কফিরঙ্গা ব্রহ্মপুত্রঃ স্মৃতিতে অম্লান সেই উজ্জ্বল শরতের দিনটি...


গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে দুপুরবেলা কড়া রোদ উঠলে, আর গাঢ় নীল রঙের আকাশ দেখলেই আমার জোরহাটের কথা মনে পড়ে। নাগাল্যান্ডের পাহাড় থেকে নেমে আসামের সমতল ধরে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির পথে ফিরছি আমি তখন। ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা আসামের দ্বীতিয় বৃহত্তম শহর জোরহাটে যখন প্রথমবারের মত এসেছিলাম এক সন্ধ্যায়,তখন আমি ভীষণ ক্লান্ত। সারাদিন হেডউইন্ড ভেঙে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৭ ধরে প্যাডেল চেপে জোরহাটের একটা মসজিদে ঘুমিয়েছিলাম সেরাতে। সেইরাত নিজে ছিলো এক বিরাট ইতিকথার! এশার নামাজের পরে সবাই যেনো কিভাবে আমার কথা জেনে গেলো, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সাইকেল চালিয়ে গিয়েছি কত কত জায়গায়! এবং আমাকে ঘিরে গোল হয়ে বসলো সবাই! এক চাচা হাক দিলেন ঐ যে দেখো এক বুড়া লোক বসা, তার আদিনিবাস তো ঢাকা! এই হাকিম ভাই, আসো দেখি এদিকে! ওই যে পাশের পান দোকান দেখলা, ওই লোকের দাদা ছিলো বাংলাদেশী! ঐযে মুসলিম হোটেলটা দেখতেছো তার মালিক অনেক বছর আগে ঢাকা গেছিলো একবার! চলো চলো, বলে ওই সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। তারা সবাই ও আমার সাথে এমন ব্যাবহার শুরু করলো, যেনো শালজোড় গ্...


কফিরঙ্গা ব্রহ্মপুত্রঃ স্মৃতিতে অম্লান সেই উজ্জ্বল শরতের দিনটি...



গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে দুপুরবেলা কড়া রোদ উঠলে, আর গাঢ় নীল রঙের আকাশ দেখলেই আমার জোরহাটের কথা মনে পড়ে।

নাগাল্যান্ডের পাহাড় থেকে নেমে আসামের সমতল ধরে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির পথে ফিরছি আমি তখন। ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা আসামের দ্বীতিয় বৃহত্তম শহর জোরহাটে যখন প্রথমবারের মত এসেছিলাম এক সন্ধ্যায়,তখন আমি ভীষণ ক্লান্ত। সারাদিন হেডউইন্ড ভেঙে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৭ ধরে প্যাডেল চেপে জোরহাটের একটা মসজিদে ঘুমিয়েছিলাম সেরাতে। সেইরাত নিজে ছিলো এক বিরাট ইতিকথার!

এশার নামাজের পরে সবাই যেনো কিভাবে আমার কথা জেনে গেলো, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সাইকেল চালিয়ে গিয়েছি কত কত জায়গায়! এবং আমাকে ঘিরে গোল হয়ে বসলো সবাই! এক চাচা হাক দিলেন ঐ যে দেখো এক বুড়া লোক বসা, তার আদিনিবাস তো ঢাকা! এই হাকিম ভাই, আসো দেখি এদিকে! ওই যে পাশের পান দোকান দেখলা, ওই লোকের দাদা ছিলো বাংলাদেশী! ঐযে মুসলিম হোটেলটা দেখতেছো তার মালিক অনেক বছর আগে ঢাকা গেছিলো একবার! চলো চলো, বলে ওই সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। তারা সবাই ও আমার সাথে এমন ব্যাবহার শুরু করলো, যেনো শালজোড় গ্রামের শিকদারের নাতি দশ বছর পরে ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছে, আর তারা সবাই শিকদারের বিরাট গুণগ্রাহী! অদ্ভুদ সুন্দর সেই মানুষগুলো, অমলিন ছিলো তাদের আতিথেয়তা! আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে গেলেন দুইজন। বিরাট এক বোলভর্তি গরুর মাংস এবং ভাত খেয়েছিলাম সেরাতে! কত ধরনের কথা যে বলতে লাগলেন তারা আমার সাথে! বাংলাদেশ যেনো ঠিক একটা স্বপ্নের মত আসামের মুসলমান সমাজে!

১০ টায় মসজিদের গেট আটকানো হবে বলে অনেকটা জোর করেই তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম। কিন্তু শর্ত দিয়ে দিয়েছে কালকে কিছুতেই যেতে পারবোনা আমি! থেকে যেতে হবে, তাদের সবার বাড়িতে যেতে হবে একবার করে! এ যেনোতেনো মানা করা না! কিছুতেই আমি যেতে পারবোনা, উঁহু! চলে গেলে ওনারা খুব মন খারাপ করবে, তা আমি খুব বুঝতে পারছিলাম!

