নভেম্বর '২২
ট্যান-মার্গো যাবে হাটগালঃ চলো সিনর, চলোও...
নাশতার টেবিলে মার্গারিতাকে বললাম, আমরা একটু বাইরে যাবো।
'কোথায় যাবো?' বড় এক টুকরো রুটি কামড়ে নিয়ে জিগ্যেস করলো ও নিরাসক্ত ভংগিতে।
বুড়োর দিকে তাকালাম একবার। এরপর মার্গোর দিকে ফিরে বললাম
'হাটগাল'
' কি?' চিবানো বন্ধ হয়ে গেছে ওর।
'হাটগাল যাবো আমরা দুজন, ভেড়াদের জন্য শিয়ারিং মেশিন কিনতে, আর র্যাঞ্চের বেড়ার জন্য কাঠ অর্ডার করতে'
বুড়োর দিকে একবার তাকালো মার্গারিতা। এরপরে দুই কামড়ে ওর বাকি খাবারটুকু গিলে নিয়ে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলার চেস্টা করলো 'তাহলে উঠছো না ক্যানো! হাটগাল কতদুর, কিছু জানো তুমি?' বলেই চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে উঠে ছুটে গেলো বাইরে। তিরিশ সেকেন্ড পরেই ফিরে আসলো এটো বাসনকোসনের কথা মনে পড়ায়।
প্রতিদিন খাবার শেষে বেশ সময় নিয়ে আইরাগ খাই আমি৷ মার্গারিতা তাই সেদিন ওই জিনিস বেরই করলোনা। বললো, আজ বানানো হয়নি আইরাগ। মুচকি হেসে নিজেই ঢেলে নিলাম জগ থেকে। ইচ্ছে করে আরও দেরী করলাম আজ, আর ও চোখ গরম করে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।
'সন্ধ্যার পর দশ মিনিট দেরী করলে ঘরে ঢুকতে দেবোনা' শাসালো বুড়ো৷
তাতে থোড়াই কেয়ার করে উপরতলায় নিজের ঘরে গেলো মার্গারিতা৷
যখন নেমে এলো, দেখা গেলো নিজের সবচেয়ে সুন্দর টারলিগটা পরেছে সে-মংগোলিয়ার ঐতিহ্যবাহী গ্রীষ্মকালীন পোশাক -ফিকে গোলাপী রঙের৷ প্রায় হাটু পর্যন্ত লম্বা রোবটার উপর শক্ত করে কোমরে পেচিয়েছে বেল্ট, গলার কাছে রংচঙে নকশা করা। আনকোরা নতুন একটা কালচে, টাইট জিনসের সাথে পায়ে চাপিয়েছে খয়েরী রঙা মলিন একটা চামড়ার বুট। হ্যাটের নীচ দিয়ে কাধের উপর বেরিয়ে এসেছে দুইটা বেনী৷ ওর মুখের দিকে চোখ পড়তেই দারুন চমকে গেলাম! ঠোঁটদুটোতে লিপ্সটিক ঘষেছে মার্গারিতা, জামাটার সাথে মিলিয়ে, গোলাপি রঙে ! ওর যে ওই জিনিস আছে, তাইই কোনোদিন ধারনা করতে পারিনি।
মার্গারিতা সাধাসাধি করেও আমাকে ওর ঘোড়ায় ওঠাতে পারলোনা। আমি এসপেরানজার পিঠে চড়েই যাবো হাটগাল। বুড়োর মুখে শুনেছি, আশেপাশের শত মাইলের মধ্যে সবচে বড় শহর ওটা, র্যাঞ্চ থেকে পশ্চিম দিকে। তবে পথ বহু গোলমেলে। সাত সকালে রওনা দেয়ায়, সুন্দর, তাজা একটা অনুভুতি এসে গেলো দুজনের মাঝেই। মাঝেমাঝেই কথা বললেও, অধিকাংশ সময় দুজনেই চুপচাপ শুনে গেলাম বাতাসের টানা শনশন, আর দেখে গেলাম পথের দুপাশের অপরুপ শোভা। দুপুর, আর সন্ধ্যার খাবার আরমোনিয়ার স্যাডলব্যাগে করে নিয়ে এসেছে মার্গারিতা। সাথে করে আমার তাবু আর স্লিপিং ব্যাগটাও নিয়ে এসেছি। কিজানি যদি অচেনা ওই শহরে যদি নিতান্তই রাতে থাকার প্রয়োজন হয়, আর থাকার জায়গা খুজে না পাই! প্রথম বিশ মাইল পথ ঘাসে ঢাকা সমতলভুমি পার হয়ে আসার পর শুরু হলো পাহাড়ি চড়াই। এখানে আরমোর কাছে হেরে গেলাম আমি। মার্গারিতাকে বললাম, ও যেনো চুড়ায় পৌছে আমার জন্য অপেক্ষা করে। অবশ্য, একা যেতে সে রাজী হলোনা, আমার সাথেই লটকে রইলো, এবং প্রায়শই অর্থহীন কথা বলে যেতে রইলো । ঘোড়াটাকে প্রায় হাটার গতিতে ছুটিয়ে নিতে হলো ওকে, ওদিকে আমার তো দম ফুরিয়ে যায়! ঘন্টা দেড়েক লাগলো সাত মাইল লম্বা চড়াই বাইতে। তবে আর নামতে হলোনা, মানে আসার সময় চড়াই পড়বেনা! ভালো খবর। আরো পঞ্চাশ মাইল পথ সামনে।
‘সিনর, ধরো, আমরা হাটগাল না যেয়ে, উল্টো পিছনে ফিরে এই পথ ধরে সোজা চলতেই রইলাম। তখন কি হবে? ‘ দীর্ঘ এক নীরবতা ভেঙে এই কথা জিগ্যেস করেছিলো মেয়েটা।
’নির্ভর করছে তুমি কি করবে তার উপর’
‘আমি কি করবো?’
