মার্চ '২২
উত্তর পূর্ব ভারতের সাত বোনেদের রাজ্যে
নাগাল্যান্ডের উত্তর ঘেঁষা দিগন্তবিস্তৃত সমভুমি ধরে,দক্ষিন-পুর্বের পাহাড়সারি বেয়ে, আসামের গহীন অরন্য ভেদ করে, মেঘালয়ের শানিত হাওয়ার দাপট ভেঙে, আমি চড়েছিলাম মোহনীয় সাত বোনেদের রাজ্যে।
চড়েছিলাম আমার চিরচেনা মাউন্টেইন বাইকে, হাজার মাইল লম্বা সেসব অপার্থিব পথ-ঘাট-উপত্যকায়। দেখেছি কত জাতের মানুষ, শুনেছি কত বিচিত্র ভাষার শ্রুতি, শুয়ে থেকেছি কতবার, হাত পা ছড়িয়ে, ঝকঝকে নীল আকাশের নীচে......
পৃথিবী ও প্রকৃতির উপর আমার আকর্ষণ দুর্নিবার। এই সেই নিয়তির অমোঘ টান, যে টানে মাতাল বনেছিলেন এককালের ফার্ডিনান্ড মেজেলিন, ফ্রান্সিস ড্রেক, মার্কো পোলো কিংবা ফ্যান্টাসির রবিনসন ক্রুসো, অ্যালান কোয়াটারমেইনরা!
আমার ইচ্ছা পৃথিবীকে খুব কাছ থেকে দেখবার, খুব ধীরে উপলব্ধি করার। মাতৃগ্রহকে ভীষণ ভালোবাসি, তাই আমি আমার সারাজীবনের সকল দুঃখের বিনিময়মুল্যেও চাইনা তার কোনো ক্ষতি করতে। যদিও আমি জানি, আমার সমাজ, একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানবজাতি তার কি করুন অবস্থাই না করেছে এবং করে চলেছে! কত কত বুলিই না তারা ছেড়ে চলেছে পৃথিবীকে বাচানোর, এবং কতই না হাস্যকর তাদের কন্ট্রাডিক্টরি লাইফস্টাইল!
তাই আমার বাহন খুব ধীরগতির, আমার বাহন কোনো ফসিল ফুয়েল পোড়ায় না, কারন আমার দেহের চর্বি তার জন্য যথেস্ট। আমার বাহন বায়ুমণ্ডলে বিচরন করতে থাকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অযাচিত শব্দতরঙ্গের সাথে যোগ করেনা সামান্য আর একটুও কম্পাংক, কারন তার কোনো হর্নের প্রয়োজন হয়না আমার বাহন যানজট সৃষ্টি করেনা, কারন সে ১ মিটার জায়গা নিয়ে আমাকে সহ ঢাকার রাস্তায় জায়গা করে দেয়। ঘন্টায় ১০ মাইল বেগের একটা বাইসাইকেল আমার বাহন। ভীষণ ভালোওবাসি ওই বাহনটাকে। বিজয় স্মরনীর সিগন্যালে মে’র কাঠফাটা রোদের মাঝে আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকে তার দিকে তাকিয়ে থাকি, দিব্যচোখে ভেসে বেড়ায় তখন, কতকিছু দেখেছি আমরা একসাথে!
আমার ধীরগতির বাহনটাকে নিয়ে নিকট অতীতে ছুটে বেড়িয়েছি দেশের আনাচে কানাচে। বাংলার গ্রামে গঞ্জে, ঘাটে, বন্দরে, বন, পাহাড় সমুদ্রে কতশত দুরন্ত স্মৃতি আমার, তা আমি কোনোদিনই ঠিক ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারিনা। ভাবনাগুলো কেমন দিগ্বিদিক হারিয়ে যায়! চোখ বন্ধ করে শুধু রোমন্থন করতে পারি আমার গত দুটি বছরের স্মৃতি-বিশ্ববিদ্যালয়ের চার মাসের সেমিস্টার চোখ বন্ধ করে উড়িয়ে দিয়ে হারিয়ে গেছি বারবার, হারিয়েছি মিষ্টিমধুর নামাঙ্কিত জনপদের বিশালতায়-আমার মাতৃভূমির মিষ্টতার কথা কে না জানে!
শখের জিনিস দিয়ে প্রিয় সাইকেলটা সাজাতাম, আর পরিকল্পনা করতাম সীমানা বড় করবার! অনেক চেস্টা এবং গলগধর্ম হবার পরে আমি উপলব্ধি করেছিলাম সত্যটা। পর্যাপ্ত ইকুয়্যিপমেন্ট, কনভেনিয়েন্ট ইলেক্ট্রনিক্স, আর সরাইমালিককে টাকা দিয়ে রাত্রিযাপনের গোছানো আউটিং এর জন্য অপেক্ষা করলে আমার জীবনের ২৪ তম বছর আর কোনোদিন ফিরে পাবোনা। অদম্য যে প্রাণশক্তি নিজের ভিতরে বোধ করি, তার সঠিক ব্যাবহার করতে হলে আর চুপ করে বসে থাকতে পারবোনা বিধায়, গত আগস্টে গাটছাড়া নিয়ে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক সীমানা পার করেছিলাম আমি, যেটা ছিলো বাংলাদেশের সিলেট জেলার তামাবিল এবং ভারতের পুর্ব জৈন্তা হিল জেলার ডাউকি। খুব সীমিত পরিমানের সংস্থান, এবং শখের তাবুটা নিয়ে গিয়েছিলাম। আর ছিলো ভীষণ আত্মবিশ্বাস।
প্রথমদিনই ভীষণ এক ধাক্কা দিয়ে তা আরো উপরে চড়িয়ে দিয়েছিলো পাহড়ি নদীর মত ছটফটে একজন খাসিয়া তরুনী। ওর কাছ থেকে কিছু ক্যান্ডি কিনেছিলাম। আট আনা রুপি দামের! চলে আসবো, তখন সামনে ঝুকে সিনেমার নায়িকাদের মত করে সে জিগ্যেস করেছিলো- “তুম কন হো? কাহা যাওগে?” উত্তরে আমি বলেছিলাম নাগাল্যান্ডের কথা। কি সুন্দর করে যে হেসেছিলো! ও কিন্তু আমাকে পাগল বলেনি। খুব কায়দা করে শুভকামনা জানিয়ে দিয়েছিলো! তখনই ঠিক করে ফেলেছিলাম, ফেরত যাবার সময় ওকে ছোট্ট একতোড়া রজনীগন্ধা দিয়ে যাবো!
উত্তেজনার চোটে যে আমার বাচার ই কথা না, ভারতে এসে সাইকেল চালাচ্ছি, রোমহর্ষক ব্যাপার স্যাপার! কিন্তু পারদ বেশ নীচে ছিলো তখন! অনেকদিন পর মাউন্টেইন বাইকিং করা লোকমাত্রই জানে প্রথম দুদিন কি কাহিল অবস্থা হয়! মেঘালয়ের রাজধানী শিলং গিয়ে পয়সাগুলো এক্সচেঞ্জ করে, একটা ভারতীয় নেটওয়ার্কের সিম কার্ড ফোনে ঢুকিয়ে, একদম ঝাড়া হাত পা নিয়ে আমি যখন নাগাল্যান্ডমুখী রওনা হলাম, ঐযে উত্তেজনার পারদ টের পেয়েছিলাম!
না, সামান্য একটা ভুল হয়ে গেছে। তখনও উত্তেজনা টের পাইনি, কারন ভীষণ বিষণ্ণ ছিলাম আমি। তিনদিন যাবত আব্বু আম্মুর সাথে কথা বলতে পারিনি কিনা! ছয় ঘন্টার বেশী তা হয়নি আমার সারাজীবনে। তাই সেদিন সন্ধ্যায় যখন মেঘালয়-আসাম রাজ্যের সীমানাবর্তি সাফাই নামের এক উপত্যকার মাঝে ছোট্ট এক পুলিশ চেকপয়েন্টে গিয়ে ওনাদের বললাম, “আসামের হাতীর কথা অনেক শুনেছি, তাই ক্যাম্প করার সাহস নেই, আপনারা খানিকটা জায়গা দিতে পারেন কি আমাকে আপনাদের কম্পাউন্ডে?” এবং এর জবাবে তারা ভীষণ আন্তরিকভাবে আমাকে একটা আস্ত সুন্দর ছিমছাম কামরার ব্যাবস্থা করে দিয়ে বললেন সন্ধ্যার পরে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের এখান থেকে দু’শ গজ দক্ষিণে একজন মহিলা তার মেয়েকে নিয়ে থাকেন, এবং তার রাধা খাবার বিক্রি করেন নিতান্ত বাধ্য ক্রেতাদের কাছে, আর আমি সত্যিই সেই মা-মেয়ের কাছ থেকে ডাল আর মুরগী দিয়ে প্রায় দুইদিন পরে ভাত খেয়ে আব্বুকে কল দিলাম, আর আব্বু চিৎকার করে উঠলো, “কে? অনিক?” - আমার হৃদয়টা ভীষণ এক প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিলো!
প্রশান্তি এমন এক অনুভুতি, যা মেঘের আড়ালের সুর্য্যের মত এনে দেয় এক আকাশ উত্তেজনার বারুদ! ফোন রেখে আমি যখন আমার চারিদিকে তাকালাম, ম্যাচের কাঠি জ্বলে ওঠার মত ফত করে হেসে ফেললাম ! ওইযে শুরু। প্রচুর হেসেছি এবার আমি এরকম ফিক করে! প্রচুর! অনেক!
নিজেকে কোনোদিন ওই রাতের চেয়ে বেশী সুখী মনে হয়নি আমার। আশেপাশের চিরচেনা পরিবেশের সাথে আমি আসামের ঐ গহীন বনের খাপ খাওয়াতে গিয়ে, অজানা ভাষায় কথা বলা মানুষগুলোর সাথে ভাঙ্গা হিন্দীতে কথা বলতে বলতে, কোথা থেকে যেনো নদীর স্রোতের মত সব ধরনের অনুভুতি ভেসে আসছিলো!
আসামে প্রথমদিন একজন সাইকেলে করে চরে বেড়ানো ফেরীওয়ালার সাথে আমি সাইকেল চালিয়েছিলাম। শেষবিকেলে লংকা নামক এক জনপদের মাইল দশেক আগে তার সাথে দেখা হয়েছিলো। আমার জামা দেখে সে জেনেছিলো আমি বাংলাদেশী, এবং বাংলাতেই কথা শূরু করলো। কলকাতার বাসিন্দা ঐ যুবকটির কথা ভীষণ মনে গেথে গিয়েছিলো আমার, তার অমায়িক ব্যাবহার, কিংবা অতুলনীয় হাসি হয়তো নয়, কিন্তু ভীষণ আর্থিক দৈন্যতার মাঝেও অমন সুখের জীবনের গল্প করা, তার রাণী এবং রাজকন্যার কথা সে অনেক গর্বের সাথে শুনিয়েছিলো আমাকে। একজন মানুষ পরিপুর্ণ সুখী হবার জন্য কত টাকা প্রয়োজন তা ওই লোকটার শরীরের জামা, এবং তার প্রাণজুড়ানো হাসিটা যদি কেউ কোনোদিন দেখে, সে জানতে পারবে।
ওয়েলকাম টু ডিমাপুর, নাগাল্যান্ড। লেখাটা খুব সুন্দর করে লেখা নাগাদের সবচে বড় শহর ডিমাপুরের সদর দরজায়! এই ব্যাপারটা আমার ভীষণ ভাল্লাগে যে, কোনো বড় শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারে এমন সুন্দর করে স্বাগত জানানো! ডিমাপুর গেটের সামান্য আগে আছে এক নাগা বাজার! আমি সেই বাজারের কোলাহলের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে দাত বের করে হাসছিলাম! লোকজন নিশ্চই অবাক হচ্ছিলো! ওই বাজারেই আমি জীবনে প্রথম পানিপুরি খেয়েছিলাম! কান্ড বটে একটা! হাতে একটা ছোট বাটি ধরিয়ে দিয়ে দোকানদার আমরা যাে ফুসকা বলি, তা মধ্যে মধ্যে পানি ঢুকিয়ে দিতে থাকে আমার হাতে একটা একটা করে! ওনার তাড়াহুড়া দেখে নিজেও গপগপ করে গিলে ফেলতে লাগলাম! সেও থামেনা, আমার ও থামার নাম নেই। ৩০ টা পানিপুরি খেয়ে ফেলেছিলাম জায়গায় দাঁড়িয়ে!
মোটামুটি ৫৮ কিলোমিটারের একটা চড়াই বেয়ে নাগাদের রাজধানী কোহিমা পৌছতে হয়। ভাগ্য বিরূপ, আমি যাবার কিছুদিন আগে সেই পথ বড় করার কাজ শুরু হয়েছে। ভীষণ ধুলাবালির ঝড় ঠেলে আমি পৌছেছিলাম ঝকঝকে কোহিমায়। ভীষণ ঠান্ডা ওখানে, এই কথাই আগে বলতে পারি! কোহিমাতে আমি শুধু যা করেছিলাম, তা হচ্ছে নাগামিজ খাবার খাওয়া! স্যাপ ব্যাং বিচ্ছু সবই খায় নাগারা। আমি না কিন্তু! আমি বেশ ভালো জিনিসই খাচ্ছিলাম বেছেবেছে!
নাগাল্যান্ডে কাটানো আটটা দিনের কথা মনে পড়লে সবার প্রথমে যা মনে পড়ে তা হচ্ছে মানুষগুলোর অবিশ্বাস্য উদারতা। তারা দারুন, দারুন, এক কথায় ইনক্রেডিবল। বাচ্চাকাচ্চাগুলো যে ভীষণ কিউট দেখতে, সাথে তাদের ব্যাবহার ঐ বয়েস থেকেই একদম ভব্য। আমি সাইকেল নিয়ে সাআ করে যখন কোনো বাজারের ডাউনহিল পার হয়ে যেতাম, ওরা হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বলতো- সেইফ জার্নি! চড়াই বাইতে থাকা অবস্থায় কেউ সামনে পড়লে বলতো খানিক জিরিয়ে নিয়ে পানি খেয়ে যেতে তার বাড়ি থেকে। পিছন থেকে যাওয়া গাড়িগুলো আমার পাশে এসে স্লো হয়ে যেতো, আমি ডানে ঘাড় ফেরানো মাত্র কেউ না কেউ হাত নাড়তো, অথবা প্রশংসাবাক্য ছুড়ে দিতো! বিপরীতদিক থেকে যাওয়া গাড়িগুলো বেশ আগে থেকেই জানালার কাচ নামিয়ে দিতো, কাছে আসামাত্রই কেউ না কেউ হাত বের করে নাড়তো!
নাগাদের ছোট ছোট বাজারগুলো ভীষণ সুন্দর দেখতে। রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট বাশ দিয়ে তোলা ছাউনিমত জায়গায় একটা আয়তক্ষেত্র শেপের টেবিলের উপর রাজ্যের যত ফলমুল, সবজি সাজিয়ে রাখে। ফল্মুলের মাঝে সবচে কমন হচ্ছে আনারস। গড়ে প্রতিটি আনারস ১৫-২০ রুপি- কেটেকুটে পরিবেশন সহ। কোহিমা থেকে ওখা জেলাতে যাবার রাস্তায় একদিন নাশতা করেছিলাম শুধু আনারস দিয়েই! পুরোটা খেয়ে শেষ করতে পারিনি, দোকানের মালকিন তার মেয়েকে বাড়িতে পাঠিয়ে পলিথিনের প্যাকেট জোগাড় করিয়ে আমার সাথে দিয়ে দিয়েছিলো ওগুলো, এক রকম জোর করেই! সেদিন রাতে এমন জায়গায় তাবু গেড়েছিলাম, যেখানে ছিলোনা কোনো খাবার। অন্ধকারে দেড় মাইল পথ হেটে খুজেপেতে একটা ছোট্ট বাজারের ছোট্ট দোকানের বন্ধ জানালা বিনয়ের সাথে ধাক্কা দিয়ে খুলিয়ে কিছু বিস্কুট, পানি, আর ওই সকালের রয়ে যাওয়া আনারসগুলো ছিলো আমার সেদিন রাতের খাবার।
রাতের খাবারের কথায় মনে পড়লো, নাগাল্যান্ডে রাত হয় সন্ধ্যা সাত টায়। ছয়টার মাঝেই বন্ধ হয়ে যাবে সব দোকানপাট। তারা দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে দিন শুরু করে, এবং অন্ধকার ঘনানোর সাথে সাথেই সবকিছু শেষ করে। অ্যাজ ইট মেন্ট টু বি। আমি যখন তাবুতে, কিংবা আমাকে মেহমানদারি করা বিছানায় শুয়ে পড়ি, তখন বড়জোর রাত আটটা। ব্যাগে করে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার প্রিয় কিছু বই। আস্তানা গাড়ার পরে, অনেক আয়োজন করে কাপ নুডলে গরম পানি ঢেলে , তার মাঝে দুইটা ডিম ভেঙে দিয়ে, বিস্কুটের প্যাকেটটা আধখোলা করে, সাথের রিডিং লাইটটা জ্বেলে দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আমি বই পড়তে পড়তে রাতের খাবার খাচ্ছি- এটা হচ্ছে নাগাল্যান্ডে আমার রাতগুলোর সংক্ষিপ্তসার। পড়তে পড়তেই কখন যেনো ঘুমিয়ে যেতাম, ঘুম ভাংতো চোখে এসে পড়া সুর্য্যের প্রথম আলোয়!
তখনকার অনুভুতি লিখে প্রকাশ করার মত নয়। নতুন একটা দিন, একান্তই আমার সেই দিন। আমি সারাদিন প্রিয় সাইকেলে চড়ে চরে বেড়াবো, সেদিন আমার সাথে কতকি ঘটবে, কত অজানা রাস্তার বাক ঘুরবো, উঠবো নতুন কোনো পাহাড়চুড়ায়, নামবো অজানা কোনো উপত্যকায়, আবার রাত আসবে, তখন আমি কোথায় থাকবো, কিভাবে থাকবো, কে জানে! এই যে অনিশ্চয়তা, এই অনিশ্চয়তাটাই আমার সবকিছু!
সে এক ভীষণ রোমাঞ্চকর সময়!
সকাল ৮ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত পাহাড়ে সাইক্লিং করার সবচেয়ে কঠিন সময়। রোদের তেজ থাকে ভীষণ! দুপুরে যখন খাওয়ার জন্য কোনো এক ছিমছাম কুটিরে ঢুকে পড়ি, বের হবার পরেই জাদুর মত সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়! সুর্য্যটা একবার ঢলে গেলেই জাদুর মত মোহনীয় বাতাস বয়, কেমন উদাস করা এক সুবাস ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের ওই বাতাসে।
নাগাল্যান্ডের বিকেলগুলো ছিলো অবিশ্বাস্য! তখন আমি সামনে এগোতে পারতাম না। চলছি, হঠাত করে ব্রেক করে থেমে যেতাম। দুই হাটুতে যেনো কোনো শক্তি অবশিষ্ট রইতোনা, কলাপস করার মত ঠাস করে প্রথমে বসে, এরপরে শুয়ে পড়তাম। আবার যখন উঠে বসতাম, চোখের কোন ভিজে অনুভুত হতো। ভীষণ সুন্দর কিছু দেখলে আমার মন একটু ভিন্নভাবে রিঅ্যাক্ট করে, কেদেই ফেলি। এর কোনো ব্যাখ্যা আমি কখনো ভেবে বের করতে পারিনি।
সবুজ পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ঝিরিগুলো! গ্রীস্মমন্ডলীয় পাহাড়ে ওগুলো একজন মাউন্টেইন বাইকারের জীবন রক্ষাকারী ও বটে! কতবার যে আমার জীবন বাচিয়েছে ঝর্ণাগুলো! স্থানীয় মানুষগুলো কায়দা করে সেই ঝর্ণার মুখে কায়দা করে দুইভাগে ভাগ করা বাশ পেতে দেয়, যাতে বাশ বেয়ে বেশ বড় একটা পানির স্রোত এক জায়গায় এসে পড়ে, আর সেখানে আমার মত পথিকেরা ক্লান্তশ্রান্ত অবস্থায় গোসল করতে পারে! শেষবিকেলে আমার সবচে প্রিয় কাজ ছিলো ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে কোমরে পেচিয়ে নিয়ে, কোনো এক বরফশীতল ঝর্ণার পানিতে ডুবে থাকা। দুনিয়ার সেরা শাওয়ার। দুনিয়ার সেরা সতেজতা!
নাগাল্যান্ডে আমার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাত ছিলো চ্যাংটংইয়্যা নামক ভীষণ সুন্দর এক ছোট্ট পাহাড়চুড়ার শহরে। অন্ধকার হয়ে গেছে, আমি থাকার মত জায়গা খুজে বের করতে পারিনি। তখনই আবিস্কার করেছিলাম চ্যাংটংইয়্যা পুলিশ স্টেশন লেখা একটা সাইনবোর্ড। প্রায় চোখে পড়েইনা অমন। রাস্তা থেকে হাতের বায়ে সরু একটা মেটে-পাথুরে পথ একেবেকে উপরের দিকে চলে গেছে। রাস্তাটা ফলো করে দেখা পাওয়া যায় চকচকে খয়েরী রঙের দালানটার। ওটা একটা গোলাকার পাহাড়ের একদম চুড়ায় বানানো হয়েছে। চারিপাশে খাদ, এবং চারিদিকে ছড়িয়ে আছে চ্যাংটংইয়্যা শহর। নীচে। একটা হাই পাওয়ারড বাইনোকুইলার দিয়ে পুরো শহরের প্রতিটি গলি চেক করা যাবে সেখান থেকে। কিন্তু পুরো থানায় কেউ নেই। দুঃখিত, একটা কুকুর ঘেউঘেউ করছিলো শুধু আমাকে দেখে! অবাক হয়ে ভাবছি কি করা যায়, তখন দেখেছিলাম দালানের এক পাশের খাদ ঘেসে একটা পায়ে হাটা পথমত দেখা যাচ্ছে। সাইকেলটা ওখানেই রেখে সেপথ অনুসরন করে পঞ্চাশ গজমত নীচে একটা জংলা ঝোপের পাশে ছোট্ট একটা ঘর দেখতে পেলাম। ওখানেই থাকে এই শহরের পুলিশ চীফ জনাব আনগামি। উনি সদ্য সারাদিনের কাজ শেষে তার ব্যাক্তিগত বাবুর্চি এবং সহকারীসমেত সেখানে ঢুকেছেন। পায়ের শব্দ শুনে বেরিয়ে এসেই হাক ছাড়লেন, আরে তোমাকেতো দেখেছিলাম আজকে বিকালে মংসেনইমতি বাজারে! সাইকেল চালিয়ে আসছিলে! আসো আসো! রাত কাটানোর জায়গা চাইতো? আগে খানিক আড্ডা হয়ে যাক?
মিস্টার আনগামি তার বাবুর্চিকে একের বদলে দুইজনের খাবার রান্না করার নির্দেশ দিলেন। আমার ধর্ম জেনে নিয়ে শুয়োরের বদলে মুরগী রাধতে বললেন, এবং আমাকে তার স্টাডিরুমে নিয়ে গিয়ে আকাশ-পাতাল গল্প শুরু করে দিলেন! “তোমার বয়স কত?” আমাকে চমকে দিয়ে নিজেই উত্তর দিলেন “নিশ্চই চব্বিশ? বিয়ে করেছো ? না?“ “নাহ! “ “এইতো সময় তাইনা? ২৪ এবং স্বাধীন! এদিকে যাবার সময়,ওদিকে যাবার সময়, দিগ্বিদিক ছুটে এবড়াবার সময়! মনতো স্থির ই থাকেনা মোটে, তাইনা?” হাহ হাহ!
ওনার বাসায় দুজনে হিজ হিজ হুজ হুজ সার্ভিং এ জম্পেশ এক ডিনার হয়েছিলো সেরাতে। আমরা যেমন পানতা ভাত খাবার সময় মাঝে মাঝে মরিচে কামড় দেই, মিস্টার আনগামি মুরগী ভাতের সাথে মাঝেমাঝে আনারসে কামড় মারছিলেন!
সেরাতে ওই গোল পাহাড়টার এককোনে বানানো ওয়াচটাওয়ারের উপরে শুয়ে শুয়ে গান শুনতে শুনতে বই পড়েছিলাম অনেকরাত পর্যন্ত। আকাশে দৃশ্যমান ছিলো বিলিয়ন বিলিয়ন তারা! অমন উজ্জ্বল রাত আমি এর আগে কোনোদিন দেখিনি।
এভাবে চলতে চলতে একদিন মন পৌছে গিয়েছিলাম! মন শহরে পৌছলে সামান্য মন খারাপের অনুভুতি হয়, এ এক এমন মন খারাপের অনুভুতি, যা বারবার ফিরে পেতে মন চায় ! মনের ভৌগলিক অবস্থান যখন মনে পড়ে, তখন মন উদাস হয়! এবং মন ছেড়ে চলে যাবার সময় মনটা একদম ভেঙে যাবার অনুভুতি হয়। আমার গন্তব্য ছিলো উত্তরপুর্ব ভারতের শেষ রণাঙ্গন নামে যার কথা প্রথম শুনেছিলাম, সেই লংগওয়া।
উত্তর পুর্ব ভারতের মায়ানমার সীমান্তে আকাশছোয়া সব পাহাড়। অমন এক পাহাড়ের একদম চুড়ায় রংতুলি দিয়ে আকা খুবই ছোট্ট একটা গ্রাম, নাম তার লংগওয়া! কয়নাক নাগাদের ঘর। ডাকনাম যাদের হেড হান্টার্স।
১৯৭০ এর দশকে শেষ কোনো মানুসের মাথা কেটেছে কোনো কয়নাক নাগা। শরীরে বিশেষ ট্যাটু আকার অধিকার এবং কানে বিকট দেখতে কাঠের গোজা দিয়ে তৈরি দুল কেবল সেসব যুবকের ভাগ্যেই জুটতো, যারা প্রতিবেশী কোনো গোত্রের কারো মাথা কেটে আনতে পারতো।
এখন তারা সভ্য। সেই প্রজন্মের ট্যাটুধারি অল্প কিছু নাগা বেচে আছেন। তারা গ্রামের মাথা। বর্তমান আং তাদেরই বংশধর, তবে তিনি মাথা কাটার সুযোগ পাননি কারো!
লংগওয়ার মানুষ একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সীমানার থোড়াই কেয়ার করে। লংগওয়া গ্রাম তাই ভারত আর মায়ানমার, দুই দেশেই পড়েছে। কোনো দেশের সরকার ই এই এলাকার রাজাকে ঘাটায়না পারতপক্ষে। সত্যিকারের রাজা তিনি, পদবী তার মহান আং। আং তার নিজের ঘরটা বানিয়েছেন খুব কায়দা করে, অর্ধেক তার ভারতে, অর্ধেক বার্মায়।
লংগওয়াতে কোনো দেশের ই বর্ডার গার্ড নেই। চরমপন্থি কিছু সংগঠন সেখানে ততপর, সীমানায় গোলাগুলি, এবং অন্য দেশের মানুষকে সামান্য বাহানায় আটক করে তারা। যাকিনা আদতে কিডন্যাপ।
লংগওয়া থেকে কিছু আগে একটা দারুন সুন্দর ভৌগলিক জায়গা আছে, যাকে স্থানীয়রা যে নাম দিয়েছে তার ইংরেজী অনুবাদ হলো- ফরেভার রেইন পয়েন্ট। বর্ষাকালে ওখানে প্রায় সবসময় মেঘ গলে পড়তে থাকে, স্বভাবতই, যাওয়া আসা দুই সময়েই তাই ভিজেছি। মেঘের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার অনুভুতি হয় ফরেভার রেইন পয়েন্ট পার করে আরেকটু উপরে গেলে!
লংগওয়া যখন আর মোটে ছয় কিলোমিটার পথ উপরে, আমার পুরো দেহ কাদায় একাকার, প্রিয় সাইকেলটাও ভিজে চকচক করছে। আলগা নুড়িপাথরের একটা সরু পথে ভীষণ খাড়া এক খাদের পারে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে বের করে একটা সামোসা চিবুচ্ছি আমি অনেক আরাম করে, ঝিরঝিরে বৃস্টিতে চোখের পাপড়ি বেয়ে প্রায় সারাক্ষণই ভীষণ ঠান্ডা পানি চোখ বেয়ে পড়ছে, খুলে তাকানো যাচ্ছেনা! জুতোটা ভিজে চপচপ করছে, দাতগুলো ঠকঠক করে বাড়ি খাচ্ছে অকল্পনীয় ঠান্ডা, কানের পাশ দিয়ে মাঝেমাঝে শা শা শব্দ করে ছুটে যাচ্ছে দামাল হাওয়া! ওই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছিলো ওটা আমার জীবনের প্রথম সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার। আবারো ওই অবস্থা হলো- আমি কেদে ফেললাম! আবার দাত বের করে হাসছিলাম ও একইসাথে! দৃশ্যটা নিশ্চই খুব অদ্ভুদ ছিলো! কিন্তু তখন সেটা দেখার জন্য কেউ ছিলোনা আমার সাথে।
সেরাতে আং এর ঘরে ছিলাম! হ্যা, লংগওয়াতে যেয়ে যে কেউ আং এর ঘরে রাত কাটাতে পারবেন, বিছানাতে, অথবা স্থান সংকুলান না হলে ঘরের ভিতরে তাবু ফেলার ও ব্যাবস্থা আছে। বিশাল তার ঘর। পঞ্চাশ থেকে সত্তরজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারবে সেখানে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকলে একটা বর্গক্ষেত্রের মত কামরা। কোনো আসবাব নেই, চারিদিকের দেয়ালে সাবেক নাগা যোদ্ধাদের ব্যাবহৃত, এখন বিলুপ্ত অস্ত্র-সরঞ্জাম ঝুলিয়ে রাখা! সদর দরজার সমান্তরালে আরেকটি দরজা চলে গেছে এরপরে একটা করিডোরের ভিতরে। করিডোরের দুপাশে কামরা। কতগুলো কামরা তা আর এখন মনে নেই! করিডোর থেকে একই কায়দায় দরজা দিয়ে বের হলে অপর আরেকটি বর্গক্ষেত্রের মত ফাকা কামরা, শুধু এই কামরার মাঝখানে বিশাল এক ফায়ারপ্লেস। আগুনের চুল্লি। বিরাট এক হাড়িতে প্রায় সারাদিন ই কিছুনা কিছু রান্নাবাড়া চলে সেখানে। সেদিন রাতে নাম না জানা কতগুলো সুস্বাদু সবজি আর ডিম ভাজি ভর্তা, আর আস্ত কাচা পেপে সিদ্ধ দিয়ে খেতে দিয়েছিলো আমাকে শুয়োর খাইনা জানার পরে। ভীষণ ভীষণ ঠান্ডা সেই রাতে বিরাট আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে রাজার ঘরে ভাত খাওয়াটা কি অসম্ভব সুন্দর এক স্মৃতি আমার!
আং এর ঘরের মায়ানমার প্রাঙ্গণটা অপার্থিব। ওপারে এত উচু পাহাড় দেখা যায়, যার চুড়া দেখা সম্ভব হয়নি মেঘে ঢেকে যাবার কারনে। তবে একদম খাড়া দেহ উঠে গেছে, যা দেখে আন্দাজ করেছিলাম ওটা পাহাড় না, পর্বত। পর্বতের নীচে উপত্যকাটা দেখা যায়। গাঢ় খয়েরী রঙের অনেকগুলো মেঠোপথ একেবেকে চলে গেছে কোন সে দুর্গম অজানায় ! ওখানটায় দাঁড়িয়ে পথগুলোর দিকে তাকিয়ে মেঘগুলোর ভয়ংকর সর্পিল ভঙ্গীতে কুঞ্জলী পাকিয়ে ভেসে বেড়ানো দেখতে দেখতে কেনো যেনো গায়ে কাটা দেয়!
লংগওয়া যাবার পথে একজন বাঙালি বন্ধুবৎসল লোকের সাথে দেখা হয়েছিলো। উনি পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, ফেরার পথে যেনো মন শহরে তার বাড়িতে একটা রাত থেকে যাই। “ আমরা দুই ভাই একসাথে রান্না করে জম্পেশ খানা হবে খন একটা, এসো কিন্তু ! “ এই কথাটা কানে বাজছিলো ফেরার পথে পুরোটা সময়। অনেকদিন পরে বাঙালি খাবার খাবো কল্পনা করেই যেই পেটের ভেতর মোচড়গুলো দিচ্ছিলো, লংগওয়া-মনের দুর্ধর্ষ ৪২ কিলোমিটার আকাশছোয়া পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দুপুরের মধ্যেই আমি মন! কিন্তু কি দুঃখের কথা, কাজল দার ফোন নাম্বার অফ ছিলো ঐ মুহুর্তে। পরে জানতে পেরেছিলাম উনি ওনার মোটরবাইকে করে কোন জংগলে চরতে বেরিয়েছিলেন, নেটওয়ার্ক ছিলোনা! ভগ্নহৃদয়ে ভাবছিলাম, মাছ ভাত খাওয়াতো হলোনা, এবার কি হবে মেট? মন ফিরে আর কি করবো? চলো বাড়ির পথ ধরি!
সেদিন যাত্রার দ্বীতিয় অংশ শুরু হয়েছিলো আমার। আমার যাত্রার দ্বীতিয় অংশ পুরোপুরি আসামময়। ইনক্রেডিবল একটা ডাইভার্স রাজ্য এই আসাম! সেখানের প্রতিটি মানুষ একেকটা গল্পের মত! সে কি ভীষণ উত্তেজনা বোধ করি আমি আসামের বুক চিরে বাংলাদেশ্মুখী আমার সেই যাত্রার কথা মনে পড়লে!
প্রথমদিন শিবসাগর জেলার সোনারী নামের ছোট্ট এক রুপকথার মত জনপদে একটা মসজিদের অবিশ্বাস্য কিছু ভালোমানুষের সাথে রাত কাটিয়েছিলাম। ঐ মসজিদের স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে আমার! দ্বীতল একটা ভবনের দোতলায় চৌকো একটা কামরা, যেখানে তিনটা সিলিং ফ্যানের নীচে তিনটা খাটে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে, শুধুমাত্র কোনো অনাহূত অতিথিদের রাতে জায়গা দেয়ার জন্যই! আমি তিনটা খাটেই ভাগাভাগি করে ছিলাম সারারাত! ছেলেমানুষি আরকি! এশার নামাজ পড়তে যখন নীচে নামি, বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সে কি বৃষ্টি! অমন স্বর্গীয় একটা পরিবেশে নামাজ পড়াটা একটা অনবদ্য অভিজ্ঞতাই বটে! নামাজ শেষ হলো, আর চমক টা এলো আমার জন্য! কি করে যেনো মসজিদের ৪০ জন মুসল্লির সবাই জেনে গেছে, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সাইকেল চালিয়ে মন গিয়েছিলাম! চোখে পানি এনে দেয়ার মত আন্তরিক অভ্যর্থনা, আর প্রশংসাবাক্যে উড়ে গিয়েছিলাম মুরুব্বি লোকগুলোর। আমাকে জিগ্যেস করলো খেয়েছি কিনা। লাজুক হেসে বললাম- “ থোড়া বহুত মোমো খায়াতা শামকো! “ দাবড়ি দিয়ে হেসে উঠলেন কয়েকজন! সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে, কোথায় খাওয়ানো যায় আমাকে, কোথায় খাওয়ানো যায় এই বৃস্টির মধ্যে! তখন এগিয়ে এলো সুসান্ত সিং রাজপুত! ও আচ্ছা, এম এস ধোনীর বড় ভক্ত হওয়ায় ওই লোককে আমি চিনি! কিন্তু সে সোনারীর মসজিদে কি করবে তাইনা? কসম, ছেলেটা দেখতে একদম তার মত।
এবং সবচে বড় কথা, ওই ছেলেটার কন্ঠ একদম, একদম হুবহু সিনেমার নায়কটির মতই! তার কথা বলার ধরন ও অমন! আমার দুই চোখ বড়বড় করে দিয়ে সে বললো, “আমার সেলুনে আমার সাথে একটু যাবেন? একটা ছোট্ট ভিডিওক্লিপ বানাবো আপনার সাথে! “ ছেলেটা মসজিদের পাশের সেলুনের নরসুন্দর। ওখানে নিয়ে আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে তার ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে, আমার মাথার পিছনে তার মাথাটা কায়দা করে বসিয়ে হেসে দিয়ে বললো আসাম, এবং ভারত সম্পর্কে আমি যেনো কিছু কথা বলি!
এরপরে ও আমাকে নিয়ে পুরো সোনারীর রেস্টুরেন্টগুলো খুজতে বের হলো, সেলুন থেকে টান দিয়ে তার ছাতাটা বের করে। বিধি বাম! মসজিদের সামনে আবার ফেরত এসেছি, তখন সেই মুরুব্বিদের একজন বললেন, ছাতাটা দে, আমি নিয়ে যাচ্ছি। বৃস্টিভেজা ওই রাতে আমাকে কোন না কোন পথে হাটিয়ে উনি পুরো জনপদের শেষ খোলা রেস্টুরেন্টে নিয়ে ভাত তরকারী মাছ খাইয়ে দিয়ে গেলেন তার বাসায়। ছাতাটা আমি সকালে সুসান্তকে ফেরত দিয়ে যাবো বলে দেরী করে ঘুম থেকে উঠেছিলাম।
আফসোস, ছেলেটার সাথে আমি কোনো ছবি তুলিনি, নামটাও যে জিগ্যেস করিনি! আমার ছোটবোন বিরাট ভক্ত সেই নায়কের, আমাকে প্রচুর ধিক্কার জানিয়েছে তাই এমন বোকামীর জন্য।
আসামের ল্যান্ডস্কেপ একদম বাংলাদেশের মত। শুধু চারিদিকের দিগন্তে কোনো পাহাড়সারি দেখা যায় ভেসে থাকতে, হোক সে অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় বা আসামের নিজস্ব! সোনারি থেকে যেদিন সোজা পুর্বে রওনা দিয়ে দেই, পথে পড়েছিলো এক রসকসহীন হাইওয়ে। সাইক্লিং এর সাথে জড়িত এমন কেউ রিলেট করতে পারবেন- প্রচুর হেডউইন্ড ছিলো ওই পথে। যেনো প্রাণশক্তি নিংড়ে বের করে নিচ্ছিলো ঐ ভীষণ ব্যাস্ত হাইওয়েটা। টানা ১৫ দিন সাইকেল চালানোর ফলস্বরুপ পায়েও সামান্য বোধ এসে যাচ্ছিলো বুঝি! সেদিন রাতে যখন আসামের অন্যতম বড় শহর জোরহাট পৌছি আমি, গতদিনের সুখস্মৃতিস্বরুপ একটা মসজিদ খুজছিলাম খুব গ্রাহ্যের সাথে! একজন হিন্দু সাইকেলচালক আংকেলকে পাকড়াও করেছিলাম জোরহাটের ৫ কিলোমিটার আগে । উনি আমাকে একটা মসজিদ দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন! সেই মসজিদে দিব্যি গোসল করে, মাগরিবের নামাজ পড়ে ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে গিয়ে শুনি জোরহাট শহরে মসজিদে রাত কাটানোর উপরে ভীষণ কড়াকড়ি! অনেক ভেবে উনি অন্য একটা মসজিদের ঠিকানা বলে দিলেন আমাকে।
কত ছোট ছোট ঘটনা মানুষের জীবন কত বড়ভাবে প্রভাবিত করে! ভাগ্যিস সেদিন উনি আমাকে ওই একটা জায়গার কথা বললেন। নাহলে কি আমি কোনোদিন ওই অদ্ভুদ মানুষগুলোর দেখা পেতাম কোনোদিন?
জোরহাটের ওই মসজিদের মুয়াজ্জিনকে বলে সাইকেলটা ভিতরে রেখে আমি বেরিয়েছিলাম শহর হাটতে। হেটে হেটে একটা মোবাইলের চার্জার কিনেছিলাম যার গায়ে লেখা ছিলো- চার্জার কা বাপ! কি সুপার ফাস্ট ১৮০ রুপি দামের ওই চার্জার! ৭০ টাকা দিয়ে বিরাট এক বোলভর্তি গরুর মাংস এবং ভাত খেয়েছিলাম সেরাতে! গরুর মানুষ অত সস্তা দেখে এক চক্কর দিয়ে এসে ৫০ টাকা দিয়ে খেয়েছিলাম আবার এক বোল গরুর মাংস এবং পরোটা! বাপরে বাপ, অতদিন পরে গরু যেনো স্বর্গীয় কোনো জিনিস মনে হচ্ছিলো!
আগের দিনের মত ঘটনা ঘটলো জোরহাটেও। এশার নামাজের পরে সবাই যেনো কিভাবে আমার কথা জেনে গেলো এবং ঘিরে ধরলো। এক চাচা হাক দিলেন ঐ যে দেখো এক বুড়া লোক বসা, তার আদিনিবাস তো ঢাকা! এই হাকিম ভাই, আসো দেখি এদিকে! ওই যে পাশের পান দোকান দেখলা, ওই লোকের দাদা ছিলো বাংলাদেশী! ঐযে মুসলিম হোটেলটা দেখতেছো তার মালিক অনেক বছর আগে ঢাকা গেছিলো একবার! চলো চলো, বলে ওই সবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। তারা সবাই ও আমার সাথে এমন ব্যাবহার শুরু করলো, যেনো গোপিনাথপুর গ্রামের রোকনুদ্দীনের নাতি দশ বছর পরে ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছে, আর তারা সবাই রোকনুদ্দীনের গুণগ্রাহী! অদ্ভুদ সুন্দর সেই মানুষগুলো, অমলিন ছিলো তাদের আতিথেয়তা! ১০ টায় মসজিদের গেট আটকানো হবে বলে অনেকটা জোর করেই তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম। কিন্তু শর্ত দিয়ে দিয়েছে কালকে কিছুতেই যেতে পারবোনা আমি! থেকে যেতে হবে, তাদের সবার বাড়িতে যেতে হবে একবার করে!
ফিরে এসে আমি যখন মসজিদের মেঝেতে শুয়ে পড়ে বইটা মেলে ধরলাম, তখন জীবনে প্রথম আমার মুজিবুর রহমান ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো। উনি ঐ মসজিদের ইমাম। বেশ উচ্ছল লোকটা। উনি আর মুয়াজ্জিন থাকার জন্য একটা কামরা আছে। কিন্তু তারা দুইজন বাংলাদেশের গল্প শুনবেন আমার কাছ থেকে, তাই আমার সাথে বিছানা বিছিয়ে ফ্লোরেই রয়ে গেলেন দুজনে। গভীর রাত পর্যন্ত সে কি কথা তিনজনের, যেনো কত পুরনো বন্ধুদের আড্ডা, ভান্ডার সীমাহিন কথার! ফজরের আজানের পরে মুজিবুর রহমান ভাই যখন আমাকে ডেকে দিলেন, ঐ মুহুর্তটা এখনো চোখে ভাসছে। আস্তে করে কাধে একটা টোকা দিয়ে তিনি প্রায় ফিসফিস করে বলে চলেছেন- “ভাই, ফজরকা ওয়াক্ত হো গায়া, ভাই ফজরকা ওয়াক্ত হো গায়া…… “ বাইরে তখন একটানা বৃষ্টির গর্জন, বজ্রপাতের চকিত আলোকছটায় সৃষ্ট আবছায়া ওই দৃশ্যটা…….আমার চোখ ভিজে অনুভুত হয় জোরহাটের মানুষগুলোর এইসব আন্তরিকতার কথা মনে পড়লে।
সকালে বাজারের ওই লোকগুলোর কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে পারিনি। কি করে না বলে চলে আসি? সবার কাছে ঢু মেরে গেলাম। পান দোকানী তখনও দোকান খোলেনি। তিরিশ বছর আগে ঢাকায় ঘুরতে এসে টিকাটুলি, মতিঝিল, সাভার, ধানমন্ডী নামগুলো মনে রাখা ওই চাচা আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটা মুহুর্ত ঘরের মাঝে বসিয়ে এক গ্লাস পানি খাইয়ে ছাড়লেন। দেখালেন আমার চাচী এবং চাচাতো ভাইদেরকে! তার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে দিয়ে জোরহাট- গোহাটি বড়রাস্তার মোড়ে আমাকে বিদায় দেয়ার সময় বারবার করে বলছিলেন, ফের জোরহাট হয়তো জীবনে কোনোদিন ফিরে আসবোনা, আমাদের আর দেখাও হবেনা, নাম্বারটাতো রইলো, চেহারাটাতো মনে থাকলো…..
আসামের বুক চিরে ছুটে চলার গল্প শুধু এরপরে। ছূটে চলেছি, দেখেছি, এবং মুগ্ধ হয়েছি।
আসামের গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি স্কুলের ৮০% ছেলেমেয়েরা সাইকেলে চেপে ক্লাসে যায়। যার সাইকেল নেই, সে বন্ধুরটার পিছনে উঠে ঝুলে থাকে।
বাচ্চা যারা সাইকেল চালাতে পারেনা, তাদেরকে মায়েরা সাইকেলের পিছনে প্লাস্টিকের চেয়ার বসিয়ে নিয়ে যায়।
আসামের রাস্তার রাজা হচ্ছে গরু। লিটারেলি গরু। হোক সে ন্যাশনাল হাইওয়ে, বুক চিতিয়ে রাস্তার ঠিক মাঝখানের সাদা দাগটার উপরে আসন পেতে বসে পড়ে। ওরা জানে, কেউ ওদের ঘাটাবেনা। কিন্তু আমার কাছে রহস্য হচ্ছে- রাস্তার দুপাশে অত সুন্দর ঘাসি জমি, গাছতলার ছায়া অথবা নীরব চারনভুমি বাদ দিয়ে ওরা ব্যাস্ত রাস্তাটাই কিজন্য বেছে নেয় জাবর কাটার জন্য! ওহ!
প্রচুর স্কুল কলেজে মেয়েদের ইউনিফর্ম হচ্ছে শাড়ি। ব্যাপারটা এত দারুন যে বলার না! একসাথে একই শাড়িপরা শয়ে শয়ে মানুষ তো আর সহসা মেলেনা!
কৈশোর পেরুনো ছেলেরা মোটরবাইক ধরে। আর মেয়েরা স্কুটার। আসামের মেয়েরা স্কুটার চালায় শোনার পরে কারো যদি চোখে ভাসে দুলকী চালে হেলেদুলে খটখট করতে এগিয়ে যাওয়া একটা দ্বীচক্রযান, তাহলে তার উদ্দেশ্যে বলি- এলাকার লাফাংগা পোলাপান যেরকম ভো করে মোটরবাইক ছোটায়, মেয়েরা ঐ ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে সা সা করে স্কুটার ছোটায়। ব্যাপারই আলাদা!
বাঙালী-আসামিজ ঝামেলা আছে। আসামিজরা এখন বাংলাদেশী শূনলেই মনে করে চুরি করে সীমানা পাড়ি দিয়ে এসেছে। আমার কাছে যে পাসপোর্ট থাকতে পারে একোতা, একথা তারা যেনো কল্পনাও করতে পারেনা! পাসপোর্ট থাকা যেনো অত্যাশ্চর্য্য কোনো স্বর্গীয় ব্যাপার স্যাপার! ভিসা আবার কি! এর নাম ও শোনেনি অনেকে। বালিকা বাজার নামে নাগাও জেলায় একটা বাজার আছে। ওই বাজারের সাইনবোর্ডটার ছবি তুলবো বলে দাড়িয়েছি, এক চাচা আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি শূনে বলে পুলিশে ধরায় দেই? চাচাকে খুব এক চোট খেলিয়েছি আমি- চক্কর। অবশ্য শেষমেষ দুজনে একসাথে বসে রসগোল্লা আর সিংগাড়া খেয়েছিলাম! সবাইকে বুঝিয়ে বলার ধৈর্য্য থাকেনা, মাঝেমাঝে খুব হাসি পেতো! কিছু না বলে শুধু হাসতাম!
মধ্য আসামের বিস্ময় কাজিরাংগা ন্যাশনাল পার্ক। কফির মত ঘোলাটে, উন্মত্ত ব্রহ্মপুত্রপারের দিগন্তবিস্তৃত ৪৩০ বর্গকিলোমিটারের চারনভুমিতে নিজেদের মত চরে বেড়ায় ২৪০০ এশিয়ান গন্ডার, ১১৪৮ পুবদেশীয় জলাভুমির হরিন (ইস্টার্ন সোয়াম্প ডিয়ার), ১৯৩৭ ওয়াটার বাফেলো, ১১১ টি বেংগল টাইগার, ১০৮৮ টি হাতি আর হরেক প্রজাতির পাখি, যার মধ্যে সারস উল্লেখ্য। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৭ এর ৩৬ কিলোমিটার পথ এই পার্কের ভিতর দিয়ে যায়। আমি ওই রাস্তা ধরায় তাই নিজ চোখে দেখতে পেরেছি বাঘ মামা ছাড়া বাকি সবাইকে! মামাকে দেখলে অবশ্য এখন আর গল্প শুনাতে পারতাম না।
একসময় গোহাটী পৌছে গিয়েছিলাম। আসামের রাজধানী। সবুজ একটা শহর। বেশ ছিমছাম। আসামে যে কদিন ছিলাম ,প্রচুর খেয়েছি! একদম ইচ্ছেমত! সবচে বেশী ছিলো সম্ভবত পানিপুরি, চিকেন মোমো, আইসক্রিম, ম্যাংগো জুস, লাচ্ছি, আর বাটার চিকেন থালি! উল্লেখিত প্রতিটা নাম একেকটা আবেগের মত!
ঘর ছাড়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পরে আমি ফিরে এসেছিলাম মেঘালয় রাজ্যে। প্রত্যাবর্তনটা ছিলো বেশ প্রফুল্ল। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। সে কি বৃষ্টি! আমি বৃষ্টি ভীষণ ভালোবাসি। আর ভালোবাসি কড়া রোদ। প্রথম যেদিন মেঘালয়ের পাহাড়সারি পার করে গিয়েছিলাম, সেদিন ছিলো কড়া রোদ। মেঘালয় তাই আমার কাছে ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছিলো!
নংপোহ পুলিশ স্টেশনের আঙিনায় তাবু ফেলেছিলাম সেরাতে। কি সুন্দর! কি সুন্দর শহর! প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের সাথে মনুষ্যসাধিত সৌন্দর্য্য সেখানে অসাধারনভাবে জুটি বেধেছে।
মেঘালয় সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি এখন অবধি। এই রাজ্যের রাস্তাঘাট সবচেয়ে সুন্দর, এবং ভালো ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা দেখানো হয়েছে। তাই মেঘালয়ের অনেক উচু পাহাড়ি পথেও সাইক্লিং করা মোটেও কঠিন হয়নি আমার জন্য। খুব সুন্দর ছোট্ট আকারের এক প্রাইভেট কার চলে মেঘলয়ের রাস্তায়, একদম ছবির মত লাগে! ভারতের যেই তিন রাজ্যের মানুষদের সাথে মিশেছি আমি, এবং তাদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর মনের মানুষ আমার মনে হয়েছে খাসিয়াদের। আমাকে ভীষণ যত্নের সাথে সিম কার্ড যোগাড় করে দিয়েছিলো সেই প্রথমে একজন খাসিয়া। এরপরে আরো কতকি সুন্দর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তাদের সংগে, তার সব উল্লেখ না করে আমি শুধু আমার এই ট্রিপের শেষ দিনটার কথা বলতে চাই।
শেষ থেকে দ্বীতিয় দিন প্রবল বর্ষণ মাথায় নিয়ে আমি মেঘালয়ের রাজধানী শিলং পার করে চলে এসেছিলাম। অবচেতন মনে ইচ্ছে ছিলো অমন বড় শহরে রাত না কাটানোর। অনেকগুলো দিন নিভৃতে কাটিয়ে শিলং শহরের ব্যাস্ততা স্নায়ুতে প্রভাব ফেলা শুরু করে দিয়েছিলো। যেই ভাবা সেই কাজ, শিলং পার করে ভাবা শুরু করলাম এই তুমুল ঝড়বাদলের মাঝে কোথায় রাত কাটাবো। একে একে মাইলেম, লাইটলিংকট পার করে চলে গিয়ে হুশ হলো, সন্ধ্যা হয়ে যাবে কিছুক্ষন পর, এবং আমি এখনো কোনো আশ্রয়ের খোজ পাইনি। বাংলাদেশ সীমানা থেকে শিলং যাবার রাস্তার গঠন হচ্ছে এমন- লাইটলিংকট একটা চেকপয়েন্ট। এখান থেকে বাংলাদেশ যাবার জন্য ৯৮% পথ ডাউনহিল। এবং শিলং যাবার পথে ৮০% ডাউনহিল। সুতরাং এটা হচ্ছে পিক। চুড়া।
মেঘালয় ভীষণ প্রতিশোধপরায়ন। সেই প্রথমদিন রোদে ঘেমে ৪০ কিলোমিটার আপহিল বেয়ে লাইটলিংকট চড়তে চড়তে সমানে গালি দিচ্ছিলাম তাকে, আর বলছিলাম, দাড়া, আসার দিন দেখবো তুই কত টাফ, এইযে খাটাচ্ছিস, সব শোধ তুলবো ৪০ কিলোমিটারের ডাউনহিলে!
সে মনে রেখেছিল চ্যালেঞ্জ টা। তাই ফেরার পথে আমাকে তার ভিন্ন চেহারা দেখিয়ে দিলো। আমি সারাজীবনে এত ঘন মেঘ, বৃষ্টি, তুফান আর ভয়ংকর ঠান্ডা দেখিনি।
আমার অত সাধের ডাউনহিল বেয়ে মোটেও উড়তে পারিনি, চশমার গ্লাসে একটা ওয়াইপারের অভাবে।
সে এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। লাইটলিংকটের চুড়ায় উঠেই সেযে ভয়ংকর ধোঁয়াশা দেখেছিলাম!
সন্ধ্যা হবার আগেই তাই পুরো দুনিয়া ডুবেছিলো অপার্থিব, বিষণ্ণ ধুসরতায়। রোডসাইডের একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকে ধোয়া ওঠা নুডলস, স্যুপ, মোমো খেয়েছিলাম। এরপর পথে বেরিয়ে শরীরে অবিশ্বাস্যরকম ঠান্ডা অনুভব করছিলাম। কেউ কোনোদিন কালবৈশাখী ঝড়ের সময় উঠানের কোনে মুরগীর বাচ্চাকে ঠান্ডায় কাপতে দেখেছেন? তাহলে আমার অবস্থা কল্পনা করতে পারবেন।
কিন্তু তখনও আমি শেল্টার পাইনি। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম- বাংলাদেশ সীমানার বাকি ৩৫ কিলোমিটার পথ আজ সন্ধ্যাতেই চালিয়ে চলে যাবো। কি হাস্যকর ছিলো সে সিদ্ধান্ত! বিশ মিনিট যেতেই টের পেয়েছিলাম ভুলটা কি করেছিলাম। ওই পথে প্রচুর মালবাহী ট্রাক চলে। আর ট্রাক ড্রাইভার রা মনের ভুলেও অমন দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়ায় রাস্তার বাম পাশ ঘেসে একটা সাইকেল আরোহীর অস্তিত্বের কথা ভেবেও দেখবেনা। কয়েকটা ট্রাক একদম শেষমুহুর্তে টের পেয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেছে। মোবাইল বের করে ম্যাপেও দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি কোথায় আছি! চোখেমুখে বাড়ি মারছে বজ্রকঠিন বৃস্টির ফোটা, চশমা একটা পরে আছি বটে, কিন্তু প্রায় অন্ধের মত এগোতে হচ্ছে সামনে। মেঘালয় হিলের ডাউনহিল। সাইকেলের গতি ঘন্টায় ৫০ কিলোমিটার। ওই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছিলো ওটা আমার জীবনের দ্বীতিয় সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার।
হঠাত পথের পাশে দুয়েকটা বাতির ঝলক দেখতে পেলাম। কোনোমতে টের পাওয়া যাচ্ছিলো তার অস্তিত্ব। বেশ কিছুক্ষন পরে বুঝতে পেরেছিলাম আমি কোনো একটা শহর পার করে যাচ্ছি। মনে পড়লো হঠাত ই, ওটা হচ্ছে প্রিয়ুনশ্লা শহর। এবং আমি জানি এই শহরে একটা পুলিশ স্টেশন ও আছে! ওই মুহুর্তে আমার চেয়ে সুখী মানুষ সারা দুনিয়ায় ছিলোনা!
সেরাতে তাবু ফেলে থাকতে হলে নির্ঘাত ঠান্ডায় মারা পড়তাম! পুলিশ স্টেশনে কোনো কামরার ব্যাবস্থা নেই, কিন্তু ইনচার্জ জানালেন পাশেই একটা হোমস্টে পাওয়া যাবে।
“ভাড়া কেমন হবে বলতে পারেন?”
“পনের শ’ হবে হয়তো!”
আমার কাছে তখন ৯০০ রুপি অবশিষ্ট ছিলো। রাতে খাওয়া হয়নি। সকালেও খেতে হবে। বাংলাদেশ ৩০ কিলোমিটার নীচে। বাইরে তুমুল গর্জনের সাথে কাদছে আকাশ। খানিকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় খুলে বললাম তাকে ঘটনাটা!
উনি একটা ছাতা বের করে দিলেন আমাকে। নিজের রেইনকোট টা চাপিয়ে বললেন তাকে অনুসরন করতে। হোমস্টেতে গিয়ে বেশ ধাক্কাধাক্কি করে মালিক কে পেয়ে, খাসিয়া ভাষায় কি যেনো কথোপকথন হলো তাদের মাঝে।
৬০০ রুপি। ৬০০ রুপি ভাড়াতে দুর্দান্ত রাজসিক সেই হোমস্টের একটা কামরা দেওয়া হয়েছিলো আমাকে। শাওয়ারের গরম পানির সুইচটা দেখিয়ে দিয়ে গেলো ছোকরা গোছের এক কিশোর, টেলিভিশনে ৯০০ টা চ্যানেল, তারমাঝে একটাতে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের ম্যাচ হচ্ছিলো! পিচ্চি আফিফ যেদিন পিট্টীটা দিয়েছিলো! শুভ্র একটা বিছানায় অবিশ্বাস্য আয়েশী ভংগিতে একটা ভারী লেপ পাতা রয়েছে, বালিশগুলোতে পুরো দেবে যায় মাথা! সেই বালিশ নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমি আবিস্কার করেছিলাম একটা ৫০০ রুপির নোট। সেই পুলিশ অফিসার শুধু হোমস্টের ভাড়া ৯০০ রুপি কমিয়ে দিয়েই চলে যাননি, সেটাই রেখে গিয়েছিলেন। সম্পুর্ণ একটা অজানা ভীনদেশীর জন্য তুমুল ঝড়বৃস্টির ওই রাতে এই ছিলো একজন খাসিয়ার আন্তরিকতা।
প্রিয়ুনশ্লা বাজারের ব্যায়বহুল একটা রেস্টুরেন্টে সেদিন রাতের খাবার খেয়েছিলাম আমি। দোকানের ছেলেটা পুরোটা সময় খোশগল্প করছিলো আমার সাথে। জানালার বাইরে গর্জন তখন বেড়ে চলেছে। মনে মাঝে কি অকল্পনীয় এক খুশীর স্রোত বইছে তখন আমার! বাড়ি চলে এসেছি প্রায়! শীতল এই রাতের উষ্ণতা ভোগ করে সকালে যে আমি চলে যাবো আমার বাংলাদেশে! সেখানে যেয়ে কি কি করবো? খালাতো ভাইয়ের সাথে ফিফা খেলাটা বন্ধ তিন সপ্তাহ! মনপুরা দ্বীপে যেতে হবে আমার তাবুটা নিয়ে! গোড়ান বাজারের ফালুদাটা খাইনা কতদিন! চট্টগ্রাম যেয়ে এবার মেজবানী গরুর মাংসটা চেখে দেখাই লাগবে! আফতাবনগরের শেষপ্রান্তে গিয়ে কতদিন বসে থাকিনা! কতদিন দেখিনা ঘোলাটে পদ্মা নদীর স্রোত!
ক্যান্ডিওয়ালীর কথা মনে আছে? খাসিয়া মেয়েটাকে রজনীগন্ধা দেয়া হয়নি। কিনতেই পারিনি যে! কিনতে পারলেও ওকে দিতে পারতাম না যদিও। ফিরে আসার দিন ঝড়বৃস্টির তোড়ে ওদের ছোট্ট দোকানটা বন্ধ ছিলো!
বাংলাদেশে পা দিয়েই আমিতো খুশীতে টগবগ! সবাই কি সুন্দর বাংলায় কথা বলছে! কানে যেনো সুন্দরবনের মৌয়ালীদের আহরিত খাটি মধুর বর্ষণ হচ্ছিলো! ঠাস ঠাস করে আমিও সবার সাথে বাংলায় কথা শুরু করে দিলাম, প্রয়োজন নেই তাও! চারিদিকে কি সুন্দর রোদ! বাতাসে সেই চিরচেনা গন্ধ! হোও করে একবুক সেই বাতাস টেনে নিয়ে জাফলং ব্রিজের পাশের একটা চা বাগানে এসে হাত পা ছড়িয়ে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে গরুগুলোর ঘাস খাওয়া দেখতে বসে পড়েছিলাম! কি শান্তি! দিগন্তে ভেসে আছে মেঘালয়।গর্বিত পাহাড়সারি মেঘছুয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে আমার দিকে চেয়ে! কত সুন্দর কিছু মুহুর্ত আমাকে দিয়েছে সে, মেঘের নিবাস! সেরাতের বাসে ঢাকা পৌছেছিলাম। সেদিন সকালেই আমার ইউনিভার্সিটির ক্লাস!
আমি একদিন ঘুম থেকে জেগে ভারতের মেঘালয়ের শানিত হাওয়ার দাপট ভেঙে ৩০ কিলোমিটার মাউন্টেইন বাইকিং শেষে একটা আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে , জাফ্লং বাজার, এবং চা বাগানে সারাটা দুপুর বিকাল টই টই করে, ৩০০ কিলোমিটারের বাস ভ্রমন শেষ করে, ফের ২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে, তিন সপ্তাহ পরে মায়ের হাতের খাবার খেয়ে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এক কোনে অবস্থিত আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে একজন প্রফেসরের লেকচার শুনেছি, খাতায় তুলেছি, বন্ধুদের সাথে তুমুল আড্ডা দিয়েছি, কাজিনের সাথে ৭ টা ফিফা ম্যাচ খেলেছি, ছোট বোনকে নিয়ে একটা সিনেমা দেখেছি, এবং! এবং এরপরে ফের ঘুমাতে গিয়েছি নিজের বিছানায়! HOW IS THAT FOR A DAY!
এইযে এতবড় একটা লেখা আপনি দেখলেন ( পড়লেন কিনা হলফ করে বলতে পারিনা ), মোটে বাইশ দিনের একটা বাইকপ্যাকিং ট্রিপ থেকে পাওয়া নিতান্ত অন্তর্মুখী এক যুবকের যতসব অভিজ্ঞতা, তার ভীষণ ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে- অনেক সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মবিশ্বাস, দর্শনের মানুষের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ, এবং বিশ্লেষণের সুযোগব্যাক্তিনির্ভর, তাই জেনারালাইজ না করে আমি শুধু আমার কথা বলি- এরচেয়ে আনন্দের আর কিছুই থাকতে পারে না বলে আমার বিশ্বাস। সৃস্টিকর্তার অপার সুন্দর এই গ্রহটিতে চলেফিরে বেড়ানোর সীমিত একটা সুযোগ যেহেতু দেয়া হয়েছে আমাকে, সেহেতু মৃত্যুর পুর্বে তার প্রতিটি সৃষ্টি, তাদের সৃষ্টি, এবং তাদের পুর্বে যারা এসেছিলেন, সবকিছুর ইতিবৃত্ত জেনে যাওয়াটা, দেখে নেওয়াটা আমার নিতান্ত কর্তব্য বলে মনে হয়। পৃথিবীর বুকে এতগুলো বছর কাটিয়ে যদি বুড়ো বয়সে স্বপ্নালু ছেলেপেলেদের চোখ বড়বড় করে দিতে পারার মত গল্প বলার ক্ষমতা অর্জন না করতে পারি, তাহলে সেটা কেমন জীবন হলো? আর গল্প? এই পৃথিবীর আনাচে কানাচে, প্রতিটি হেটে বেড়ানো মানুষ, প্রতিটি উড়ে বেড়ানো পাখি, বেলাভুমিতে আছড়ে পড়া প্রতিটি ঢেউ, শ্যামলিমার সকল নিঃস্বার্থ ত্যাগ, চাঁদের বুকের প্রতিটি কালিমা, প্রতিটি নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস গ্রহন একটি করে অপ্রতিরোধ্য গল্প।