জুলাই '২৩
সেই ছেলেটি, যে সবকিছু দেখতে চেয়েছিলো...
উনিশ’শ বাষট্টির নভেম্বরের কোনো এক রৌদ্রজ্জল সকালে বাইশ বছর বয়েসী হাইনজ স্টুকার তার কালি প্রস্তুতকরণের চাকুরীটা ছেড়ে দেন, এবং জন্মভুমি হুভেলহফ, জার্মানী থেকে একটি থ্রি স্পীড বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বুকভরা স্বপ্ন, দুই চাকায় চড়ে পুরো পৃথিবী দেখবেন। ওই যে শুরু। টানা ৫০ টি বছর আর জার্মানী ফেরা হয়নি ছন্নছাড়া সেই যুবকের। ভ্রমণ করেছেন ১৯৬ টি দেশে, ২১ টি পাসপোর্টের মালিক হয়েছেন, একাধিক বাইকে করে চড়েছেন ৬ লক্ষ ৪৮ হাজার কিলোমিটার পথ। ইমাজিন, তিনি চাইলে চাঁদে পৌছে, পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার ৬৯% পথ অতিক্রম করতেন, এবং বিষুবরেখা বরাবর পুরো পৃথিবী ৫১ বার চক্কর দিয়ে আসতে পারতেন।
এই দুরন্ত যাত্রায় বহু বাধা পেরিয়েছেন স্টুকার, তিনি প্রায় জানে মারা পড়েছেন দক্ষিন আমেরিকার কুখ্যাত আটাকামা মরুভুমিতে ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে, ক্রুব্ধ জনতার ধাওয়া খেয়েছেন হাইতিতে, মোজাম্বিকে শিকার হয়েছেন ভয়ংকর মৌমাছি দলের আক্রমণে, ক্যামেরুনে মিলিটারির কাছে আটক হয়েছেন, তার বাইকটি হারিয়েছেন সাইবেরিয়ার বিরাণ প্রান্তরে, আরেকটি চুরি হয়েছে ব্রিটেনের পোর্টসমাউথ বন্দরে। স্টুকারের এই মরিয়া হয়ে দুনিয়া দেখতে চাইবার, পৃথিবীর বাতাসে ভেসে বেড়ানো অতুলনীয় সংগীত শুনবার আকাঙ্ক্ষার প্রধানতম কারন, হুভেলহফের ঐ ঘিঞ্জি কারখানায় তিনি আর কোনোদিনই, কোনোকিছুর বিনিময়েই ফিরতে চাননি।
ভুগোলের প্রতি ভীষণ টান কিশোর স্টুকারের। স্কুলে তার প্রিয়তম বিষয়। নতুন নতুন দেশ, সেদেশের মানুষ, সংস্কৃতি সম্পর্কে সব তথ্য হা করে গিলতো সে। তখনই তার মনে ইচ্ছা জেগেছিলো, আমিও একদিন যাবো এক অ্যাডভেঞ্চারে।
তার মনে হয়েছিলো, একটা বাইসাইকেল পৃথিবী দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বাহন। প্রথমত ওটা সবচেয়ে কম খরচের। এরপরে আসবে, একটি বাইসাইকেল যথেষ্ট ধীরগতির, যাতে করে তিনি তার চারিপাশের জীবন উপযুক্তভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন, আর তা যথেষ্ট দ্রুতগতির, যাতে বিশাল দুরত্ব কোনো বড়সড় বাধা ছাড়া পাড়ি দেয়া সম্ভব। ১৮ বছর বয়েসে ইউরোপে বড় বড় সাইক্লিং ট্রিপে বের হতে লাগলেন স্টুকার। ১৯৬০ সালে একটা ১০ হাজার কিলোমিটার বাইকট্রিপে গিয়েছিলেন ভু-মধ্যসাগরের তীর ধরে। ওই একটি বছর তার মনের সকল আকাঙ্ক্ষায় যেনো বারুদ ঢেলে দিলো।
