাট বিশাল, দিনটির চেয়ে কয়েকগুন লম্বা, যেসব রাতে আমার মনে পড়তো মার্গারিতা আলভারেজের কথা। হা করে শ্বাস নেয়ার রাতগুলো প্রায়শই ফিরে আসতো, বিশেষ করে শীতের মাঝবেলার সেই চিরচেনা মংগোলিয়ান প্রান্তরের রোমাঞ্চকর আবহাওয়ার সাথে যখন প্রায় পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিলো গ্রেট স্টেপের সকাল, দুপুর, আর সন্ধ্যাগুলো। রাতগুলো আমার কাটতো বড় ছটফট করে, কেদেকেটে একাকার করে ফেলতে মন চাইতো সমস্ত নিঃসঙ্গতা, কিন্তু অত সহজে কান্না এলে তো! কিন্তু কান্নাগুলো জমে থাকতো। কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমাকাশের লালিমায় চেয়ে থাকতে থাকতে পূর্বঘোষণা ছাড়াই তারা বয়ে যেতো পাহাড়ী ঢলের মত করে। বুকটাকে যেনো বাতাসে ভেসে বেড়ানো কাগজের টুকরোর মত হালকা করে দিয়ে যেতো সেই রক্তিম বিকেলগুলো।

ফেব্রুয়ারীর এক সকালে অবিশ্বাস্য বিরান এক প্রান্তরের মাঝে আমি। হঠাত করে প্রচন্ড বেশী শীত অনুভুত হলো আমার, সারাজীবনে অমন কোনোকিছু দেখিনি আমি এর আগে। কালবৈশাখী ঝড়ে পড়ে মুরগীর বাচ্চারা আশ্রয়হীন হয়ে যেভাবে কাপে, ঠিক সেভাবে কাপতে কাপতে রাতগুলো কাটতো, ঘুম যে কখন হতো, তা আমি ভেবে পাই না। দিনে দৃষ্টি চলতো কয়েক মিটার, আমার চারিদিকে যেনো ধুসর এক পর্দা ছেয়ে আছে। ওই বিপদের মাঝে অনেক বড় সাহায্য করেছিলো আমার মস্তিষ্ক। শেষ যেদিন আমার জিপিএস ঠিকমত রিডিং দিয়েছিলো, সেদিন দেখে রাখা দক্ষিণমুখী এক ট্রেইল আমার চোখে ভেসে আছে পর্দার মত। আমি নিশ্চিতভাবে দক্ষিণেই চলেছি ভেবে দিব্যি চলতে রইলাম, অন্ধের মত দিনে গড়ে বিশ কিলোমিটার করে দুস্তর, দুর্লঙ্ঘ্য কাদামাখা, বরফের টুকরো পাড়ি দিয়ে, শরীরের সাথে যুঝে। ভাগ্যক্রমে আগুন জ্বালবার উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলেই আমি কেবল আলু সিদ্ধ করার কাজ করতে পারছি। ওটা ছাড়া আর কিছু তখন আমার পক্ষে বানিয়ে খাওয়া সম্ভব হতো না। একদিন একটা পাথরের আড়ালে বরফ খুড়ে গর্ত করে সেখানে বহু কায়দা করে আগুন জ্বালতে হলো। অন্য একদিন পেয়েছি একটা ঝোপের আড়াল। আকাশ ভেঙে অবিরত পড়ছে পেজা তুলোর মত বরফ। রাতে তাবুর সাথে সামান্য স্পর্শ লেগে গেলে ওখানের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিলো, এবং আমি কুকুরকুণ্ডলী হয়ে পড়ে রইতাম পাতলা স্লিপিং ব্যাগটা আর আমার যাবতীয় জামাকাপড়ের পাহাড়ের নীচে। তার মাঝেই মনে পড়তো আমার স্লিপিং ব্যাগটা মার্গারিতার কাছে রয়ে গেছে। কোত্থেকে যেনো এক ঝলক উষ্ণ হাওয়া এসে শরীর ছুয়ে যেতো আমার, একটা ছোট, কিন্তু খুব বিলম্বিত এক ক্ষণ ধরে। শরীরের সবগুলো রোম দাঁড়িয়ে যেতো কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া-ই।

