নভেম্বর '২২
মার্গারিতার পিছুঃ উত্তরের ঠান্ডা, ও একাকী ট্যান
‘অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, মিস্টার বাটুখান!’ হাসিখুশী লোকটার আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে বলছি আমি ’নিশ্চয় বুঝতে পারছো, তোমার ভাইয়ের ফেরীতে করেই এখানে এসেছি আমি, টার্ট থেকে। খুব ইচ্ছা, দ্বীপটা দেখার! আমি সারা পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছি!’
শেষ কথাটা বলার সময় শরীর শিহরিত হলো আমার! প্রতিবারই কাউকে একথা বলার সময় আমার রক্তসঞ্চালন দ্রুত হয়ে যায়। অদ্ভুত এক খুশীতে ভরে যায় হৃদয়। এই ক্ষেত্রে সম্ভবত বাটুখানেরও তার কাছাকাছি একটা অনুভুতি হলো! ভীষণ আন্তরিক, আর উজ্জ্বল হাসি নিয়ে আমাকে বিব্রত করে আমার তারিফ করতে লাগলো লোকটা। উঠোনের শেষপ্রান্তে, বেলাভুমিতে লম্বা একটা গাছের ছায়ায় মাদুর বিছিয়ে আমাকে ওখানে বসতে বলে নিজে চলে গেলো ঘরে।
সেই বাচ্চা ছেলেটা এতক্ষনে তার বাপ-চাচার বন্ধু হিসেবে বেশ মেনে নিয়েছে আমাকে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো এদিকে। বেশ খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে গালে হাত দিয়ে দুইচোখ বড়বড় করে গিলতে লাগলো আমাকে। এবার হাতছানি দিতেই চলে এলো আমার কাছে। ওকে পাশে বসিয়ে আদর করে দিলাম। আমার আদরের চোটে অধিকাংশ বাচ্চাই বিরক্ত হলেও, এই ছেলে হলোনা। বরং উপভোগ করলো নাক-গাল টানাটানি। মংগোলিয়ান শিশুরা দেখতে অদ্ভুতরকম অপার্থিব। খুবই তুলতুলে ধরনের আদুরে ভাবভঙ্গি। ক্ষণিকের জন্য সব দুশ্চিন্তা ভুলে গেলাম আমি।
এরমাঝে বাটুখান বড় এক ডিশে করে হরশুর আর আইরাগ নিয়ে এলো আমাদের জন্য। তাদের দুপুরের খাবার সময়ে এসে হাজির হয়েছিলাম আমি। দুই ভাই আমার সাথে ভাগ করে নিতে চাইলো তাদের আহার। বাটুখানের স্ত্রীর সাথে তখনো পরিচয় হয়নি, তবে দূর থেকে অভিবাদন জানিয়েছে মহিলা একবার। ওদের সাথে বসে খেতে খুব ইচ্ছা হলো, গতরাতের পর থেকে খাওয়ার সুযোগ আসেনি। কিন্তু অস্থিরতায় আমি ওই কাজ করতে পারলাম না।
খানিক দূরেই আরমোনিয়া ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। ওকে দেখিয়ে বাটুখানকে জিগ্যেস করলাম, পুরো দ্বীপটা একবার চক্কর দিয়ে আসতে ওর কতক্ষন লাগবে?
দুই ভাই একবাক্যে বলে দিলো- আধঘন্টা!
যা ভেবেছিলাম তারচেয়েও অনেক বেশী ছোট এই দ্বীপ! ওই মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামী আধঘন্টার মাঝেই নিশ্চিত হতে চাই আমি, মার্গো এই দ্বীপে এসেছে কিনা। বাটুখানকে সেকথাই বললাম, তবে একটু ধীরে!
‘বাটুভাই, তোমাদের এই দ্বীপে বিদেশি আসে কেমন?’
‘প্রায়ই আসে, তবে বছরের একটা নির্দিস্ট সময়ে! এই সময়টা সেটা না। একটূ থেমে যোগ করলো সে ’কিন্তু আমার নাম বাটুখান!’
‘আমি যেখানে থাকি ওখানে আমরা একে অপরকে ভাই বলে ডাকি। ভাই মানে আখ। ব্রাদার…...তোমাদের দ্বীপে বিদেশী টুরিস্ট এলে থাকে কোথায়?’
‘সবাই-ই সাথে করে তাবু নিয়ে আসে!’
‘গতকাল কোনো বিদেশী মেয়েকে দেখেছো? বয়স উনিশ, স্প্যানিয়ার্ড, রোদেপোড়া চামড়া, বোচা নাক, তামাটে ছোট চুল কাধ পর্যন্ত, থুতনীতে তিনটা তিল আছে!’
বাটুখান যেভাবে উত্তর দিলো, তাতে আমার সন্দেহ, হলো, খুব সন্দেহ হলো! সে প্রচুর দ্বিধা নিয়ে জানালো, না, অমন কাউকে দেখা যায়নি দ্বীপে!
দ্বীর্ঘ একটা সেকেন্ড চেয়ে রইলাম তার দিকে।
সত্যি বলছো বাটুভাই? বিশ্বাস করো, তাকে খুজে পাওয়া যে আমার খুবই দরকার….’
‘অমন কাউকে দেখিনি ট্যান ভাই, সত্যি বলছি’ দ্বিধাহীন কন্ঠ এবার লোকটার।
‘তোমার বাড়িতে আজ রাতটা থাকতে দেবে আমায়?’
‘নিশ্চই ……’
‘অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে!' যদিও রাতে আমি থাকছি না, ফাকি দিয়ে পালাবো! 'আচ্ছা, তোমাদের দ্বীপে লোকসংখ্যা কেমন বাটুভাই?’
‘সাকুল্যে দশটা পরিবার! বাজারে তিনঘর, আমার প্রতিবেশী চারজন, আর এখান থেকে উত্তর-পূর্বে খাড়ির সামনে ঘর বানিয়েছে তিনটা পরিবার!’
‘আমি সবার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, নিশ্চয় সমস্যা নেই কোনো?’
