ট্যানের অবাধ্য ছুটে চলা


আচমকা দিব্যচোখে ভেসে উঠতো আধো-অন্ধকার এক কামরা, কাঠের তৈরী দেয়ালের সেই কামরায় চৌকো একটা গ্রীলবিহীন জানালা, সেই জানালার লাগোয়া, বারুদের গন্ধওয়ালা একটা জরাজীর্ন টেবিলের উপর এক হাত কাত করে রেখে পিঠ সোজা করে নড়বড়ে চেয়ারটাতে বসে আছি আমি, অন্য হাতে একটা ঠান্ডা কোকাকোলার গ্লাস শক্ত করে ধরে রাখা। কানে ক্রমাগত বেজে চলেছে টানা বর্ষণের মধুর শব্দ, ঝাঁঝাঁ করে নেশাধরানো এক ছন্দে বয়ে চলেছে পাহাড়ী বাতাস, বাধ্য করছে বড়বড় করে শ্বাস নিতে। ছোট জানালাটার বাইরে গাঢ় অন্ধকার, ক্বচিৎ কোনো বজ্রপাতের গর্জনের সাথে পুরো দুনিয়া দৃশ্যে এসে পড়ে, তখন যতদুর চোখ যায় শুধু মলিন, ধুসর বৃষ্টির ধারা, গাঢ় সবুজ পাহাড়ি চাদরে আছড়ে পড়ছে তারা। ছোট্ট সেই ক্যাফের নিরিবিলি কাউন্টারের রেডিও থেকে খড়খড়ে প্রশান্তির এক শব্দ তুলে ভেসে আসছে একটা স্প্যানিশ লোকসংগীতের শিহরণ জাগানো সুর।..দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দুর্গম পাহাড়ি ক্লিফের গোড়ায় জনবিরল এক শহরে আছে ওই ক্যাফে, আমি জীবনে কোনোদিন যাইনি সেখানে, শুনিওনি তার অস্তিত্ব সম্পর্কে, কিন্তু আমি জানি, কর্ডিয়েরা ব্লাংকার আরও বহু দক্ষিণের কোনো এক উষ্ণ, ব...


ট্যানের অবাধ্য ছুটে চলা



কি সেইসব দিনগুলো, আর কি সেই অনুভুতি, তা আমি কোনোদিন ভুলে যাবো না। প্রতি সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে বিরাট বড় এক বোকা মনে হতো, মনে হতো, এ কেমন বোকা আমি, স্বর্গসুখের সন্ধানে নিজদেশ ছেড়ে পৃথিবীর মাঠে-ময়দানে যাযাবরের মত ঘুরছি, অথচ ঠিক একই আমি চুড়ান্ত অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করছি দুনিয়ার সেরা সুখের আধারটাকে! কল্পনায় ফিরে যেতাম আলতেন্তসেতসেগ ফিরমিনবাইশিন, বুড়োর চুরুট ফোকা, মায়াবী লেকের ধারে, মার্গারিতার চপলতা....! কিছুক্ষণ বোকাবোকা অনুভুতি নিয়ে, শুন্য মনে বসে থাকতাম। এরপর আচমকা দিব্যচোখে ভেসে উঠতো আধো-অন্ধকার এক কামরা, কাঠের তৈরী দেয়ালের সেই কামরায় চৌকো একটা গ্রীলবিহীন জানালা, সেই জানালার লাগোয়া, বারুদের গন্ধওয়ালা একটা জরাজীর্ন টেবিলের উপর এক হাত কাত করে রেখে পিঠ সোজা করে নড়বড়ে চেয়ারটাতে বসে আছি আমি, অন্য হাতে একটা ঠান্ডা কোকাকোলার গ্লাস শক্ত করে ধরে রাখা। কানে ক্রমাগত বেজে চলেছে টানা বর্ষণের মধুর শব্দ, ঝাঁঝাঁ করে নেশাধরানো এক ছন্দে বয়ে চলেছে পাহাড়ী বাতাস, বাধ্য করছে বড়বড় করে শ্বাস নিতে। ছোট জানালাটার বাইরে গাঢ় অন্ধকার, ক্বচিৎ কোনো বজ্রপাতের গর্জনের সাথে পুরো দুনিয়া দৃশ্যে এসে পড়ে, তখন যতদুর চোখ যায় শুধু মলিন, ধুসর বৃষ্টির ধারা, গাঢ় সবুজ পাহাড়ি চাদরে আছড়ে পড়ছে তারা। ছোট্ট সেই ক্যাফের নিরিবিলি কাউন্টারের রেডিও থেকে খড়খড়ে প্রশান্তির এক শব্দ তুলে ভেসে আসছে একটা স্প্যানিশ লোকসংগীতের শিহরণ জাগানো সুর।..দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দুর্গম পাহাড়ি ক্লিফের গোড়ায় জনবিরল এক শহরে আছে ওই ক্যাফে, আমি জীবনে কোনোদিন যাইনি সেখানে, শুনিওনি তার অস্তিত্ব সম্পর্কে, কিন্তু আমি জানি, কর্ডিয়েরা ব্লাংকার আরও বহু দক্ষিণের কোনো এক উষ্ণ, বিরান উপত্যকা পেরিয়ে গেলে খুজে পাওয়া এক শহরে ঠিক অমন একটা ক্যাফে পাওয়া যাবে, আর পৃথিবীতে আসা কোনো এক ঝড়োবৃষ্টিতে কাকভেজা সন্ধ্যায় ওখানে বসে কোকাকোলা পান করা আমার ভবিতব্য, চুড়ান্ত নিয়তি, কোনোভাবেই তা এড়াবার নয়।

