জুলাই '২৩
কিশোর মুসা রবিন, এবং আমাদের মাস্টার জর্জ!
রবিন মিলফোর্ডকে রকিব হাসান বলতেন মুখচোরা। কিন্তু আমাদের হ্যাংলা পাতলা বাদামী চুলের কিশোরটিও একসময়ে গানের দলে যোগ দেয়ার মত বহির্মুখী জগতকে আয়ত্ব করে ফেললো, লস অ্যাঞ্জেলেসের সব মেয়েকে নিজের মায়াজালে জড়িয়ে ফেললো! অথচ রবিনকে প্রথম চেনা দিনটির পরে ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও, আমি কিন্তু বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম ইন্ট্রোভার্ট রয়ে গেছি! কিন্তু রবিন ও তার দুই বন্ধু আমার জীবনের বাকি সবকিছু কি অবিশ্বাস্যভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে! কি একটা ফ্যাসিনেটিং কল্পনার রাজ্য আমার আছে, যেখানে একবার ঢু মেরে এসে জীবনের সব দুঃখ, চাপ, আক্ষেপ ভুলে গিয়ে আমি হয়ে উঠি পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষদের একজন।
২০০৭ সালের বসন্তে আমি ক্লাস সিক্সে পড়তাম। এর আগে পুরোটা জীবন আমার কেটেছে নিভৃত এক গ্রামে, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন এক অজপাড়া গ্রাম, যেখানে ছিলোনা বিদ্যুত, যেই গ্রামে আমার জীবন কেটে যেতো সমবয়েসীদের সাথে খালের পর খাল সাতরে, গ্রামের পর গ্রাম ছোক ছোক করে, বনের পর বন পাখির বাসা খুজে, সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে চিলেকোঠার নির্জন কামরাটায় একমনে আমার বাংলা বই, আজকের ইংরেজী, আর প্রাথমিক গণিত বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে, নীল প্যান্ট, সাদা শার্ট চাপিয়ে কোমরে তিনখানা বই নিয়ে বাজারের প্রাইমারী স্কুলে গিয়ে তালুতে জোড়া বেতের বাড়ি মারা জাদরেল সব শিক্ষকের কাছে শিক্ষা নিয়ে। গোপীনাথপুর গ্রামটা যতখানি ছোট ছিলো, আমার জীবনের গন্ডিটা ছিলো তারচেয়েও ছোট। কারন তো আগেই বলেছি- আমার জীবনে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে জড়াতে পারিনা আমি, বড় বেশী অপ্রভিত, অতিরিক্ত লাজুক, আমি কথা বলতাম শুধু আমার অন্য সত্বাগুলোর সাথে।
কিন্তু আমি ছিলাম ভীষণ অনুভুতিপ্রবণ। একটা পাখির বাচ্চার মৃত্যু আমার জীবনকে অসম্ভবরকম বিষাদে পুর্ণ করে দিতে পারে, একটা গুমোট সকালে বৃষ্টির ফোটা মাটিতে পড়ে বাতাসে তৈরী হওয়া সোঁদা গন্ধটা আমাকে খুশীতে নাচিয়ে দিতে পারে।
সেই আমাকে যখন সেবছর ঢাকা শহরে নিয়ে এসে শহরের কড়া নিয়মকানুনের স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিলো, যে স্কুলের জানালা দিয়ে তাকালে কালচে খালের পানিতে ভেসে বেড়ানো পাতিহাঁস দেখা যায়না, ঝড় এলে যে স্কুলের জানালা বন্ধ করতে হয়না, এমনকি পাওয়া যায়না টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার মধুর শব্দ। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিভাবে কাটাবো আমি এমন জীবন? আমার দিন আর রাতগুলো কত লম্বা হয়ে গেলো!
