নভেম্বর '২২
চপল ট্যানের মার্গারিতা আলভারেজ...
তোমাকে কখনো মার্গারিতা আলভারেজের কথা বলেছি? ওইযে দস্যি স্প্যানিশ মেয়েটা, মঙ্গোলিয়ার খোলা প্রান্তরে ঘোড়ার পিঠে চেপে যেতো অজানা প্রান্তর মাড়িয়ে, গ্রীষ্মের বিকেলে ভেড়ার খোয়াড়ে বসে চরম আলস্যে শিয়ার করতো যে, কনকনে উত্তুরে শীতের রাতে চিলেকোঠায় কম্বলমুড়ি দিয়ে গরম আইরাগে চুমুক দিতে দিতে দাদুর কাছে মংগোলিয়ার রূপকথা শুনতো যেই মেয়েটা! দাদু, আর মার্গারিতার রুপকথার গল্পে আমিও জড়ালাম সেবার। ওদের নিস্বংগ র্যাঞ্চে আমাকে ফোরম্যানের চাকরি দিলো মেয়েটা। কিন্তু ওটা যে শুধু কথার কথা ছিলো! আমি ফোরম্যান ছিলাম না, আমি ছিলাম ওই বৃদ্ধের একমাত্র ছেলে, আর ওই মেয়েটার হাজারো দস্যিপনার সঙ্গী!
ছটফটে ওই মেয়েটাকে ভালোবাসি আমি। কিন্তু...কিন্তু...তুমি জানো, কিন্তু কি! আমি যে কাউকে কোনোদিন বাধনে জড়াতে পারবোনা! সেবার বসন্তে র্যাঞ্চের পশ্চিমের দুই বিঘা ক্ষেতে বার্লির চাষ করেছিলাম। কথা ছিলো, র্যাঞ্চের ধারদেনা চার মিলিয়ন তুগরিক মেটাবো আমরা ওগুলো বেচে, এরপর আমাকে বেতন দেবে দাদু। তুলে আনার দুইদিন আগে ক্ষেত থেকে অধিকাংশ বার্লি চুরি হয়ে গেলো। আমি জানি কাজটা কার, কিন্তু, কোনো প্রমাণ ছিলো না। কাউকে না বলে উলানবাটার চলে গিয়েছিলাম আমি, দুই সপ্তাহের মাঝে পাচশ ডলার উপার্জন করে এনেছিলাম, অন্য একদিন সেকথা শোনাবো তোমাকে। যেদিন ফিরে এলাম, র্যাঞ্চের সামনে আমার দুই হাত ধরে অঝোরে কেদেছিলো মার্গারিতা। আমার পুরোটা পৃথিবী সেদিন উলটপালট করে দিলো সে।
র্যাঞ্চে ফের ঢুকতেই দাদু কানমলা না দিয়ে ছাড়লোনা আমাকে। একদম লাল করে ছাড়লো। আমার অবস্থা দেখে বাড়ীর কর্তা-কর্ত্রী একপ্রকার টেনে নিয়ে গেলো রান্নাঘরে। সকালের বেচে যাওয়া খাবারটুকু তড়িঘড়ি করে গরম করে দিলো আমাকে ফের মার্গারিতা। আমি খেতে খেতেই দুজনের একগাদা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলাম। এদিকের খবরও জানতে পারলাম তখন। দুপুরে আমাকে খুজতে মার্গারিতা গোসসা ভেঙে বার্লিক্ষেত, এবং তার আশেপাশের এলাকা চষে ফেলেছে। কোথাও পায়নি, না আমাকে, না আমার সাইকেলটা। মার্গারিতা অবশ্য স্বীকার করলোনা, তবে দাদু বললো স্প্যানিশ মেষপালিকা র্যাঞ্চে ফিরে এসে কেদে বুক ভাসিয়েছে, ধরেই নিয়েছে আমি আজীবনের জন্য চলে গেছি র্যাঞ্চ ছেড়ে, কাউকে কিছু না বলে। বোকা মেয়েটার বুদ্ধির হাল দেখে আমিতো হেসেই বাচিনা! অন্তত চিলেকোঠায় যেয়ে দেখলে বুঝতো, আমার যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি রেখে আমি এই পৃথিবীর কোথায় যেতে পারি? দাদুও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি ব্যাপারটা, কিন্তু সে জানতো আমি ফিরবো। মার্গারিতা তার কথা বিশ্বাস করেনি অবশ্য, চিলেকোঠায় আমার কামরায় যেয়ে বসে থাকতো ঘন্টার পর ঘন্টা, যদিও এটাও সে অস্বীকার করলো। দুজনে মিলে অবশিষ্ট বার্লিগুলো কেটেছে, মাত্র একদিন আগে তা শেষ হয়েছে। সব আটি দিয়ে রাখা আছে ক্ষেতের পাশে। আজ থেকে সেগুলো র্যাঞ্চে আনার কাজ শূরু হবে। প্রথমে দাদুর পরিকল্পনা ছিলো, ক্ষেত দেখেই বার্লি বেচে দেয়ার। কিন্তু এখন অতবড় একটা ধাক্কা খাওয়ায়, সেগুলো আমরা মাড়াই করে বিক্রি করবো। এতে বেশ খানিকটা বাড়তি পয়সা উঠবে, কিন্তু খাটনিও হবে বেশ। খাটনি? দাদুকে বললাম, সামনের পাহাড়টা কেটে রাস্তা করতে বললেও সেটা আমি করে ফেলবো, ও নিয়ে তুমি ভেবোনা। বলতে বলতেই আমার পকেট হাতড়ে টাকা বের করলাম। প্রায় দেড় মিলিয়ন তুগরিক বেচে ছিলো তখন আমার পকেটে। দুজনে আমার কাজের কথা শুনলেও, টাকার পরিমানের ব্যাপারে কোনো ধারনা ছিলোনা। এক সপ্তাহে কি আর এমন করে ফেলেছি, লাখখানেক তুগরিক হয়তো? হা করে চেয়ে রইলো দাদু, আর মার্গারিতা হাততালি দিয়ে উঠলো।
‘সিনর, তুমি তো এই টাকা দিয়ে আরামসে রাশিয়া চলে যেতে পারবে, সেখানে যেয়েও কয়েকমাস রাজার হালে চলতে পারবে!’
‘তাই বুঝি?’ মুচকি হাসলাম ‘কখনো পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ হলে তোমাকে বলবো, দেড় মিলিয়ন তুগরিকে কয়দিন চলা যায় রাশিয়ায়। এখন দাদু, এটা তোমার ভাড়ারে রাখো’ স্থবির বুড়োটার আলখাল্লার পকেটে টাকাগুলো গুজে দিলাম।
‘ও কি?’ সচকিত হয়ে উঠলো দাদু!
‘তুগরিক। আরে এটা র্যাঞ্চের পয়সা, আমার না।’
খানিকক্ষণ নীরবতা, আমাকে বিব্রত করতেই যেনো হবে তাদের!
‘তুই অদ্ভুত লোক, ট্যান’ আর কিছু বের হলোনা বুড়োর মুখ থেকে। মার্গারিতা মুচকি হাসলো।
‘খাইছে! এই মার্গো, দাদু এই কথা শিখলো কোত্থেকে? সর্বনাশ’ দাত বের করে উচ্চশব্দে হাসতে রইলাম আমি, আর আমার সাথে নিমেষে যোগ দিলো মার্গারিতা, বৃদ্ধ লোকটা দুইচোখে স্নেহের বৃষ্টি ঝরিয়ে নিয়ে চেয়ে রইলো আমাদের দিকে।
‘সিনর’ মার্গারিতা হাসি থামিয়ে বলছে ‘তুমি সত্যি অদ্ভুত লোক। জীবনের সবচে বড় স্বপ্নটা তাড়া করতে বেরিয়ে যেই কারনে আটকে পড়লে, তার সমাধান হাতে পেয়েও এভাবে হেলায় হারাচ্ছো?’
‘আমি জানি আমি কি হারাচ্ছি, আর কি পাচ্ছি সেনোরিতা’ হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলাম ওকে ‘ কত কাজ পড়ে আছে, মনে করে দেখো শুধু। জলদি চলো, বার্লি ক্ষেতে যাবো। তার আগে অবশ্য আমার এসপেরানজাকে উদ্ধার করতে যাবো বাতসাইখানের র্যাঞ্চে, কিন্তু তারও আগে, আমি দুই ঘন্টা ঘুমাবো! শেষ কবে ঘুমিয়েছি মনে নেই, দিব্যি! ’
দুই ঘন্টার কথা বলে ঘুমালাম প্রায় চার ঘন্টা। দুপুরবেলা মার্গারিতা আক্ষরিক অর্থেই টেনে উঠালো আমাকে বিছানা থেকে। দুপুরের খাবার শেষে ও লিফট দিলো ফের, ওর আপালুসা ঘোড়াটায়, আরমোনিয়ায়। আমার তখন মাথা ঝিমঝিম করছে, হাতের পেশীতে ব্যাথা করছে, চোখদুটো কটকট করছে, কিন্তু মনের মাঝে কি যে এক প্রশান্তি! আমি কয়েক সেকেন্ড পরপর শুধু মার্গোকে দেখছি, অসংখ্য বাহানায় শুধু সেদিকেই বারবার ফিরে তাকাচ্ছি, প্রতিটা মুহুর্ত অসম্ভবরকম বিলম্বিত হয়ে উঠলো, যখন আমার চোখদুটো তার দৃস্টিসীমায় মঙ্গোলিয়ার দিগন্তবিস্তৃত ঘাসের প্রান্তর, সোনারংমাখা পাহাড়সারী, আর ঝকঝকে নীল আকাশ খুজে পাচ্ছে, কিন্তু মংগোলিয়ান মেষপালিকার মায়ায় ভরা, সরল মুখটা, চেপে বসা ঠোটজোড়া, বোচা নাকটা, মোহনীয় চোখজোড়া খুজে না পাচ্ছে, দমটা যেনো ফুরিয়ে আসছে, মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠছে! যখনই সে তা খুজে পাচ্ছে, কৈশোরের লাগামহীন হৃদয়ের মত উদ্বেলিত হয়ে উঠছে বুকের মাঝে, বইছে এক অজানা খুশীর ফুল্লধারা, নিজের অজান্তে চোখ দুটো হয়ে উঠছে জাগ্রত, প্রশস্ত! সে এক অবিশ্বাস্য অনুভুতি। মার্গারিতা আল্ভারেজ কিন্তু এসব কিছুর ধার ধারে না। সে পুরোটা পথ বকবক করে গেলো, কি যে বললো, সে নিজেও কিছু জানেনা, আর আমার মনটাও যে তখন কোথায় হারিয়েছিলো, সেকথাও আমি জানি না।
আমাকে বাতসাইখানের র্যাঞ্চ থেকে বেশ কিছুটা আগে, একটা টিলার উপর নামিয়ে দিলো সে। আমি তিনবার পিছনে ফিরে মার্গারিতাকে দেখেছি। ও টিলাটার অন্যপাশে লাগাম ছেড়ে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসে অপেক্ষা করবে আমার ফিরে আসার। আর আমি অদ্ভুত চরিত্র জনাব বাতসাইখানের কাছ থেকে আমার সাইকেলটা নিয়ে এলাম, সেইযে রেখে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে তাকে ধন্যবাদ জানাতে হলো, আমাকে ব্যাক্তিগতভাবে করা তার সাহায্যের জন্য। কিন্তু তবু গোয়ার লোকটা বার্লির ব্যাপারে কিছু বলতে নারাজ, নিজের দুটি ভিন্ন সত্বার মাঝে বড় সাবধানে এক সীমারেখে বানিয়ে রেখেছে সে।
আমি বার্লিক্ষেতে ফিরতেই শুরু হলো ফের আরেকদফা চোখমুখ বন্ধ করে খাটনি। বার্লির গাছগুলোকে আটি বানিয়ে বাধা হলো, সেই কাজ করলাম আমি আর মার্গারিতা। দাদু করলো পরিবহনের কাজ। আমাদের ছোট্ট ওয়াগনে একবারে চার আটির বেশী যাচ্ছেনা। আটিগুলো বানাতে বানাতেই দাদু র্যাঞ্চে গিয়ে আবার ফেরত আসে। পরের তিনটা দিন টানা আটি বাধা-আটি ওঠানো-আটি পরিবহন পর্ব শেষে আমাদের ইয়াকটা কাজে লাগানো হলো। আমার দাদার মুখে শোণা গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের ইয়াক সংস্করণে আমি নিজে হলাম রাখাল। ওই বেচারার উপরেও গেলো বেশ ধকল। তবে একদিন দুপুরে ঠিকই আমাদের তিনটের একটি গোলাভর্তি বার্লির শস্য উপচে পড়লো। দেড় একর জমির তিন ভাগের একভাগ ফসল আমরা তুলতে পেরেছি। তখন দাদু ফের গেলো আনাক র্যাঞ্চে, এবারও একা, ফিরে এলো একগাল হাসি নিয়ে। পরদিন বড় একটা মোটরকার ওয়াগন এসে আমাদের গোলা খালি করে নিয়ে গেলো বার্লি, আর অন্য একটা পিকআপ ট্রাকে ওঠানো হলো খড়ের পাঁজা। সেদিন বিকালেই মার্গারিতাকে একা রেখে দাদু আমাকে নিয়ে চললো বাতসাইখানের র্যাঞ্চে। চার মিলিয়ন তুগরিক আমার পকেটে। মার্গোকে পইপই করে বলে দেয়া হয়েছে, ও যেনো উঠোনের সীমানা পার না হয়। ভ্রু কুচকে তাকিয়েছে, কিন্তু মেনে নিয়েছে সে।
বাতসাইখান ভ্রু কুচকে তাকালো বৃদ্ধের পানে। মোটেও খুশী হয়নি তাকে দেখে। দাদুর ওতে কোনো পাত্তাই নেই, আজ তার হারানোর কিছু নেই। পুরনো বন্ধুর র্যাঞ্চে ঢুকে সে কোনোকিছু নিজের মনে করতে কার্পন্যবোধ করলোনা। নিজ থেকে রান্নাঘর থেকে পানি এনে বসে পড়লো নিজে টেনে বের করা একটা চেয়ারে। খোশমেজাজে বন্ধুপুত্রের কুশল জানতে চাইলো। যদিও সাড়া পেলোনা অন্যপ্রান্ত থেকে, কিন্তু তাতে কি! দাদুকে অত স্ফুর্তিতে কখনো দেখিনি আমি।
‘তো, চাচা, কিজন্যে এসেছেন?’ বাতসাইখান সোজা সাপটা কথার লোক।
আমাকে দৃশ্যপটে ঢুকতে হলো তখন। আমার কানে ইতিমধ্যে নিজের-ই বলা একটা বাক্য সজোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার একমাত্র শ্রোতা আমি শুধু শুনছি মার্গারিতাকে দেয়া আমার ওয়াদা- চতুর্থ চাঁদের প্রথম দিন বাতসাইখানের মুখের উপর ছুড়ে ফেলবো আমি চার মিলিয়ন তুগরিক। নিজের অজান্তেই উপরে চোখ উঠে গেলো আমার। আজ কি চতুর্থ চাঁদের প্রথম দিন? সম্ভবত না। কিন্তু তাতে কি! সবসময় যে সবকিছু আক্ষরিকভাবে সমন্বয় রেখে ঘটবে, তা কে বলেছে? ঠিক একইভাবে, বাতসাইখানের মুখের উপর ছুড়ে ফেলতে পারলাম না আমি টাকাগুলো। বলার সময় যা-ই বলে থাকি, আমি সবসময় চেস্টা করি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে সম্মান করতে।
‘বাতসাই ভাই’ আমার পকেট থেকে নোটের তাড়াগুলো বের করে এগিয়ে দিলাম ‘দাদু কথা দিয়েছিলো তোমার বাবার কাছ থেকে ধার করা টাকা সে শোধ করবে তিন মাসের মধ্যে। তোমার নিশ্চই কোনো অভিযোগ নেই এই ব্যাপারে?’
‘কত ওখানে?’
‘তুমি যা পাও, তার পুরোটাই আছে’
‘আরে দে না ওর হাতে, গুনে নিক। বাপ মা মরা ছেলে, ওর আর কি আছে। হিসেব ঠিকঠাক রাখতে হবে যে। গুনে নে বাছা, গুনে নে’ দাদু খোশ মেজাজে পরামর্শ দিলো।
তবে টাকা গুনলোনা বাতসাইখান। ওগুলো নিয়ে শুধু এমন একটা ভংগি করলো, যাতে বোধ আছে এমন যে কেউ বুঝতে পারে, সে আমাদের চলে যেতে বলছে। দাদু এমন বেয়াদবি সহ্য করলোনা অবশ্য।
‘কি রে! তোর বাপটার যে মান সম্মান ছিলো, কিছুই কি রাখবিনা? লোকে বলবে কি? অলতানের ছোটছেলে বাতসাইখান বাপের বয়েসী লোককে তাচ্ছিল্য করে!’
‘তাচ্ছিল্য?’ মুখ বাকিয়ে হাসলো বাতসাই ‘তুমি কোন মুখে ওকথা বলছো? তুমি কতটুকু সম্মানের যোগ্য চাচা? কি করেছো তুমি আমার নিরীহ বাপটার সাথে? তার মত আমাকেও বোকা বানাতে পারবে ভেবেছো?’
‘কি বলতে চাস?’
‘বিদেশী ছেলেটা তোমাকে পছন্দ করে। সেভাবেই থাক। আমি সত্যি চাইনা আর কিছু বলতে। কিন্তু তুমি বাধ্য করলে কি করবো জানিনা।’
‘মুখটা সামলে রাখতে শেখ বাতসাইখান। আর আমাকে খেপাস না বলে দিলাম।’
হ্যাচকা টানে আমাকে ঘুরিয়ে দিলো বুড়ো সদর দরজামুখো। সে নিজে গটগট করে হেটে এগোলো আমার আগে। আমার আরমোনিয়া যখন বায়ারকে অনুসরন করে রুক্ষ পথটা ধরে র্যাঞ্চের পথে এগোচ্ছি, দাদু তখনো নিশ্চুপ। আমার দিকে তাকাচ্ছেনা। অথচ সেদিনটা ঝকঝকে রোদমাখা, মায়াবী বাতাসের উদ্বলিত একটা দিন। আমি তাই এগিয়ে গেলাম দাদুর ঘোড়াটার পাশে।
‘শোনো বুড়ো’ আমার কন্ঠে উচ্ছলতা ‘ইয়ো তে আমো! মানে জানো? আমি তোমাকে ভালোবাসি। এরমানেও জানো না? বি চামদ হাঁইরতাই। আমি যাকে ভালোবাসি, তা নির্ভর করে কিসের উপর জানো? সে আমার সাথে কি করলো, তাই। আমি সাধারনত লোকের কথায় কান দেইনা, বুড়ো। তুমি কি ভেবেছো? আমি বাতসাইখানের কথা শুনে কল্পনায় তোমার ভয়ংকর ভয়ংকর খারাপ সত্বাগুলো খুজে বেড়াচ্ছি? এটা না করা আমার সারাজীবনের সাধনা। দাদু, তুমি যদি এখন না হাসো, সত্যি বলছি আমার মন খারাপ হবে, খুব। আর আমার মন খারাপ হলে আমার খুবই খারাপ লাগে’
ফিক করে হেসে ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘোরালো বুড়ো। ফিরে তাকিয়ে গম্ভীরমুখে বললো ‘এদিকে আয়তো ট্যান! হা কর দেখি, তোর নতুন দাতগুলো সব গজিয়েছে কিনা!’
‘আমাকে শিশু মনে হয় নাকি তোমার? দাত গজিয়ে দুটো খসেও গেছে ইতিমধ্যে। আমরা সমান সমান।’
‘বলিস কিরে?’ জাদরেল গলায় হাসলো বুড়ো।
‘আরও কি বলি শোনো। আমি আর মার্গারিতা আনাক র্যাঞ্চে যাবো কাল। তুমি বসে বসে ঝিমাবে উঠোনের গাছতলায়।’
‘এরপর?’
‘দুইটা গরু কিনবো’
‘দরদাম জানিস?’
‘জানিনা। কিন্তু তাতে কি, তুমি বলে দিও।’
‘ওরে গাধারাম! তিরিশ মাইল দূর থেকে আমি গরুর দাম বলে দেবো?’
‘আরেরে’ আমি জুলফি চুলকাতে লাগলাম। আসলে মার্গারিতার সাথে শেষ একটাবার মংগোলিয়ান প্রান্তরে চরতে চেয়েছিলাম। কোনো একটা বাহানা আসলেই দরকার ‘আচ্ছা, আমরা যেয়ে নাহয় একবার দেখে এলাম। পছন্দ করে আসি, পরদিন তুমি দরদাম করে নিয়ে এলে!’
‘তাহলে তুই একা গিয়ে দেখে এলি! মার্গারিতা না থাকলে আমি খাবো কি?’
‘আরে বুড়োটা’ বাংলায় বিড়বিড় করলাম প্রথমটুকু ‘আরে, তুমি...তুমি একবেলা রেধে খেতে পারবেনা?’
‘হুম!’ গভীর চিন্তার ভাব দেখালো বুড়ো ‘হঠাত তোর আনাক র্যাঞ্চে যাবার ব্যাপারে এত আগ্রহ! তাও আবার মার্গারিতাকে সাথে নিতেই হবে!’
‘কই আগ্রহ’ উত্তরের পাহাড়সারির দিকে তাকালাম আমি চট করে ‘আচ্ছা, তুমি যেতে চাইলে যাও’
মুচকি হাসলো বুড়ো। এরপরে পুরোটা পথ এই ট্রেইল, প্রান্তর তার কত পরিচিত, কত আপন, সেসব বিষয়ে বকবক করতে রইলো, আর আমি শুনতে রইলাম।
র্যাঞ্চের সীমানায় ঢুকতেই দূর থেকেই কেমন এক সুর শুনতে পেলাম। একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে গতি বাড়িয়ে উঠানে ঢুকেই দেখতে পেলাম অভাবনীয় এক দৃশ্য! দেখি মার্গারিতা সেজেগুজে বসে আছে সিডার গাছটার নীচে! চুল আচড়েছে পরিপাটি করে, এরপরে ছোট একটা ঝাকার মত চাঁদির একদম মাঝবরাবর এনে স্তুপ করে রেখেছে। নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছেনা, তবে ঠোঁটেও সম্ভবত লিপ্সটিক ঘষেছে, গোলাপিরঙা টারলিগটা গায়ে চাপিয়েছে, ওর একমাত্র কালচে জিনসটা পরনে। চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে নিপুন ভঙ্গিমায় ঠোঁট এবং হাতের আঙুলের দারুন দক্ষতায় মন ভালো করা এক সুর উঠিয়েছে সে ও কিসে? হারমোনিকা! আমাদের উপস্থিতি টের পেতেই থেমে গেলো সেই সুর, দৌড়ে এসে একরাশ স্প্যানিশ বলতে লাগলো সে।
‘ তোমা! মে আলেগ্রো! সোয়লা চিকা মাস ফেলিয দেল মুন্দো! ও দাদু, কি যে ভাল্লাগছে আমার, তোমাকে যদি বলে বোঝাতে পারতাম! অবশেষে আমাদের ঋণ শোধ হয়েই গেলো! ও সিনর ত্যান, তুমি আমাদের জন্য দেবদূতের মত! কোত্থেকে উড়ে এলে তুমি, কেনোই এলে, আর কিভাবে প্রাণ ফিরিয়ে আনলে আমাদের এই উঠানে, তা তো আমি কিছুই জানিনা, আমি শুধু জানি তুমি পৃথিবীর সবচে ভালো লোকদের একজন, আমি...আমরা তোমাকে ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি! তে আমো সিনর, তে আমো মুচো...চলো সিনর, আমরা একসাথে নাচবো এখন! এসো এসো। এই দাদু, এসো তুমিও এসোনা!’ হইহই করে আমাদের তিনজনকে প্রত্যেকের দুই হাতের পুর্ব-পশ্চিমে অন্যের দুই হাত ধরিয়ে রেখে একটা বৃত্ত বানিয়ে ফেললো অদ্ভুত মেয়েটা।
‘সারদানা, সিনর! দাদু পারে! আমি আর দাদু কত নেচেছি!’ চোখেমুখে আলোর ছটা নিয়ে কাতালুনিয়ার বিখ্যাত নাচের ছন্দে দুই পা তালে তালে দোলাচ্ছে সে! সাধারনত সারদানার সময় স্ফুর্তিলা স্প্যানিয়ার্ডরা গোল হয়ে দাঁড়ায় পাশের দুজনের হাত ধরে নিজের এক পা নির্দিস্ট তালে তালে উপরের দিকে ছুড়ে দেয়, একে একে আরও মানুষ যোগ দিতে থাকে, আর বৃত্তটা বড় হতেই থাকে, আমাদের সেই বিলাসিতা নেই, কিন্তু মনে আনন্দেরও যে অভাব নেই! বুড়োটা শিস দিতে শুরু করলো, আর মার্গারিতা তার মহাকাব্যিক(!) কন্ঠে গান ধরলো।
আমি হাসবো, আমি নাচবো,
আমি বাঁচবো, লা লা লা!
আমি হাসবো, আমি গাইবো,
আমি বাঁচবো, লা লা লা!
কখনো বৃষ্টি আসে,
মুছে দিতে সব দুখ!
কখনো এক ফোটাই পারে,
ফেরাতে সব সুখ!
কাঁদো কেনো, কোন সে কারন?
যদি পাও ব্যাথা, ভুলেই যাও বরং!
কেনো করো আফসোস, কোন সে কারন?
জীবনই যদি এমন, তবে বাঁচোও তেমন!
অদ্ভুত সেই গান। কথাগুলো কিভাবে যে মনে গেথে গেলো! মংগোলিয়ান সেই সন্ধ্যার আলোআঁধারিতে আমার ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে অপার্থিব দৃশ্যটা আমি কোনোদিনই ভুলে যেতে পারবোনা। আজ, এতবছর পর, বুকের ভিতর বিদীর্ন হয়ে যাওয়ার অনুভুতি হচ্ছে সেই সন্ধ্যার কথা ভেবে। মার্গারিতা ঘাস ফড়িঙের মত ছটফট করছিলো, ওর মুখটা এর আগে কোনোদিন অমন উজ্জ্বল দেখিনি। আমার বাম হাতে বৃদ্ধের জীর্ন শীর্ন হলদেটে হাতটা শক্ত করে চেপে বসেছিলো, নীরবে একরাশ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চলেছে সে আলিংগন, ডান হাতের কব্জিতে একমুঠি উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ছিলো আমার জীবনের সবচে বড় আনন্দ।
আমরা সবাই মিলে সেদিন রাতের খাবার খেলাম কলরব করতে করতে। সবার কত কথা! এতদিন তা কোথায় ছিলো, কে জানে। একদম শেষমুহুর্ত পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো, যতক্ষণ না আমার আচমকা মনে পড়লো, আমার বিড়ম্বনাহীন, নির্বিঘ্ন ফার্মিং জীবনটার কতটা কিনারায় চলে এসেছি। মার্গারিতা আর দাদুকে দেখে মনে হলো তারা ভিন্ন কোনো সময়ে, ভিন্ন কোনো জগতে আমার মগজের ভিতরে বিরাজ করছে, ওটা যেনো তাদের অশরীরি স্বত্বা, আমি কথা বললেও যেনো তারা তা শুনবেনা, আমি হাউমাউ করে কাঁদলেও তারা যেনো কোনো ভ্রুক্ষেপ করবেনা, আমি যেনো তাদের থেকে বহুহাজার মাইল দুরের কোনো অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা, মাথা কুটে মরছি, ওই মুহুর্তে নিজেকে আস্টেপৃস্টে জড়িয়ে নেয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু কোনো উপায় নেই! হাত বাড়ালেই যেনো তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে, আমি পতিত হবো অন্ধকারে, চারিদিকে তাকিয়ে দেখবোনা কিছুই, চিৎকার করবো, জবাবে শুধু তার প্রতিধ্বনিই বারবার, বারবার ফিরে আসবে আমার কাছে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। সব থেকেও কিছুই না থাকার অনুভূতি, মনটা যখন নিকট ভবিষ্যতকেই বর্তমান ভেবে নেয়। সম্ভবত অদ্ভুত আচরন করছিলাম ওই কিছু মুহুর্তে। কাধে ঘনঘন টোকা খেয়ে বাস্তবে ফিরে এসেছিলাম। দাত বের করে হাসলাম মার্গারিতার দিকে চেয়ে।
‘গ্রাসিয়াস, সেনোরিতা, গ্রাসিয়াস মুচেস!’
‘কেনো কেনো?’
‘সবকিছুর জন্য’
‘কোন সবকিছু?’
‘জানিনা’
‘দাদু, দেখো দেখো, আমাদের সিনর ত্যান ফের একবার হোমসিক হয়ে পড়েছে। সিনর, তুমি কেনো করো আফসোস, কোন সে কারন? জীবনই যদি এমন, তবে বাঁচোও তেমন! …’ কথার মাঝেই সুর দিয়ে গান গেয়ে উঠলো মেয়ে। ফের একবার হারমোনিকা বাজাতে শুরু করলো, সুরটা একাধারে করুন, এবং আনন্দে হৃদয় পুর্ন করে দেবার মত।
এরপরের দুইটা দিন আমি সত্যি সত্যি ছুটি নিয়ে নিলাম র্যাঞ্চ থেকে। দাদুকে, এমনকি মার্গারিতাকেও বলিনি কোথায় যাচ্ছি। গেলাম আমি আসলে মাতাল হাওয়ার উপত্যকায়, ঐ নামই আমি দিয়েছি মার্গারিতার সবচেয়ে পছন্দের জায়গাটির। সেখানে যেয়ে তুমুল বাতাসের গর্জন উপেক্ষা করে নিজের সাথে কথা বলে ঠিক করে ফেললাম মংগোলিয়াতে আমার বাকিটুকু যাত্রাপথ। একটা দিন বেছে নেবো, জানিনা সেদিন কতটা বিমর্ষ হয়ে পথে নামবো, কিন্তু আমি সেদিন রওনা হবো দক্ষিনমুখী, গোবী মরুভুমির উপকণ্ঠ বরাবর। সেখানে যেয়ে যা হবার হবে, অতঃপর রাশিয়া। তবে সেই দিনটির আগে আমাকে আরও বেশ কিছু কাজ বাকি।
সুতরাং পরদিন দাদুকে নিয়ে গেলাম আনাক র্যাঞ্চ। এতদিন ধরে নাম শূনে এসেছি, আমার কল্পনার চোখে আনাক ছিলো বিরাট কিছু একটা। অথচ গিয়ে হতাশ হতে হলো! কি ভেবেছিলাম, আর কি দেখলাম! এমনকি আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিনের সীমানা ওটার চেয়ে বড়। তফাত শুধু, ওখানে পাকা রাস্তা আছে, তাই আশেপাশের শহরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে তারা। তাদের ব্যাবসা মুলত নিজেদের পন্যের চেয়ে অন্যের উপরেই বেশী নির্ভরশীল। ওই যেমন দাদু তার ভেড়ার উল বেঁচে শতকরা তিন শতাংশ দিয়ে এসেছে জনাব আনাকবাটারকে। কপাল আর কাকে বলে! বেশ ঈর্ষাও হলো আমার। পরমুহুর্তেই মনে পড়ে গেলো, সেকি, আমার ঈর্ষা করলে চলবে? আমাকে তো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বিনীত মানুষ হতে হবে। পাহাড়ের মত মৌণ-মহান, আকাশের মত উদার হতে হবে। নাহলে আমি বাড়ি ফিরবো কোন মুখে! সুতরাং, ঈর্ষা আমি করলাম না। বৃদ্ধ জনাব আনাকবাটারের সাধা কফি পান করতে করতে দাদুর সাথে তার খোশগল্পে সুযোগ পেলেই যোগ দিলাম! এরপরে গেলাম গরু দেখতে। ভিডিও গেম খেলতে যেয়ে দেখেছি অমন গরু, নাম শুনলাম হালিন-গোল! খয়েরী রঙের অদ্ভুত নিরস চোখের গোলগাল গরুগুলো দুধ দেয় বালতি ভরে! আমাদেরতো তাই-ই চাই! একজোড়া দম্পতিকে আমাদের করে নিলাম দাদু আর আমি। মেয়ে গরুটা এতটাই ভদ্র যে, সে আমাকে পেটে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে অভিবাদন জানালো। সাথে সাথেই আমি ওর নাম দিয়ে দিলাম- বাহো! স্প্যানিশ শব্দটার অর্থ নম্রভদ্র।
তিরিশ মাইল পথ ওদের একদিনে হাটিয়ে নিতে চাইনি আমি। কিন্তু মার্গারিতা রাতে একা থাকবে, সেটাও মেনে নিতে পারিনি। দাদুকে পাঠিয়ে দিলাম আমি তাই তার বায়ারসমেত, যদিও বুড়ো গাইগুই করলো! আমি দিব্যি আরমোনিয়া আর গরু দম্পতিকে নিয়ে তাবু গাড়লাম মাঝপথের এক পর্বতচুড়ায়। বহুদিন পর একা তাবু খাটানো হলো। দাদু দিগন্তে হারিয়ে গেলো, আর আমি কেদে ফেললাম। আকাশের দিকে চেয়ে অসংখ্য তারা গুনতে রইলাম, একটা বিশেষ তারার দিকে আধঘন্টাযাবত চেয়ে ভাবতে রইলাম তার জন্মদিনে আমি কোথায় ছিলাম। খানিক পরেই মনের মাঝে নানা অনুভুতির স্রোত, হৃদস্পন্দন হয়ে এলো দ্রুত, আরও দ্রুত। এইতো সেই পুরনো আমি। এখনো হারিয়ে যাইনি।
সকালে আলো ফোটার আগেই রওনা হয়ে সতেরো মাইল আপাত ঢালু পথ খুব জলদিই পাড়ি দিয়ে ফেললাম। ঠিক নাশতার আগেই পৌছে গেলাম, নাকি তারা দুজন আমার জন্য অপেক্ষা করে বসেছিলো, তার আর খোজ নেয়া হয়নি, শুধু নতুন গরুদুটোকে গোয়ালে গোয়ালস্থ করার উত্তেজনাটুকুই মুখ্য ছিলো সবার জন্য। আমি গরু-বউয়ের নাম বাহো দিয়েছি শুনে মার্গো গরু-জামাতাকে ডাকলো বাহমব্রে! স্প্যানিশ যুক্তাক্ষরের কারিকুরিতে না যেতে চাইলে সোজা বাংলায় ওটার অর্থ ভদ্রমানুষ। গরু দম্পতি দুধ দেয়া শুরু করলে একটানা দুইশ দিন কয়েক লিটার করে দুধ বিক্রি করতে পারবে দাদু। সেই টাকা আর কাউকে দিয়ে দিতে হবে বলে জমাতে হবেনা, মার্গারিতা চাইলেই একটা নতুন নীল রঙের জিনস কিনতে পারবে, হাটগাল যেয়ে একবাক্স সাজগোজ কিনে আনতে পারবে, সেকথা ভেবে আনন্দে হেসে ফেলি আমি।
সেরাতে এক মুহুর্তও ঘুমাইনি আমি। তিনজনে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছি উঠানের সিডার গাছটার নীচে বসে। দাদু আর মার্গারিতা যখন ঘুমিয়ে পড়েছে বলে একদম নিশ্চিত, আমি তখন আস্তাবলে ঢুকেছি দীর্ঘযাত্রার জন্য প্রস্তুত আমার প্যানিয়ারটা নিয়ে। বহুদিন পর ক্যারিয়ার-প্যানিয়ার জুড়ে দিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে গেলো আমার এসপেরানজা। বাইকটার ধাতব, শীতল দেহে হাত রেখে, হাটু গেড়ে, টপ টিউবের সাথে মাথাটা ভর দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম কিছুক্ষন। ফিসফিস করে উচ্চারন করলাম- ‘আমরা আবার বেরুবো পার্টনার! আমরা দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াবো, অজানা পথে...শিহরণ খুজবো। আমি আসছি, তুমি একটু অপেক্ষা করো!’