সময়ের হিসাব নেই আমার কাছে, কিন্তু একদিন সকালে তীব্র আলোর ঝলকানিতে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। তড়িঘড়ি করে বাইরে উকি দিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেললাম। সুর্য! কোত্থেকে যেনো এসে হাজির হয়েছে সে ফের আরেকবার। পুরো পৃথিবীকে হাসাচ্ছে। হাত পা নাড়িয়ে এক ঝলক নেচে নিলাম আমি, খুব সম্ভবত ওকে নাচই বলা চলে। গলতে থাকা বরফে পা ডুবিয়ে হেটেছি কতক্ষণ, এবং এরপরে আগুন জ্বালিয়ে বসেছি ডিম ভাজি এবং খিচুড়ি রান্না করতে। পেটপুরে খেয়ে পেটটাকে ঢোল বানিয়ে দুপুর পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে উঠেছি। দুপুরে ফের একবার পেট ভরে খেয়ে ফের আরেকবার গড়িয়ে পড়েছি, এরপর ঘুম ভেঙেছে মধ্যরাতে। চারিদিকের বিস্তীর্ন প্রান্তর ধরে মৃদু এক শব্দ তুলে ছুটে চলেছে বাতাস, ওটা ছাড়া সামান্যতম শব্দ নেই কোথাও। আমার দুই হাটুতে অবশ এক অনুভুতি, গরম শ্বাস পড়ছে বাহুতে। মধ্যরাতের ঘন অন্ধকার তাড়িয়ে আকাশে কোটিখানেক তারা, সম্ভবত মহাকাশের সব তারাগুলো সেরাতে দৃশ্যপটে এসে ধরা দিয়েছে, যা দেখে আমার মনে হচ্ছিলো আমার হাতে এখন এত সময় আছে যে, আমি ওই সবগুলো তারাকে একটি একটি করে গুনে ফেলতে পারবো, ওদের সবাইকে একটা করে নাম দিতে পারবো, আর প্রত্যেককে ফের আরেকবার আমার দেয়া নাম ধরে ডাকতে পারবো, আর ভীষণ অদ্ভুত এক আনন্দের সাথে আমি আবিস্কার করলাম, সেই তারাগুলো নিজ নিজ নামের ডাকে সাড়া দিচ্ছে আমাকে, ওরা মিটিমিটি করে উঠছে ঠিক ওই মুহুর্তে, যেনো আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে একটু হাসি দিয়ে বলছে, তোমাকে ভালোবাসি! একদৃষ্টিতে ওদের প্রত্যেকের ভালোবাসা উপলব্ধি করে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম ফের আরেকটাবার, ওই রাতের তারারা দেখলো আমার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, বড়বড় চোখগুলো প্রশস্ত, জাগ্রত, নিজের জীবনে নেয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য নিজের প্রতি চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো আমার পরিতৃপ্ত হৃদয়টা। ওটাই ছিলো আমার পৃথিবী ভ্রমণের প্রথম স্বার্থক মুহুর্ত, যেই মুহুর্তে জীবনের কোনো পিছুটান আমাকে ছুতে পারেনি, ঠিক যেমনটা আমার কৈশোরের দুরন্ত স্বপ্নগুলোতে ঘটতো, যা আমার ধমনীতে রক্তের ফুল্লধারা বইয়ে দিতো। ওই মুহুর্ত থেকে ট্যান পরিবর্তিত হয়েছিলো তার ভিন্ন ওই সত্বাটিতে, ঠিক যেমনটা ছিলো তার পুরোটা কৈশোরের সাধনা। ওই মুহুর্ত থেকে আমি আমার জীবনের উদ্দেশ্য খুজে পেয়েছিলাম।


ট্যাগ: