বৈশাখের বন্যতাঃ শরনখোলা ফরেস্ট অফিস রোড, এবং আমাদের মাউন্টেইন বাইক!


খুলনা ও বাগেরহাট জেলার একদম সীমানারেখা ধরে গড়ে ওঠা ঘনজংগলে ঘেরা তিলক গ্রাম থেকে একটা খোয়াবিছানো পথ সোজা উঠে গেছে খান জাহান আলী সেতু রোডে। ওই তেরাস্তার মাথায় এসে দাড়ালে দেখা যায় তিনটা আলাদা পথ চলে গেছে খুলনা, যশোর আর মংলা বন্দরের পথে। ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে আমার রাইড পার্টনারের দিকে তাকালাম। তখনও জানিনা আমরা কোন পথটা বেছে নেবো। কি বলো মেট? বায়ে চলি? শরণখোলার নাম শুনছো কোনোদিন? পার্টনার সবসময় আমার কথা বিনাবাক্যব্যায়ে মেনে নেয়। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জনপদগুলোর একটি, সুন্দরবন উপকুলবর্তী, সিডরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরণখোলা অভিমুখী দুজন সাইকেল আরোহী এপ্রিলের সেই কাকডাকা ভোরে।


বৈশাখের বন্যতাঃ শরনখোলা ফরেস্ট অফিস রোড, এবং আমাদের মাউন্টেইন বাইক!



খুলনা ও বাগেরহাট জেলার একদম সীমানারেখা ধরে গড়ে ওঠা ঘনজংগলে ঘেরা তিলক গ্রাম থেকে একটা খোয়াবিছানো পথ সোজা উঠে গেছে খান জাহান আলী সেতু রোডে। ওই তেরাস্তার মাথায় এসে দাড়ালে দেখা যায় তিনটা আলাদা পথ চলে গেছে খুলনা, যশোর আর মংলা বন্দরের পথে। ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে আমার রাইড পার্টনারের দিকে তাকালাম। তখনও জানিনা আমরা কোন পথটা বেছে নেবো। কি বলো মেট? বায়ে চলি? শরণখোলার নাম শুনছো কোনোদিন?

পার্টনার সবসময় আমার কথা বিনাবাক্যব্যায়ে মেনে নেয়। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জনপদগুলোর একটি, সুন্দরবন উপকুলবর্তী, সিডরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরণখোলা অভিমুখী দুজন সাইকেল আরোহী এপ্রিলের সেই কাকডাকা ভোরে।

দুজনে ঢাকা থেকে বেরিয়েছি দিনকয়েক আগে। বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম। ছিলোনা কোনো গন্তব্য। দুচোখ যেদিকে যায়, চলেছি আমরা সেদিকে! উল্লেখিত দিনটা ছিলো ভীষণ গরম। রামপালের পাশ ঘেসে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম মোংলা, তখন প্রান বাচিয়েছিলো এক বুড়ো চাচা তার ডাবভর্তি ভ্যান দিয়ে। অমন ঠান্ডা ডাবের পানি খাওয়ার জন্যে হলেও অমন গরম এক দিনে সাইকেল চালানো উচিৎ দক্ষিণবঙ্গের মাছের ঘেরপার ধরে। খুলনা-বাগেরহাটের সবচেয়ে সেরা অলঙ্কার এই দিগন্তবিস্তৃত জলের আধারগুলো, একবার দেখে কে ভুলে যেতে পারে সে দৃশ্য!

আমার বাড়ি দক্ষিণবঙ্গে। ভীষণ গর্বের সাথে সবাইকে বলে বেড়াই, যখন বলি, গলার স্বর এমনিতেই উচু হয়ে যায়- “ আমাগে দক্ষিনবংগে আসো, দেহেনে ওহেনে কিরম শান্তি, আর মায়া, মানুষজন সব সাদাসিধে, আর যেদিক চাবা, খালি ধানের খ্যাত, আর তালগাছ দেহা যায়, বাগেরহাট ঢুকলি পরে দেখবা খালি মাছের ঘের! সে এক বিদিক ব্যাপার, বাতাসের মদ্যি নিশার মোতো গন্ধ আছে, মধুমতি নদীর পারে যাইয়ে একবেলা খালি বইসে থাইয়ে দেহো!” আসলে এই কথা বলেই আমার ওই রাইডের পার্টনারকে পটিয়েছিলাম।

আমার ভালোবাসার দক্ষিণবঙ্গের অমন সব দস্যি,অপরাজিত,আদ্যপান্ত প্রশান্তিমাখা পথ ধরে আমি চলে যেতে পারি অনেকদুরে!

তপ্ত রোদ জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো আমাদের, কিন্তু আমি আর পার্টনার আমাদের নতুন কেনা রোদচশমার চরম সদ্ব্যবহার করতে লাগলাম। আমার পরনে ছিলো একটা ক্যামোফ্ল্যাজ ট্রাউজার, সেদিনের রোদে জ্বলে গিয়েছিলো তার রঙ। মংলা বন্দরে কয়েক বোতল জুস গিলে যখন আমরা ছোট্ট একটা ডিঙ্গিতে করে মংলা নদী পার হয়ে যাচ্ছিলাম, পার্টনারের মুখ একশ ওয়াট বাল্বের মত জ্বলছিলো। একপাশে সুন্দরবন, আর নদীর ওপারের ল্যান্ডস্কেপ কেমন হবে তা কল্পনা করেই তার সেই আনন্দ।

সেদিনের অনুভুতিগুলো ছিলো একদমই অন্যরকম। যতই দক্ষিনে এগুচ্ছিলাম,কি যে রোমাঞ্চিত লাগছিলো! এখন মনে করে অবাক হচ্ছি একদিনে অত ঘটনা ঘটেছিলো কিভাবে!

এপ্রিলের উজ্জ্বল সেই দুপুরের স্তব্ধতার মাত্রা ক্রমশই আরো বাড়তে শুরু করলো আমরা যখন মোংলা উপজেলা পার করে মাদুরপাল্টা বাজার নামের আড়ালে মোড়েলগঞ্জ ঢুকে গেলাম।

অপার্থিব এক ধরনের বাতাসের ধারা বয়ে যায় সেখানে,নীরবতা এমন,মাঝেমাঝে যখন দুয়েকটা নাম না জানা পাখি ডেকে ওঠে, দিগন্তের কোথাও কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসা কোনো গরুর হাম্বা,কিংবা গৃহস্থলীর টিউবওয়েল চাপার নেশাধরানো আওয়াজ,কানে যেনো পীড়া দেয়! দুপাশে দেখার মত কিছু নেই,শুধু অগাধ,অগাধ জলরাশি,মোহাগ্রস্থের মত যেদিকে শুধু তাকিয়েই থাকতে মন চায়,কারন অনেক অনেকক্ষণ পরে যখন চারিদিকের ছবির মত নিশ্চলতার রাশ টেনে ধরে হঠাত একটা মাছরাঙ্গা তার ক্যামোফ্লাজ ছেড়ে ছো মেরে কোনো ছোটমাছ তুলে নেবে,তখন পানির কূলকুল আওয়াজটা,আর সৃষ্ট ঢেউগুলোতে এপ্রিলের মধ্যদুপুরের সুর্যরশ্নির প্রতিফলনটা-খানিকটা হাসি ফুটিয়ে দেয় চোখেমুখে!

জেওদাড়া বাজার থেকে হাতের ডানে যে পথটা চলে গেছে, সেটা চলতে চলতে সুন্দরবনে ঢুকে যায়, সোজা তার শেষ সীমানায় ভোলা নদী আর বগি খালের মোহনাছোয়া শরণখোলা ফরেস্ট অফিস অবধি। মেট আর আমার সেদিন রাতে ওখানেই থাকার ইচ্ছা! মোটে তিরিশ কিলোমিটার সেই পথ ছিলো তখন পর্যন্ত আমার সেরা অ্যাডভেঞ্চার!

অ্যাডভেঞ্চার শুরু হতে দেরী আছে, সবে দুপুর গড়াচ্ছে। “নাম মনে নাই” বাজারের কাঠের পোলটা পার হয়েই হঠাত করে সব রাস্তাঘাটের পেভমেন্ট গায়েব, এমনকি দিগন্তে মনে হচ্ছে কোনো পথের ছিটেফোটাও নেই। ওই বাজারে গিয়ে শূনি আজব ঘটনা, গত পাচ দিন ধরে ওখানে লোডশেডিং। ঐযে শুরু হলো জুস না খেতে পারা! সারাটাদিন যতবার মনে পড়েছে জুসের কথা, হৃদয়টা যেনো ভেঙে যাচ্ছিলো!


পার্টনার আর আমি, কেউ ই রাইডের মাঝে ভারী খাবার খেতে পছন্দ করিনা। তাই ওই বাজারের সবজান্তা মুরুব্বিদের বলা "সামনে আর বাজার নাই" ভয়কে পাত্তা না দিয়ে আমরা তপ্ত একটা মাটি পুড়ে লাল হয়ে যাওয়া অফরোড দিয়ে সোজা দক্ষিণে এগোতে লাগলাম। হাতের ডানে আস্তে আস্তে সব পানি শেষ হয়ে যাওয়া শুরু করলো, সেখানে জায়গা নিতে লাগলো ম্যানগ্রোভ! বাম পাশে আমাদের দিগন্তবিস্তৃত ফসলের জমি, গরুগুলো চরছে, আর বাতাসে বইছে দক্ষিনের সুবাস!

একটা সময় খোয়া বিছানো পথ শুরু হলো। কিন্তু খোয়াগুলো আলগা। আমাদের মনের অবস্থা তখন ভীষণ ভালো, তাই শূরুতে পাত্তা দেইনি। কিন্তু কত আর সয় কব্জিতে?

“ হেই ছোট, সামনে ভালো রাস্তা আছে, বড় রাস্তা?”

“ হ, আরিট্টু সামনে গেলিই বড় রাস্তায় ওঠফেন, ভিশল রাস্তা, এক্কেবারে আরামে চইলে যাতি পারবেনেন।”

“শুনলা মেট? দেই টান,চলো চলো!”

আমরা তো আর জানতাম না, সারাগায়ে কাদালেপা ওই বিচ্ছু বালিকা তার ছোট্টজীবনে কোনোদিন পাকা রাস্তা দেখেনি! ওর সেই “ভিশল” রাস্তা দেখে আমিতো হাসা শুরু করে দিলাম! মেট সম্ভবত হাসি লুকাতে স্যাডল ছেড়ে সাই সাই করে টানা শুরু করলো আমাকে ছাড়িয়ে। ওর পিছু নিতে গিয়ে ২৮ কেপিএইচ গতিতে সদ্য ট্রাক থেকে নামিয়ে বিছানো একটা আলগা মাটির স্তুপের ওপর দিয়ে ছুটতে লাগলাম আমিও।

সে দুই বছর আগের কথা। আজ নিশ্চই শরণখোলা ফরেস্ট অফিসের ওই রাস্তাটা ঝা চকচকে পেভমেন্টে মোড়া, ওই বাচ্চা মেয়েটা হয়তো এখন ওই পথেই কোনো অটোরিকশায় চড়ে প্রতিদিন স্কুলে যায় দস্যিপনায় মাততে!

একপাশে ম্যানগ্রোভের খালপার রেখে চলে গেছে দুরন্ত সেই পথটা। কি সুন্দর আলোকছটা চারিদিকে! রোমাঞ্চকর সেই মেঠোপথ বিরাট এক অজগরের মত একেবেকে এগিয়ে গেছে, যাকে দুপাশ থেকে সবুজে রাঙিয়ে ঘিরে ধরে আছে নাম না জানা শতশত জংলী ফুল ,ফল ও পরগাছার দঙ্গল! শেষবিকেল তখন, বাচ্চাদের “গুলিগোল্লা” আর লুকোচুরি জমে উঠেছিলো বেশ সেসব ঝোপজংগলে!

