ট্যানের মংগোলিয়ান দাদী, ও কাজাখ ভাই...


শহর বলতে খুব বেশী কিছু নেই মংগোলিয়াতে। পৃথিবীর সবচেয়ে কম ঘনবসতিপুর্ণ দেশ বলে কথা! আর তাদের গ্রামগুলোও বিচ্ছিন্নতার সমার্থক শব্দ। কতসব রোমাঞ্চকর গিরিখাত, উপত্যকা, আর রুপকথার মত খোলা প্রান্তর চারিদিকে! কোন একটা গ্রামের গোড়াপত্তন যখন হতো, হয়তো শত শত বছর আগে, যখন দুনিয়ার বুকে হেটে বেড়াতেন দা গ্রেট খান, ওইসব দিনে গড়ে ওঠা সেসব গ্রামের জন্য বেছে নেয়া হত সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর কোনো পাহাড়ী ঝর্না বা হাটুজলের নদীর পার! নদীটা একেবেকে বয়ে গেছে সবুজ ঘাসে ছাওয়া দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর মাড়িয়ে, যেখানে চারিদিকের দিগন্ত শেষ হয়েছে কোনো না কোনো সাদাটে সবুজ, অথবা সোনারঙ্গা সবজে পাহাড়ের ঢালের চুড়ায় মেঘের আবছায়ায়, আর ঢালের গোড়ায় চরে বেড়ানো অসংখ্যা ইয়াক, ঘোড়া, ভেড়া আর গাধার দংগলে! মংগোলিয়াতে মানুষের চেয়ে কয়েকগুন বেশী ভেড়ার জনসংখ্যা আছে, এবং ঘোড়ার সংখ্যা ঠিক মানুষের সমান। ওগুলোই ওদের সবকিছু। সকল ঐশ্বর্য্য। গ্রামগুলোর মাঝে গঠনগত একটা অদ্ভুত ধরনের মিল থাকলেও, তারা ছিলো একে অপরের থেকে সম্পুর্ন আলাদা গতিপথে, অনেক, অনেক দূরে। প্রতিটা ম...


ট্যানের মংগোলিয়ান দাদী, ও কাজাখ ভাই...



শহর বলতে খুব বেশী কিছু নেই মংগোলিয়াতে। পৃথিবীর সবচেয়ে কম ঘনবসতিপুর্ণ দেশ বলে কথা! আর তাদের গ্রামগুলোও বিচ্ছিন্নতার সমার্থক শব্দ। কতসব রোমাঞ্চকর গিরিখাত, উপত্যকা, আর রুপকথার মত খোলা প্রান্তর চারিদিকে! কোন একটা গ্রামের গোড়াপত্তন যখন হতো, হয়তো শত শত বছর আগে, যখন দুনিয়ার বুকে হেটে বেড়াতেন দা গ্রেট খান, ওইসব দিনে গড়ে ওঠা সেসব গ্রামের জন্য বেছে নেয়া হত সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর কোনো পাহাড়ী ঝর্না বা হাটুজলের নদীর পার! নদীটা একেবেকে বয়ে গেছে সবুজ ঘাসে ছাওয়া দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর মাড়িয়ে, যেখানে চারিদিকের দিগন্ত শেষ হয়েছে কোনো না কোনো সাদাটে সবুজ, অথবা সোনারঙ্গা সবজে পাহাড়ের ঢালের চুড়ায় মেঘের আবছায়ায়, আর ঢালের গোড়ায় চরে বেড়ানো অসংখ্যা ইয়াক, ঘোড়া, ভেড়া আর গাধার দংগলে! মংগোলিয়াতে মানুষের চেয়ে কয়েকগুন বেশী ভেড়ার জনসংখ্যা আছে, এবং ঘোড়ার সংখ্যা ঠিক মানুষের সমান। ওগুলোই ওদের সবকিছু। সকল ঐশ্বর্য্য।

গ্রামগুলোর মাঝে গঠনগত একটা অদ্ভুত ধরনের মিল থাকলেও, তারা ছিলো একে অপরের থেকে সম্পুর্ন আলাদা গতিপথে, অনেক, অনেক দূরে। প্রতিটা মানুষের বসতির মাঝে সে যে কি বিস্তর দুর্লংঘ দুরত্ব, তা কাউকে বলে বোঝানো কঠিন বৈ কি! ওই একেকটা গ্রামই যেনো ছিলো একেকটি নিউ ইয়র্ক, একেকটি প্যারিস! তবে সেইসব প্যারিসের প্রতিটি লোক অপরজনকে চিনতো, তাদের কার কোন সন্তান কত শীত আগে জন্মেছে, তাও কারো অজানা নয়। মাইলের পর মাইল দিগন্তবিস্তৃত ঘাসের জমি। উচুনিচু ঢেউখেলানো ঘাসের জমি, ঠিক যেনো বাচ্চা ছেলের হাতে আকা কাগজের প্রান্তর! প্রতিটা গ্রামে আর যা থাক আর না থাক, একটা জিনিস পাওয়া যাবেই, তা হলো খরস্রোতা একটা হাটুজলের খাল! পাহাড়ী ঝর্না থেকে সৃষ্ট খালের পানি ভীষণ ঠান্ডা, হাত ছোয়ালে আর কোনো অনুভুতিই সেখানে অবশিস্ট থাকেনা।

পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার আলতাই পর্বতমালার সোনালী কোনো উপত্যকার অমনই এক গ্রাম সাগান-গোল এ একদিন এসে হাজির হয়েছিলো ট্যান। মিস্টার ট্যান, একজন বাংলাদেশী ব্রক্ষ্মচারী, যে বিদেশবিভুইতে নিজের নামের বিকৃত উচ্চারনে অতিস্ট হয়ে এই নামেই নিজেকে পরিচয় দেয়, তার ডায়েরীটা কোনোভাবে আমার হাতে এসে পড়েছিলো। নীচের লেখাটুকু ট্যানের ডায়েরীরই একটি ছোট্ট অংশ।

-অনিক।

.....................

আমরা যখন সাগান-গোল ফিরে আসি, তখন পড়ন্ত বিকেল। গ্রামের পাশে এক টিলার উপর আধশোয়া হয়ে আমিরকে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে ওর বোনেদের সাথে ভেড়া এবং ঘোড়ার পাল সামলাতে লেগে পড়তে দেখলাম। আমিরের সবচেয়ে বড় বোনটা আমার বয়েসী। কাজাখরা দেখতে সাধারণত এশীয় এবং ককেশীয়দের মাঝামাঝি একটা চেহারার, তবে মেয়েদের মাঝে ককেশীয় ছাপটা বেশী প্রবল মনে হয়। কিন্তু মিস আইলিনকে দেখলে খাটি ইউরোপিয়ান বলবেনা, এমন লোক পাওয়া মুশকিল। আমির হাত তুলে আমাকে দেখালো, আর সে খুব সুন্দর একটা হাসির সাথে হাত নাড়লো। ছোকরাটা আমাকে এমনই ব্যাস্ত করে রেখেছে, ওদের ঘরের কারো সাথেই কথা বলার ফুরসত পাইনি। ওদের দিকে একবার ইশারা করে আমি মিসেস আইশার ভোজনশালার দিকে চলে এলাম। ওখানটা এখন শুনশান। গ্রামের সবাই জড়ো হবে মাগরীবের পরে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম রান্নাঘরে। মিসেস আইশার চোখদুটো বড়বড়, যেনো সারাক্ষণই প্রশস্ত, জাগ্রত, চারিপাশে যতকিছু ঘটছে, সবকিছু পান করে নিচ্ছে। আমাকে দেখেই সম্ভবত বললেন, রেস্তোরা খুলতে এখনো ঢের দেরী আছে বাছা, তুমি আগে এসে পড়েছো। কিন্তু আমার ওতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার পুরোটা মংগোলিয়ান জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব পশ্চিমা উচ্চারনে তাকে বললাম- ‘আমি জানি আপনি মংগোলিয়ান জানেন, মিস আইশা। আমি ট্যান। অনেক দুরের দেশ থেকে এসেছি।’ তার জবাবে ক্রুর ভংগিতে তাকালেন বৃদ্ধা আমার দিকে, তাতে আমি নিশ্চিত যে, তিনি আমার কথা বুঝেছেন। আরও মিনিট কয়েক একমনে নিজের কাজ করে গেলেন। এরপরে আমাকে পুলকিত করে মংগোলিয়ানে কথা বলে উঠলেন।

‘তোমাকে দেখতে ভারতীয় মনে হচ্ছে।’

‘কৌশলগতভাবে, আপনি পুরোপুরি ভুল বলেননি। তবে আমার বাড়ি আধুনিক ভারতে নয়, তার প্রতিবেশী এক বদ্বীপ। বাংলাদেশ। আমি পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছি, দাদী!’ কথা শেষ করে তার চোখের দিকে চেয়ে রইলাম আমি।

‘বেশ, আমি ভুল করেছি’ ফোকলা হাসি হাসলেন মিসেস আইশা। অন্তত প্রথমে তাই মনে হলো। কিন্তু খানিক বাদেই মনে হলো, না, তিনি দন্তহীন নন মোটেও। এই বয়েসেও তার গালভরা দাত! পরমুহুর্তে তিনি আমার হাতে একটা বেসনের বাটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘দাদীকে সাহায্য কর তবে। বেসন ঘুটতে জানিস?’

‘নিশ্চই, নিশ্চই দাদী’ দাত বের করে হাসলাম আমি। বুঝে গেছি ইতিমধ্যে ইনি কেমন মানুষ! পরিস্কার পানির পাত্র থেকে মেপেঝেপে পানি নিয়ে বেসনের পাত্রে ঢেলে দিলাম আমি।

‘আমি জানি’ আমার নতুন দাদী দক্ষহাতে ঘোড়ার মাংস কাটছেন ‘তা, তোর বাবা মা এভাবে ছেড়ে দিতে রাজী হলো তোকে? তুই তো নিতান্তই বাচ্চা ছেলে একটা’ আমার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে ভ্রু কুচকে তাকালেন।

‘না দাদী, পালিয়েছি’ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানালাম তাকে ‘তোমার কাছ থেকে মঙ্গোলিয়ার গল্প শুনবো বলে’

‘দেখো ছোড়ার কান্ড!’ না হেসে পারলেন না আইশা দাদী। আমার কাজ দেখে হলেন সন্তুষ্ট। জানতে চাইলেন আমি জীপ ভাড়া করে এসেছি কিনা এই দুর্গম অঞ্চলে, কোত্থেকে ই বা এসেছি আজ।

‘না দাদী! আমার নিজের দুইটা চাকা আছে, ওর উপর বসে গড়াতে গড়াতে পুরো দুনিয়া চরে বেড়াই!’