চিলেকোঠায় ফিরে কাপড় পাল্টে শেষবারের মত ছোট্ট কামরাটার বিছানায় বসে খোলা জানালা দিয়ে দিগন্তবিস্তৃত মংগোলিয়ান ঘেসোপ্রান্তরের দিকে চেয়ে রইলাম। শা শা শব্দ করে তুমুল এক নেশাধরানো বাতাসের ধারা বইছে, কাত হয়ে উড়ছে ঘাসের দঙ্গল। বাতাসের ওই শব্দ ছাড়া সামান্যতম আর কোনো সাড়া নেই কোথাও। নীরব, নিশ্চুপ, রহস্যময় আলোআঁধারিতে ঢাকা চাদনী রাতের পৃথিবী। নির্জনতাটুকু স্নায়ুর উপর চেপে বসতে গিয়েও বসছেনা, অজানা এক শিহরণ এসে ভর করলো শরীরে, ধমনীতে রক্তপ্রবাহ ছলকে উঠলো, দিব্যি অনুভব করলাম। চুপ করে বসে থাকতে খুব ইচ্ছা করছে, কিন্তু আমার তখন খুব তাড়াহুড়া করতেও মন চাইছে। ওভাবে যেনো আমি আজীবন বসে থাকতে পারতাম, চেয়ে থাকতে পারতাম জানালার ওপাশে, প্রায়শই আমাকে ধাক্কা দিয়ে যেতো একদল রোমাঞ্চ! আমাকে ঐ মুহুর্তে দেখলে অবাক হতো যেকোনো মানুষ। অনেক সময় নিয়ে জুতোজোড়া পায়ে গলিয়ে আর একটাবারও পিছনে না তাকিয়ে নিঃশব্দে নেমে এলাম দোতলায়। খুব সন্তর্পনে, অনেকটা পিপড়ের গতিতে মার্গারিতার কামরার দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। কয়েক মুহুর্তের দ্বিধার পর সত্যিই ভেড়ানো দরজাটা খুলে ভিতরে চলে গেলাম। দেয়ালে ম্যান্টেলপিসটা ঝুলছে- একজন মংগোলিয়ান তরুণী তার মাস্টাং ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে, আর ঘোড়াটা সামনের দুই পা উপরে তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এমন এক অপুর্ব জলছবি সেই ম্যান্টেলপিসে। বই রাখার তাকগুলো প্রায় শুন্য। লেখিকা মার্গারিতার ছোট্ট ডেস্কের উপর কতগুলো কাগজ অযত্নে বিছিয়ে রাখা। মেয়েটা মেঝেতে বিছানা ফেলে ঘুমায়, কারন ঘুমের মাঝেও স্থির হয়ে থাকতে পারেনা সে, খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়। মেঝেতে একটা ম্যাট্রেস পাতা, গোলাপি একটা চাদর বিছানো আছে তার উপর। ওইতো মার্গারিতা আল্ভারেজ দে লা রোসা। গোলাপের মত যে মুক্তা। পশ্চিমের জানালা চুইয়ে এসে স্বর্গের পরীদের মত সুন্দর মুখটাকে নিজের সবটুকু মহিমায় উজ্জ্বল করেছে আকাশের চাঁদটা। শীতকাল চলে গেছে। কিন্তু মার্গারিতা অভ্যাসবশত আমার স্লিপিং ব্যাগটা গায়ে জড়িয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছে, এক হাত ভাজ করে গালের নীচে রেখেছে, লাইলাক ফুলের সুবাসে সুবাসিত তামাটে চুলগুলো ইতস্তত কপালের উপর ছড়িয়ে আছে, টানা, গভীর নিঃশ্বাসের নিয়মিত শব্দ ভাসছে বাতাসে। আমি মোটেও কাদিনি তখন। সামান্যতম মন খারাপের অনুভুতিও আসেনি। বরং যা এসেছিলো, তা হচ্ছে পৃথিবীর পবিত্রতম অনুভুতিটি দ্বারা চালিত এক অপার্থিব প্রেরণা, হালকা রাইডিং জার্সি চুইয়ে চামড়ায় লাগা বাতাসের ধারাটাকে মনে হচ্ছিলো বেহেশতের সমীরন। পকেট থেকে ছবিটা বের করলাম। আরও একটা কাগজ ছবিটার সাথে করে মেয়েটার হাতের কাছে রেখে দিলাম, যাতে ভাঙা স্প্যানিশে আমি লিখেছিলাম- “তুমি ভালো থেকো সেনোরিতা। সবসময় হেসো, কখনো কেদোনা, ঠিক যেই দুরন্ত মেয়েটাকে আমি বন্ধু হিসেবে পেয়ে জীবনের সেরা মাসগুলো কাটিয়েছি তার সাথে, ঠিক অমন...বিদায়!”
নীচতলায় নিজের বদ্ধ কামরায় দাদু ঘুমাচ্ছিলো নাক ডাকিয়ে। তার জন্য লেখা চিঠিটা আরও ছোট। ইংরেজী হরফে বাংলায় লিখেছিলাম- “তোমাকে ভালোবাসতাম, বুড়ো।” মার্গারিতা অনুবাদ করে দেবে ওটা তাকে। ওকে আমার শেখানো বাংলা ভাষার পরীক্ষাটাও হয়ে যাবে এতে। জীবনে ওই শেষবার আমি বৃদ্ধ ওটগোনবায়ারকে দেখেছিলাম। বেশীক্ষণ থাকার সাহস হয়নি, বুড়োর ঘুম খুবই পাতলা। আস্তাবলে ফিরে আরমোনিয়ার কেশর এলোমেলো করে দিলাম, আপালুসা ঘোড়াটাকেও এরপর আর কোনোদিন দেখিনি। মেয়েটা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলো, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। ও কোনো শব্দ করলোনা, থুতনিটা বাড়িয়ে ঘষে দিলো আমার মাথার সাথে। ব্যাস, আর একমুহুর্তও দেরি করিনি তারপর। ক্রমেই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে থাকা পুবাকাশের দিকে ত্রস্ত দৃস্টি ফেলে আমি চড়ে বসলাম এসপেরানজায়। আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রাটার শুরু করলাম নিজের অজান্তেই।