ততদিনে তিনি নিজের কাজের উপরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছেন। যেই কাজটার প্রতি তার মোটেও আবেগ নেই, জীবন ধারনের জন্য সারাজীবন তাইই করে যেতে হবে? "এটা বেচে থাকার মত কোনো কারন হতে পারে? আমিতো আমার জীবনে চাইলে পৃথিবীটাকেও ঘুরে ঘুরে দেখতে পারি!" বলতেন স্টুকার।
একটাসময় বাপের সাথে ভয়ানক তর্কযুদ্ধ শেষে, তার কাছ থেকে একটি পেনিও কোনোদিন চাইবেননা বলে দিয়ে, ৬২’র নভেম্বরে তিনি বেরিয়ে গেলেন তার সেই নিরন্তর যাত্রায়।
তার মা ১৯৬৬ এবং বাবা ১৯৮৯ সালে পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন। সেদিন বিদায়ের পর আর কোনোদিন দেখা হয়নি তাদের ছেলের সাথে।
একগুয়ের মত পথ চলতে চলতে হাইনজ স্টুকার এক লক্ষের উপরে ছবি তুলেছেন, কখনো পথের খরচ তুলেছেন সেসবেরই প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ, ডোনেশন, এবং তার ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখালেখি, এবং পোস্টকার্ড বিক্রির টাকা দিয়ে, যেসব বুকলেটস তার ছবি, লেখা প্রকাশ করে, তাদের থেকে পাওয়া আয়ে। আবার কখনও করেছেন কাজ। কাজ কাজ, এবং কাজ। কোনো কাজই হাইনজের কাছে অসম্মানের ছিলো বলে মনে হয়নি।
প্রথমবারের মত নিজের ছবি বিক্রি করে টাকা পেয়েছিলেন তিনি লন্ডনে, ১৯৬৭ সালে। ৩০০ ডলারে তার গল্প কিনে নিয়েছিলো ইস্ট লন্ডনের একটি বুকলেট প্রকাশনী! একবার ইথিওপিয়াতে থাকাকালীন একদমই শেষ হয়ে গিয়েছিলো তার অর্থসংস্থান। যদিও ওখানে তিনি পেয়েছিলেন অবিশ্বাস্য ভাগ্যের সহায়তা। ইথিওপিয়ার তৎকালীন সম্রাট হেইলি সেলাসির অনুগ্রহবাবদ তিনি তার সাক্ষাৎ, এবং অমুল্য ৫০০ ইউ এস ডলার সমমুল্যের ইথিওপিয়ান বার পেলেন।
তার বাইকটা ছিলো সাধারন বাইকপ্যাকারদের চেয়ে তুলনায় বেশ ওজনদার। তাবু এবং জামাকাপড়ের সাথে তার বহন করতে হতো ছবি তোলার বহু উপকরন, ওটিই যে তার যাত্রাটা চালিয়ে নেবে! আর থাকতো বুকলেট, যেগুলো তিনি পথেপথে বিক্রি করতেন। অনেকে মুদ্রিত মুল্যের চেয়ে বহুগুন বেশী দিয়ে ওগুলো কিনে নিতো, তার প্রতি ভালোবাসার স্বরুপ হিসেবে। লোকে তাকে বলতো, তুমি তোমার বাইকে একটা ইঞ্জিন কেনো লাগিয়ে নাওনা? তার উত্তর হতোঃ লোকে কি হেলিকপ্টারে চড়ে পাহাড়ে ওঠে, শুনেছো?