মাথা নাড়লো বাটুখান।
বাটুখানের প্রতিবেশীরা সাধাসিদে জেলে সব। খোজখবর নেয়ার চেয়ে আমার কাছে সহজ মনে হলো সবার উঠোনে একবার করে দাঁড়িয়ে সবার সাথে অভ্যর্থনা বিনিময় করে যাওয়া। মার্গোর চিহ্ন ও আশেপাশে থাকলে আমি অবশ্যই টের পেতাম! কারন সবার উঠানে যেয়েই আমি পানি খেতে চাইলাম। একপর্যায়ে পেটটা যেনো ঢোলের মত ফুলে গেলো আমার পানির তোড়ে! ছোট দ্বীপটা সম্পর্কে প্রথমে যে ধারনা হয়েছিলো, তা বদলে গেলো নিমেষেই। মানুষগুলো অসম্ভব বন্ধুত্বপুর্ন। স্বর্গেও সাপ থাকে। ওই হোতকাটা অমনই এক সাপ ছিলো। প্রতিটি বাড়িতে দারুন অভ্যর্থনা পেলাম আমি। বাড়ির মেয়েরা কিছু খাওয়ার জন্য বললো, আর পুরুষেরা আমার ভ্রমন সম্পর্কে জানতে চাইলো। যথাসম্ভব কম সময়ে সবার ইচ্ছাপুরন করলাম।
মার্গারিতার চিহ্ন ও নেই। এবং গতসপ্তাহে কোনো বিদেশি আসেনি বলছে তারা। আমি মার্গোর চেহারার বর্ননা দিলাম কয়েকজনের কাছে, কিন্তু ফলাফল ধ্রুবক। শেষপর্যন্ত যা হলো, তা হচ্ছে- আমি মেজাজ হারিয়ে ফেললাম।
উত্তর পূর্বের খাড়ির কাছে এসে ঘটলো বিপত্তি! দূর থেকেই দেখলাম দশ-বারোজন লোকের জটলা। মাটিতে কি যেনো একটা পড়ে আছে, তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে তারা সবাই। আরেকটূ কাছে যেতেই বুঝলাম মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসটা একটা মৃতদেহ। আমি নিশ্চিত ওটা আজ সকালে বাজারে খুন হওয়া সেই হতভাগিনী! ওপথও মাড়ালামনা, অনেক দূর দিতে একটা টিলার আড়াল দিয়ে সরে গেলাম আমি। কিন্তু সমস্যা হলো, দ্বীপে আর কোনো জনবসতি বাকি রইলোনা!
পুরোটা কাঠের ছেলের দ্বীপের কেন্দ্র জুড়ে পাহাড়ি বন। ওই জংগলে নিশ্চয় নেই মার্গারিতা। ও তো আর আমার সাথে লুকোচুরি খেলছেনা! কি জানি, তাও নিশ্চিত না। পুরো দ্বীপটার বেলাভুমি ধরে আরেকটা চক্কর খেয়ে ফিরে এলাম ফেরীঘাটে। এরপরে আরেকবার। তারপরে আরেকবার। ছোট দ্বীপটার আনাচেকানাচে এমনভাবে ঘুরে বেড়ালাম, যাতে ইচ্ছা করে কেউ দূরে সরে না গেলে অবশ্যই আমার সাথে দেখা হতো। শুধু এড়িয়ে গেলাম উত্তরপাশের সেই খাড়ি। হোতকাটার সামনে কিছুতেই পড়তে চাইনি। শেষ একবার ফেরীঘাটে ফিরে এসে জেটিতে পা ঝুলিয়ে বসে শুন্য দৃস্টিতে চেয়ে রইলাম দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির দিকে। ক্ষিদে টের পেলাম তখন। পেটের মাঝে অবশ এক অনুভুতি। দুপুর থেকে ঘুরে ফিরছি, তখন শেষ বিকেল। হতাশ হয়ে ফিরে এলাম বাটুখানের বাড়িতে।
তখনই, অযাচিতভাবে আমি মার্গারিতার ট্রেইল খুজে পেলাম! সৈকতে সারি দিয়ে উপুড় হয়ে থাকা নৌকাগুলোর একটার কালো গলুইতে সাদা রঙের চক দিয়ে বড় করে স্প্যানিশে লেখা- ট্যান ও এসপেরানজা, আমিগো! ধ্বক করে উঠলো বুকের মাঝে। এটা কিছুতেই কাকতালীয় ব্যাপার হতে পারেনা। বাটুখানকে ডেকে নিয়ে এলাম, দেখালাম লেখাটা। সে নিজেও বেশ অবাক হলো। ও আমার কাছে জানতে চাইলো, কি লেখা ওটা!
‘ট্যান ও এসপেরানজা, আমিগো!’
লোকটা চমকালো। আর সে তা প্রকাশ ও করলো ‘কি বললে? এসপেরানজা? তুমি সেকথা কি করে জানলে?’
‘আমি স্প্যানিশ পড়তে পারি বাটুভাই। আর, আমি যেই মেয়েটাকে খুজছি, একমাত্র সে-ই লিখতে পারতো ওই বাক্যটা ’
‘তুমি তাকে কেনো খুজছো?
‘ও আমার বন্ধু, একসাথে হাটগাল শহরে বাজার করতে এসেছিলাম আমরা। হঠাত, ও ঠিক করেছে আমাকে কিছু না বলে চলে যাওয়ার, এবং নিশ্চই কোনো গুরুত্বপুর্ন কারনে।’
‘তোমার বাড়ি কোন দেশে, ট্যান ভাই?’
‘বাংলাদেশ’
‘ওটা কি দক্ষিন এশিয়াতে?’
মাথা ঝাকালাম শুধু।
‘কিছু মনে না করলে, তোমাকে দুইটা প্রশ্ন করবো। তোমার ভালোর জন্যই, ভাই।’
‘করো!’
‘এসেপেরানজা কে?’
ভ্রু কুচকে তাকালাম আমি লোকটার দিকে। বলছে কি?
‘কি বললে?’
‘এসপেরানজা। উত্তরটা খুব জরুরী মিস্টার। যদি যেনে থাকো, আমাকে বলো দয়া করে!’
‘ আমার একটা বাইক আছে, ওই নামে ডাকি ওটাকে’
‘তুমি যাকে খুজছো, তার বাবার নাম বলতে পারবে?’
‘আলমানযো রদ্রিগেজ’
নিজের জামার আস্তিনে হাত দিলো লোকটা। দুই টুকরো কাগজ বের করলো। প্রথমে নিজে একটা পড়লো। পরমুহুর্তে তড়িঘড়ি করে দ্বীতিয় কাগজটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলো।
‘এটা নাও!’
একটা চিরকুট! বেশ স্বাভাবিকভাবে পড়লাম ওটা। স্প্যানিশ লিখেছে তার প্রেরক।
'তুমি একটা পাজি লোক সিনর! এখানে কেনো এসেছো? কোনও এক শীতের সকালে মায়াবী লেকের পানিতে দেড় ঘন্টা ডুবে থাকতে হবে তোমাকে, মনে করিয়ে দিও আমি যদি ভুলেও যাই একথা। এই সিনর বাটুখান খুব ভালোলোক, আমাকে পেটভরে খাইয়েছে। তোমার আর আরমোর জন্য একটা বোটের ব্যাবস্থা করে দেবে, টু শব্দ না করে চলে যাবে তীরে, এরপর সোজা র্যাঞ্চে। আমার পিছু নেয়ার কথা ভেবো না। তোমার এসপেরানজা ভালো আছে।
ইতি, এম।'
পড়া শেষ হবার সাথে সাথে ছিড়ে ফেললাম আমি ওটা। মেজাজ হারিয়েছি।
বাটুখান সম্ভবত আমার এই প্রতিক্রিয়া আশা করেনি। চুপসে গেছে সে।
‘কবে দিয়েছে ও এটা তোমাকে?’
‘গতকালই! আমার কোনো ভুল হয়েছে? কিন্তু ওই মিস বলে গিয়েছিলো, একদম নিশ্চিত না হলে যেনো কিছুতেই কাউকে না দেই ওটা!’
