শীতল সবুজ মংগোলিয়ান উপত্যকায় এক আকাশ চঞ্চলতা!


আমার সারাজীবনের অসংখ্য রঙিন স্মৃতির যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা এবং মুহুর্তগুলো আমি আজীবন চোখ বন্ধ করে পুণরায় ঠিক একইভাবে অনুভব করতে পারি, ওটা ছিলো অমন একটা মুহুর্ত। মার্গারিতা আল্ভারেজ ঝড়ের বেগে উড়ে এসে যখন আমার পাশে দাড়ালো, সরল মুখটা, সেই মুখের অপার্থিব হাসি, আর এক ঝলক বিরহ নিয়ে সে আমার হাতটা ছুলো, আমার বুকটা যেনো নিমেষেই শুন্য হয়ে গেলো। নতুন সব অনুভুতিতে পূর্ন হতে লাগলো মনটা। একটু আগে নিজের আকাশপাতাল চিন্তা, দুনিয়ার এমাথা থেকে ওমাথা ছোটার ভাবনা, সবকিছু কত তুচ্ছ মনে হলো, আমার জীবনের সকল চুড়ান্ত প্রত্যাশারা যেনো ওখানে, ওই মুহুর্তে এসে থেমে গেলো, মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো সেই মায়াবী কিশোরীর অপার্থিব মায়াজালে, বুকের মাঝে উষ্ণ একটা ধারা যেনো বিদ্যুৎচমকের মত ছুটে গেলো বিরাট এক বিলম্বিত ক্ষণ তৈরী করে।


শীতল সবুজ মংগোলিয়ান উপত্যকায় এক আকাশ চঞ্চলতা!



সেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগেছিলাম আমি, অথচ রাতে ঘুমিয়েছি মাত্র দুই ঘন্টা। উত্তেজনায় কাপছি তখন। বাতসাইখানের পাওনা টাকার বেশ বড় একটা অংশ আমার পকেটে। প্রায় ষোল লক্ষ তুগরীক। বেচে যাওয়া বার্লিগুলো নিশ্চই ইতিমধ্যে তুলে বিক্রি করে ফেলেছে দাদু। আলুগুলো নিয়ে আনাক র‍্যাঞ্চে একা একা যেতে তার নিশ্চই বেশ কস্ট হবে। র‍্যাঞ্চে ফেরার জন্য আমার তাই তাড়ার শেষ নেই। নাশতা করার জন্য বারবার বলেও আমাকে রাখতে পারলেন না মিস্টার তেমুজিন। তার কাছ থেকে আন্তরিক বিদায় নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে উলানবাটারের মুল এভিনিউতে অবস্থিত বাসস্ট্যান্ডে হাজির হলাম। বডরাখগামী দারুন সুন্দর এক রঙিন বাসে চড়ে বসলাম। একগাদা পটেটো চিপস, আর ম্যাংগো জুস নিয়ে বসেছি। গলদঘর্ম হয়ে আসনটা খুজেপেতে তিন মিনিট পরেই বাসটা ছেড়ে দিলো। আমার পাশে বসেছেন এক প্রৌঢ়, সুবেশী রাশিয়ান ভদ্রলোক, যখন জানা গেলো আমাদের ভাষার মিল নেই, আন্তরিক কিছু ইশারা শেষে তিনি মুখ গুজলেন দিমিত্রি গ্লাকোভস্কির একটা উপন্যাসের পাতায়, আর শরীর শক্ত করে বসে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলাম আমি।