‘আমি কি করে বলি বলো। তোমার মন যা চায়’
‘আমার মন কি চায়?’
চট করে তাকালাম ওর দিকে। নাহ, হাস্যরসের চিহ্ন নেই চেহারায়। চোয়াল শক্ত করে সামনে তাকিয়ে আছে। সোজা একটা মেঠোপথ, সামনে বহুদুর পর্যন্ত কোনো বাক নেয়নি সেপথ।
‘হয়তো কখনো থামতে চায়না। তবে তুমি কি বলেছো সম্ভবত বুঝতে পেরেছি। আলতেন্তসেতসেগ থেকে সোজা পূর্বে রাশিয়ার শেষ বড় শহর ভ্লাদিভস্টক। ওখানেই কোথাও আছে অ্যানা গ্রাম। ‘
‘তুমি ভুল ভেবেছো। এমনকি ওকথা আমি জানতাম ও না’
‘ঠিক আছে। তাহলে হয়তো তোমার মন চাইবে সোজা জাপান সাগরে ভেসে পড়তে। প্রশান্ত মহাসাগর পার করে এরপর চলে যাবে তুমি আমেরিকায়। আমেরিকার পূর্ব উপকুলে পৌছেও যদি না থামো, তুমি আটলান্টিকে ভাসবে আবার, এরপর হয়তো চলে যেতে চাইবে সোজা স্পেনের পশ্চিম উপকুলে। কিন্তু খানিকটা দক্ষিনে না গেলে তোমার আর তোমার বাড়ি, সেভিয়া যাওয়া হবেনা। পূর্বগামী পথ ধরে তোমার মনটা কি তখনো যেতে চাইবে?’
‘চাইবে, চাইবে’ সাগ্রহে মাথা ঝোকালো মেয়ে।
‘তাহলে আর কি। মধ্য ইউরোপের বন, পাহাড় ,নদী পেরিয়ে, কাজাখস্তানের মহাপ্রান্তর পাড়ি দিয়ে ফিরে আসবে আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিনে। তখন কি তোমার মন থেমে যেতে চাইবে মনে করো?’
‘না’
‘তাহলে তোমার মন হয় বোকা, নাহলে উন্মাদ, অথবা একাধারে দুটোই, এবং অমন উন্মত্ত বোকা হতে চাওয়াটাও দারুন একটা ব্যাপার। কারন তুমি দ্বিতীয়বার একই গোলকপথে চক্কর খেয়ে জীবনটা পার করে দিতে চাইবে। ফের জাপান সাগর, প্রশান্ত…’
‘আমার জীবনটা তাহলে পূর্ব -পশ্চিমের এই সীমানায় আটকে গেছে, খেয়াল করো সিনর! আমার বাড়ি! ফিরমিনবাইশিন ! অ্যানা গ্রাম! সব একই সরলরেখায়! ‘
‘তা বটে’ ব্যাপারটা ভেবে আমিও বেশ অবাক হলাম।
‘আচ্ছা সিনর, তুমি কি উন্মত্ত বোকা?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আচমকা প্রশ্ন ছুড়ে দিলো সে।
‘তুমি যদি মনে করো আমি উন্মত্ত বোকা, তাহলে তাই-ই। আর যদি…’
‘আর যদি বলি তুমি আসলে একটা পাগল? উন পোকো লোকো?’
‘এতে একদমই আপত্তি নেই আমার সেনোরিতা! পাগল খেতাব পেয়ে গেলে অনেক সুবিধা আছে।’
‘কি কি সুবিধা আছে?’ চোখ ট্যারা করে তাকিয়েছে এদিকে মার্গারিতা।
‘আছে তো কতই। কিন্ত সবচে বড় সুবিধা হলো- কেউ তোমাকে ঘাটাবেনা পারতপক্ষে। আমার মত নির্বিবাদী মানুষের এরচেয়ে বেশী কিছু চাওয়ার থাকতে পারেনা।’
‘তুমি...তুমি সত্যি একা থাকতে অনেক, অনেক ভালোবাসো, তাই না, সিনর ত্যান?’ কেমন এক সুরে প্রশ্ন করলো আরমোনিয়ার আরোহিণী, মাত্রই দিনের প্রথম তীব্র সুর্যরশ্নির আগমনের সাথে একাকার হয়ে জ্বলছে তার হ্যাজেলরঙা মায়াবী চোখদুটো!
‘বাসি, সেনোরিতা। কিন্তু কখনো কখনো তোমার মত দারুন কাউকে পেয়ে গেলে তার সাথে দিনরাত চরে বেড়াতেও খুব ভালোবাসি।’
মুচকি হেসে হ্যাটের কোনটা আরও খানিকটা টেনে দিলো সে চোখের উপর।
সেলেঞ্জের অববাহিকা ধীরে ধীরে আমাদের ছেড়ে উলটোপথে চলে গেলো। নদীপারের বিস্তীর্ন সমভুমি ছেড়ে আমরা সরু একটা পাহাড়ি ট্রেইল ধরলাম। পথে কদাচিৎ কোনো গার, অথবা আরোহীর সামনে পড়লে জিগ্যেস করে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছি, হাটগালের দিক সম্পর্কে। যদিও বুড়ো বেশ ভালোমত বুঝিয়ে বলেছে। আমার স্পীডোমিটারের জিপিএস যদিও সামান্য বিগড়ানো, তবু পথ চিনতে অসুবিধা হচ্ছেনা। আরও একটা বড়সড় চড়াই পেরিয়ে গেলাম আমরা। সবসময়ের মত মার্গো আমার সাথে ধীরগতিতে চড়াই বাইলো। মানুষের পায়ে চলা, প্রায় চিহ্নহীন সরু সেই ট্রেইল, যার কন্ঠজুড়ে ইতিউতি ফুটে রয়েছে ল্যাভেন্ডার ফুলের দঙ্গলেরা।
ফিরে তাকালাম মেয়েটার দিকে। ট্রেইলের দিকে চেয়ে আছে।
‘মার্গো!’
‘মার্গো?’
‘তোমাকে কেউ মার্গো বলে ডাকেনি কখনো?’
‘শুধু তুমি’ হাসলো মার্গো।
‘আচ্ছা মার্গো, শোণো!’
‘শুনছি, সিনর!’
‘আজ তোমাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে! অভিজাত স্প্যানিশ রমনীদের মত!’
হা হা করে হেসে উঠলো মার্গারিতা! জানতাম, ওটাই হবে।
‘তুমি নিশ্চয় ভুলে গেছো সিনর, আমি স্প্যানিশ রমনীই! আর অভিজাত বলতে ঠিক কি বোঝালে আমি জানিনা, তবে আমার মনে হয় আমার নানা এই কথা শুনলে তোমাকে আচ্ছা কয়েক ঘা মারতো!’ আবারো হাসতে লাগলো সে প্রাণখোলা হাসি, আর আমি তা শুনতে রইলাম। এই হাসি সংক্রামক, তবে তা হাসির সংক্রমণ করে না, করে প্রশান্তির!
কত ছোট ছোট কারনে কি প্রানোচ্ছোল হয়ে ওঠে এই মেয়েটা! ওর সংস্পর্শে তখন যে-ই থাকুক, বাঁধভাঙা স্রোত নিয়ে তার উপরেও এসে পড়ে আনন্দের হাটুজলা নদীর তোড়!
আমাদের র্যাঞ্চ আর তার আশেপাশের এলাকা বছরের অধিকাংশ সময়েই থাকে সবুজ। সেলেঞ্জ থেকে যত দূরে সরে যেতে লাগলাম, নগ্ন, মেটেরঙ্গা পাহাড়েরা দৃশ্যে এলো। সদ্য ঝরিয়ে নিয়েছে গায়ে লটকে থাকা সকল বরফ, শীতকালের পুরোটা সময় ধবধবে সাদা হয়ে থাকে তারা। আর থাকে ভয়ংকর শীতল। সাত কিলোমিটার লম্বা সেই চড়াইটা পার হতে যেয়ে আমি হলাম প্রচুর ক্লান্ত। অবস্থা বুঝে নিয়ে মার্গো আমাকে থামালো। নাম না জানা চুড়াটার ঢালে, পথের পাশে একটা ঝোপের পাশে আসন গেড়ে বসে দুজনে কিছু খেয়ে নিলাম। কয়েকটা বাজ, আর পানি। যদিও মার্গো খিদে যতটা, তারচেয়ে বেশী, ওর ভাগেরটা কম পড়ে যাওয়ার ভয়ে খেলো।
ওখান থেকে দক্ষিন পশ্চিমে তাকালে অনেক নীচে দেখা যায় বিরাট এক প্রতিফলিত আকাশের টুকরো। ওটা কিংবদন্তীর খুভসগুল লেক। মাত্র দুই’শ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে দুনিয়ার গভীরতম লেক বৈকালের ছোটবোন এই মোহিনী। দুপুরের প্রারম্ভে সুর্যরশ্নির প্রতিফলনে ভয়ংকর সুন্দর হয়ে উঠেছে ঝকঝকে নীল পানির ওই আধারটা। আমরা দুজন নির্বাক কতক্ষণ যে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে! মংগোলিয়ার সবচে বড় মিঠাপানির হ্রদ। আমাদের গন্তব্য ওখানেই। লেকপারের খেটে খাওয়া মানুষের ছোট্ট শহর হাটগাল। কোনোকিছুর সাতেপাচে নেই এখানের মানুষ, উত্তরের ধেয়ে আসা ঠান্ডাটা সমঝে চলে, জেলেনৌকা নিয়ে সকাল-সাঝ-রাত পরিশ্রম করে মাছ ধরে আনে পুরুষেরা। সংসারভক্ত মহিলারা ব্যাস্ত থাকে তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে, নানা পদের মাছ রান্না করে, আর বিকেলে বাড়ির পুবউঠানে যেয়ে চেয়ে থাকে কর্তার আগমনপথে।
শহরটা যেনো তৈরী হয়েছিলো নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বেও। যার যার ছোট ছোট বাড়িগুলো একান্ত সুবিধামত জায়গা বেছে নিয়ে বানানো হয়েছে, নেই কোনো পরিকল্পনা। পুরো হাটগাল শহরটা যেনো বিরাট এক সার্কাসের তাবু, যার মালিক কোনো খোজখবর রাখতে নারাজ, কোথায় গাড়া হলো সং এর তাবু, কোথায় তার দড়াবাজিকরদের। আজীবন ঘর বলতে যা বুঝে এসেছি, তার সাথে নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিলো মংগোলিয়ার গার, আর হাটগাল শহরটা প্রথমবার দেখে জানলাম, গারগুলো যত্নের সাথে বানানোর মতও আভিজাত্য দরকার পড়েনা অনেকেরই। মার্গো পর্যন্ত বেশ অবাক হলো ছন্নছাড়া ভাবটা দেখে। আদতে যাযাবর মংগোল জাতির হাতে গোনা যে কয়েকটা সত্যিকারের শহর আছে, হাটগাল তাদের একটা নয় বলে আমার তখন ধারনা হয়েছিলো। কেবলই লেক খুভসগুল, লেকের পানি, আর লেকের শিকারযোগ্য মাছেরা হাতেগোনা কিছু লোককে আকৃষ্ট করে নির্দিস্ট কোনো ঠিকানায় আটকে রেখেছে। শহরের প্রতিটি মানুষ অন্য সকলের ঘরের খবর জানে, বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখে। লম্বা শীতের মাসগুলো শেষ করে সবে প্রানচঞ্চল হয়ে উঠছে তারা। বাইরের দুনিয়ার সাথে সামান্যই সম্পর্ক আছে বিরান এই প্রান্তরের।
আজ, এতবছর পর মনে করে অন্তরাত্মা কেপে ওঠে আমার, জনমানবহীন, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ওই ছোট্ট শহরটা কিভাবে আমার সারাজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। বুক ফেটে কান্না চলে আসে, যখন অনুভব করি, কি হারিয়েছিলাম আমি ওই হ্রদের পানিতে! বসন্তের সেই ঝলমলে দুপুরের স্মৃতিগুলো আমার বড় বিদীর্ণ, তোলপাড় করে দেয় সব। আফসোস, যদি সেদিন ঘুর্ণাক্ষরেও জানতাম কি ঘটতে চলেছে! কিন্তু নিয়তি বড় কঠোরহস্তে নিয়ন্ত্রন করে তার আজন্মের প্রথা-গতিপথ-সম্পর্ক। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বিরাট কোনো এক খেলার অংশ! খেলাটা চলছে, চলতেই থাকবে, নিজের অজান্তে সবাই কোনো না কোনো অংশে খেলে চলেছে ওটা।
আমরা দুই অভাগা অংশগ্রাহী, সেদিন দুপুরে মনের মাঝে গভীর আনন্দ নিয়ে চরে বেড়াচ্ছিলাম উত্তর মংগোলিয়ার ছোট্ট সেই শহরটায়। মার্গারিতার হাতে ছেড়ে দিলাম সব দায়িত্ব। ওর পিছনে পিছনে ঘুরতে লাগলাম, ছোটবেলায় মায়ের সাথে বাজারে গেলে যেভাবে ঘুরতাম। পাহাড়ি ঢালের গোড়ায় শহরের যে অংশটা, ওখানে কেবলই গৃহস্তের ঘরবাড়ি। ও জিগ্যেস করে নিলো, কোথায় পাওয়া যাবে ভেড়ার লোম কাটার মেশিন, শিয়ারিং মেশিন। একেবারে সাড়া পড়ে গেলো ওর কথায়। সবাই খুব উৎসাহের সাথে জানিয়ে দিলো, লেকের পারে মিস্টার চিনুয়ার দোকানে পাওয়া যাচ্ছে ঐ জিনিস। উলানবাটার থেকে হাতে গোনা কয়েকটা এসেছে এখানে। আমাদের কাঙ্খিত দোকানটা খুজে পাওয়ার আগে অবশ্য মার্গারিতার চোখ পড়লো ঢালের গোড়ায় একটা রঙচং মাখা দোকানে। দোকানের কিশোরী মেয়েটাও রঙচং মেখে সং হয়ে আছে। এক মুহুর্ত লেগেছিলো আমার বুঝতে, ওটা সাজগোজের দোকান। এই এক যন্ত্রনা! মার্গোর দিকে একনজর তাকিয়েই বুঝে ফেললাম, দুনিয়ার সকল কিশোরীর মতই ,তার বুকের মাঝেও ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে ওটা দেখে, চোখগুলো বড় হয়ে গেছে। আমার কোচকানো ভ্রু দেখে হেসে ফেললো সে!
‘বেশী সময় নেবোনা সিনর, বিশ্বাস করো!’
‘সেটা বিশ্বাস করা সম্ভব না, কিন্তু তোমাকে মানাও করবোনা। চলো, যেয়ে দেখো’
‘ধন্যবাদ সিনর! তুমি বুদ্ধিমান লোক! মানা করে লাভ নেই বুঝতে পেরেছো। আরে তুমি জানো, দাদুর সাথে যুদ্ধ করে তাকে দিয়ে একটা মেকআপ বক্স, আর কয়েকটা হেয়ারব্যান্ড কিনিয়েছিলাম! গত চার বছরে ঐ আমার সব প্রসাধনী, বিশ্বাস করতে পারো? স্পেনে আমার এক ড্রয়ার ভর্তি সাজুগুজু রেখেছিলো মা! তুমি আবার ভেবোনা দাদুর উপর আমি অভিযোগ করছি! আমিতো এক কাপড়ে এসেছিলাম, সে-ইতো আমাকে এতগুলো জামা কিনে দিয়েছিলো, যেখানে দুইটার বেশী আমার তো লাগারই কথা না। এইতো গত গ্রীষ্মে এই টারলিগটা কিনে এনেছিলো দাদু দূরের কোনো শহর থেকে। খুব সুন্দর না সিনর? যদিও একটু বড় হয়ে গেছে আমার মাপে। দাদু বলেছে, র্যাঞ্চের ধারদেনা শোধ হয়ে গেলেই আমাকে আরও একটা জিন্স কিনে দেবে। এবার আমি নীল জিন্স কিনবো’
বকবক করতে করতে দোকানটার পাশে এসে পৌঁছল সে আমাকে নিয়ে।
দোকানের কিশোরী মালকিন মার্গোকে পেয়ে যেনো আকাশের চাঁদ দেখেছে। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দুজনের অর্থহীন কথোপকথন শুনে যেতে হলো আমাকে ঝাড়া দশ মিনিট। মার্গারিতা নতুন এক ধরনের লিপ্সটিক, আর ভ্রূতে ঘষতে হয়, কি যেনো বলে, এই দুইটা জিনিস পছন্দ করে রাখলো। সব টাকা আমার পকেটে, আর মুল কেনাকাটা এখনো বাকি বিধায়, মংগোলিয়ান মেয়েটার সাথে চুক্তি করে এলো, যাবার পথে নিশ্চয় ওগুলো সে নিয়ে যাবে। মনে মনে যে আশা করলো, আমাকে সে বলেই ফেললো ওটা, কিছু টাকা বেঁচে থাকবেতো? এরপরে আমার বিরাট স্বস্তির কারন হয়ে ও বললো, ‘চলো সিনর, সিনর চিনুয়ার দোকান নাকি ওওওই যে…’
‘তুমি চুড়ি চেনো মার্গো?’
‘চুড়ি কি?’
‘বাংলাদেশের মেয়েরা দুই হাতে পরে ওগুলো। গোল চাকতির মত জিনিস, হাতের আঙ্গুল মুঠি করে গলিয়ে নেয়। যদি কাচের চুড়ি হয়, তাহলে একের পর এক, অনেকগুলো পরে ওভাবে। এরপরে তারা যখন হাটে, বা হাত নাড়ায়, ঝনঝন করে শব্দ হয়! কেউ কেউ ইচ্ছে করে বেশী শব্দ করে! সোনার, বা রূপার চুড়িও আছে, ওগুলো দুইহাতে দুইটা পরে সাধারনত।’
আমার কথা শুনে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলো মার্গারিতা! উত্তেজনার বারুদ ফুটলো যেনো! কোথায়, কিভাবে ও চুড়ি খুজে পাবে, এই নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করলো, আর কেনো চাইলেও পাবেনা, জানতে পেরে খুব আফসোস করলো। কোনো একদিন অবশ্যই চুড়ি পরতে চায় ও, বললো।
'কোনো একদিন আমি অবশ্যই চুড়ি পরবো সিনর! ইচ্ছামত হাত নাড়িয়ে ঝনঝন শব্দ করবো!’