ফিরে এসে আমি যখন মসজিদের মেঝেতে শুয়ে পড়ে বইটা মেলে ধরলাম, তখন জীবনে প্রথম আমার মুজিবুর রহমান ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো। উনি ঐ মসজিদের ইমাম। বেশ উচ্ছল লোকটা। উনি আর মুয়াজ্জিন থাকার জন্য একটা কামরা আছে। কিন্তু তারা দুইজন বাংলাদেশের গল্প শুনবেন আমার কাছ থেকে, তাই আমার সাথে বিছানা বিছিয়ে ফ্লোরেই রয়ে গেলেন দুজনে। গভীর রাত পর্যন্ত সে কি কথা তিনজনের, যেনো কত পুরনো বন্ধুদের আড্ডা, ভান্ডার সীমাহিন কথার! ফজরের আজানের পরে মুজিবুর রহমান ভাই যখন আমাকে ডেকে দিলেন, ঐ মুহুর্তটা এখনো চোখে ভাসছে। আস্তে করে কাধে একটা টোকা দিয়ে তিনি প্রায় ফিসফিস করে বলে চলেছেন- “ভাই, ফজরকা ওয়াক্ত হো গায়া, ভাই ফজরকা ওয়াক্ত হো গায়া…… “ বাইরে তখন একটানা বৃষ্টির গর্জন, বজ্রপাতের চকিত আলোকছটায় সৃষ্ট আবছায়া ওই দৃশ্যটা…….আমার চোখ ভিজে অনুভুত হয় জোরহাটের মানুষগুলোর এইসব আন্তরিকতার কথা মনে পড়লে।

আমার যে ফিরতেই হবে বাংলাদেশের পথে। হাতে সময় খুবই কম! ইতিমধ্যে আমার নতুন সেমিস্টারের এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। পরে জেনেছিলাম, কম্পিউটার গ্রাফিক্স নামে এক বিষয়ে আমার শিক্ষিকা প্রথম মিড পরীক্ষার সিলেবাস প্রায় অর্ধেক শেষ করে ফেলেছেন দুইদিনে! কি যে ভুগেছিলাম ওটা কাভার করতে যেয়ে,ফিরে আসার পরে!

 সকালে বাজারের ওই লোকগুলোর কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে পারিনি। কি করে না বলে চলে আসি? ফজর শেষে সবাই দোকানপাট খোলা অবধি ঘুমিয়ে রইলাম ফ্লোরেই! পরে সবার কাছে ঢু মেরে গেলাম। পান দোকানী তখনও দোকান খোলেনি। তিরিশ বছর আগে ঢাকায় ঘুরতে এসে টিকাটুলি, মতিঝিল, সাভার, ধানমন্ডী নামগুলো মনে রাখা ওই চাচা আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, কিছুতেই আমি রাইডের সময় সকালে কিছু খাইনা বুঝতে পেরে একটা মুহুর্ত ঘরের মাঝে বসিয়ে এক গ্লাস পানি খাইয়ে ছাড়লেন। দেখালেন আমার চাচী এবং চাচাতো ভাইদেরকে! ফেরার পথে তার রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করালেন তার বড় ছেলের সাথে, "এই দেখ, কে, বাংলাদেশ থেকে আইছে তোর এই ভাই, সালাম দে!"

 আমি সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে হাইওয়ের দিকে এগোলাম, আর তিনি আমার পাশে পাশে হাটতে হাটতে তখনো অনর্গল কথা বলে চলেছেন। শরতের সেই আকাশের রঙ গাঢ় নীল, মেঘের দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, উজ্জ্বল সাদা, চোখদুটো ধাধিয়ে যায় সেদিকে তাকালে। ভীষণ কড়া রোদ উঠেছিলো সেদিন। তবে আমার যে মোটেও গরম লাগছেনা! মনটা ভীষণ উদাস হয়ে ছিলো। মাঝেমাঝেই আড়চোখে তাকাচ্ছিলাম আমার পাশের লোকটির দিকে, আর ভাবছিলাম, কত কাজ পড়ে রয়েছে তার! দোকানটা কে খুলবে! সে আমার সাথে আর কতদুর যাবে? কারন ই বা কি?

আমরা যখন দুজন একসাথে শেষ কদমটা হেটে ফেলেছি,সে তার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে দিয়ে জোরহাট- গোহাটি বড়রাস্তার মোড়ে আমাকে বিদায় দেয়ার সময় বারবার করে বলছিলেন, ফের জোরহাট হয়তো জীবনে কোনোদিন ফিরে আসবোনা, আমাদের আর দেখাও হবেনা, নাম্বারটাতো রইলো, চেহারাটাতো মনে থাকলো…..

আজ আর তার চেহারাও যে আমার মনে নেই....কিন্তু আজ সেদিনের মত কড়া রোদ উঠেছে। কাশটা গাঢ় নীল। বাতাস বইছে, কেমন যেনো উদাস করা এই চৈত্রের বাতাস।1


ট্যাগ: