জুলাই '২৩
লংকাঃ আসামের গহীন অরন্যরাজী পেরিয়ে আচমকা এক শহরতলী!
আসামের হোজাই জেলার প্রাণচঞ্চল, অথচ ছোট্ট এক শহর লংকা। জংগলে ঢাকা এই জনপদের উত্তরে ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিগঠিত উর্বর সমতলভুমি, দক্ষিণে কিছুদুর গেলেই পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সারি।
গত শরতের এক উত্তপ্ত দিনে প্রথমবারের মত আমি লংকা গিয়েছিলাম।দক্ষিন আসামের ঘন বনভুমি, আর ওখানকার এবড়োথেবড়ো মাটির পথ আমি অবশ্য চাইলেই এড়াতে পারতাম, কিন্তু অবচেতন মনে আমি বেশ করে দেখতেও চাইছিলাম আসামিজ হাতিদের নিবাস। কপলি নদীর দক্ষিন তটরেখা ধরে এগিয়েছে ভীষণ সরু, আমার জীবনে দেখা সবচে ঘন জংগলের মাঝ দিয়ে তৈরি এক পথ। কিজানি কবে শেষ ঐ পথে পিচ ঢালা হয়েছিলো! থ্রি কিলো নামের এক অদ্ভুত বাজার থেকে কয়েকটা কলা, আর এক কাপ বিশ্রী রকম কড়া লাল চা পান করে একটা কয়লা গুদামের ভিতর দিয়ে কাদামাখা মাটির পথ অতিক্রম করে কিছুটা দূর যেয়ে আমি পেয়ে গিয়েছিলাম সেই পথের হদিস। একটা বাশ ফেলে আটকে রাখা, পাশের ছাউনিতে ইউনিফর্ম পরা একজন গার্ড বসে আছে। সেতো নাছোড়বান্দা, আমাকে কিছুতেই যেতে দেবেনা ঐ নির্জন পথে একা। কিভাবে যেনো তার মন মানিয়ে নিলাম আমি। আমার নাম পরিচয় টুকে রেখে, কোথাও একবার ও না থেমে ১৭ কিলোমিটারের ঐ বনটা পাড়ি দেয়ার উপদেশ দিয়ে ছাড়লো।
নিজেকে কোন এক হনু বলে মনে হলো ওই পথে সাইকেল চালাতে চালাতে। দুইপাশে এতই ঘন বন, আর গাছগুলো এত লম্বা, ভরদুপুরে সেখানে সন্ধ্যার আধার। অসংখ্য, আই মিন, অবিশ্বাস্য সংখ্যার কীটপতংগ একসাথে গর্জন করছিলো পুরোটা সময়। ঠিক যেনো কোনো সিনেমার দৃশ্য! শাআআআআআ করে একটানা শিস, চিৎকার, অথবা কান্নার মত শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে, আর তার মাঝেই কোথাও খট করে কোনো ডাল ভাঙার শব্দ পাওয়া যায়, পাওয়া যায় খুটখুট পদক্ষেপের আভাস, ওগুলো বানর, হাতী হতেই পারেনা!
আমার অ্যাকশন ক্যামেরাটা চালু করতে থামলাম এক জায়গায়। সেখানেই, আমার থেকে দুই ফুট দুরত্বে দেখা গেলো তিন চার গাদা হাতীর গোবর। হ্যা, হাতীর গোবর ই ছিলো ওগুলো, আর একদম সদ্য, তরতাজা। হতচকিত হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম, বুকের মাঝে হাতুড়ির মত পিটাচ্ছে হৃদপিণ্ড! কিন্তু তবু আমি অ্যাকশন ক্যামেরা চালু করলাম। কিজানি, যদি হাতীর ধাওয়া খাওয়া রেকর্ড হয়ে যায়? বেচে গেলে সেটা খুব স্মরণীয় হবে। সর্বশক্তিতে প্যাডেল দিতে থাকলাম। ভাগ্য আপাতদৃস্টিতে খারাপ হলেও, আদতে সুপ্রসন্ন ছিলো, ওখানে পাহাড়ি উচুনিচু পথ। সা করে ডাউনহিলগুলো পার হয়ে গেলাম, আর আপহিলগুলোতে যখন আট কিলোমিটার পার আওয়ারে চড়তে চড়তে ভীষণ ঘেমেনেয়ে গেলাম, মানসচক্ষে হাতী দেখতে লাগলাম শুধু। গাছের ডাল ভাঙার শব্দ তো আছেই! ওদের দৌড়ের গতি যেনো কত? ৪০? আমার সাইকেল ডাউনহিলে ৫০ কিলোতে ছুটতে পারে! প্লিজ, আল্লাহ, একটা বড় ডাউনহিল দরকার আমার!
কিছুক্ষন বাদেই বিরাট এক ডাউনহিল পেয়ে গেলাম। ফিরে পেলাম সকল আত্মবিশ্বাস। সা সা করে নামতে লাগলাম, নিজেকে কল্পনা করলাম কোনো অলিম্পিক মাউন্টেইন বাইকার হিসেবে। ৪৫ কিলোমিটার পার আওয়ার মনের মাঝে হাতীর ভয় নিয়ে সোজা কপলি নদীতে নেমে যাওয়া, সে ছিলো এক ভীষণ থ্রিলিং ব্যাপার।
কপলী নদীর বরফের মত ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নতুন জীবন পেলাম যেনো। ঘণ্টাখানেকের মত দাপাদাপি করলাম। সাংগু আর মাতামুহুরী চোখে দেখলেও, ঐ প্রথম আমার কোনো পাহাড়ি নদীতে নামা। অ্যাকশন ক্যামেরার চেস্ট মাউন্টটা ভুলে ফেলে গিয়েছিলাম নদীর পারেই। ৩ কিলোমিটার সামনে গিয়ে সেকথা মনে হতেই পাগলের মত ফিরে এলাম! দুইজন জেলে, মাছ ধরার বিরতিতে গোসল করে খেয়েদেয়ে নিচ্ছিলো, তারা হাক ছাড়লো আমাকে দেখেই! " আরে বা ভাইয়া, আপ তো আ গায়ে! ইধার হ্যায় আপকা চিজ!" তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আমি লংকামুখী যাত্রা শুরু করলাম।
আরও প্রায় এক ঘন্টা পর ভ্যাপসা গরমের ওই বনভুমি থেকে খোলা আকাশের নীচে বেরিয়ে এলাম। বের হবার পর অবশ্য মনে হচ্ছিলো, ঐ পথ যদি শেষ না হতো! যাই হোক, ভীষণ ক্ষুধার্ত, এবং পিপাসার্ত অবস্থায় বহুখোজার পর একটা ছোট্ট টং দোকান খুজে পেয়ে গেলাম সেখানে। সেই দোকান এক অভিজ্ঞতাই বটে। কিজানি কবে ভুলে যাই, তাই আমি ওটা অবশ্যই লিখে রাখতে চাই।
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল হাইওয়ে ২০ অন্যান্য সব হাইওয়ে থেকে আলাদা। আসামের দক্ষিনের পাহাড়ি লোকালয়গুলোর সাথে পুরো ভারতের প্রধানতম যোগাযোগ। প্রচুর ট্রাক চলে, আর জংলী, প্রচুর বৃস্টিপাতের ঐ এলাকায় সম্ভবত বহুবছর কোনো মেরামত হয়না।ছালচামড়া উঠে যাওয়া পথটা ধুলোর রাজ্য। ধুলো খেতে খেতে প্রায় বেহুশ হয়ে আমি হাতের ডানে একটা টং দোকান দেখে ঢুকে পড়লাম। দোকানে দুজন মহিলা বসে আছেন,একজনের বয়স ২৫ মত, অপরজন ত্রিশের আশেপাশে। তাদের দেখে বোঝা যায় বেশ কর্মঠ। আমি দোকানের সামনে থেকে উকিঝুকি দিয়ে দেখতে লাগলাম কি খাওয়া যায়। চেহারা আর দেখার মত ছিলোনা, ঘাম, ধুলো, আর দুর্বলতায়। দোকানে শুধু বিস্কূট আর বনরুটি। ওসব এখন গলা দিয়ে নামবেনা জানি। কিন্তু কিছুতো খেতেই হবে। নিজ থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট ছিড়ে নিয়ে বাইরের একটা বেঞ্চিতে বসে কোনোমতে গিলতে লাগলাম।
আমার হযবরল অবস্থা দেখে অপেক্ষাকৃত বেশী বয়েসীজন হিন্দীতে জিগ্যেস করলেন আমি কোত্থেকে এসেছি। শূধু বাংলাদেশ শব্দটা উচ্চারন করলাম। খুব আশ্চর্যের বিষয়, আমার উত্তর শুনে তিনি অবাক হলেন না। অবস্থা বুঝে নিয়ে স্বল্পভাষী সেই মহিলা বাংলায় বললেন, আমি চাইলে পরোটা বানিয়ে দিতে পারেন, কিছু সবজি তৈরী করা আছে, তা দিয়ে খেতে পারবো। রাজী হয়ে বসে পড়লাম। ব্যাগ থেকে গামছা বের করে গলায় পেচিয়ে নিলাম, জামার ভিতরের ঘাম মুছতে লাগলাম। এক ফোটা বাতাস ও ছিলোনা তখন। আমাকে ডেকে ভিতরে বসতে বললেন তিনি, তখন বুঝলাম, ওটা আসলে তাদের বাড়ি, সামনের বারান্দাটাই কেবল দোকান হিসেবে চলে। দুজনে ফিসফাস করে আসামিজ ভাষায় কি যেনো বলাবলি করছিলেন, আর বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ঘাম মোছার জন্য একটা কাপড় ও এনে দিলেন।
গরমে ঘামতে ঘামতে যখন গরম পরোটা খাচ্ছিলাম, আমার পানি শেষ হয়ে গেলো। দরজার পাশে রাখা কলসিটা থেকে পানি ঢালতে যাবো, মহিলা হা হা করে মানা করে বললেন, আমি বিদেশী, ঐ পানি পেটে সইবেনা। তিনি আমাকে বোতলজাত পানি এগিয়ে দিলেন। আমি নিতে চাইলাম না দেখে বললেন, দাম দিতে হবেনা, একজন পথিককে পানি খাওয়াচ্ছেন তিনি কেবল। গ্রামের ঐ নিতান্ত সাধারন মহিলাটির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, আর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমি যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু প্রকাশ করিনি। তার ওই কথাটা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি, সাইকেলচালক ঐ ছেলেটা খুব হিসেব করে পয়সা খরচ করে, আর তার মনটা ঠিক অতবড়ই ছিলো, যতটা হলে নিজের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনটা প্রাধান্য দেয়া যায়। বলাই বাহুল্য, বিস্কুট, পরোটা, ভাজি কিংবা পানি, অথবা কয়েক মিনিটের সেই অসাধারন ,মুহুর্তের জন্যে আমার কাছ থেকে কোনো টাকাই নেননি তিনি। এই না নেবার কায়দাটাও অদ্ভুত। আমার খাওয়া শেষ হবার আগেই তার ছোটবোনকে বললেন তিনি ছাগল, বা গরু কিছু একটা মাঠ থেকে আনতে যাচ্ছেন, আমি যা যা খাই, তার দাম তিনি দিয়ে দেবেন। একথা বলেই তিনি চলে যান, আর তার ছোটবোন আমার সাথে একদম কোনো কথাই বলতে রাজী নয়। শূধু একটা কথাই বললো, আমি জোর করে টাকা রাখতে চাইলে “ মে নেহি লে সাকতা”
জীবনে আর কোনোদিন তাদের সাথে আমার দেখা হবেনা। তাতে কি। আমিতো তাদের মনে রাখবো আজীবন।
সারাটা দুপুর কি যে কস্ট করে পথ চললাম। কিছুক্ষন পরপরই ট্রাকের দল আসে, একবারে ৩০-৪০ টা। মাঝেমাঝে যখন আপহিলে আসে ওরা, সে এক যন্ত্রনা! আমার চেয়ে কম গতি ট্রাকের, কানের উপর ঘো ঘো করতে করতে ধুলোর মেঘ ছিটায়, আর পার করেও যায়না। ডড়াইভার হেলপার হাত বের করে নাড়ে, যেনো সহমর্মিতা দেখাচ্ছে! ধুর। আমার জীবন কালিময় বানিয়ে দিয়ে তারা চলে যায়, তখন ভাঙাচোরা, জঘন্য সেই পথ ধরে আমি খর রোদে পুড়ে কয়লা হচ্ছি। দুপুরে এক দোকানে কলা দেখতে পেয়ে থামলাম। খুবই রেয়ার জিনিস এটা। দোকানের মহিলা কলা খুচরা বিক্রি করেনা। আমি বললাম, কি হিসাবে বিক্রি হয়? সে বললো কমপক্ষে এক ডজন। আমি মুচকি হেসে মনে মনে বলি, আরে, তোমার কি কোনো ধারনা আছে, আমি এক ডজন দুই মিনিটে সাবাড় করবো? এই নাকি পাইকারী? ১৫ টা কলা চেয়ে নিলাম। দোকানে উপস্থিত সবার চোখ বড় বড় করে দিয়ে একের পর এক কলার খোসা ছুড়তে লাগলাম আমি ট্র্যাশে। লুংগী কাছা দিয়ে বসে থাকা এক লোক সেভেন আপ দিয়ে গলা ভিজাচ্ছিলো, চলে আসার আগে সে আমাকে এক গ্লাস পান করে যেতে বললো। এক গ্লাস নিমেষেই শেষ দেখে আরেক গ্লাস দিলো।
শেষবিকেলে, রোদ পড়ে গেলে বেশ উদাস হয়ে গেলাম। আর মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে লংকা, তখন একটা জনপদে থামলাম, নামটা আর মনে পড়েনা এখন। যদিও ম্যাপ খুজলে পাবো। কারন ওখানে একটা নদী ছিলো। কপলিই, কিন্তু কপলি বলে আর চেনা যায়না। টলটলে নীলচে পানি এখানে এসে খয়েরী হয়ে গেছে। এক পানিপুরিওয়ালার কাছে পানিপুরি খেয়ে জিগ্যেস করলাম নদীতে নামার জায়গা আছে কোথায়। বাংলা বলতে পারে এমন এক ছোট্ট ছেলেকে ডেকে সে বুঝিয়ে দিলো তাকে, আমি কি চাই। ছেলেটা একটা সাইকেলে করে আমাকে নদীর পার দেখিয়ে দিয়ে গেলো। লোকের বাড়িঘরের উঠোন পেরিয়ে যাচ্ছিলাম, আর হা করে দেখছিলো সবাই। যেখানে নদীতে ডুবালাম, তার মিটার বিশেক বায়ে হাইওয়ের উচু ব্রীজ। আমাকে যেই ছেলেটা নদীতে পৌছে দিয়ে গেছে, কিছুক্ষন পর দেখি সে তার দলবল নিয়ে হাজির ঐ ব্রীজের উপর। ওখানে থেকেই চিৎকার করে সে আমাকে জিগ্যেস করলো “ ভাই, তুমি বাংলাদেশেরতে সাইকেল চালায়া আইছোনা, কও?” ওর বন্ধুদের সাথে বাজি লেগেছে। জিতিয়ে দিলাম ওকে। বাজারে ফিরে এসে দেখি আইসক্রিম খাচ্ছে ওরা। নিশ্চই বাজির দরের।
লংকার দশ কিলোমিটার আগে একজন সাইকেলে করে চরে বেড়ানো ফেরীওয়ালা দৃস্টি আকর্ষণ করলো আমার। বাংলাদেশের পতাকাখচিত জামা পরে থাকায় সে আমাকে বাংলাদেশি বলে চিনে নিলো। তাই বাংলায় হাক ছাড়লো, কোঠায় যাচ্ছি। সেও নাকি লংকা যাবে। বাহ। যদিও প্রথমে একটূ অখুশী হলাম, তার ধীরগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে আমার লংকা পৌছতে। কিন্তু মুখের উপর মানাই বা করি কিভাবে। ১০ কিলমিটার পার আওয়ারে শুনশান এক গাছেঢাকা রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম আমরা একসাথে। বয়েসে যুবক সে। আমার চেয়ে বছর তিন চারেক বড় হয়ে হয়তো। কিন্তু চেহারায় দারিদ্র্যের ছাপ প্রবল। চেহারাটাও কেমন যে মায়ামায়া! হঠাত তাকিয়ে একবার দেখে বেশ একটা ধাক্কা খেলাম। সমাজের আরেকটু উপরের পর্যায়ে বসবাস করতে পারলে, এই লোককে রাজকীয় বলবেনা, এমন সাধ্য কার ছিলো! কিন্তু খানিক বাদেই জানতে পারলাম, সে একজন রাজাই। তার একটা রাণী, আর রাজকন্যা আছে, কলকাতায়। তাদের মাথার মুকুট অক্ষুন্ন রাখতেই হাজার মাইল দুরের এই জনপদে গাধার খাটুনি খাটে সে সকাল থেকে সন্ধ্যা, প্রতিদিন। গড়ে ৫০-৬০ কিলোমিটার সাইকেল চালায় সে প্রতিদিন। ঐ উচুনিচু টিলাটক্কর ভরা পথে, গ্রামে গ্রামে যেয়ে গৃহস্থলীর তৈজসপত্র বিক্রি করে।
সারজুল ইসলাম, কলকাতার বাসিন্দা ঐ যুবকটির কথা ভীষণ মনে গেথে গিয়েছিলো আমার, তার অমায়িক ব্যাবহার, কিংবা অতুলনীয় হাসি হয়তো নয়, কিন্তু ভীষণ আর্থিক দৈন্যতার মাঝেও অমন সুখের জীবনের গল্প করা, তার স্ত্রী এবং কন্যার কথা সে অনেক গর্বের সাথে শুনিয়েছিলো আমাকে। একজন মানুষ পরিপুর্ণ সুখী হবার জন্য কত টাকা প্রয়োজন তা ওই লোকটার শরীরের জামা, এবং তার প্রাণজুড়ানো হাসিটা যদি কেউ কোনোদিন দেখে, সে জানতে পারবে।
একসাথে লংকা পৌছুলাম দুজনে। কথায় কথায় আমি বলেছিলাম, আমার কম খরচের হোটেল দরকার! সে বললো, আমি চাইলে তার মেসে থাকতে পারি। কিন্তু মেসে কোনো ফ্যান নেই, এই কথাও মনে করিয়ে দিলো সে। কস্ট যদি হয়ই, একটা হোটেল বের করে দেবে। প্রথমেই একটা হোটেলে নিয়ে গিয়ে সে আমাকে ছোলাবুট, পিয়াজি, আর চা খাওয়ালো। যদিও প্রায় কিছুই খেতে পারলাম না। দোকানভর্তি সব বাঙালী লোকেদের আড্ডা। আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে স্টারড্রম দিয়ে দিলো তারা। ভীষণ ক্লান্ত থাকায়, সবার কথা মনে করতে পারছিনা এখন আর, কিন্তু বহু ধরনের কথা যে হয়েছিলো তাদের সাথে, সেটা নিশ্চিত। সন্ধ্যার পর সে আমাকে তার মেসে নিয়ে গেলো। সারজুল ভাইয়ের মেস দেখে আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে বলার দরকার, তাই বলেছে, আসলে ওখানে অতিরিক্ত একটা মানুষের থাকার কোনো সাধ্য নেই। তাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে আমি সেদিন তৃতীয়বার গোসল করলাম তাদের গোসলখানায়। গোসল করে বের হতেই, একজন বৃদ্ধ, বুজুর্গ ধরনের লোক সালাম দিলেন আমাকে। উনি মেসের মালিক, এবং তাবলীগ জামাতের বড় ধরনের একজন নেতা। তিনি প্রথমেই আমাকে চারটা কালিমা বলতে বললেন। কালিমা তাইয়্যেবা শেষ করার আগেই আমাকে থামিয়ে দিলেন, উচ্চারন ভুল হয়েছে। এরপর আমাকে তার স্টাডিরুমে নিয়ে গিয়ে ঝাড়া দেড় ঘন্টা উপদেশ দিলেন। তরুন বয়েসের ইবাদতের ওজন, আর পাপাচারের সম্ভাবনার কথাতো বললেনই, ভ্রমন করা যে কত ভালো কাজ, তাও বললেন,আর বললেন জলদি বিয়ে করতে। ইস, ওই মুহুর্তে আফসোস হচ্ছিলো, আমার বাপকে যদি ফোন দিয়ে ব্যাপারটা বলে দিতেন হুজুর!!
এরপরে নতুন এক সেট কাপড় পরে বের হলাম হোটেল খুজে বের করতে। একটা হোটেলে নিয়ে গিয়ে প্রায় সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলো, কিন্তু দামে বনলোনা! সারজুল ভাই অনেক চেস্টা করেও ৫০০ রুপির নীচে কোনো হোটেলরুম খুজে বের করতে পারলোনা। আমি তাকে জোর করে বোঝালাম, আমি বরং থানায় চলে যাই, তারা আমার জন্যে তাবু গাড়ার একটা জায়গা দেবেন নিশ্চই।
ওটাই যে সারজুল ভাইয়ের সাথে আমার শেষ দেখা, জানতাম না। বিদায় দিয়ে থানায় এলাম আমি। থানায় আরেক কান্ড! তাবু করার পারমিশন চাইতেই ওসি খেপে গেলেন আমি কেনো আরও আগে আসিনি তার কাছে। বাপরে বাপ। উপস্থতি একজন সাংবাদিক সাথে সাথে ক্যামেরা আর নোটবুক বের করে আমাকে চেপে ধরলো, ইন্টারভিউ দেয়া লাগবে একটা। ওসি সাহেবের ঝাড়ি খেয়ে জলদি শেষ করলো সে। আর আমি? কি অপ্রস্তুত এক অবস্থা! ইংরেজীতে উত্তর দিয়ে গেলাম তাদের ইংরেজী প্রশ্নের জবাবে।
পুরো লংকায় একনামে সবাই চেনে ফাতিমা হোটেল। এই শহরে কোনো মুসলিম টুরিস্ট এলে, ওখানেই থাকে। ওসি সাহেব তার একজন ইন্সপেক্টরকে বললেন মোটরবাইকে করে আমাকে ফাতিমা হোটেলে নিয়ে যেতে। গেলাম, থানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। তিনি কি বললেন হোটেল মালিক, ঝাকড়া চুলের বিশালদেহী ফর্সা, চশমা পরা আংকেলটাকে, জানিনা। কিন্তু আমাকে আপ্যায়ন করা হলো দারুনভাবে। যাবার আগে ইন্সপেক্টর বলে গেলেন, আমি যা চাই খেয়ে নিতে, রাতে এবং সকালে। কোনো টাকা যেনো না দেই, সব ওসি সাহেব দিয়ে দেবেন। সে কি এক অবস্থা! আসামে বাঙালীদের দুরবস্থার কথা কত শুনেছি, আমি তাই প্রতিনিয়ত ভীষণ অবাক হতে লাগলাম। আমার সাইকেলটা নিশ্চই আমার সবুজ পাসপোর্টটার ওজন বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছিলো। আমি ব্যাপারটা নিশ্চিত। ধন্যবাদ বেল্লা।
সারাদিনে অসীম ক্লান্তি শেষে পেট পুরে মাছ মাংস সবজি ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে এসে আমার এয়ার কন্ডিশনড রুমের ডিম লাইটটা জ্বেলে দিয়ে, ডাবল বেডের একটায় ভেজা জামাকাপড় শুকাতে দিয়ে, শাওয়ারের নীচে দিনের চতুর্থবার গোসল সেরে চুল শুকাতে শূকাতে বাড়িতে, আব্বুকে কল দিলাম। রসিয়ে বর্ণনা করতে লাগলাম দিনের অভিজ্ঞতা, আর আব্বু ওদিকে গর্বের ঠেলায় বাচেনা! তার নিতান্ত অপদার্থ ছেলেটা বিদেশবিভুইতে একা একা কিসব কান্ড করে বেড়াচ্ছে! ওটা লুকাতে আমাকে বারবার ঝাড়ী মারতে লাগলো অবশ্য! বাড়ি থেকে বের হবার সময় বলেছিাম আমার সাথে আরও দুজন থাকবে। মিথ্যাটা ফাস হয়ে গেছে।
এই হচ্ছে লংকাকান্ড! কোনোদিন যাতে ভুলে না যাই শরতের ওই ঘটনাবহুল দিনটির কথা, তাই আমি সেদিনের প্রায় সব খুটিনাটী লিখে রাখলাম। যদিও তবুও বহুকিছু বাদ দিয়ে গেছি, কিন্তু আশা করি সেগুলোও মনে পড়েই যাবে কখনো না কখনো।1