‘চুড়ি পরলে কিন্তু শাড়ীও পরতে হবে’
‘শাড়ী! চুড়ি! কি সুন্দর ছন্দ তো! ওটাও নিশ্চই দারুন কিছু হবে, তাই না সিনর?’ বাচ্চাদের মত হাততালি দিয়ে উঠলো স্প্যানিশ কিশোরী।
‘হ্যা, দারুন। কিন্তু আপাতত চিনুয়ার সাথে বনিবনা করো’
লেকের পারে পৌছে একজনকে জিগ্যেস করতেই দেখিয়ে দিলো চিনুয়ার দোকান। লেকের পাশে মেঠো পথের ধারে একটা দোচালা কাঠের ঘর। খয়েরী, সাদা, বাদামী, আর সবুজ রঙের মিশ্রন কাঠামোতে। সারা দোকানে মাছের আশটে গন্ধ। তৈজসপত্র দিয়ে ভরা, কিন্তু কোনো প্লাস্টিকের পন্য দেখিনি। মাটি, কাঠ আর পিতল দিয়ে তৈরী সব, অগোছালোভাবে ছিটিয়ে আছে ছোট্ট খুপরিমত দোকানের অন্দরমহলে। সামনের বারান্দায় মোড়ায় বসে ঝিমাচ্ছিলো দোকানী লোকটা। জনাব চিনুয়া। বিদেশী দেখে ভ্রু কোচকায়না এই শহরের লোক। লেক খুভশগুল দেখতে প্রায়শই সীমানার ওপারের মানুষেরা আসে। পরে জেনেছিলাম, সাকুল্যে দুইটা সরাইখানা আছে এই শহরে। দুইটাই আসলে কারো না কারো গার। ব্যাবসার লোভে অন্য কাজে লাগিয়েছে। দুটোতে জায়গা না হলে লোকেরা নিজ ঘরে নিয়ে যায় অতিথিদের। তারাও কিছু মনে করেনা, বরং নেটীভ জীবনধারা খুব কাছ থেকে দেখতে পারার জন্য গর্ববোধ করে।
চিনুয়া লোকটা ঝানু ব্যাবসায়ী। প্রৌঢ়। প্রথমেই লম্বা এক ফিরিস্তি দিলো, হাজার কিলোমিটার দূর থেকে কত সহস্র সাধনার পরে সে এই কৃষকবান্ধব জিনিস এই ছোট্ট শহরতলীতে নিয়ে এসেছে, কতবড় যুগান্তকারী ঘটনা ওটা, মার্গারিতাকে দিয়ে স্বীকার করালো। মনে মনে ভেবে রাখলাম, মেয়ে পেয়ে ঠকানোর সামান্য চেষ্টা করতে আমাকেই কথা বলতে হবে। আসার আগে বেশ খোজ নিয়ে এসেছি আমি এই মেশিনের ব্যাপারে। বেশ দামী জিনিসই বটে, সদ্য এখানকার মানুষের হাতে এসেছে বলে কথা। দেখা যাক এই লোক কত হাকে দাম!
‘কত রাখবে ওটা মিস্টার?’ বেশ ভাব জমিয়ে নিয়েছে মার্গো চিনুয়ার সাথে।
‘বিদেশীদের গাট থেকে সবসময় বেশী রাখি আমি, কিন্তু যেহেতু বলেছো ওটগোনবায়ারের আত্মীয় তুমি, নিশ্চয় ছাড় পাবে! বুড়োর সাথে এক কালে বেশ দহরম মহরম চলতো আমার।’
খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, এবার এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখে ভাবান্তর হলোনা ওর মাঝে। মার্গারিতার কাছে তিন লাখ তুগরিক দাম হাকলো। হা হয়ে গেছে বেচারী ক্রেতা!
মুচকি হাসলাম আমি। মার্গোকে বললাম, আমি কথা বলছি। যদিও আমি বরাবরই এই কাজে অপটু। কিন্তু দায়িত্ব কাধে নিয়েছি বলে কথা। আমি ওই লোকের দুর্বলতা জানি। এই অচল শহরে ও কিছুতেই এত দামী ক্রেতা হারাতে চাইবেনা।
‘আমি মার্গারিতার অভিভাবক, মিস্টার, ওকে সাথে নিয়ে এসেছি। কিন্তু তুমি এত বেশী দাম চাইছো কেনো?’