কিছু কিছু মানুষের সাথে বন্ধুত্ব বিরাট কোনো ঘটনা ঘটার উপলক্ষ হয়ে জীবনটাকে আমুল বদলে দেয়। অমনই একজন ছিলো আমার ক্লাসে মোটা করে এক রোদেপোড়া চেহারার ছেলে। ক্লাস পিরিয়ডের বিরতিতে ক্লাসরুমের এক কোণে নির্বাক বসে ওকে প্রায়ই দেখতাম ছোট সাইজের একটা বই বের করে পড়ছে। কিভাবে জানিনা, কিন্তু ওর সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিলো আমার। ও ছিলো পড়ুয়া ধরনের। ওই সময়টাতে বই পড়া ছাড়া অন্য কিছু ওর জীবনে ছিলোনা। অথচ আমি- সারাজীবনে শহর থেকে কিনে দেয়া বাবার দুয়েকটা রূপকথা, আর ভুতের বই ছাড়া আর কিছু কোনোদিন না পড়া ছেলেটা ওর কাছ থেকে হা করে শূনতাম অন্য এক জগতের কথা। ও বলতো প্রশান্ত মহাসাগরের কথা। ক্যালিফোর্নিয়ার কথা। ও এমনকি দক্ষিণ আমেরিকা নামে কোনো একটা জায়গার গল্পও আমাকে শোনাতো, আর বলতো, আমি যদি তিন গোয়েন্দা না পড়ি, তাহলে আমার জীবনে দামী বলতে কিছুই থাকবেনা! সাধারণত কেউ এমন কথা বললে হেসে উড়িয়ে দেয়ার কথা ঐ বয়েসী বাচ্চাদের, কিন্তু আমি হার স্বীকার করেছিলাম ওর কাছে। আমাকে আম্মু টিফিনের জন্য ১০ টাকা করে দিতো প্রতিদিন। তখন পর্যন্ত সেই টাকা আমি আইসক্রিম আর আচার খেয়ে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু একদিন ঠিক করলাম, ৫০ টাকা জমিয়ে একটা তিন গোয়েন্দার বই কিনবো! কিনতেই হবে।
সপ্তাহান্তে বহু খুজেপেতে এলাকার একটা লাইব্রেরীতে গিয়ে হাজির হলাম। প্রবীণ একজন লোক বসে আছেন, চোখে হেভী পাওয়ারের চশমা। আমার বোকাসোকা ভংগি দেখে জানতে চাইলেন আমি কি খুজছি! আমি তিন গোয়েন্দা খুজছি তাকে সেটা বলতে পারলাম না। কারন আমার সেই বন্ধুটি কি যেনো একটা ইংরেজী শব্দ বলে দিয়েছিলো, বইয়ের নাম নাকি ওটা, আর সাথে একটা নাম্বার ও থাকে। আমি কোনটা চাইবো তার কাছে? কিন্তু কিছুতো একটা চাইতেই হবে! তাই বইয়ের সারি থেকে আশেপাশের অন্য সবগুলো থেকে আলাদা রঙের, অমন একটা বই তাকে দেখিয়ে দিলাম। উনি বের করে যখন সবজে রঙা বইটা আমার হাতে দিলেন, আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম সেটার দিকে। কি সুন্দর, কি সুন্দর! কালো-সবুজ আর কমলা রঙের আকিবুকির মাঝে বাদামী রঙের ওভারশার্ট পরে একটা কিশোর আতঙ্কিত ভংগিতে দুইহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে! ভালোমত তাকালে বোঝা যায়- পটভুমিতে আসলে বিরাট কোনো দানবের চোখ। উপরে লেখা- তিন গোয়েন্দা, ভলিউম ৩২, রকিব হাসান। ও আচ্ছা, ইংরেজী শব্দটা তাহলে ভলিউম ছিলো!