স্টুকারের ছিলোনা কোনো নির্দিস্ট গতিপথ, পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা, এমনকি তার পরের পদক্ষেপটি সম্পর্কেও তার ছিলোনা কোনো ধারনা। “নতুন একটি দিন আসবে, এবং আমি জানবোনা সেদিন আমার সাথে কি ঘটবে” এই ছিলো তার প্রেরণা। দিনের পর সপ্তাহ, মাস বছর, যুগ ধরে চলতে রইলো তার যাত্রা, এবং প্রতিনিয়ত গড়ে উঠতে লাগলো বিশাল এক সার্বজনীন পরিবার। এই পরিবারের হাজারো সদস্যরা বিচিত্র জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির, তবে এদের সবাই হাইনজকে বন্ধু বলে, ভালোবাসে। কোনো বন্ধুর সাথে হয়তো জীবনে আর কোনোদিন দেখা হয়নি, অথবা কারো সাথে হয়েছে নাটকীয় পুনর্মিলনী! এমনই একজনের কথা বলা যাক তবে!
১৯৮৩ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় ছিলেন স্টুকার। আলবেনিয়ার ভিসা পাবার জন্য পেপারওয়ার্ক নিয়ে ভুগছেন তিনি, অমন সময়ে অযাচিত এক বন্ধু, অ্যালবার্ট আলবাকেতের সাক্ষাত পান তিনি। তার বাসায় জায়গা পেলেন স্টুকার বার্সেলোনায় কাটানো পুরোটা সময়, এবং তাদের দুজনের মাঝে গড়ে উঠলো অকৃত্তিম বন্ধুত্ব। স্টুকার প্রায়শই কাউকে না বলে হারিয়ে যেতেন, বিদায়পর্ব ছিলো তার কাছে অসহনীয়। অ্যালবার্টের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটলো, একদিন কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন ভবঘুরে লোকটি।
প্রায় ৩০ বছর পরে, বার্সেলোনার একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিলো স্টুকারের খবর। “Cyclist of the endless trip” শিরোনামের ওই খবরে বলা হয়েছিলো, তিনি বাড়ি ফেরার পথে ফের একবার বার্সেলোনায় আসবেন। দুই বন্ধুর বেশ আবেগঘন এক সাক্ষাত হলো সেবার। তারা আর কোনোদিন আলাদা হননি এরপর।
আশির দশকেই, প্রায় দুই দশক ধরে পথ চলতে থাকা স্টুকার ঠিক করেছিলেন পৃথিবীর প্রতিটি দেশে যাওয়ার। ১৯৯৬ সালে ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দেশ সিশেলস পৌছে শেষ হয়েছিলো তার সেই লক্ষ্য। তবে পারফেকশনিস্ট এই লোক তাতেই সন্তুষ্ট হননি। তিনি তখন ভাবতে বসলেন, বেশ কিছু দেশে খুব কম সময় পার করা হয়েছে! তাদের সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন আরও গভীরভাবে দেখতে স্টুকার ৩৪ বছরের অদেখা সেই বাড়ির পথ না ধরে, চললেন আজন্মের অদেখা সবকিছু দেখতে। The man who wanted to see it all!
আলেকজান্ডারের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ডারিয়াসের ব্যাবিলন,মেনেসের মেম্ফিস,খুফুর গিজা, হেরোডটসের এথেন্স,লিওনিদাসের স্পার্টা,জুলিয়াস সিজারের রোম, নেপোলিয়নের এলবা,লিওনার্দো ডা ভিঞ্চির তাসকানি,উইলিয়াম ওয়ালেসের এডিনবরা,এরিক ব্রাইটিজের স্ক্যান্ডিনেভিয়া, বিলি দা কিডের টেক্সাস, টম চাচার কেন্টাকি, আলেকজান্ডার সুপারট্রাম্পের আলাস্কা,ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হিসপ্যানিওলা,এডওয়ার্ড থ্যাচের নাসাউ,মন্টেজুমার টেনকটিটলান,চে গুয়েভারার (নাকি লিওনেল মেসির?)রোসারিও,সাদা স্বপ্নের শহর সান্তা ক্রুজ ডিলাসারে,আসমানছোয়া কুইটো,কুখ্যাত আটাকামা, মেজেলিনের পাতাগোনিয়া,জিভারো ইন্ডীয়ানদের আমাজন, সোনার শহর জোহানেসবার্গ, ডোরাকাটা বিড়ালদের সেরেংগেটি, কালো শিকারীদের মাসাই মারা, পৃথিবীর উদ্যান তানজানিয়া, নামিবিয়া, আদিমানবদের ইথিয়োপিয়া,বিরান সাহারার মৌরিতানিয়া, পানির শহর ভেনেজ্জিয়া, উত্তরের স্বপ্ন রেকিয়্যাভেক,অসলো,হেলসিনকি, রুপকথার পিরেনিজ উপত্যকার সুইটজারল্যান্ড, রুপসী মহিলাদের জর্জিয়া, চেঙ্গিসখানের মঙ্গোলিয়া, বিরান সাইবেরিয়া, পামির পর্বতের তাজিকিস্তান,হিমালয়ের তিব্বত,বিচিত্র ভারতবর্ষ,প্যাসিফিকের পলিনেশিয়া,অস্ট্রেলেশিয়া,মেলানেশিয়া,ইন্দোনেশিয়া.......চরে বেড়িয়েছেন দুনিয়ার এমাথা থেকে ওমাথায়.....