‘ও একা ছিলো?’ কন্ঠ চড়ে গেলো আমার নিজের অজান্তেই।
‘না। সাথে দুজন ছোট ছোট ছেলে, মংগোলিয়ান। সাইকেল চালিয়ে ভুতের মত এসেছিলো গতকাল সন্ধ্যায়, রাতটা কোনোমতে আমার বাড়িতে কাটিয়ে পরে আবার একইভাবে চলে গেছে, আজ সকালেই। আমি তাকে প্রশ্ন করিনি, কিন্তু মনে হয়েছে সে খুব উদ্বিগ্ন ছিলো। নিজে থেকে বলেছে, সে খুব বিপদজনক পরিস্থিতিতে আছে, তার পিছনে ফেউ লেগেছে, একইসাথে একজন বন্ধুও। শত্রুর কাছ থেকে পালানো যতটা গুরুত্বপুর্ন, তেমনই দরকার বন্ধুকে একটা মেসেজ দেয়া। দক্ষিন এশিয়ান কোনো যুবক সেই বন্ধুটি। তাকে ওই দুটো প্রশ্ন জিগ্যেস করতে বলেছে আমাকে সে। তোমার উত্তর এটার সাথে না মিললে আমি তোমাকে ভুল খবর দিতাম। আমি কোনোদিন দক্ষিন এশিয়ান লোক দেখিনি ট্যান ভাই, তাই তোমাকে প্রথমেই দিতে পারিনি খবরটা, ক্ষমা কোরো’ আরেক টুকরো কাগজ দিলো সে আমাকে। মংগোলিয়ান লেখা। আমার চোখে প্রশ্ন দেখে মুখে বললো সে- এসপেরানজা, আলমানযো রদ্রিগেজ।
‘শত্রুর কাছ থেকে পালাবে!’ হঠাত চমকে উঠলাম আমি। আমার সব উদ্বেগ একবারে কয়েকগুন বেড়ে গিয়ে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠলো মন টা এক মুহুর্তে।
‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বাটুভাই। মেয়েটাকে সাহায্য করার মত মানুষ খুব কম আছে পৃথিবীতে। ও গেলো কিভাবে? ফেরীতে যায়নি।’
‘আমার ভাই নিজে তাকে আমাদের মাছধরা ট্রলারটায় করে নামিয়ে দিয়ে এসেছে মেইনল্যান্ডে।’
‘এরপর কোনদিকে যাবে, কিছু বলেছে?’
‘না !’
‘আমাকে আর কিছু বলতে বলেছে?’
‘না !’
‘আমাকেও মেইনল্যান্ডে পৌছে দেবে?’
‘না !......মানে, নিশ্চয়’
‘ক্ষমা করবে বাটুভাই । আমি একটু বেশী বাজে ব্যাবহার করেছি তোমার সাথে। আসলে, বুঝতেই পারছো….’
‘বলতে হবেনা ভাই। বুঝতে পেরেছি!’ আন্তরিক হাসলো লোকটা ‘তোমার ঘোড়াটা নিয়ে তৈরী থেকো, আধঘন্টার মাঝেই আমার ট্রলার প্রস্তুত হয়ে যাবে তোমার জন্য।’
অধীর হয়ে বেলাভুমিতে পায়চারী করতে রইলাম আমি। নিজের অজান্তেই কখন যেনো চলে এলাম বাজারের কাছে। একটা গার দেখতে পেয়ে গৃহিণীর কাছে একটু পানি চাইতে গেলাম। পানি চাইতে গেলাম, আর ফ্যাসাদে পড়লাম। উঠোনে বসে করাত দিয়ে গাছ কাটছিলো এক লোক, আমার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। এই সেই পাড় মাতাল! স্ত্রীকে খুন করে এসে দিব্যি কাঠের চলা ফাড়ছে! ও কি বলবে তা দেখার জন্যে আর অপেক্ষা করলাম না, ঘুরেই দিলাম ছুট। ও পিছনে আসছে কিনা দেখার জন্যও ফিরলাম না। কিছুদুর যেতেই দেখা পেয়ে গেলাম আরমোনিয়ার! ও দিব্যি লেজ নাড়িয়ে চরে বেড়াচ্ছিলো বেলাভুমিতে। একলাফে ওর পিঠে চড়ে বসলাম, আর ও আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে এলো বাটুখানের বাড়ির আঙিনায়।
দুয়েক কথায় ঘটনা বলতেই মিস্টার বাটু পুরোটা বুঝে নিলো। কিন্তু বেলাভুমি ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেলোনা কোনো মাতাল হ্যাঙলা পাতলা লোককে!
‘ওর কথা ভুলে যাও ট্যানভাই! পাড় মাতাল, প্রায়ই এই কাজ করে, ওকে ভয় পাবার কিছু নেই, উলটো ভিতুর ডীম একটা।’
‘একটু আগে বাজারে ওর স্ত্রীকে জবাই করেছে’ শুকনো মুখে জানালাম তাকে।
‘কে?’ ভীষণ চমকে তাকালো লোকটা আমার পানে।
‘ও নিজে’
‘সর্বনাশ!’
‘হ্যা, সর্বনাশ’
‘তুমি তোমার ঘোড়াটাকে ডেকে বাধো। ঢেউয়ের দোলায় ভয় পাবেনা তো?’
‘নাহ, ভয় পাবেনা, শক্ত মেয়ে। আর, ওকে বাধা সম্ভব না, জানলে ওর মালকিন আমাকে সিডার গাছের সাথে বেধে রাখবে…... চলো, যাই!’
বাটুখানের ব্যাপারে মার্গারিতা কি বলেছে, মনে আছে আমার। যাবার আগে ওর ছেলেটাকে আদর করবার সময় এক ফাকে সবার অজান্তে পিচ্চিটার নেংটির মাঝে পঞ্চাশ হাজার তুগরিক গুজে দিলাম আমি। আমার মনে হয় কাজটা খারাপ করিনি। দাদু নিশ্চয় কিছু মনে করবেনা।
বাটুখানের স্ত্রী একটা পুটুলিতে করে আমার জন্য বেশকিছু খাবার দিয়ে দিয়েছে। এই অজপাড়া গায়ে অমন অমায়িক, সুন্দরী মহিলা খুবই বড় কোনো অলংকারের মত। খুব দোটানায় ছিলাম, ওটার জন্য টাকা সাধা অভদ্রতা হবে কিনা। মহিলার হাসি দেখে আমার মনে হয়েছিলো অভদ্রতার চুড়ান্ত হতো, মনে খুব কষ্টও পেতো সে। তাই প্রানখোলা একটা হাসিই কেবল উপহার দিলাম তাকে।
পড়ন্ত দুপুরের শেষ আলোয় বাটুর পরিবারকে বিদায় দিয়ে তার ছোট্ট মাছধরা ট্রলারটার ছাউনির নিচে যেয়ে বসলাম। আরমো ডেকে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো।
আমাকে নামিয়ে দিয়ে নিজে মাছ ধরতে যাবে বাটুখান। গভীর রাত পর্যন্ত তাইই করবে। ভাগ্য সহায় দেখলে সারারাতই থেকে যাবে।
‘কি মাছ পাও, বাটু ভাই?’
‘সবচে বেশী আছে স্যামন আর ট্রাউট। কিন্তু ওসব কি আর বেচে দাম পাওয়া যায়? ভাগ্য ভালো হলে কোনোদিন জালে ওঠে সাইবেরিয়ান গ্রেইলিং। কিন্তু আমার ভাগ্যে জোটে শুধু সাইবেরিয়ান রোচ!’