প্রেতের ছায়া। আমার জীবনে পড়া প্রথম ছবিবিহীন বই। ওটা পড়ার সময়কার বিশেষ কিছু স্পেসিফিকালি মনে পড়েনা এখন আর, কিন্তু ওই মুহুর্তটা থেকে আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলো। আমার নিতান্ত গৎবাঁধা, বিরক্তিকর, একঘেয়ে শহুরে জীবনে উত্তেজনার বারুদ নিয়ে এলো যেনো রকী বীচের তিন কিশোর! সারাটা সপ্তাহ আমি অপেক্ষা করে থাকতাম বৃহস্পতিবার বিকেলের জন্য, আর বইয়ের ভাজে জমানো ৬০ টাকা বের করে পকেটে করে নিয়ে হেটে হেটে লাইব্রেরীতে যাওয়ার জন্য। যখন বড়সড় কোনো ছুটিতে গ্রামে যেতাম- আব্বুর কাছে যেয়ে ঘ্যানঘ্যান করে টাকা নিয়ে একবারে কতগুলো ভলিউম কিনে নিয়ে যেতাম! গ্রামে যেয়ে আমি যখন খালে ঝাপাঝাপি না করে উঠোনের এক কোণে বাবরা গাছটার ছায়ায় বসে একমনে তিন গোয়েন্দা পড়তাম, বছরখানেক আগেই আমার অত্যাচারে অতিস্ট সেজোচাচী আমাকে চোখ বড়বড় করে দেখতো।
আমার ছোট্ট, সাধারন দুনিয়াটা ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকলো। আমার গ্রামটা ছাড়িয়ে অনতিদুরের পৃথিবী, প্রকৃতি, আর মানুষেরা কেমন হয়, কিভাবে বাচে, তারা কিভাবে ভাবে, আর কত তার বিশালত্ব, আমি আবিস্কার করতে থাকলাম মোহাচ্ছন্ন হয়ে। যেই আমি আমার জন্মশহর ছাড়া আর কোনো জনপদের নামও কোনোদিন শুনিনি, সেই আমি আমাজনের গহীন অরণ্য থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর, আফ্রিকার মরুভুমি থেকে সাভানা, প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতা থেকে আটলান্টিকের প্রতুলতা, পৃথিবীতে হাজারো রহস্যময় জাতিসত্বার অস্তিত্ব চিনতে শিখেছি। আমি যখনই ভাবি, আমার অমুক জ্ঞানটা কিভাবে এসেছে, অধিকাংশ সময়েই ওটা তিন গোয়েন্দায় ট্রেসব্যাক করে। তিন গোয়েন্দা যেবার আমাজন রেইনফরেস্ট গেলো, ওটা আমাকে তৈরী করে দিয়েছে এক পৃথিবী কল্পনা, সেই জিভারো ইন্ডিয়ান, পান্নাদেবতার ভাঙা দুর্গ, এরপরে বজরাবহরে ভেসে তিন গোয়েন্দার অপার্থিব সেই অ্যাডভেঞ্চার! মিরাটো যখন মারা গেল, বুকটা যেনো ভেঙে গিয়েছিলো। এমনই এক ডিসেম্বরের দুপুরে আমার গ্রামের কোনো এক সরিষাক্ষেতের পাশে মেহগনি গাছের নীচে পাটি পেতে, কম্বল গায়ে পেচিয়ে, দম বন্ধ করে আমি পড়েছিলাম ভীষণ অরণ্য, সেকথা মনে পড়লে আজও একইরকম শিহরণ বোধ করি!