সাড়ে পাচশ কিলোমিটার ভীষণ রুক্ষ, কখনো চিহ্নহীন পথ ধরে চলতে দুইবার যাত্রাবিরতি দিলো বাস, খোলা প্রান্তরের মাঝেই। আর ওদিকে আমার অপেক্ষা যেনো আর ফুরোতেই চায়না। সেদিন গভীর রাতে বডরাখের জনবিরল এক পথে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো বাসটা তার দীর্ঘ যাত্রার শেষ স্টপেজ- আরও দেড়শ কিলোমিটার পশ্চিমের মুরুন শহরে। পুরো বডরাখ শহরে একটিও দ্বিতল ভবন নেই, নেই কোনো ইট-সিমেন্টের ছোয়াও। অনেকটা হাটগালের বড় সংস্করনের মত। কোথাও কোনো আলো জ্বলছেনা, তবে বাসের ড্রাইভার আমাকে বলে দিয়েছে কোথায় গেলে রাতে থাকতে পারবো! প্রধান সড়ক থেকে উত্তরের পাহাড়সারির সবচেয়ে উচু চুড়াটাকে নিজের চোখ বরাবর রেখে হাটতে হবে। ঠিক যেই মুহুর্তে টিলাটা সামান্য বাক নিয়েছে বলে মনে হবে, তখন পথ ছেড়ে পুর্বে তিন’শ মিটার মেঠোজমি হাটলে আমার সামনে উদয় হবে দি বডরাখ ইন সরাইখানা। ঠিক তাই হলো। খুবই কম ভাড়া ছিলো আমার কামরাটার, মনে পড়ে। সরাইয়ের মহিলা নিজের কাজ এতই ভালোবাসেন যে, ওই রাতদুপুরে আমার জন্য হরশুর আর বাজ বানিয়ে খেতে দিলেন, আমার আপত্তি সত্ত্বেও।

দারুন এক ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলাম পরদিন সকালে আমি দারুন সেই শহরে। বডরাখ শহরকে আমি কোনোদিন ভুলবোনা। শহরের উত্তরে একসারি পাহাড় থোকা দিয়ে রাখা কতগুলো ডিমের মত মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে। মাটির রাস্তাঘাট, আর মাটির মানুষদের শহর। সরাইওয়ালী মহিলা তার ছেলেকে আমার সাথে দিয়ে দিলেন, ভাড়ায় গাড়ি পাওয়া যায় শহরের যে প্রান্তে, সেখানে। এখান থেকে উত্তরের দেড়শ কিলোমিটার ভয়ানক দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আমাকে পৌছতে হবে আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিনের সবচেয়ে কাছে যেখানে গাড়ি চলাচলের পথ আছে। এরপর এজিন-গোল নদী যেখানে সেলেঞ্জের সাথে মিলিত হয়েছে, সেপথে পশ্চিম থেকে আগত সেলেঞ্জের স্রোতের শব্দ অনুসরন করে হাটতে হবে আরও প্রায় দশ কিলোমিটার উত্তর-পুর্বে।

সবকিছুই ঠিকমত হচ্ছিলো, কিন্তু বিপদটা এলো ঠিক মাঝপথে, আমাদের যাত্রাপথের শেষ মনুষ্যনিবাস এগুর থেকে পঞ্চান্ন কিলোমিটার উত্তরে, যেখানে বাইরে থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ভীষণ ক্ষীণ। আমাদের ফোর হুইল ড্রাইভের ফ্রন্ট এক্সেল ভেঙে দুই টুকরো। আমার ড্রাইভার, মাঝবয়েসী জনাব কারা তার আদরের সাত বছর বয়েসী ছেলের আবদার মেটাতে তাকেও আমাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন লম্বা যাত্রায়। আমার জন্য যতটা না বিপদ, এই বাপ ছেলের জন্য তারচেয়ে কয়েকগুন বেশী। মিস্টার কারা জানালেন, তার কাছে শুধুমাত্র যেই একটা জিনিসের কোনো বিকল্প নেই, ঠিক সেটিই হয়েছে, অথচ দুর্গম পথে যাত্রার জন্য তার প্রস্তুতি কম ছিলোনা। তখন আমার সামনে পথ খোলা ছিলো দুটি। প্রায় পয়তাল্লিশ কিলোমিটার সামনে আমার র‍্যাঞ্চ বরাবর হাটা ধরা, এবং পথিমধ্যে কোনো যাযাবর পরিবারের গারের সন্ধান পেয়ে তাদের কারো ঘোড়ার পিছনে আরোহী হতে চাওয়ার দাবী করতে পারার আশা করা, অথবা পঞ্চান্ন কিলোমিটার পথ দক্ষিণে হেটে এগুর শহরে প্রত্যাবর্তন, এবং সাহায্য নিয়ে আসা। মনটা ভীষণ করে প্রথম কাজটা করতে চাইলেও, কারার ছেলেটার দিকে চেয়ে পারলাম না সেকাজ করতে। সকাল দশটার কিছু পরে ব্যাকপ্যাকে হালকা কিছু খাবার, এবং পানি দিয়ে আমি এগুরমুখী হাটা শূরু করলাম। বাপ ছেলে রইলো তাদের গাড়িতে।