‘সাইবেরিয়ান রোচ? আমার দেশে রোচকে বলে পুটিমাছ! সাইবেরিয়ার পুটি নিশ্চয় অনেক বড়।’
‘বড় তো বটে, তবে একটা পাইক, কিংবা গ্রেইলিং এক গালে দশটা রোচ গিলে নিতে পারে। গতবছর গ্রীষ্মে ধরেছিলাম একটা পাইক, তুমি যদি দেখতে ওটা! আমার চেয়ে লম্বা, ওই এক মাছ বেচে তিন মাস শুয়েবসে কাটিয়েছিলাম!’
‘বলো কি! আরিব্বাস’ লেকের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে থেকে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, অতবড় মাছ সত্যিই আছে এর নীচে!
‘আমাকে যেখানে নামিয়ে দেবে, ওখানে কি আছে?’
‘স্যামন ছাড়া আর কিছুই নেই’’ বাটুখানের সরল জবাব।
হেসে ফেললাম ওর কথা শুনে।
‘এরমানে আমি বলতে চাইছি, ওখানের ভুদৃশ্য কেমন? জংগল? সমভুমি? পাহাড়? ট্রেইল আছে?’
‘ও! নেমেই তুমি পাবে একটা খাড়াই। উপরে উঠলে উত্তর-দক্ষিনে চলে গেছে টার্ট-হাটগাল হাইওয়ে। একদম যা তা অবস্থা, কিন্তু ওই ওখান দিয়েই গাড়ি চলে। রাস্তার পশ্চিমে এখন আছো তুমি, পূর্ব দিকে কিছুটা পাহাড়, আর বাকিটা মাইলের পর মাইল ফাকা মাঠ, সবুজ ঘাস, আর পাইনবন।’
‘ধন্যবাদ।’
বাটুখানকে ধন্যবাদ দিলেও আমি দিশা খুজে পেলাম না। টার্ট বা হাটগালমুখী নিশ্চয় যায়নি মার্গো, তাহলে বোটেই যেতে পারতো। আর, ওর সাথে যেহেতু সাইকেল আছে, নিশ্চয় বনে জংগলে পথবিহীন কোথাও ঘুরে বেড়াতে পারবেনা। একটু যেনো আশার সাথে প্রশ্ন করলাম বাটুখানকে।
‘পুব দিকে যাওয়ার ট্রেইল আছে কোনো ওখানে?’
‘অসংখ্য’ উত্তর শুনে চুপসে যাবার কথা থাকলেও গেলাম না। চ্যালেঞ্জটা নিচ্ছি। ছন্নচ্ছাড়া মেয়েটার ট্রেইল আমি খুজে বের করবোই।
একঘন্টার মত সময় পর তীরে পৌছে গেলাম আমরা। আরমো আর আমি ঝকঝকে বেলাভুমিতে লাফিয়ে নেমে গেলাম। আন্তরিকভাবে বিদায় জানালাম মিস্টার বাটুখান বায়ারমারকে। ফের একদিন ভালো হৃদয়ের লোকটার সাথে দেখা করবো আমি, ভাবলাম। অনেকক্ষন চেয়ে রইলাম তার গমনপথে। শান্ত পানিতে মৃদু ঢেউ তুলে ধীরে ধীরে গুঞ্জন করতে করতে জ্বলতে থাকা সূর্যের কীরনের মাঝে হঠাত যেনো হারিয়ে গেলো সে।
‘চলো আরমো! আমরাও চলে যাই!’ ঘোড়াটার পিঠে চেপে বসলাম আমি। হেলেদুলে ওকে এগোতে দিলাম পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। আর আমি ভাবতে লাগলাম কি করবো। কানের মাঝে বারবার বাজছে বাটুখানের কথা! শত্রুর কাছ থেকে পালাতে হবে, কোনো এক বন্ধুকে একটা মেসেজ দেয়াও অমন জরুরী! কিন্তু, নিরীহ মেয়েটার জীবনে শত্রু কোত্থেকে আসবে? আমার মনে পড়ে গেলো, নিরীহ মেয়েটার শত্রুর আসলে অভাব নেই। অ্যানাটলি নামক সেই পিশাচটার কথা মনে পড়লো। রাশিয়ান নারী ব্যাবসায়ী, আর এটা রাশিয়ান সীমান্ত, হাটগালে রাশিয়ানদের অবাধ যাতায়াত! ভাবনাটা রীতিমত চমকে দিলো আমাকে। মনে পড়লো বাতসাইখানের কথা। ওকে যে কোনো মুল্যে বিয়ে করতে চায় লোকটা! মার্গারিতার যদি লোকালয়ে প্রয়োজন থাকে, তাহলে যাবার মত মোটে দুইটা জায়গাই আছে, র্যাঞ্চ ছাড়া,টার্ট আর হাটগাল। ও কি আদৌ টার্ট যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হলো। হাটগালে ফিরবে কি? ফিরতে পারে বলে বেশ ভালো একটা সম্ভাবনা এলো আমার মাথায়। এরপরের ব্যাপার, ও আমার গতিবিধি সম্পর্কে জানে। কিন্তু কি করে? আর জানেই যদি, তাহলে আমার জন্য কেনো সে অপেক্ষা করছেনা? যদিও এমনও হতে পারে যে, বাটুখানের কাছে রেখে যাওয়া চিঠিটা পুরোটা আন্দাজের উপর। ও হয়তো দান মেরেছিলো একটা, আমি যদি পৌছেই যাই ওই দ্বীপে কোনোভাবে।
যাই হয়ে থাক, সেগুলো এখন অতীত। আমি এখন তেপান্তরের মাঝে, আধার ঘনাতে বাকি নেই বেশী। মার্গারিতা আল্ভারেজও এসেছিলো এখানে। ঠিক চব্বিশ ঘন্টা আগে। চব্বিশ ঘন্টায় কি কি করতে পারতো ও?
ও যদি কোনো উৎরাই বেয়ে নেমে থাকে, তাহলে বহুদুর চলে গেছে! আবার এমনও হতে পারে, আমার কাছ থেকে সর্বোচ্চো ২০ মাইল দূরে কোনো পাহাড়চুড়ায় আছে মার্গারিতা। সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাটা ধরেই আমি চারিদিকে রেকি করতে লাগলাম আরমোর পিঠে চেপে। আরেকটা সমস্যা, যেটা এখনো মাথায়ও আনিনি, তা হচ্ছে রাত হলে আমি কি করবো! আমার এসপেরানজার সাথে মার্গারিতা তাবুটাও নিয়ে গেছে। আরমোকে দিয়ে অতিরিক্ত ওজন যতটুকু সম্ভব কম বহন করাতে চেয়েছিলাম আমি। তাই তাবুটা বাইকের সিটপোস্টের সাথেই সেটে দিয়েছিলাম। ওইকথা মনে পড়ে একাধারে প্রশান্তি, আর অনিশ্চয়তা বোধ হলো আমার। প্রথম অনুভুতির কারন, মেয়েটা অন্তত রাতবিরেতে থাকা নিয়ে একটু হলেও অবলম্বন পাচ্ছে। আর দ্বিতীয়টা, রাতের বেলা উত্তরের আকাশছোয়া এই চুড়ায়, খোলা প্রান্তরের মাঝে ঠান্ডায় কিভাবে কাপবো, আদৌ টিকে থাকবো কিনা, সেই চিন্তায়। আমার দেশে শীতকালের সবচে ঠান্ডা রাতটির চেয়েও উত্তর মংগোলিয়ার এই প্রান্তরের বসন্তের রাত অনেকগুন বেশী শীতল।
জলদিই সিদ্ধান্ত নিতে হতো আমার। যদি মার্গারিতাকে খুজে বেড়াতে চাই, তাহলে রাতের অনিশ্চয়তা মেনে নিতে হবে। কিজানি, ভাগ্য ভালো হলে কোনো একটা ছন্নছাড়া যাযাবর পরিবারের সাক্ষাত পেয়েও যেতে পারি। আধুকিন মংগোলিয়ায় শহরায়ন বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও, এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষ ঠিকানাবিহীন ঘুরে বেড়াতেই পছন্দ করে। আর, ওই ঝুকি নিতে না চাইলে, অদ্ভুত মেয়েটার চিরকুটটার কথা মেনে নিয়ে, আমার যত দ্রুত সম্ভব আলতেন্তসেতসেগের পথ ধরতে হবে।
র্যাঞ্চে ফিরে যাবার সামান্যতম ইচ্ছাও আমার নেই, নিশ্চিতভাবেই। একথা নিশ্চিত হতে পারার পর আর কোনো ভাবনা চলেনা, আর ওকথা নিশ্চিত করেছে শুধু একটামাত্র চিন্তা- র্যাঞ্চে কিভাবে ফিরি আমি, মার্গো নেই যে!
সুতরাং, আমি চড়ছি। সেদিন সারারাত ঘোড়ায় চড়েছিলাম আমি। পশ্চিমে লেকের সীমানা থেকে পুর্বে নাম না জানা অসংখ্য ট্রেইলে আমি খুজে ফিরেছি এসপেরানজার চাকার চিহ্ন! আমি দক্ষ ট্র্যাকার নই মোটেও, প্রায়ই নিজের কাছে হাস্যকর মনে হলো নিজের প্রচেষ্টাকে, কিন্তু আমি থেমে তো যেতে পারিনা!
আরমোনিয়াও বুঝতে পেরেছে, আমি কাকে খুজছি। ওর কোনো ক্লান্তি নেই। চড়াইয়ের পর চড়াই, মাইলের পর মাইল আমাকে পিঠে নিয়ে দৌড়েছে সে। বাটুখানের স্ত্রীর পুটুলি থেকে বের করে খেয়েছি আমরা দুজনে ভাগাভাগি করে, ঝর্না থেকে খেয়েছি পানি, দুই ঘন্টা পরপর আধঘন্টার বিরতি দিয়েছি আপালুসা মেয়েটাকে। তীব্র শীতে কেপেছি। চাদের আলোয় ভেসে যাওয়া মংগোলিয়ান প্রান্তরে আশাহতের মত ছুটে বেড়িয়েছি। ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, আমি তখন চোখ বড়বড় করে চেয়ে আছি, দুইহাতে কোনো বোধ অবশিষ্ট ছিলো না। আরমোনিয়া বড় বড় শ্বাস ফেলছে, মাঝেমাঝেই দৌড় থামিয়ে হাটছে সে। বিরাট এক পাথরের চাই খুজে পেয়েছি। আমার চারিদিকের দিগন্ত তখন শেষ হয়েছে শ্বেতশুভ্র পাহাড়ে। আরমোনিয়াকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়ে আমি ওর স্যাডল ব্যাগ হাতড়ে এমন কিছু একটা খুজতে লাগলাম, যা গায়ে পেচিয়ে শুয়ে পড়তে পারতাম আমি। কিছু নেই! কিচ্ছু না।
কুকুরকুন্ডলী হয়ে শুয়েছিলাম আমি পাথরের আড়ালে, শীত থেকে বাচতে গায়ের উপর যথেচ্ছভাবে টেনে নিয়েছি বালি, এবং মাটি। বুক পর্যন্ত ঢেকে নিয়ে আমি ওভাবেই শুয়ে রইলাম। প্রথমে মনে হয়েছিলো, ঘুম আসবে না। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, টানা দুইদিন ঘুমাবো আমি তখন! কিন্তু যখন জেগে উঠলাম, সুর্যটা দেখে মনে হলো, তিন ঘন্টার বেশী সময় পার হয়নি। পুরোটা সময় স্বপ্ন দেখেছি, আধোজাগরনের মাঝেই কেটেছে সেই সময়। কুকুরের মত গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়েছি। ধুলোবালিমাখা আমাকে ঐ মুহুর্তে কেউ দেখলে পাগল ঠাউরাতো।
তার দশ মিনিট পর উত্তরের বরফঢাকা পাহাড়সারির দিকে তাকিয়ে বড় একটা ঢোক গিলে নিয়ে, সেদিকেই এগুলাম আমি আর আরমো।
আমার জীবনে অত ঠান্ডা খুব কমই অনুভব করেছি। আজও মনে পড়লে চমকে উঠি, ভয়ানক ওই রুক্ষ প্রান্তরের কঠোরতা মনে করে। ততক্ষণে ট্রেইল বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই, প্রায় জমে যাওয়া বাতাসে হা করে শ্বাস নিচ্ছি, কোনোদিন কোনো মানুষ এপথে গিয়েছে কিনা, আমি তাও জানিনা। কিন্তু এই পথে সাইকেল চালানো যায়! ওটাই আমার চালিকাশক্তি।
দুপুরের পর একটা পাহাড়চুড়া পেরিয়ে সামনে দেখতে পেলাম বিরাট এক পাইনবন। পাইনবন আমি খুব ভয় পাই, ওখানে দিক ঠিক রাখা সম্ভব হয় না। সামান্য কিছু দ্বিধা! এরপরে ঢুকে পড়েছি ওই পাইনবনেও। নিজের সবটুকু ক্ষমতা খরচ করে বনটা পেরিয়ে এলাম। ওপারের কুয়াশাঢাকা তৃণভুমিতে পৌছে একটা ঝর্নার গর্জন কানে এলো। তাকে অনুসরণ করে এগোতে একটাসম শব্দের প্রচন্ডতায় চমকে উঠলাম আমি। ঢেউখেলানো প্রান্তর এড়িয়ে একটা গিরিখাতের কাছে পৌছে গেলাম, তখন মনে হচ্ছিলো শব্দটা আমার নীচ থেকে আসছে! কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে! গিরিখাতের পার ধরে এদিকওদিক সরে বহু চেষ্টা করলাম কোনো পানির ধারা খুজেপেতে! পাইনি। শেষমেশ ধারনা করেছিলাম, ওটা নিশ্চই কোনো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, আরও অনেক, অনেক নীচে কোথাও গিয়ে পতিত হচ্ছে, হয়তো জন্ম দিয়েছে ওখানে কোনো এক ক্ষরস্রোতা, চঞ্চলা পাহাড়ী নদীর। তার কিছুক্ষণ পর অনেক নীচে জনমানুষের চিহ্ন খুজে পেলাম আমি। অতদুর থেকে দেখে মনে হচ্ছে ওটা কোনো পরিত্যাক্ত গ্রাম। ওখানে যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই আমার। যেই গিরিখাত আমার সামনে সোজা নেমে গেছে ভয়ঙ্করদর্শ্ন এক খাদ তৈরী করে, তা থেকে নামার কোনো পথই চোখে পড়ছেনা বহু, বহুদুর পর্যন্ত। আরেকটাবার আরমোনিয়াকে বিশ্রাম দিয়ে, আমি পাইনবন পেরিয়ে ফিরে এলাম আগের সেই পাহাড়টার চুড়ায়। এরপর দক্ষিন-পশ্চিম ধরে ফের উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলা, সাইকেল চলতে পারার মত পথ খুজে বের করে অনুসরন করা, আর চাকার দাগ দেখতে পাবার জন্য তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে থাকা। দক্ষিণের পথ অবিশ্বাস্যরকম আরামদায়ক এক অনুভুতির তৈরী করে। ধুসর-সাদা বিষণ্ণ অঞ্চল ধীরে ধীরে রুপ নিতে শুরু করে সবুজ, প্রাণভুমিতে, পাখির ডাক শুনতে পাওয়া যায়, বাতাসের শব্দ তখন আর অসহনীয় মনে হয় না। কিন্তু আমার উদ্বেগে ভরা মন তার কিছুই দেখতে চায় না।
সেদিন বিকালে আমি সব উদ্যম হারিয়ে ফেললাম। একটা টিলার উপর বসে দক্ষিণের প্রান্তরে চেয়ে কেদে ফেললাম। একেতো অনেক সুন্দর কিছু দেখলে আমার এমন হয়, তার উপরে মনটা বিষণ্ণ। আমার তখন ওখানে, ওভাবেই বসে রইতে মন চাইলো। পেট আর পিঠ প্রায় মিশে গেছে আমার ততক্ষণে, কিন্তু খাবার কথা মনে হলে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে নির্জীব হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে শুয়ে রইলাম। দুই গাল ভেজা।
আরমোনিয়া এলো তখন। আমাকে প্রাণহীন অবস্থায় দেখে চমকে গিয়ে ডাকলো সে। ওর থুতনী ঠেকালো আমার পেটে। ওর দিকে তাকিয়ে আবার কেদে ফেললাম আমি। বিকালের প্রশান্তিমাখা বাতাস, আর আপালুসা ঘোড়াটা আমাকে ফের উঠিয়ে বসালো। আরমোনিয়া আমাকে নিয়ে আরেকবার ছুটলো। কেদেকেটে মাথাটা পরিষ্কার হয়েছে আমার, তখন বহু ধরনের কথা খেলে বেড়াচ্ছে মাথায়।
আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে কখন যে কোনপথে চলে এলাম আমি! হঠাত নিজেকে আবিস্কার করলাম বিরাট এক টিলার মাথায়, চারিদিকে বহুদুর দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য প্রায় লাল করে রেখেছে আকাশটা। আরও একবার লেক খুভশগুল দেখতে পেলাম আমি, সূর্য টা ঝুলে রয়েছে তার বিস্তৃত জলরাশির উপর। যেখান থেকে গতকাল শূরু করেছিলাম, সেখানেই ফিরে এসেছি আমি। পশ্চিমের ট্রেইলগুলোতে মার্গারিতাকে খুজে পাইনি। ফের উত্তরের টার্টগামী পথের দিকে চলেছি আমি এখন, তাই হতাশা বেড়ে চলেছে। অমন এক সময়ে দুইটা হার্টবিট মিস হয়ে গেলো আমার। কাদায় মোড়া পথ। কাদার সৃস্টিকারক ছোট একটা পাহাড়ী গোড়ালী জলের খাল। আমার ট্রেইলটাকে দুইভাগ করে দিয়ে চলে গেছে সে ঢাল বেয়ে। ঘোড়ার খুরের আঘাত নেই কোনো, অপ্রচলিত এই পথে একটা মাত্র চাকার দাগ পড়ে আছে, যেখানে ছুটে গিয়ে আমি ধরেই নিলাম সাইকেলের চাকা পড়ে তৈরী। ভালো করে দেখলাম আমি চিহ্নটা। যদিও টায়ার অনেক পুরনো, এবং প্রায় ক্ষয়ে গেছে তার গ্রিপ, তবুও আমি প্যাটার্ন দেখে সাইকেলের ফ্রন্ট-ফেসিং ডায়রেকশন বুঝে নিতে পারলাম। উত্তরে গিয়েছে ওটা, আমি যেদিকে চলেছি। ও খুব সম্ভবত এখনো ছুটছে, এবং সামনে চড়াই। ও ছুটছে। মার্গারিতা। আমাকেও ছুটতে হবে। টার্টমুখী ছুটতে হবে আমাকে। লেকের পার ধরে।
‘গিডি আপ, আরমো!’ আপালুসা মেয়েটাকে নিয়ে তীব্র গতিতে উত্তরমুখী ছুটলাম আমি। মার্গারিতা সাইকেল চালাতে পারতো, অমন একটা ট্রেইল ধরে যাচ্ছি, যেটা অনেকটা হাইওয়ের সমান্তরালে গিয়েছে। হাইওয়ে! হঠাত হাসি এলো বাটুখানের কথাটা মনে পড়ায়! পাথর, মাটি আর ইটের টুকরো মিলে একাকার হয়ে আছে ওখানে। বৃষ্টি এলে কি অবস্থা হয় কে জানে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম সেপথ। কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই। বড় বেশী নীরব চারিদিক। ওটাই হাইওয়ে।
একবার আরমোর স্যাডলব্যাগ থেকে বের করে একটা বাজ খেয়ে নিলাম। খেতে হবে আমাকে। সেবার হাতে শক্ত কি যেনো একটা লাগায় বের করে আনলাম ওটা! আমার শখের অডিও প্লেয়ার! চার্জ দিতে পারলে, আর খুব বেশী মন চাইলে, ওটায় উচ্চস্বরে পুরনো দিনের গান শুনি আমি। খানিকটা চার্জ অবশিষ্ট আছে ওতে। আজ রাতটাও খুব সম্ভবত পথ চলতে হবে আমার। হঠাতই মনটা ভালো হয়ে গেলো, এখন আর কোনো ভয়ই লাগছেনা! কোন কোন গান শুনবো, তা মনে মনে ভেবে বের করতে লাগলাম। হ্যা, বন্দে মায়া লাগাইছে! দুনিয়ার যদি শুধুমাত্র একটা গান প্রয়োজন হতো, তাহলে ওটাই.....