জ্বলন্ত কয়লার মাঝে এক ফোটা পানি পড়ে যেভাবে ছ্যাত করে উঠে নিবে যায় তার লালচে অঙ্গার, ঠিক একইভাবে আমাকে শান্ত করতো, আমাকে আমিতে ফিরিয়ে আনতে পারতো, আমার চপল মনের উদাসী কল্পনারা। তবু, মার্গারিতা আলভারেজ আমার জীবনের সব আনন্দ নিয়ন্ত্রণ করতো, অনুপস্থিতিতেই। অনুভুতিহীন এক জড়বস্তুর মত আমি বিদ্ধস্ত এক হৃদয় নিয়ে প্রতিটা বিরাট সেকেন্ড, মিনিট পেরিয়ে এগিয়ে যেতে রইলাম। কতবার যে ভেবেছি ফিরে যাওয়ার কথা! কতবার যে উল্টোঘুরে কিছুদুর গিয়ে ধাক্কা খেয়ে ফেরত এসেছি আমার পথে, তাও মনে নেই।

ওভাবেই, প্রায় দশদিন টানা সাইকেল চালিয়ে শরীরের দুর্বিসহ অবস্থা করে উত্তর মহাসড়ক পেরিয়ে মধ্য মঙ্গোলিয়ার অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তারভাগাতাই পর্বতমালা গোড়ায় পৌছলাম।প্রায় সাড়ে তিন হাজার মিটার উচ্চতার সেই পর্বতসারি পেরিয়ে আমি চলে এলাম যেনো অন্য এক দুনিয়ায়! আমার চারিপাশের সবুজ প্রকৃতি জাদুমন্ত্রবলে গাড় খয়েরী, ধুসর হয়ে গেলো! অথচ আকাশটা অমন গাঢ় নীলই রইলো, সে এক অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার! পশ্চিম মঙ্গোলিয়ায় পথঘাটের অস্তিত্ব প্রায় নেই। তবে এখানেই থাকে শহর এবং আধুনিক জীবনকে প্রাণভরে ঘৃণা করা সেদেশের ঐতিহ্যবাহী যাযাবর জনগোস্টির মানুষেরা। চারিপাশে উচু পর্বত, আর তার মাঝের ছবির মত সুন্দর উপত্যকায় বড় একটা গার বানিয়ে তারা থাকে, চারিদিকে শুষ্ক, লালচে মরুভুমি। তাদের রান্নাঘর, শোবার ঘর, এবং অতিথিশালা ওই একটাই ঘর। আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার ছিলো তাদের অবিশ্বাস্য অতিথিপরায়নতা। এমনকি অজানা অচেনা আমি যদি প্রথমবারের মত তাদের গারের পাশ দিয়ে যাবার সময় দরজায় কোনোরকম করাঘাত না করেই সোজা ঢুকে না যাই, ওই পরিবারের কেউ সেটা জানলে তাকে বেশ বড়সড় অপমান বলে গন্য করবে। তাদের সংস্কৃতিতে দরজায় নক করার নিয়ম নেই, লাভ-ক্ষতির কোনো হিসেব নেই, সব হিসেব শুধু জীবনের আনন্দের। দিন দুই তিনেক পরপরই আমি অমন কোনো পরিবারের সামনে পড়ে যাই। সেদিন পেট ভরে খাওয়া হয়ে যায় আমার। কেউই পারতপক্ষে মেনে নিতে পারেনা যে আমি পরদিনই চলে যাবো, তবে মেনে নেয় অধিকাংশ সময়েই, একজন বাদে, মিসেস দেলবি নামের সেই দশ সন্তানের জননী আমাকে কিছুতেই ছাড়েননি, আমি মংগোলিয়ান জানি শুনে তার আবদার, গল্প শোনাতে হবে। দুইশ’র উপরে ভেড়া, এক’শ ঘোড়া এবং ইয়াক, আর তিন’শ ছাগলের মালিক তাদের বিরাট পরিবার। সাত ছেলের পাঁচজনে বউ নিয়ে থাকে, ছোট মেয়ে ছাড়া বাকিরা চলে গেছে যার যার সংসারে। সারাদিন উৎসবের মত পরিবেশ বিরাজ করে তাদের উপত্যকায়, কেউ ঘোড়ার পিছনে দৌড়াচ্ছে বা কেউ ছাগল কোলে নিয়ে লাফাচ্ছে, কেউ হয়তো ইয়াকের দড়ি ধরে সটকে আছে, আর বেরসিক ইয়াক তাকে টেনে-হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে নরম ঘাসের উপর দিয়ে। সেই বান্দা আবার হা হা করে হাসছে। বিদ্যুতের নাম গন্ধ নেই এই এলাকায়, সন্ধ্যার পর কুপিবাতি জ্বালিয়ে রাতের খাবারের আসরটা জমতো দুর্দান্ত! চারিদিকে কলরব, বৃদ্ধা দেলবির নাতী নাতনীদের খুনসুটি। খাওয়া শেষে আইরাগের আড্ডা, এরপর সবাই সটান ঘুম, মোট চারটা গারে প্রায় বিশজনের বিশাল পরিবার বাস করে, কিন্তু কারো সামান্যতম অসুবিধাও হয়না। আমি ঘুমোতাম সবচেয়ে পুরনো, এবং সবচেয়ে বড়টিতে, মিসেস দেলবির প্রয়াত স্বামী যখন তাকে সবে বিয়ে করেছেন, তখন তাদের দুজনের নিজহাতে তৈরী করা গার। তিনটা দিন ওদের সাথে কাটিয়ে দিলাম। ফের শরীরে অলসতা ভর করার আগেই বিদায় নিলাম আমি। যাওয়ার আগে আমার ব্যাগে যতটুকু শুন্য জায়গা ছিলো, সবটা পুরন করে দিলেন মিসেস দেলবি অপচনশীল খাবার দিয়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় জানালেন যিনি যেদিন আমাকে, সেদিন থেকে আমার যাত্রা সরাসরি পশ্চিমে শুরু হয়েছিলো। আর দক্ষিণে মানুষের বাসযোগ্য পরিবেশ নেই। আমার সামনে আলতাই পর্বতমালা, মিসেস দেলবির এক ছেলে, যার নাম আমার আর মনে নেই, সতর্ক করে দিলো আমাকে, এই অঞ্চলে নেকড়ের আনাগোনা আছে। শুকনো গলায় তাকে ধন্যবাদ দিয়ে জানালাম, আমি নেকড়ে ভয় পাই বেশ। ব্যাটা বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট হবে, ইতিমধ্যে দুই সন্তানের বাপ।