কখনো মেঠোপথ, কখনো পেভমেন্ট, কখনো ক্লান্তিকর খাড়া চড়াই, এবং কখনো ভীষণ শক্তিবিনাশকারী উতরাই, এবং পাথুরে আকাবাকা পাহাড়ী পথ ধরে কখনো হেটে, কখনো দৌড়ে, কখনো প্রশান্তিভরে চারিপাশের অপার সৌন্দর্য্য গিলে নিয়ে, আর কখনো বুকের মাঝে পাগলা ঘোড়ার দৌড় অনুভব করে আমার সেই কঠিন যাত্রা শেষ হলো সন্ধ্যার কিছু পরে। বেশ দ্রুতই এসেছি। এবং সেই রাতেই আমার ড্রাইভারের বলে দেয়া দিক অনুসরন করে তার শ্বশুরবাড়ী খুজে বের করে, আমার বয়েসী কারার শ্যালককে সংগী করে ওর স্ট্যালিয়নে চড়ে ফিরে এলাম দুর্ঘটনাস্থলে। বাপ বেটা তখন ঠকঠক করে কাপছে শীতে।

ছোকরা শালার নাম ওডগেরেল। ইগুর শহরে কার মেকানিকের কাজ করে। প্রায় ভোররাতে কাজ সেরে নিজের ঘোড়ায় চড়ে একা রওনা হলো সে দক্ষিণমুখী। আর আমাদের অসমাপ্ত যাত্রা আবার হলো শুরু। আমার শরীরের অবস্থা তখন বলাই বাহুল্য। কিন্তু ঘুম এলোনা। সকালের আলো ফোটার কিছুক্ষণের মাঝেই মিস্টার কারা আমাকে নামিয়ে দিলো ক্ষরস্রোতা এজিন-গোল নদীর তীরে। যাবার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কেদে ফেললো সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে, আর শুধু যাত্রার একমুখী তেলের পয়সা ছাড়া একটা পাই ভাড়া হিসেবে রাখতে অস্বীকার করলো।

বাপ বেটাকে বিদায় দিয়ে ঘুম তাড়াতে ঐ ঠান্ডার মাঝে এজিন-গোলের পানিতে সাতরালাম। অতিরিক্ত কাপড় বের করার সময় আবিস্কার করলাম, মিস্টার তেমুজিন কোনো এক সুযোগে আমার ব্যাগের মাঝে সেই ক্যামেরাটা রেখে দিয়েছেন, বলেননি আর কিছুই। মলিন এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো আমার ঠোটের কোনে। নতুন একসেট কাপড় পরে নিয়ে ক্যামেরাটা চালু করে কতগুলো ছবি তুলে নিলাম অদ্ভুত সুন্দর সেই উপত্যকাটার। এরপরে হাটা ধরলাম সেই পথটা ধরে, প্রায় তিনমাস আগে যেপথে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে আমি খুজে পেয়েছিলাম আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিন। এতদিনেও একটুও পরিবর্তন হয়নি আমার চারিপাশের কিছুই। হবে কিভাবে, কখনো কোনো মানুষের ছোয়া পেলেতো পাল্টাবে! শুধু উত্তরের বিরাট পাহাড়গুলোর বরফে এখন সুর্যরশ্নি প্রতিফলিত হচ্ছেনা, বরং গাঢ় সবুজ রঙে চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছে। সেই জামগাছতলায় এসে দাড়ালাম একবার। প্রায় পৌছে গেছি। ওইতো, সেদিনের মত আজও দেখা যাচ্ছে, মায়াবী লেকের প্রতিবিম্ব, জনশুন্য আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিনের রঙিন ঘরগুলো। ওখান থেকে অনেক কায়দা করে আমি নিজেকে ফ্রেমে রেখে একটা ছবি তুলে নিলাম। তখন নিজের অজান্তেই কিযেনো করে ফেললাম, ক্যামেরাটা থেকে সাথে সাথে ছবি প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে এলো। আমার উত্তেজনা আর দেখে কে! আরও এক গাদা ছবি তুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম, সেই শৈশবে নতুন কোনো খেলনা পাওয়ার চেয়ে উত্তেজনাটা কোনো অংশে কম ছিলোনা।

জামগাছটা এখন গ্রীষ্মকালীন যৌবন পার করছে, কিন্তু ফলশূন্য। গতবারে পকেট ভরে নেয়া জামগুলোর কথা মনে করতেই পেটের মাঝে মোচড় দিলো। শেষ যেনো কখন খেয়েছি? মনেই নেই। বুনোঘোড়াদের ট্রেইলটা ছেড়ে পায়েচলা পথটা ধরে আমি নেমে গেলাম নীচের উপত্যকায়। হাটছি, আর ভাবছি, মংগোলিয়াতে আমার ফার্মিং জীবনের শেষপ্রান্তে এসে পড়েছি। বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে উঠলো আমার। প্রথমত, র‍্যাঞ্চটা ছেড়ে চলে যাবো কিছুদিনের মাঝে, কিন্তু আগে কোনোদিন কোথাও যা হয়নি, মায়ায় পড়ে গেছি আমি এখানটার। দ্বিতীয়ত, সেই মায়ার জালের প্রধান বিস্তারকর্তী মেয়েটার মায়াবী হাসি, আদুরে কথাগুলো নিজের অজান্তেই শেষবারের মত হয়তো শুনে ফেলেছি। র‍্যাঞ্চে আমার দায়িত্বটুকু শেষ করে সোজা দক্ষিণে চলে যাবো আমি এবার। গোবী মরুভুমির পাশ ঘেঁষে এরপরে পশ্চিমের রাশিয়ান সীমান্ত। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান পেরিয়ে আমি পৌছে যাবো ইরান। আমার স্বপ্নের পার্সিয়া। সেখানে আমি দেখবো ইশফাহান, সিরাজ, বন্দর আব্বাস, ইয়াজদ, পার্সিপোলিস...যেসব দুরন্ত প্রান্তরে হাজারো বছর আগে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, ডারিয়াস, জেরেক্সেসরা, পার্সিয়ার রাজকুমারেরা। বহুদিন পর নিজের যাযাবর সত্বাটা জেগে উঠলো। মনটা ছেয়ে গেলো অদ্ভুত এক বিষণ্ণ এবং প্রশান্ত অনুভুতির যৌথ মিশ্রনে।

একমনে ভেবে চলছি, উদাস ভঙ্গিতে, ভীষণ পরিশ্রমে হালকা অনুভুত আমার দেহটা টানতে টানতে, ঠিক অমন একটা মুহুর্তে উদ্দেশ্যহীনভাবে আমার কাছে এসে পৌছুলো এক আকাশ চঞ্চলতা। দক্ষিণের খোলা প্রান্তর থেকে আমার কানে এলো দুনিয়ার মধুরতম ডাকটি।

‘সিনঅঅঅর’

মার্গারিতা।

আমার সারাজীবনের অসংখ্য রঙিন স্মৃতির যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা এবং মুহুর্তগুলো আমি আজীবন চোখ বন্ধ করে পুণরায় ঠিক একইভাবে অনুভব করতে পারি, ওটা ছিলো অমন একটা মুহুর্ত। মার্গারিতা আল্ভারেজ ঝড়ের বেগে উড়ে এসে যখন আমার পাশে দাড়ালো, সরল মুখটা, সেই মুখের অপার্থিব হাসি, আর এক ঝলক বিরহ নিয়ে সে আমার হাতটা ছুলো, আমার বুকটা যেনো নিমেষেই শুন্য হয়ে গেলো। নতুন সব অনুভুতিতে পূর্ন হতে লাগলো মনটা। একটু আগে নিজের আকাশপাতাল চিন্তা, দুনিয়ার এমাথা থেকে ওমাথা ছোটার ভাবনা, সবকিছু কত তুচ্ছ মনে হলো, আমার জীবনের সকল চুড়ান্ত প্রত্যাশারা যেনো ওখানে, ওই মুহুর্তে এসে থেমে গেলো, মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো সেই মায়াবী কিশোরীর অপার্থিব মায়াজালে, বুকের মাঝে উষ্ণ একটা ধারা যেনো বিদ্যুৎচমকের মত ছুটে গেলো বিরাট এক বিলম্বিত ক্ষণ তৈরী করে।