মিসেস আইশার প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

‘তুমি বাইসাইকেল চেনো দাদী?’

‘চিনি বটে, কত দেখেছি! কিন্তু ও তো খুব কস্টের কাজ! তুই আমার সাথে ফাজলেমি করছিস না তো?’

আমি শুধু হাসলাম তার দিকে তাকিয়ে। ওইতো, তিনি বুঝে নিলেন আমি সত্য বলছি, কি মিথ্যা! এই হচ্ছে একটা গুন, যা একটা মানুষ পৃথিবীর আর কোনো কিছু থেকে শিখতে পারেনা- শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা ছাড়া। তাইতো আমি সারাটাজীবন বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেদের খুব শ্রদ্ধা করি।

‘বলোনা, তোমার জন্ম কোথায় হয়েছিলো দাদী? এই বদ্ধ প্রান্তরে থাকতে নিশ্চই তোমার দম ফুরিয়ে যায়?’

‘পাকা পাকা কথা বলিস না!’ নিজের ভাবগাম্ভীর্য্য বজায় রাখতে চেয়েও পারছেন না তিনি আমার দরাজ কন্ঠের উচ্ছল কথাবার্তা শুনে! তবে জন্মস্থান ফাস করলেন দাদী।

‘আমি জন্মেছি এখান থেকে আরও বহু পশ্চিমে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে ছোট্ট এক গ্রামে, কিজান ছিলো তার নাম। আমার বাপ অনেকটা তোর মত ছিলো। ঘুরে বেড়াতো। আমার মা ছিলো তার বিরাট ভক্ত! আটান্ন সালের কথা, নিকিতা ক্রুশ্চেভের আমলে সোভিয়েতের পশ্চিম থেকে মানুষের দেশান্তরের যুগ শুরু হলো। আমার বাবা সোজা পুর্বে ছুটলেন। পুবদেশীয় খোলা প্রান্তর তাকে টানতো নেশার মত। মংগোলিয়া এসে বাবা আর কখনো পশ্চিমে ফিরবেনা বলে ঠিক করলো। ওইতো, এরপর কোথা থেকে কোথায় আমরা না গিয়েছি! ভেড়া চরিয়েছি, ঘোড়া পেলেছি, চাষবাস ও করেছি, কোনো পিছুটান ছিলোনা আমাদের। এখন এখানে ভাল্লাগছেনা, চলে গেলাম ওয়াগন বেধে অন্য কোনো প্রান্তরে। আহা, ওটাই ছিলো জীবন।’ শেষদিকে কেমন ধরে উঠলো তার কন্ঠ।

‘ঠিক! ঠিক বলেছো দাদী, একদম ঠিক বলেছো!’ প্রায় চিৎকার করে উঠলাম আমি ‘আহা, আমিও যদি…’

‘তুই এখন তাই-ই করে বেড়াচ্ছিস’ আমাকে মনে করিয়ে দিলেন বৃদ্ধা!

দাত বের করে হাসলাম আমি! ঠিক বলেছেন আইশা দাদী। আমি সত্যিই তখন আমার স্বপ্নের জীবনযাপন করছি। অন্তহীন গন্তব্যের জীবন!

আইশা দাদীর কাছ থেকে সাময়িক বিদায় নিয়ে আমি যখন মাগরীবের নামাজ শেষে আবার ফিরে এলাম, আমি হয়ে গেলাম সেদিন তার প্রধান সাহায্যকারী। কখনো ওয়েইটারের কাজ করিনি তখনো, কিন্তু মোটেও খারাপ না আমি সেকাজে। এদিক থেকে হাক আসছে, ওদিক থেকে হাক আসছে, লোকজন অবাক হচ্ছে, আর ঘটনা টের পেয়ে হাসছে, আরও বেশী উৎফুল্ল হয়ে উঠছে একজন বিদেশীকে তাদের সেবায় দেখে। মজার কান্ডটা হলো যখন আমিরখান ওমারভ স্বয়ং আমাকে খুজতে খুজতে এসে আইশা দাদীর আসরে ঢুকলো। চিৎকার করে এক প্লেট মানতি চাইলো সে, চারিদিকে তাকিয়ে কাকে যেনো খুজছে। প্লেট হাতে খোদ তাকেই হাজির হতে দেখে ওর চোখ উঠলো কপালে!

‘ট্যান ভাই, করেছো কি!’

‘হ্যালো আমিরখান ওমারভ! এইযে তোমার অর্ডার’ আমার ভাবটা যেনো, গ্রামের ছোটভাই আমার সে, শুধু নামেই পরিচয়। প্লেটটা সযত্নে রেখে আর একটা কথা না বলে উল্টো হেটে চলে এলাম, ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম অন্য আরেক টেবিলে! আড়চোখে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম, বসে বসে ফুসছে সে, আর সেই ক্ষোভ ঝাড়তে হামলে পড়েছে খাবারের উপর! আরও প্রায় ঘন্টাদেড়েক পর যখন সব ব্যাস্ততা স্তিমিত হয়ে এলো, একে একে সবাই চলে যেতে লাগলো, রয়ে গেলো শুধু আমিরখান। এখনো বুঝতে উঠতে পারছেনা, ট্যান ভাই এমন করলো কেনো। প্রথমবারের পর আর একবার খাবারও চায়নি সে।

রান্নাঘর থেকে একবার সেদিকে উকি দিয়ে আমি আইশা দাদীকে বললাম, আমার বন্ধুটি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে, আমরা তার তারুন্যের গল্প শুনতে চাই, ওটা আমার সেদিনের মজুরী। মিষ্টি হেসে তিনি বিরাট এক ঝাকাভর্তি তার সবচে সুস্বাদু কাবাব আর বড় এক ডিশ কুরদাক উন্মোচন করলেন, নানা পদের শুকনো মসলা আর পেয়াজের স্তুপের সাথে কড়া ভাজি করা গরুর মাংস ওটা, নিমেষেই জিভে জল এনে দেয়! হই হই করতে করতে আমি একের পর এক সেগুলো নিয়ে এলাম টেবিলে, আমির যেখানে বসেছে। হাসি দুই কান ছুয়ে গেছে তার অতোক্ষণে!

‘আমি জানতাম, আমি জানতাম এমনটাই হবে, তাইতো বসে আছি, যাইনি!’ কুটিল হাসি দিলো কাজাখ কিশোর!

‘দারুন করেছো!’ ওর কাধে চাপড় দিলাম আমি বেশ জোরেশোরে ‘ আইশা দাদীর গল্পের কথা বলেছিলে, সেকথা না শুনে যাই কি করে! তাইনা দাদী?’

‘উনি তোমার দাদী হলো কবে?’

‘এইতো, আজ বিকেলে’

আমার কয়েক ঘন্টা বয়েসী আইশা দাদী স্নেহের হাসি হাসলেন। ভীষণ ঠান্ডা বাতাসের কবল থেকে আমাদের আড়াল করে রাখা বড় পাথরের বোল্ডারটার পাশে আরামদায়ক অগ্নিকুন্ডের পাশে বসে আমি মংগোলিয়ান যাযাবরদের রোমাঞ্চকর জীবনের কথা শুনলাম। দাদী কথা বলেন খুব আবেগ নিয়ে, এমনকি আমির পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে গেলো। সেদিন গভীর রাত পর্যন্ত কত কাহিনীই না তিনি আমাদের শোনালেন!

মঙ্গোলিয়াতে তখন রেললাইন তৈরী হচ্ছে! কাস্পিয়ান সাগরের তীরে মাছ ধরা ছোট্ট আইশা দাদীর বাবা ট্রান্স সাইবেরিয়ানের বর্ধিত সেই অংশের কাজে যোগ দিয়ে উপার্জন করার সৌভাগ্য পেয়ে যান প্রথমবার এদেশে এসেই। দাদীর মনে আছে, সাপের মত একেবেকে এগিয়ে যাওয়া রেললাইনের সাথে এগিয়েছিলো তাদের গারও। একমাসের বেশী কখনো থিতু হতে পারেনি তিনজনের ছোট্ট পরিবারটা। উনিশশ একষট্টি সালে যখন সব কাজ শেষ হয়ে গেলো, বাবা তখন ভুলে গেছেন নিজের সব দুর্বলতা, অনিশ্চয়তা, পাঁচশ ভেড়া, আর তিনশ ছাগল কিনে থিতু হয়ে গেলেন তারা উত্তর-পুর্ব মঙ্গোলিয়ার খেনতি পর্বতমালার কোনো এক অজানা উপত্যকায়। ছয় মাস না যেতেই বাড়ি পালটে ফেললো যদিও আইশা পরিবার। অতিরিক্ত ঠান্ডায় বিরক্ত হয়ে তার বাবা ঠিক করলেন, র‍্যাঞ্চিং করলে দক্ষিণের গরম জমিতেই করা উচিত! গোবির প্রান্তরে জন্ম নিলো পরিবারের ছোট ছেলে, আইশা দাদীর একমাত্র ভাই, আর তার ঠিক এক বছর পরে কোন এক অসুখে পড়ে মারা গেলেন তার মা। ছোট্ট ভাই, এবং বাবার সাথে তার সংগ্রামের জীবন।

অমনই কোনো একদিন বাবা ঠিক করলেন, আর একা একা থাকা নয়, ছেলেমেয়েদের ভালোর কথা ভেবে তিনি নিয়মিত ভ্রমণ করে, এমন এক যাযাবর গ্রামে এসে হাজির হলেন। সবগুলো ভেড়া, আর ছাগল বিক্রি করে দিয়ে কিনলেন ঘোড়া আর ইয়াক, ওরা বেশি কষ্টসহিষ্ণু, এবং ভ্রমনের সময় অনেক উপকারী। গ্রামটা আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করলো তাদের, কাজাখ পরিচয়, কিংবা ধর্ম নিয়ে কারো সামান্যতম মাথাব্যাথাও নেই! সময়ের প্রয়োজনে এদিক থেকে সেদিকে ছুটে বেড়ায় জনাবিশেক পরিবারের সেই গ্রাম। সেই গ্রামের সম্পদ কয়েক হাজার ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া, ইয়াক! কিছুদিন বাদেই আইশা দাদী মায়ের অভাব বোধ করতেন না, ঠিক যেমন তার বাবা চেয়েছিলেন। তার দিন কাটতো গ্রামের মহিলাদের কাছ থেকে সেলাই, রান্না, আর গান শিখে! কিন্তু চুপিচুপি দাদী বলেছেন, এটা হচ্ছে কথার কথা, মুলত তার দিন কাটতো বান্ধবীদের সাথে দস্যিপনা করে। বারো বছর বয়সের আগে কাউকে পনি (ছোটদের চলার উপযুক্ত ঘোড়া ) দেয়া হতো না, দাদীর বয়সতো তখন সবে এগারো, চলবে কেনো? কখনো গ্রামের পাশের নদীর তীর ধরে হাটা অভিযান, অথবা তারও দুরের পাহাড়সারীতে ট্রেকিং ছিলো তার সবচে প্রিয় বান্ধবী আলতার পছন্দের কাজ। প্রিয় বন্ধুর কথা বহুদিন পর স্মরণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেন দাদী। যখন তাদের বয়স একটা পনি ঘোড়া পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেলো, চারিপাশের এলাকায় বন্ধু খুজতে যেতেন তারা। গ্রামের প্রবীনদের কাছ থেকে সদ্য লিখতে শেখা মেয়ের দল তাদের নতুন বন্ধুদের সাথে চিঠি আদানপ্রদান করতো। মজার ব্যাপার হলো, চিঠির লেখিকা এবং পিয়ন হতো একই মানুষ, কি আর করার, তাদেরতো আর পোস্টম্যানের বিলাসিতা নেই! একসময় দেখা গেলো, এই কাজ এতই জনপ্রিয় হয়েছে কিশোরমহলে, দাদী আর আলতার লুকিয়ে যেতে হতো, সবার নজর এড়িয়ে চলার স্বার্থে! আলতার কথা বলতে বলতে দাদী একসময় বিষণ্ণ হয়ে উঠলো।

দুঃখ নিয়ে বললেন, অমনটা যদি না হতো! সেলেঞ্জ নদীর অববাহিকায় সেবারের বসন্ত কাটানোর জন্য থেমেছিলো যাযাবর গ্রাম। আইশা দাদীর প্রিয়তমা বান্ধবী কেমন পালটে গেলো হঠাত করে! সেলেঞ্জপারের এক র‍্যাঞ্চার যুবকের প্রতি তার সে কি টান! এমনকি নির্লজ্জের মত সে স্বীকার ও করে নিলো তা। এক মাস মাত্র তাবু ছিলো সেলেঞ্জে, ঐ এক মাসে আলতা নিজের হৃদয় খুইয়ে বসে আছে, এবং, ওটাই চুড়ান্ত, আইশা-আলতা জুটি যেনো কোন শতবর্ষী স্মৃতি। প্রিয় বান্ধবীকে ভুলে অচেনা এক ছোকরার প্রতি এহেন অন্তরঙ্গতা দেখে আইশা দাদী ভীষণ ঈর্ষাকাতর হলেন, কিন্তু আলতার সাথে খারাপ ব্যাবহার তো তিনি করতে পারেন না! তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনে বরং ইতি টেনে বিয়ের ব্যাবস্থা করে দিলেন দাদী, খুব দ্রুত সেকথা আলতার বাপকে জানিয়ে। মেয়ের আবদার না রেখে পারলোনা বাবা, গ্রীষ্ম এসে পড়ার আগেই দক্ষিনমুখী যাত্রার আয়োজন করছে যখন গ্রামের সবাই, অমন এক সময়ে অনাড়ম্বড়ভাবে বিয়ে হয়ে গেলো দাদীর বান্ধবীর।

আইশা দাদী জীবনে প্রথমবার ভীষণ একা বোধ করলেন, একটাবারও প্রিয় বান্ধবীর কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই কারাভানের সাথে রওনা দিলেন দক্ষিণে! নিয়তির কি পরিহাস, দাদী হাসিমুখে বললেন, আলতাকে ফের কবে দেখতে পাবো জানতাম না, অথচ আটদিন পরেই ওর সাথে দেখা হলো আমার, কিন্তু ও যে আর কথা বলেনা! কেউ জানেনা কিভাবে মারা গেলো আমার প্রাণের বান্ধবী!

এই পর্যায়ে বিরাট এক ধাক্কা খেলাম আমি। মাথার ভিতরে কিছুক্ষণ যাবত ঘুরতে থাকা ছোটখাটো কিছু হিসেব যেনো চকিতে মিলে গেলো।

‘দাদী, তোমার বান্ধবীর নাম আলতেন্তসেতসেগ, তাইনা?’ অনুচ্চ কন্ঠে কথা বলে উঠলাম আমি।

‘তুই জানলি কি করে রে?’ হাসলেন দাদী।

‘আলতা দাদীর স্বামী ওটগোনবায়ারকে আর কোনোদিন দেখেছো?’

‘তুই তার নাম জানলি কি করে?’ এবার দাদী অবাক।

‘বলোনা, তাকে আর কোনোদিন দেখেছো?’

‘আর কোনোদিন দেখিনি, কিন্তু শুনেছি ওর কথা’

‘এখনো ওই র‍্যাঞ্চেই থাকে বায়ার দাদু। আর কোনোদিন বিয়ে করেনি সে, পরিবারের সবাইকে বিদায় দিয়ে একাই থেকে গেছে সেলেঞ্জপারের সেই বসতিতে। আর কখনো সরেনি, ওটাকে বড় করেছে, কিভাবে জানিনা, কিন্তু অনেক বড়, অথচ দীনহীন এক র‍্যাঞ্চ ওটা এখন। জানো র‍্যাঞ্চের নাম কি? আলতেন্তসেতসেগ। দাদীকে খুব ভালোবাসে দাদু, এখনো তার কথা ভেবে কেদে ফেলে। বহুবছর একা কাটিয়েছে সে, বছর চারেক আগে এক বিদেশী কিশোরী পথ হারিয়ে উঠেছিলো তার র‍্যাঞ্চে, এখন একটা সংগী জুটেছে, দুজনে দিব্যি আছে। আর, শেষ কথা হচ্ছে, এবছর বসন্তে আমি ওখানে ফোরম্যানের কাজ করেছি’

‘অদ্ভুত কথা শোনালিরে ট্যান!’ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো আইশা দাদী। সম্ভবত অতীতের কথা ভাবছে ‘আমি জানতাম মংগোলিয়া অনেক বড় দেশ। কিন্তু এত ছোট!’

‘পৃথিবীটাই খুব ছোট্ট এক জায়গা দাদী! আমরা, মানুষেরা অহেতুক তাকে বড় মনে করি, বড় করে ফেলি!...আলতা দাদীকে কোথায় কবর দিয়েছিলে তোমরা? বলতে পারবে? বায়ার দাদু কি যে খুশী হবে সেকথা জানতে পারলে, তুমি যদি জানতে দাদী!’

‘পারবো রে! কিন্তু তুই আমাকে অবাক করছিস। ওটগোনবায়ার সম্পর্কে বহু বাজেকথা কানে এসেছে আমার। তুই একদম নিশ্চিত, একই লোকের কথা বলছি আমরা?’

‘একদম নিশ্চিত!” মাথা ঝোকালাম আমি ‘কিন্তু তুমি এসব কি বলছো!’

‘যদিও শোণা কথা, কিন্তু বিশ্বাস কর ট্যান, যা শুনেছি, তা ভুল হতে পারেনা!’

‘আমাকেও একটু শোনাবে?’ আমার বাতসাইখানের কথা মনে পড়ে গেলো, মনে আছে কিভাবে লোকটা দাদুকে ঘৃণা করে, কিছু একটা বলতে যেয়েও বলেনা আমাকে।

‘তুই উত্তরের ভাতৃসংঘ সম্পর্কে কদ্দুর জানিস?’

‘কিচ্ছু জানিনা!’

‘হুম।... এই বাদর’ আমিরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন দাদী ‘তোর বাপ এসে পিঠে তিনটা লাঠি ভাংবে! এখনো ঘুমোতে যাচ্ছিস না কেনো?’

‘আরে আরে, ট্যান ভাই ছাড়া আমি যাবো নাকি!..ট্যান ভাই, বলোনা, আমিও গল্প শুনবো!’ বলতে বলতে বিরাট এক হাই ছাড়লো কাজাখ কিশোর। হেসে ফেললাম দাদী আর আমি। এরপর আমির নিজেই মেনে নিলো, যথেস্ট গল্প শুনেছে, সে আর জেগে থাকতে পারবে না! আমাকে জলদি আসার তাগাদা দিয়ে চলে গেলো নিজের ঘরে ঘুমাতে!

চারিপাশ তখন নিস্তব্ধ। আগুনে কয়লা পোড়ার ফটফট, এবং মঙ্গোলিয়ার মাতাল হাওয়ার তৈরী মৃধুমন্দ শো শো শব্দ কানে যেনো বোমার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আটোসাটো কোটটা আরেকটু টেনেটুনে বসলাম আমি। আইশা দাদুর চোখে ঘুম নেই। রাত আটটার পরে একটা জনমানুষ জেগে থাকেনা এই গ্রামে। কিন্তু দাদী আমাকে কথা দিয়েছে।

‘উত্তরের রাশিয়ান সীমান্তে শীতকাল বড় নির্মম। লেক খুভশগুল ও তার আশেপাশের হাতেগোনা কিছু গ্রাম, আর লেকের পশ্চিমের উচ্চভুমিতে রেইনডিয়ার উপজাতি ছাড়া আর কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। কিন্তু, আসলে আছে। সবার অগোচরে সেখানে ঘাটি গেড়ে আছে ভ্রাতৃসংঘ, এ এমন এক দল, যারা আছে পুরো পৃথিবী জুড়ে, অসম্ভব তাদের ক্ষমতা। যেখানেই টাকার চিহ্ন পর্যন্ত আছে, সেখানেই তাদের হাত। ইউরোপ থেকে শুরু করে পুর্ব-পশ্চিমে সমানে নিজেদের সাম্রাজ্য ছড়িয়েছে ওরা। যেখানে যে সুযোগ! ওরা মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়। প্রচুর অর্থ-বিত্ত দান করে বেড়ায়। সমাজে বিরাট প্রতিপত্তি। উপার্জনের জন্য ব্যাবসা করে নারীদেহের, অস্ত্রের, মাদকের, অর্থপাচারের, মানবপাচারের, আবাসনের, অ্যালকোহলের, পরিবহনের! এমন কোনো কাচা পয়সার ব্যাবসা নেই দুনিয়ায়, যাতে তাদের হাত নেই। কিন্তু জানিস, ওদের কাছেই সাধারন মানুষ হাত পাতে, ওদেরকেই শ্রদ্ধা করে। কারন, খুব কম মানুষই জানে তারা কারা! আর যারা জানে, তারা হয় পৃথিবীতে থাকে, নাহলে থাকে না। দুটোই বিকল্প’

‘মাফিয়া’ ফিসফিস করে বললাম আমি। গলার স্বরটা কেমন কেপে গেলো তবু। ঠান্ডায়?