শিহরণ? সে কি দুই গোয়েন্দা, বব আর ওমর ভাইয়ের ক্যারিবিয়ান অ্যাডভেঞ্চারে ছিলোনা? কি ছিলোনা জলদস্যুর দ্বীপে? শিহরণ কি দক্ষিণের দ্বীপে ছিলোনা? প্রশান্ত মহাসাগরের স্বর্গ তাহিতির সেই কিশোর-কিশোরী যুগল- সাগরের হাসি এবং ঝিনুক, আর তাদের অমায়িকতা আমার মন প্যাসিফিকের মতই বড় করেছিলো! শিহরণ ছিলো তিন গোয়েন্দার আমাজনে প্রত্যাবর্তনে, পেরূভিয়ান-ব্রাজিলিয়ান সীমান্তে লুই ভ্যালেন্তি নামক ধুরন্ধরকে পাকড়াও করতে এসে বাউন্টি হান্টার, তথা অর্কিড শিকারী গোয়েন্দা ও ওমর ভাইয়ের সেই ক্রুজোয়াড়ো শহর দেখা! ক্রুজোয়াড়োর সেই নোংরা জার্মানকে মনে আছেতো, যে গর্ব করে বলতো সে দুই বছর কাপড় পাল্টায়না? বোকোকেও নিশ্চই মনে আছে, আর মনে আছে বেচারী এদিথকেও! শিহরন ছিলো অথৈ সাগরে, ডেংগু পারভির সাথে কিশোর পাশার মগজের খেলায়, শিহরণ ছিলো বিশ্ববিখ্যাত ছবিচোর এবং কোড ব্রেকার মসিয়ে শোপার সাথে কিশোর পাশার সেই সাতটি কাকাতুয়ার রহস্যভেদে, শিহরণ ছিলো আফ্রিকার জ্বলন্ত প্রান্তরে পোচারদের বিরূদ্ধে যুদ্ধে, লাল মাটির শহর মোম্বাসার নিকটে আমাদের মুসা আমান সৈনিক পিপড়ের কামড়ে দিগম্বর হয়েছিলো, সেকথা কি আর ভোলা যায়! ভোলা যায়না লেক ভিক্টোরিয়াতে কিশোরদের স্মরণীয় সেই রাতটাও, সেই ট্রিটপ হোটেলে, যেখানে বেড়াতে এসে রাণী হয়েছিলেন রাজকুমারী এলিজাবেথ! কত অদ্ভুতভাবে পৃথিবীর কথা শিখিয়েছে তিন গোয়েন্দা! আমি কখনো কোনো বইতে পড়ে মুখস্ত করিনি, আমাজন রেইনফরেস্ট আর নদীর ব্যাপকতা, বুক্যানিয়ারদের ইতিহাস, আফ্রিকার আদিমতা, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নীতি, প্রাচীন মিশরের মমিরহস্য, এক মিলিয়ন অন্য জিনিস, এবং সর্বোপরি- শিখেছিলাম সততা, এবং কর্তব্যপরায়ণতা। জীবনে কোনোদিন হলিউড সিনেমা না দেখা কিশোর আমি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে এতকিছু জানতাম, যা শুনে হা হয়ে যেতে পারতো যে কোনো সমবয়েসী। তিন গোয়েন্দা আমাকে সবচেয়ে বেশী শিখিয়েছে আন্তরিকতা এবং সম্মাণের অসম্ভব এক মিলন। ওরা তিনজন প্রাণের বন্ধু, কিন্তু তাদের সম্বোধন তুমি। কি সুন্দর, কি সুন্দর একটা ব্যাপার! তিন গোয়েন্দা কোনোদিন ওদের প্রাণের শত্রুকেও তুচ্ছ করে কথা বলেনি, দিয়েছে অগ্রজের সম্মাণ, নো ম্যাটার হু হি ইজ। রাইভাল শোপার সাথে কিশোর পাশার কথোপকথন যুগান্তরী। এমনকি শুটকি টেরীকেও কখনো কার্স করেনি তিন গোয়েন্দা ( মুসা অবশ্য দুয়েকবার তুই তোকারী করেছে, আরে মুসা, আমার মুসা, ব্যাড বয় মুসা, ভেরী ব্যাড বয়, পা মুছে ঘরে ঢোকো…)
মরুর বুনো ঘোড়া ওমর শরীফ, ক্যাপ্টেন ফ্লেচার, ভিক্টর সাইমন, ডেভিস ক্রিস্টোফার, ফগর্যাম্পারকট, আংকেল ডিক, মেরীচাচী, রাশেদ চাচা, মিসেস শেলী মিলফোর্ড, রজার মিলফোর্ড, রাফাত আমান, মিসেস আমান, রাবাত আমান, আন্ট ক্যারোলিন, পারকার আংকেল, মিস আইলিন, বব ( ববতো কতগুলো আছে ), ফরাসী শোপা, খোড়া শোপা, রাজকীয় রোলস রয়েসের শোফার হ্যানসন, মুসার ছিচকাদুনে কাজিন ফারিহা, উৎপাত সৃস্টিকারী জনাব টেরিয়ার ডয়েল, বোকাসোকা টকার, নটি, রাফিয়ান, কিকো, এবং এই মুহুর্তে মনে না পড়া অসংখ্য রঙ্গিন চরিত্রে ভরে গেলো আমার পৃথিবী!