মার্গারিতার মৃদু হাসি ভেসে এলো কানে।‘ অভিভাবক! ও রে সিনর’
আমার কাছে আরেকবার ফিরিস্তি দিলো জনাব চিনুয়া, কি কারনে ওটা অমুল্য। লোকটার বলার ভংগি, আর পোশাক পরিচ্ছেদ, আর চেহারার পানে একবার দেখে হঠাতই আমার মনটা গলে গেলো। পরিবারে কে কে আছে জিগ্যেস করলাম। বউকে নিয়ে একা থাকে, কোনো সন্তানের মুখ দেখেনি। জানতে পারলাম, পুরোটা শীতকাল গুহায় কাটিয়ে বেরিয়ে এসে মেরুভালুকেরা যেভাবে ক্ষুধা নিয়ে ঘোরে, এই শহরের বাসিন্দারাও শীত শেষে ওভাবে থাকে। বসন্তে কিছু বিদেশী ভ্রমণকারী আসে, তখন হিড়িক পড়ে যায় টাকার। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত? খেয়ে না খেয়ে মাছ ধরে যায় তারা। আমার নিজের টাকা হলে তিন লাখ দিয়েই কিনতাম আমি ওর কাছ থেকে ঐ জিনিস। কিন্তু দাদুর ব্যাপারটা তো মাথায় রাখতেই হবে।
ওকে দুই লাখ তুগরিকে রাজী করিয়ে ফেললাম। খুশিমনেই রাজী হলো সে, কারন আমি চাইলে আরও নামতে পারতাম। ওর বাড়ির গুদামঘরে যাবার আমন্ত্রণ জানালো সে আমার পন্য বুঝে নেবার জন্য। অত দামী জিনিস দোকানে রাখেনা। মার্গোকে বললাম এসপেরানজাকে দেখে রাখবার জন্যে, চিনুয়ার ঘোড়ার পিছু পিছু আমি আরমোনিয়াকে নিয়ে এগোলাম, তারা ভাষ্য অনুযায়ী দশ মিনিট দুরত্বে তার বাড়িতে।
‘জলদি কোরো অভিভাবক! দ্রুত রওনা হওয়া চাই!’ মার্গো বললো অধীর কন্ঠে। দোকানের পাশে সিডার গাছটার নীচে ঘাসের উপর বসে লেকের দিকে চেয়ে রইলো সে। ওর দিকে একবার ট্যারাচোখে তাকিয়ে নিয়ে, রওনা হলাম আমি চিনুয়ার ঘোড়াটার পিছু নিয়ে।
সেদিন যদি ওকে ওভাবে রেখে চলে না যেতাম! যদি মার্গারিতাকে পাঠাতাম চিনুয়ার সাথে! যদি লোকটা দোকানেই রাখতো জিনিসটা! অন্য কিছু একটা যদি হতো, যা হয়েছিলো তা ছাড়া! আমার জীবনের সকল সুখের বিনিময়ে আমি ঐ মুহুর্তটা বদলে দিতে পারার ক্ষমতা যদি অর্জন করতে পারতাম!
কিন্তু তা তো আর হবার নয়। আমিই গিয়েছিলাম মিস্টার চিনুয়ার বাড়ি। লেকের পার ঘেঁষে এগোলাম দুজনে। পথের দুপাশেই ছোটছোট কাঠের ঘর। চারিদিকটা বড় বেশী নীরব যেনো। শুধু লেকের পারে আছড়ে পড়া কুলকুল স্রোত, আর বাতাসের নেশাধরানো শব্দ। অমনই এক ঘরের সামনে যেয়ে থামলো মিস্টার চিনুয়া। সদর দরজার সামনে টুলে বসে এক টুকরো কাঠ খোদাই করে মুর্তি তৈরীতে ব্যাস্ত তার স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। মহিলা সবসময় দাত বের করে হাসছে। ছোটছোট, কুতকুতে চোখে সরলতা। আমাকে টুলটা ছেড়ে দিয়ে সে চলে গেলো, আমার এক গ্লাস পানির আবদার মেটাতে। চিনুয়াকে সেই ফাকে গুনে দিয়ে দিলাম দুই লাখ তুগরিক। স্বামী-স্ত্রী পানি আর শিয়ারিং মেশিন নিয়ে ফিরলো একদম একইসাথে। চিনিয়ার স্ত্রী বেশ গল্পবাজ মহিলা। আমার সাথে গল্প জুড়ে দিলো, অভদ্রতা করে উঠেও আসতে পারলাম না আমি! পানির সাথে কিছু মিষ্টি খাবারও নিয়ে এসেছে সে আমার জন্য। তার স্বামীর ব্যাবসা কেমন মন্দা যাচ্ছে তা থেকে শুরু করে, লেকের মাছ ধরা মৌসুমে কি সুন্দর প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে হাটগাল,সেকথা বললো। বললো এখন শহরটা দেখে নিশ্চয়ই মৃত মনে হচ্ছে, আদতেও তাই! এটা নাকি কিছুতেই আসল হাটগাল না, তার উপর যোগ হয়েছে গত মাসখানেক যাবত নতুন উৎপাত, শহর থেকে বাচ্চারা গায়েব হয়ে যাচ্ছে! ওদের কোনো খবর ও পাওয়া যাচ্ছেনা, কেউ মুক্তিপন চেয়ে চিঠিও দিচ্ছেনা। আইন রক্ষক বলতে যে তিনজন লোক আছে শহরে, তারা প্রথমে পাত্তা না দিলেও, গত এক সপ্তাহ যাবত খুবই কঠিন সময় পার করছে। এ কথা শুনে একটা দ্বীর্ঘশ্বাস পড়লো আমার। এই প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও শকুনের ছায়া পড়েছে, কুনজর দিয়েছে কোনো কুৎসিত মানুষরুপী প্রেতেরা। ওদের বাচ্চাদেরকে সাবধানে রাখতে বলে, আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, আর অনেক শূভকামনা জানিয়ে আমি উসখুশ করতে থাকা আরমোর পিঠে চেপে বসলাম একটা সময়।