মার্গারিতার বরফশীতল, নরম হাতটায় শক্ত করে চেপে বসলো আমার আঙুলগুলো।

‘তোমাকে কতকি বলে বকা দেবো বলে ভেবে রেখেছিলাম সিনর……কিন্তু, কিন্তু...ওই পাহাড়ের চুড়া থেকে তোমাকে দেখে এমন কেনো হলো বলোতো, আমি…আমি…’ ফুপিয়ে উঠে থেমে গেছে আমার অপ্সরা, চোখদুটো তার জ্বলজ্বল করছে, সেখানে একসাথে ফুটে আছে কতশত অনুভুতির ছটা!

‘জানো মার্গো, আমি উলানবাটার গিয়েছিলাম। অনেকগুলো টাকা উপার্জন করে এনেছি। হারানো বার্লি নিয়ে আর কিচ্ছু ভাবতে হবেনা, দেখো তুমি! যতকিছু করা লাগে আমরা করবো, কোনো খারাপ লোকের শয়তানিতে কিচ্ছু এসে যায়না আমাদের…’

মার্গারিতার ফোপানি এতে বরং বেড়ে গেলো। চোখের মনির একদম কোণে এসে জমে ছিলো এতক্ষন, এবার অশ্রুটুকু টপটপ করে পড়লো, উষ্ণ করলো আমার হাত।

‘আর জানো‘ চট করে ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে ফেললাম আমি ‘শহরের এক সিনর আমাকে একটা ক্যামেরা উপহার দিয়েছে! চলো, আমরা একটা ছবি তুলবো ওটা দিয়ে। তোমার সাথে ছবি তুলতে দেবে আমাকে?’

জোরে জোরে মাথা ঝাকালো মার্গারিতা। আর আমি? কসরত করে ক্যামেরাটা আমাদের মুখ থেকে যতটা সম্ভব দূরে ঠেলে দিয়ে, লেন্সটা এদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে মার্গারিতাকে বললাম হেসে ফেলতে, আর ও, চোখে পানি, ঠোটে হাসি নিয়ে যখন খিলখিল শব্দ করে উঠলো, শাটারটা টিপে দিলাম। সাথে সাথে ডেভেলপ হয়ে বেরিয়ে আসা ছবিটাতে নিজেকে দেখে মার্গারিতার একরাশ অভিযোগ, না না না না সিনর, না, হবেনা, আরেকটা তোলো, পর ফেভর! বাচ্চা মেয়েদের মত করে ওকে ভোলালাম ক্যামেরার চার্জ শেষ বলে। কিন্তু ওই যে ছবিটা, জীবনের পরবর্তী অংশে আমি কতকি হারিয়েছি, তবু ফরাসী গায়ানার ভয়ংকর কারাগারে, আমাজনের গহীন অরন্যে সেতসি মাছির কামড়ে, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে বিপন্ন ভেলায় ভেসে, সাহারার দুর্গম মরুঝড়ে, ডাকাতিতে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেও, কখনো ওই একটা কাগজের টুকরো নিজের কাছছাড়া করিনি।

অশ্রুটুকু না মুছেই আরমোনিয়ার আরোহিণী তার রাজকীয় ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা হলো আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিনে।

‘তোমার ক্যামেরার ফিতাটা তো আজ নেই সিনর, এখন কি হবে?’ একগাল হাসলো মার্গারিতা।

মুচকি হাসলাম আমি। মার্গারিতা আলভারেজের হাজারো কৌতূহলী প্রশ্নের বান এড়িয়ে চুপ করে অসাড়ের মত পড়ে রইলাম তার এলোমেলো চুলের রাজ্যে, অপুর্ব এক সুবাস ভেসে আসছে কোত্থেকে যেনো... লাইলাক ফুলের মত মোহনীয়, মিষ্টি সেই সুবাস।