অবশেষে একদিন, ২০১০ সালের কোনো এক মিষ্টি দুপুরে, ৭০ বছর বয়েসে, দ্বীতিয়বার হুভেলহফ ছাড়ার ঠিক ৪৮ বছর পরে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি তার প্রিয় জন্মভুমিতে। ঘরের ছেলে তখন নিতান্তই বুড়ো একজন লোক, তবে ঘরে সে ফিরেছে!
স্টুকারকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী ভ্রমন করা সাইক্লিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কতৃপক্ষ। the man who wanted to see it all, শিরোনামে একটি ছোট ডকুমেন্টারির তৈরী হয়েছে তার বর্ণীল জীবনের উপর, স্টুকার নিজে লিখেছেন অসংখ্য বই, তবে একটির নাম না লিখলেই নয়ঃ Home is elsewhere…….
বেলাশেষে সকল ব্যাস্ততার অবসান ঘটলে, হাইনজ স্টুকারের মত আকাশছোয়া স্বপ্নবাজ মানুষেরা মনে মনে বাক্যটা আউড়ে যায়, হোম ইজ এলসহোয়্যার। একজন হেইনজ স্টুকার নিজের জীবনের ৮০ টি বছর পার করে এই পৃথিবীতে আজও শ্বাস নিচ্ছেন, তিনি কি জানেন, তারই অজান্তে আরও কতগুলো তরুণ প্রাণের রক্তে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি, যারা তার মত পৃথিবীর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ওই প্রাণজুড়ানো সংগীত শুনবার আকাংখায় তোলপাড় করে মরছে প্রতিনিয়ত! কিন্তু তিনি নিশ্চিত জানেন, ৫০টি বছর বাড়ি না ফেরার ডেয়ার তার মত খেলতে পারবেনা দুনিয়ার সেরা বাউন্ডুলে ছোকরাটিও। কার আছে সেই হিম্মত?
হাইনজ স্টুকার আমাকে একটা প্রিয়, ভীষণ প্রিয় কবিতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমি জানি, অনেকের ই পড়তে ভাল্লাগবে ওটা। তাই অ্যাটাচড করে দিলাম নজরুলের সেই অমর কবিতাংশ!
থাকব না'ক বদ্ধ ঘরে
দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে
মরছে যে বীর লাখে লাখে।
কিসের আশায় করছে তারা
বরণ মরণ যন্ত্রণাকে
কেমন করে বীর ডুবুরি
সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী
চলছে উড়ে স্বর্গপানে।
হাউই চড়ে চায় যেতে কে
চন্দ্রলোকের অচিনপুরে,
শুনব আমি, ইঙ্গিতে কোন
মঙ্গল হতে আসছে উড়ে।
পাতাল ফেড়ে নামব আমি
উঠব আমি আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্বজগৎ দেখব আমি
আপন হাতের মুঠোয় পুরে।