একটা পাহাড়ের ওপাশে হঠাত করেই হারিয়ে গেলো সূর্যটা। এর কিছুক্ষন পরেই ঘনালো অন্ধকার। সন্ধ্যাতারার আলোয় একটা জলা দেখতে পেয়ে আরমোনিয়াকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য ছেড়ে দিলাম কিছুক্ষনের জন্য। ও ঘাস খেলো। পানি খেলো। আর আমি খেলাম আরও একটা বাজ। কম্পাস, আর মানচিত্রটা দেখে নিয়ে আমি আবারও নিশ্চিত হয়ে নিলাম আমার পথ সম্পর্কে। টার্ট ওখান থেকে আরও চল্লিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। তখনই, বলা নেই কওয়া নেই, বেশ জোরে বাতাস বইতে লাগলো। চামড়া কেটে বসে যাওয়ার মত শীতল সেই বাতাস। হ্যাটটা খুলে রেখেছিলাম, আমার লম্বা, পাতলা চুলগুলো এলোমেলো নাকচোখের উপর দিয়ে উড়তে শুরু করলো। আতংকের সাথে উপরে তাকালাম! কোনো মেঘের ছায়া দেখতে পেলামনা যদিও, কিন্তু দিগন্তে আকাশটা যেনো একটু বেশী কালো দেখাচ্ছে না? ষোলকলা পুর্ন করতে আজ রাতে ঝড়বৃষ্টি শুরু নাহলেই হয়! বাতাস চিরে সাত কিলোমিটার পথ সামনে যেয়ে আরেকটা জলা দেখতে পেয়ে থেমে দাড়ালাম। খেয়াল হয়েছে, তিনদিন গোসল করিনা আমি, এবং খুব ঘুম পাচ্ছে। ঝিমঝিম ভাবটা কাটাতে একটা ঝাকুনিমত দরকার। আমার আশেপাশের বহু, বহু দুরে কেউ থাকার সামান্যতম সম্ভাবনা নেই জানা সত্বেও, চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে, শরীরের সব কাপড় খুলে ঝাপিয়ে পড়লাম ওখানে, একটা ঝাকুনির আশায়। যতটা ঠান্ডা লাগবে ভেবেছিলাম, অত অনুভুত হলোনা। তবুও মিনিট পাচেকের মাঝেই দাত ঠুকতে ঠুকতে নিজের জামা দিয়ে শরীর মুছে, তিনস্তরের কাপড়গুলো সব পরে নিলাম। জুতোর শেষ ফিতেটা বাধা হয়ে যেতেই সে কি এক প্রশান্তি! এখন আমি সারারাত ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে পারবো। খুজে ফিরতে পারবো মার্গারিতার ট্রেইল।
বিরতির পর চলা শুরু করলাম, আর আমার অডিও প্লেয়ারটায় খুব প্রিয় কিছু গানের তালিকা বানিয়ে ছেড়ে দিলাম। চাঁদ উঠে গিয়েছিলো ততক্ষণে। তেরোদিন বয়েসী ভরাযৌবনা সে! তখনো এলোমেলো বাতাস বইছে, আমার দুপাশে সবুজ প্রান্তর রাতের আলো-আধারিতে ধুসর,তবু বহুদুর চলে যায় দৃষ্টি। অমনই এক উদাস দৃস্টিপথে হঠাত করে উদয় হলো খুব সম্ভবত একটা মরীচিকা। মরীচিকা ছাড়া আর কি বলতে পারতাম ওটাকে? বড় একটা পাথর দেখতে পাচ্ছি, আমার পথ থেকে একশ মিটার মত পূর্বের এক ঢালে। দক্ষিন আকাশে দ্বিতীয় সিকির পুর্ন চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পাথরের চাইটার সামনে, ঘাসের উপর বসে থাকা মিষ্টি দেখতে একটা মানবীর অবয়ব। তার পাশে ফেলে রাখা একটা দুইচাকার বাহন, ওটা যেনো আমার কতদিনের চেনা! ছোট্ট একটা তাবু খাটিয়েছে ওই ট্রেকার, তাবুর একপাশে খাড়া গিরিখাত। মেয়েলী ছায়াটা ব্যাস্তহাতে কিছু একটা ঘাটছে, নীচের দিকে তাকিয়ে। কাধ পর্যন্ত ছাটা এলোমেলো চুলগুলো তার, কি মনে করে যেনো আচমকা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। চেয়ে দেখলো আমাকে। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো তার মায়াবী মুখাবয়ব, অতদুর থেকেও পরিষ্কার বোঝা গেলো সে মুখে হাসি ফুটেছে। ঠিক যেনো…...
আচমকা মোহ কেটে গেলো আমার। ভীষণ এক আনন্দে দুলে উঠলো মনটা! শরীরে সামান্যতম শক্তিও যেনো আর অবশিষ্ট নেই, ঘোড়াটার উপর প্রায় উপুড় হয়ে পড়লাম আমি। অনেক কথা বলার আছে তখন আমার, কিন্তু কিছু বলতে ইচ্ছা হচ্ছেনা।
কতক্ষন পরে আরমোনিয়ার লাগাম ছেড়েছিলাম, অথবা আদৌ আমি ছেড়েছিলাম, নাকি ও ওর মালকিনকে চিনতে পেরে সাগ্রহে নিজেই এগিয়ে গেলো সেদিকে, তা আমি জানিনা! মার্গারিতা উঠে দাড়িয়েছিলো, স্বভাবসুলভ ভংগিতে দেহের পিছনে দুইহাত বেধে সে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি ধীরে ধীরে ওর সামনে গিয়ে দাড়ালাম। আলগোছে আরমোর পিঠ থেকে নেমে গিয়ে আমার তাবুর সামনে, মার্গো একটু আগে যেখানে বসেছিলো, ওখানে বসে পড়লাম। আরমোনিয়ার বাদামী কেশরের ভেতরে অদৃশ্য হলো মার্গোর মাথাটা। কিযেনো বলছে ফিসফিস করে। ঘোড়াটা আদুরে ডাক ছাড়লো একটা। আমি নীরবে দেখতে লাগলাম দুজনের কান্ড। খেয়াল হলো, তখনো আমার অডিও প্লেয়ারটা চলছে। বন্ধ করলাম ওটা। প্রথমে কথা বললো মার্গারিতাই।
‘হোলা সিনর! তুমি কেমন আছো?’
ওর দিকে চেয়ে রইলাম আমি কেবল। জানিনা সেই দৃষ্টিতে কি ছিলো। আমি বলার কিছু খুজে পাইনি।
দাত বের করে নিঃশব্দে হাসলো মার্গারিতা। যেনো বহুযুগ পরে দেখলাম আমি ওর সেই মায়ায় ভরা, স্বতস্ফুর্ত হাসি। তিনদিন ধরে জমতে থাকা সব ক্ষোভ-অভিমান-দুশ্চিন্তার স্রোত-আর ক্লান্তি, সব যেনো একসাথে চুড়ান্ত একটা আঘাত করলো আমাকে, এরপরে চিরতরে ছেড়ে চলে গেলো। সটান শুয়ে পড়লাম আমি ঘাসের উপর। শতকোটি তারার ঠান্ডা আলো গায়ে মেখে আমি ওদের পানেই চেয়ে রইলাম। নিঝুম রাত, মাতাল হাওয়ার টানা শোঁ শোঁ, আর আমাদের নীরবতার বিচ্ছিন্ন আওয়াজ অখন্ড হয়ে রইলো কিছুমুহুর্ত।
‘বাহ, তোমার কাছে তো অনেক খাবার আছে মনে হচ্ছে! আমি একটা বাজ খাই?’