আকাশে হঠাত মেঘের ঘনঘটা। মনে মনে যেকথা ভাবছিলাম, পার্টনার সেটা ভেবেও পায়নি। এখন বৃষ্টি নামলে এই পথটা হয়ে উঠবে নরক, দক্ষিনের মাটি কেমন আঠালো হয়, তা আমি ভালোমতই জানি! তার উপর ওটা সুন্দরবন বলে কথা! বৃষ্টি যখন নামলো, আমরা চায়ের আড্ডায় জমে গেলাম একটা ছনের ছাউনির নীচে। বেশ কিছুক্ষন পরেও যখন থামেনা, মেট আর আমার চোখাচুখি হলো। ওইযে ভুল একটা সময়ে ভুল চোখে তাকানো ছিলো! বেরিয়েই ফেসে গেলাম গ্যাড়াকলে! সে কি কাদা, সর্বনাশ! ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছিলাম, ঠিক একটা শামুকের মতই গতিতে, তবু কয়েকবার উলতে পড়লাম ধপাস করে! এমন পিচ্ছিল কাদ! আমার অবশ্য কাদায় গড়াগড়ি করতে খুব ভাল্লাগে…...কিন্তু! অনিচ্ছায় না!

কিছুক্ষন পর এমন অবস্থা হয়েছিলো, সাইকেল ঠেলেও নিতে পারছিলাম না। না, আছাড় খাবার অত্যাচারে না, সেটা সয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সাইকেলের চাকাযে একটাও ঘুরছেনা আর! ফ্রন্ট ডেরার আশেপাশের এলাকা পুরো পাঁচ কেজি কাদায় মোড়িত। পিছনের চাকা আটকে গেছে। চেইন যে কোথায়, কিছুক্ষন খুজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা। সামনের চাকা আটকে গেছে ফর্কের মাঝের গ্যাপটা কাদাবরন করায়!


সে কি বিহ্বল অবস্থা আমাদের! মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই পুরোটা সময় কেউ কারো সাথে একটা কথাও বলিনি। এমনকি ভাবটাও নেইনি যে একজন আরেকজনকে চিনি!

সেদিন বিকেলের কথা কোনোদিন ভুলিনা আমি। ঢাকায় এসে পুরো ড্রাইভট্রেইন পালটে আক্কেল-সেলামি দিতে হয়েছিলো আমার। আর, হারিয়েছিলাম অ্যাডভেঞ্চারাস একটা পার্টনার! এরপর থেকে আমার সাথে ও গুগল ম্যাপে নেই, এমন কোনো রাস্তায় যেতে চায়না!


মাগরিবের আজানের পরে আমরা একটা পুকুরের মধ্যে সাইকেলটা চুবাতে বাধ্য হয়েছিলাম। অন্ধকার হবার পরে আমাদের দুজনের একমাত্র হেডলাইট টা জ্বালিয়ে, খানিকটা শিহরণ, আর কিছুটা লোম খাড়া করা উত্তেজনার সাথে স্যাতসেতে গন্ধওয়ালা একটা জংলা পথে ধরে, যেনো অনন্তকাল পরে পৌঁছেছিলাম শরণখোলা! আমাকে গুগল ম্যাপের জাদুকর বলে আমার ছোটবোন, ওর কথা রাখতেই কোত্থেকে যেনো একটা আবাসিক হোটেল খুজে বের করেছিলাম। ক্লান্তশ্রান্ত, কাদামাখা, প্রশান্তিতে ভরা আমরা ওই রাতে খেয়েছিলাম চিংড়ি, ভাত, আর চিংড়ি, আবার চিংড়ি!

শরণখোলা নামটা আমার কাছে অনেক আবেগের…...ওটাই ছিলো আমার প্রথম সাইকেল নিয়ে গন্তব্যহীন ছুটে চলা। পাকা রাস্তাটা দেখতে আবার একদিন ফিরে যাব আমি ফরেস্ট অফিস রোড!