‘রাশিয়ান মাফিয়া’ আমাকে কিঞ্চিত শুধরে দিলেন আইশা দাদী ‘মঙ্গোলিয়ার উত্তর সীমানারেখা ধরে ওদের স্বর্গরাজ্য’

‘তুমি কি এখন বলবে, বায়ার দাদু...?’ হযবরল কন্ঠে বলে উঠলাম আমি।

হাসলেন আইশা দাদী ‘তুই দাদুকে পছন্দ করিস খুব, তাইনা ট্যান?’

‘আমার সাথে তার সম্পর্কটাই অমন ছিলো দাদী!’

‘ওটা ই তো জরুরী, তাইনা?’

‘ঠিক তাই। কিন্তু তুমি যা খুশী বলতে পারো দাদী! আমি মন খারাপ করবোনা’

‘তোকে দুঃখ করতে হবে না ট্যান। আমি কি বলছি তাই শোন শুধু। প্রতিবেশী র‍্যাঞ্চগুলোর ব্যাবসা থেকে যতরকম সুবিধা আদার করতো ওরা, তার প্রধান অস্ত্র ছিলো বায়ার। হয়তো কোনো এক শীতে প্রতিবেশীর সব ঘোড়াগুলো মরে গেলো, বসন্তে বায়ার নিজের ঘোড়া ভাগ করে নেবে তাদের সাথে। অথচ সেবছর না ঘুরতেই প্রতিবেশীর জমির সব ফসল নস্ট হয়ে গেলো রহস্যময় কোনো কারনে, ঘোড়ার দল কোথায় গিয়ে আর ফিরে এলোনা! আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকা সে বন্ধু বায়ারের কাছে ফের হাত না পেতে এবার ধার চাইবে। বায়ার দেবেও। কিন্তু এই চক্র কখনো শেষ হবেনা! চারিপাশের সমস্ত র‍্যাঞ্চাররা স্বর্বস্ব খুইয়ে চলে যাবে, এও কিন্তু তারা চায় না। চক্রের কোনো এক পর্যায়ে র‍্যাঞ্চারদের ভাগ্য ফিরবে। আবার সুদিন, এবং ফের আসবে দুর্দিন। একা বায়ার আর কত লোককে সাহায্য করবে? তারওতো চলতে হবে! তখন বায়ার তাদের বিনিময়মুল্যে সাহায্য করতো। কারও কাছ থেকে বিনিময় হিসেবে নিজের ‘ব্যাবসা’র জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিতো, কারো কাছ থেকে সুদ। গোটা এলাকার অর্থনীতির চাকা একাই ঘোরাতো সে।’

কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে গেলো আইশা দাদী। খিলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাত খুচিয়ে স্তব্ধ আমার দিকে তাকালেন ‘কিন্তু তুই একটা কথা বলে নতুন একটা চিন্তা ঢুকিয়েছিস আমার মাথায়। ও এমন এক জায়গায় র‍্যাঞ্চ বানিয়েছে, যেটা ওদের রাজত্ব! আর ওর পরিবারের কথা কি বলেছিলি? সবাই ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো? একথা আমার বিশ্বাস হয়না। তোর কি মনে হয়, ঝামেলায় না জড়িয়ে পারতো বায়ার? আমারতো ধারনা, ওকে ব্লাকমেইল করা হয়েছে। আলতা মানুষ চিনতে ভুল করার কথা না। যদিও একথা আরও অনেক, অনেক বছর পরের। কে জানে, হয়তো ওর একা হয়ে যাওয়ার কাহিনীটা আরও বেশী করুণ, যা আমি তোকে ধারনা দিতে পারি! জীবনটা মোটেও সরলরেখা না ট্যান, যা দেখছিস,তা সবসময় তা না, বরং তুই কখনো যা দেখিস না, হয়তো ওটাই সবকিছু! কথাটা মাথায় রাখিস বাছা’

‘নিশ্চই দাদী! আমি এখনো বিশ্বাস করি বায়ার দাদু সজ্ঞানে কখনো অমন জঘন্য কাজ করতে পারেনা।’

‘পৃথিবী দেখার এটা তোর একটা ধরণ! সবসময় বিশ্বাসটা অমনভাবে করবি ট্যান। যত নেতিবাচকতা আছে, শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তা এড়িয়ে চলবি, যতক্ষণ না বাধ্য হচ্ছিস। দুনিয়াতে যদি উজ্জ্বল চিন্তা করার মানুষ কমে যায়, তাহলে অন্ধকার ঘনাতে যে বেশি বাকি থাকেনা! সবসময় বিশ্বাসটা অমনভাবে করবি ট্যান।’

‘করবো দাদী!’ লম্বা এক দ্বীর্ঘশ্বাসের সাথে একরাশ ধোয়া বেরুলো আমার নাকমুখ দিয়ে।

আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন আইশা দাদী। এরপরে ঠিক আমার দাদীর মত কথা বলে উঠলেন।

‘আরও খাবি?’