ওমরভাই হলেন আমারো ওমর ভাই। তাকে চোখ বুজে বিশ্বাস করতাম! কি অসম্ভব প্রাণবন্ত একটা চরিত্র! বেদুঈন যুবককে ভালোবেসেছিলাম সেই প্রথম দর্শনে, ঠিক কিশোর পাশার মত!
মুসা আমান আমাকে শিখিয়েছে বন্ধুত্বের গুরুত্ব, মুসা আমান বহুবার বুঝিয়েছে কিভাবে আত্মত্যাগী হতে হয়। মুসা যখন জীবনঘনিস্ট কছু বলতো, আমি খুবই ইমোশনাল হয়ে মনে রাখতাম তার কথা। মুসা আরেকটা জিনিস আমাকে শিখিয়েছে, তা হচ্ছে- খাইছে বলা। প্রথম প্রথম অন্য অনেক কিশোর-কিশোরীর মত আমিও জোর করে খাইছে বলতাম, মুসাকে অনুকরণ করতে চাইতাম, কিন্তু পরে এমন হলো যে, অনাকাংখিত পরিস্থিতিতে ফেলে দিতো আমাকে সেই খাইছে, কিন্তু নিজের অজান্তেই বলে ফেলতাম! এমনকি এই এতবছর পরে এসেও আমার ইউনিভার্সিটির প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশনে একবার আমার প্রফেসরের সামনে আমি খাইছে বলে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম!
রবিন, আমাদের নিরীহ রবিন শিখিয়েছে কিভাবে দলের জন্য উতসর্গ করতে হয় নিজের আকাঙ্ক্ষা। ক্ষমতার দম্ভ না দেখানো রবিন মিলফোর্ড সবার রোল মডেল, আই মিন, কতশতবার রবিন দলের ভালোর জন্য নিজে অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন, এমনকি নায়ক হবার সুযোগ ছেড়েছে? আমাদের নথি গবেষক তার নেতার উপর পুর্ন আস্থা রাখে।
কিশোর পাশা। কোকড়া চুলের বাদামী চামড়ার কিশোরটি নিজের দেশকে কত ভালোবাসে! জীবনে কোনোদিন চোখে না দেখা কিশোর পাশা তার বন্ধুদের সেই দেশের ভাষা শিখিয়েছে, সুযোগ পেলেই গল্প করেছে হাজার মাইল দুরের এই দেশের চাদনী রাতে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের জমির সুবাসের। কিশোর পাশা শিখিয়েছে কখনো নিজের শিকড় ভুলে না যেতে, কিশোর পাশা শিখিয়েছে কিভাবে হতে হয় বিনয়ের অবতার, কিভাবে সম্মান করতে হয়! কিন্তু কিশোর পাশা একটা জিনিস কখনো শেখাতে পারেনি, কিভাবে সে পানির মত অত জটিল সব ধাধা ভেদ করে ফেলে! একটা কুকুরের আচরণ দেখে সে কালপ্রিট পাকড়াও করেছিলো একবার, আর কাকাতুয়া রহস্যে তার মগজ ছিলো অসম্ভব ক্ষুরধার, ওটা ফ্যাসিনেট করবে পৃথিবীর যে কাউকে!