ওখান থেকে হাটগালের করাতকলের দোকানে গেলাম আমি। এটা খুজেপেতে মোটেও বেগ পেতে হলোনা, সারিসারি গাছের কান্ড, আর কাটা কাঠ পড়ে আছে। দাদুর দেয়া চিঠি দেখাতেই একগাল হাসলো দোকানি। বললো, এক সপ্তাহের মাঝেই পৌছে যাবে, একদমই চিন্তা না করতে। আমি ওকে দুই লাখ তুগরিক অগ্রীম দিয়ে দিলাম। মোট দাম কত হবে, তা নাকি বুড়োর সাথে বোঝাপড়া হবে তার।
এরপর এক দৌড়ে আরমোনিয়া আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো মার্গোর কাছে। কিন্তু কোথায় মার্গো! চিনুয়ার দোকানের বারান্দা ওভাবেই পড়ে আছে, চাল থেকে ঝোলানো প্রার্থনা পতাকাগুলো উড়ছে পতপত করে, কিন্তু পাশের সিডার গাছটার নীচে মার্গো নেই, নেই এসপেরানজাও। বিরক্ত হলাম মেয়েটার উপর। আমাকে বললো জলদি করতে, এখন নিজেই গায়েব। কোথায় যেতে পারে ভাবতে প্রথমেই মনে এলো, নিশ্চয় সেই প্রসাধনীর দোকানে! সোজা চলে এলাম ঘোড়া হাকিয়ে। দোকানের মেয়েটা আমাকে দেখে একগাল হাসলো, জিগ্যেস করলো মিস মার্গারিতা কোথায়! বুঝতে বাকি রইলোনা, এখানে আসেইনি সে। তাড়াহুড়ো করে ফিরে এলাম সিডার গাছতলায়। না, নেই মার্গারিতা। প্রচন্ড বিরক্ত তখন আমি। আরমোকে পাশে নিয়ে শুয়ে রইলাম লেকপারে। ও ফিরে এলে কি কি বলে গালমন্দ করবো, তা ভেবে রাখছি। একের পর এক বলে যেতে হবে সব। দুপুর জাকিয়ে বসেছে প্রায়। সন্ধ্যার আগেই র্যাঞ্চে ফেরার ইচ্ছা আমার। আধঘন্টা যখন পার হয়ে গেলো, রাগ বাড়ার বদলে পড়তে শুরু করলো আমার। তারপর হঠাত করে কোত্থেকে যেনো রাজ্যের উদ্বেগ এসে ভর করলো। ভুল হয়ে গেছে! মেজাজ খারাপ করে এখানে পড়ে না থেকে, আমার শহরটা চক্কর দেয়া উচিত ছিলো।
ভাবনাটা আসতেই আরমোনিয়াকে নিয়ে শহরের প্রতিটি গলি, একটি একটি করে ঘুরতে শুরু করলাম। সামনে বন্ধুভাবাপন্ন চেহারার কেউ পড়লেই জিগ্যেস করলাম একটা বিদেশী মেয়েকে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছে কিনা। সবার উত্তরই হলো নেতিবাচক। একবার না, পুরো হাটগাল শহর তিনবার চক্কর দিলাম আমি আর আরমোনিয়া। মাঝেমাঝে এসে বিরতি নিচ্ছি সিডার গাছতলায়। একবার মিস্টার চিনুয়ার চোখে পড়লাম, সে জিগ্যেস করলো কি ব্যাপার। খুলে বললাম তাকে ঘটনা। শুনে সেও অবাক হলো, একইসাথে উদ্বিগ্ন হলো। ততোক্ষণে সূর্য টা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। তিন ঘন্টা হতে চললো মার্গারিতাকে খুজে পাচ্ছিনা। ঘেমেনেয়ে গেছি আমি। কি করবো এখন আমি?
কোনোকিছুই করার নেই, বেচারী আরমোনিয়াকে খাটিয়ে মারলাম আমি। এদিক-সেদিক ছুটতেই রইলাম ওকে নিয়ে। বেচারি এমনিতেই খুব ক্লান্ত সারাদিনের ধকলে, তবে কোনো প্রতিবাদ করলোনা। সেও বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। শহর থেকে বেরিয়ে এলাম আমি।
পশ্চিমে সবুজ একটা উপত্যকা পার করে দিগন্তে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে খোরিদোল পর্বতমালা। পাথরের খাড়া দেয়াল সোজা উঠে গেছে। নীচের দিগন্তবিস্তৃত ঢালু সমভুমির প্রায় পুরোটাই হাটগাল থেকে দৃশ্যমান। ভালো করে এদিক সেদিক তাকিয়েও আমার চোখে কোনো মানুষের অবয়ব ধরা পড়লোনা। কিন্তু তাই বলে তো আর বসে থাকতে পারিনা আমি ওখানে। কোনো টিলার আড়ালে নিশ্চয় পড়েছে। ঘাসের নরম পথটায় তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে কোনো সাইকেলের চাকার চিহ্ন খুজে পেতে চাইলাম, কিন্তু অসংখ্য আকিবুকির মাঝে আমার অনভিজ্ঞ চোখে কিছুই পড়লোনা। সোজা ট্রেইলটা ধরে এগোতে রইলাম। কিন্তু বিধিবাম, কিছুক্ষন পরে তিন দিকমুখী তিন টা ট্রেইল চলে যেতে দেখলাম আলাদা হয়ে। এবার? কোনদিকে যাবো?