প্রশ্নের ধরনে ওর দিকে ফিরে না তাকিয়ে পারলাম না। ঘোড়ায় চড়তে চড়তে খাবো বলে দুইটা বাজ বের করে আমার কোটের পকেটে রেখেছিলাম। কোন এক ফাকে মাটিতে পড়ে গেছে, ওগুলো কুড়িয়ে পেয়ে মার্গারিতা ওই কথা জিগ্যেস করেছে। ওর চেহারার দিকে নজর গেলো তখন। সেজেগুজে বের হয়েছিলো তিন দিন আগে। নতুন জামা টা ধুলোবালিতে মলিন। চুলের বেনীদুটো কিজানি কখন হারিয়ে গেছে, এখন ওগুলো কাধের উপর এলোমেলো ছড়িয়ে আছে! ক্লান্ত, অবসন্ন চেহারা, দুই চোখের নীচে কালসিটে পড়ে গেছে। নীচের ঠোটে লম্বা, শুকনো একটা কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। তবুও সবসময় হাসছে ওর মুখটা।
উঠে গিয়ে আরমোর স্যাডল ব্যাগ থেকে বাটুখানের স্ত্রীর দেয়া পুটুলিটা বের করে আনলাম। কোনো কথা না বলে ওর হাতে তুলে দিলাম ওটা।
‘আমার ওতেই চলতো’ বললো বটে, কিন্তু একবার বসে খাওয়া শুরু করতেই গোগ্রাসে গিলতে লাগলো ও। খাওয়ার ধরনেই বুঝলাম, আধপেটা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
‘কেনো, মার্গো?’ এই প্রথম কথা বললাম আমি। শুধু এতটুকুই।
‘চিৎকার করেছিলে, নাকি ঠান্ডা লাগিয়েছো? তোমার গলা ভেঙে গেছে। কোলাব্যাঙের মত শোনাচ্ছে কন্ঠ’ কথা বলার সময় খাওয়া থামিয়ে দিলো ও। মার্গারিতা খাওয়ার সময় মুখ বন্ধ করে চিবায়। দুই ঠোট একদম একসাথে সেটে থাকে,অনেকটা খরগোসের মত, দেখতে বেশ অদ্ভুত দৃশ্যটা। নিজের বক্তব্য জানিয়ে দিয়ে ফের ব্যাস্ত হয়ে গেলো টুকটুক করে চিবুতে।
'কেনো?’ একঘেয়ে সুরে একই প্রশ্ন আমার।
‘আমার অনেক ঘুম পেয়েছে সিনর, বিশ্বাস করো! আজ রাতে একটূ ঘুমাতে দাও আমাকে, পর ফেভর! ভোর হবার সাথে সাথে ডেকে দিও, আমি লাফ দিয়ে উঠে যাবো!’
'কেনো মার্গো?' আমি যেনো ঘোরের মাঝে কথা বলছি!
তখন নিজের মুখটা কপট রাগে বাকাতে গিয়ে সে চোখদুটো ছোট করে, ঠোট চেপে ধরে এমনভাবে তাকালো, যে আমি দাত বের করে হেসে ফেললাম!
‘খাও। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো’
‘গ্রাসিয়াস!’
আর বেশি খেলোনা ও এরপরে। আমাকে সাধলো। মানা করে দিলাম। খেতে খেতেই ঢুলতে লাগলো ও। দুইচোখ টকটকে লাল, আধবোঝা। ওকে আর কিচ্ছু জিগ্যেস করলাম না। খাওয়া শেষে সোজা তাবুতে ঢুকলো ও, এমনকি আরমোনিয়ার কথাও ওর মনে রইলোনা। আমি এসপেরানজাকে ঘেটেঘুটে দেখছিলাম। এক মিনিটও হয়নি, ফিরে এসে তাবুর ভিতরে উকি দিয়ে দেখি, অঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকে শূধু চোখ আর কপালটা বেরিয়ে আছে! মৃদু একটা হাসি খেলে গেলো আমার মুখে। ঢাকার পুরনো এলিফ্যান্ট রোড থেকে শখ করে কেনা আমার তাবুটার এরচেয়ে সদ্ব্যাবহার সম্ভবত আগে কখনো হয়নি। ওটা ছিলো দুইজন মানুষের তাবু। আমি ঘুমোতাম, আর এসপেরানজাকেও যাতে সাথে রাখতে পারতাম, তাই দরকারের চেয়ে বড় ওই তাবুটা বহন করতাম আমি। কিন্তু মার্গারিতা ঘুমাচ্ছে ওখানে। সেই হিসেব তাই অর্থহীন। যতবড় তাবুই হোক, আমি ওখানে ঘুমাতে পারিনা! ইতিমধ্যে বাতাস বেশ শীতল হয়ে উঠেছে! মেয়েটার গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আমি?
আমি আরমোনিয়ার কাছে গেলাম। বেশ লম্বা একটা রাত পার করতে হবে আমাকে। তাই সময় নিয়ে ওর জিন খুলে নিলাম। দলাইমলাই করে খুজেপেতে একটা টিলার আড়ালে, পাথরের খাজে এমন একটা জায়গা পেয়ে গেলাম, যেখানে ঘোড়াটা ঠান্ডা বাতাসের তোড় থেকে আড়াল পাবে। মার্গো যেভাবে আদর করে, তেমনিভাবে ওর কেশরের ভেতর নিজের মাথা গলিয়ে সুড়সুড়ি দিলাম আপালুসা মেয়েটাকে। এরপরে ফিরে এলাম এসপেরানজার কাছে। পুরো বাইকটা, এমনকি তার স্পোকগুলো পর্যন্ত চকচক করছে! খুবই যত্ন করেছে মার্গো ওটার, বুঝতে পারলাম সহজেই। আর আমি আরমোনিয়াকে কি খাটানোই না খাটিয়েছি আমি টানা কটা দিন, ভেবে মরমে মরে গেলাম যেনো!
তাবুটা যেখানে টাঙিয়েছে মার্গারিতা, ওখান থেকে কিছুটা উত্তরে, একটা টিলা। আশেপাশের সবচেয়ে উচু। আমি ওখানে চলে গেলাম। যাবার আগে এসপেরানজার হ্যান্ডেলবারের ওপর অযত্নে ফেলে রাখা মার্গারিতার শালটা নিয়ে গেলাম। ওটা মাফলারের মত গলায়, মাথায় পেচিয়ে নিলাম। অডিও প্লেয়ারটায় আবার শব্দ করে গান ছাড়লাম। এরপরে সবচেয়ে উচু সেই জায়গায় গিয়ে ঢালে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লাম। মার্গারিতার প্রিয় শালটা থেকে লাইলাক ফুলের সুবাস পাওয়া যায়। আমি জানিনা ঘটনাটা কিভাবে ঘটে, কিন্তু প্রতিবারই মুগ্ধ হই আমি তাতে। কিজানি, হয়তো ব্যাপারটা অনধিকার চর্চাও হতে পারে। কিন্তু, আমার মনে হয়, আমি মার্গারিতার কাছে শালটা ব্যাবহার করার অনুমতি চাইলে ও নিশ্চয় মানা করতোনা।
রাতটা জেকে বসতে শূরু করেছে, চাঁদটা তাই ক্রমাগত উঠে আসছে আকাশের আরও, আরও উপরে। মেঘের সাথে যখন লুকোচুরি খেলে সে, কি এ অদ্ভুত সুন্দর লাগে আমার ব্যাপারটা! মহাকাশের মত বিশাল হৃদয়ে পাতালে শুয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আমি ভাবতে রইলাম আকাশ-পাতাল।