একজনের নাম নেয়া হয়নি, সে আমাদের জর্জিনা পারকার! মিস জর্জিনা, অথবা মাস্টার জর্জ ছিলো আমার সারাজীবনে টলারেট করা একমাত্র মেয়ে চরিত্র, যার কোনো খুত আমি কখনোই ধরতাম না। জিনার একটা মেয়ে আপালুসা ঘোড়া ছিলো, নাম যার কমেট, আমি কল্পনার চোখে ক্যালিফোর্নিয়ার এমাথা থেকে ওমাথা ছোট করে ছাটা তামাটে চুলের, বনবেড়ালের মত ক্ষিপ্র এক জেদী কিশোরীকে তার আপালুসায় চড়ে চষে বেড়াতে দেখতাম। আমার কৈশোরের নায়িকা। আমার কতশত লাজুক হাসির সৃষ্টিকারিণী!
আমার কৈশোরের নায়ক-নায়িকাদের আমি সারাজীবন বুকে জড়িয়ে রাখবো। ওরাই আমার সব। আমি যখন তিন গোয়েন্দা পড়তাম, কখনো হাসতাম, কখনো কাদতাম, কখনো দাতে দাত চেপে পেশী শক্ত করে থাকতাম, আমার মা দেখতো, আর অবাক হতো, একসাথে কতকি করেছি আমরা! আজও আমার মুখস্ত কিশোর পাশার সেই অমোঘ নিমন্ত্রণবার্তা- হাল্লো কিশোর বন্ধুরা, আমি কিশোর পাশা বলছি, আমেরিকার রকী বীচ থেকে, জায়গাটা লস অ্যাঞ্জেলেসে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে…..
তিন গোয়েন্দা পৃথিবীর এমাথা থেকে ওমাথা বেড়িয়েছে। সাথে আমার মনটা কেড়ে নিয়ে গিয়েছে। আমার মনটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই থেকে পড়ে আছে কতসব অজানায়! তার প্রতুলতা আমি বলা শূরু করতে চাইনা, কারন ওটা ভিন্ন ইতিহাস। তবে, আমার পৃথিবী ভ্রমণের একটা বিশেষ অংশে পাশা স্যালভেজ ইয়ার্ড যে আমি একদিন খুজে বের করবো রকী বীচে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। স্যালভেজ ইয়ার্ডের পিছনের দেয়ালে একটা ছবি আকা থাকবে, ১৯০৫ সালে স্যান ফ্র্যান্সিসকোতে এক ভয়ানক অগ্নিকান্ডের ছবি। ওখানে একটা লাল রঙের কুকুরের চোখের উপরে ছোট্ট করে একটা চাপ দেবো! লাল কুকুর চার দিয়ে ঢুকেও আমি মোবাইল হোমটা খুজে পাবোনা। এরপর আমি যদি সহজ তিনের লুকানো বাটনের খুপরিটা খুজে না পাই, তখন ভাববো, আমি কি সবুজ ফটক এক ব্যাবহার করবো, নাকি দুই সুড়ংগ দিয়ে সোজা চলে যাবো কিশোর পাশার ডেরায়? মুসা আমান দশাসই এক কিল মেরে আমার দাত ফেলে দেবেনাতো? দিলে দিক, আমি বলবো, আমার কথা না শুনলে আমি শুটকি টেরীকে গোপন পথের কথা বলে দেবো! ওরা নাকি “বারো গোয়েন্দা” খুলে বসে আছে!
ভালো থেকো তিন গোয়েন্দা। ভালো থেকো মিস...সরি, মাস্টার জর্জ।