‘খাবো তো! কালকে। এখন খুব ঘুম পাচ্ছে!’

‘দাদীর ঘরে থেকে যা না আজ!’

‘আলিচাচা আমার জন্য অপেক্ষা করবে যে!’

‘হ্যা, তাও বটে! আচ্ছা যা। কাল আবার আসিস। চিন্তা করিস না, কালকে আর খাটাবোনা তোকে…’

‘কি যে বলোনা! আমাকে রান্নাঘর থেকে ভাগাতে পারো কিনা দেখবো’

‘হয়েছে যা!’ মুচকি হাসলেন বৃদ্ধা!

পরদিনও আইশা দাদীকে সাহায্য করলাম আমি। সেরাতেও আমরা গল্প করেছিলাম, তবে কিনা, সেদিন কথা বলতে হলো আমাকে। আমার গল্প শুনে দাদী যে প্রশ্নটা করলো আমাকে, তা আর কোনোদিন করেনি কেউই। দাদী জানতে চাইলো, ‘তোর কখনো বিয়ে করে সংসারী হতে ইচ্ছে করেনা ট্যান?’

‘খুব ইচ্ছা করে দাদী, খুব! বিশ্বাস করো, আমার একটা বউ না থাকা সত্বেও বউটাকে কত যে ভালোবাসি! কিন্তু তা কেউ জানেনা।’ মন খারাপের ভংগি করে চুপ করে গেলাম আমি।

‘কিন্তু তোকে কে বিয়ে করবে? তুইতো শুধু উড়ে বেড়াতে চাস!’

‘খুব বিশেষ কেউ একজন করবে দাদী! আর এমনিতেও আমার বউ হতে হলে তাকে খুবই বিশেষ হতে হবে। কিন্তু কি জানো, আমি তাকে দেখামাত্রই চিনে ফেলবো, যে ইনিই সেই রাজকুমারী, যিনি আমার রাণী হতে চলেছেন!’

‘বাবা!’ চোখ বড়বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আইশা দাদী! ‘এত প্রেমময় হৃদয় নিয়ে যাযাবর হলি কি করে বলতো শুনি?’

‘কি আর বলবো দাদী! তুমিতো শুনলেই রাজকুমার থেকে রাজা হয়ে যেতে আমার কতই না ইচ্ছা! কিন্তু এই ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, তারচেয়ে বেশী রোমাঞ্চ অনুভব করি আমি অন্য একটি জিনিসে। এইতো, এখন তাই করছি। তোমার সাথে গল্প করছি মঙ্গোলিয়ার খোলা প্রান্তরে বসে, যেখানটা আমি দুইদিন আগে জীবনে কখনো চোখে দেখিনি, অথচ এখন যাকে মনে হচ্ছে আমার নিজের বাড়ি। আমার কোনো ছোটভাই নেই, অথচ মনে হচ্ছে আমিরখান ওমারভকে জন্ম থেকে দেখছি, আমার দাদীটা যেনো কোত্থেকে উড়ে এসে তুমি হয়ে গেলে।’

‘হুম, তোর হৃদয় তাহলে শুধু প্রেমময় না! তুই হলি...উম...পাগল!'

‘পোকো লোকো!’

‘ওটা কি?’

‘ও দাদী, ওটা স্প্যানিশ!...আচ্ছা দাদী, তোমাকে কখনো মার্গারিতা আল্ভারেজের কথা বলেছি?’

‘নাহ! কে সে?’

‘দুনিয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমতি, সুন্দরী, কোমলহৃদয়, সাহসী এবং ভালো মেয়ে।’

‘ওও!’ চট করে তাকিয়ে দেখি আমার দিকে সরু চোখে চেয়ে আছে দাদী!

‘আহা দাদী’ মুহুর্তের মাঝে নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিলাম নিজের লাগামহীন হৃদয়ের ’মজা করছিলাম। ও আসলে একটা উপন্যাসের চরিত্র। ছোটবেলায় পড়েছি কোথাও। ওর জন্য আজও আমার মন খারাপ হয়। মন খারাপ হয়, কারন ওকে আমি খুবই ভালোবাসি-কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা যে তাকে বলা যাবেনা, উঁহু, মোটেও না! কারন কি জানো? কারন সে এমন এক দুনিয়াতে বাস করে, যেখানে আমি যেতে পারিনা! কি অসহায় একটা অনুভূতি, তাই না দাদী?’

‘তোর বয়স কত ট্যান?’

‘বাইশ বছর!’

‘আমার বয়স কত জানিস? বাহাত্তর। আমার কাছ থেকে কি লুকাবি বল? কিন্তু আমি তোকে জোর করবোনা বাছা। আমি জানি তোর মনের কথা। শোণ, কখনো কখনো সবচেয়ে অসহনীয় কস্টগুলোর কথা ভেবে সেই কস্ট লাঘবের জন্য দরকারি সব দুঃসাধ্য ঘটিয়ে ফেলা যায়। শুধু তোর মন সবচেয়ে বেশী যেই জিনিসটা চাইবে, ঠিক তাই করবি, অন্য কিচ্ছু না! ঠিক আছে? কারন মানুষের মন অধিকাংশ সময়েই ঠিক কথাটা বলে’

‘ঠিক আছে দাদী!’

আইশা দাদী অমনই। আমার খুব আপন হয়ে উঠেছিলেন মঙ্গোলিয়ার উইচ লেডি।