একদিন সকালে উঠে হাত পা গুলো অসম্ভব ভারী বলে মনে হলো। চোখের উষ্ণ অনুভুতি, আর আঙুলের অসাড়তা টের পেতেই নিশ্চিত হয়ে গেলাম, জ্বরে পড়তে যাচ্ছি। দুশ্চিন্তার কিছু অবশ্য নেই, বছরে দুবার নিয়ম করে জ্বর আসে আমার, গ্রীষ্মের মাঝামাঝি, আর শীতের শুরুতে। সেদিন তাবু ফেলেছিলাম ছোট এক জলাশয়ের পারে, মিঠেপানির এক লেক। শরীরে ক্ষমতা থাকতে থাকতে দুই তিনদিন খেতে পারার মত আলু, আর মিসেস দেলবির দেয়া সবজি রান্না করে রাখলাম। চারিদিকে তাকিয়ে বিরাট শুন্য প্রান্তর ছাড়া কিছুই চোখে পড়লোনা। দক্ষিণে উচু পাহাড়সারি।

ততদিনে আমি আবার সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছি। তবে বছরের অন্যান্য সময়ে এই বিষয়ে হেয়ালি করলেও, জুলাই মাসের ক্যালেন্ডারে আমি খুব তীক্ষ্ণ নজরে রাখি। অনেকের কাছে শুনতে অবিশ্বাস্য, এবং অসম্ভব মনে হলেও, আমার মাস-তারিখ জানার সামান্যতম সুযোগ ও ছিলোনা, যদি না আমি নিজে দিন গণনা করতাম। মংগোলিয়ান যাযাবরেরা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের থোড়াই কেয়ার করে। একদিন রাতে তাবুতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি রীতিমত মগজের উপর তুমুল চাপ দিয়ে হিসেব করে বের করতে চাইলাম সেদিনের তারিখ! আমি যেদিন উলানবাটার থেকে র‍্যাঞ্চে ফিরেছিলাম, সেটা ছিলো মে মাসের আটাশ তারিখ। এরপর চোখ বন্ধ করে প্রতিটি দিন আমি স্মরণ করতে লাগলাম, আর আঙ্গুলের কড়ি গুনতে রইলাম। সে কি এক যন্ত্রনা! কতবার যে খেই হারিয়ে ফেললাম, আর নতুন করে শুরু করলাম! একবার এমনকি জুন মাসে ৩১ আছে কিনা তাও ভুলে গেলাম, শেষে স্কুলে শেখা নিয়ম অনুযায়ী মনে করতে হলো কোন কোন মাস বিলম্বিত! প্রতিদিন রাতের কথা স্মরণ করা ছিলো দুর্বিসহরকম কঠিন। শেষমেষ ঘন্টাদুয়েক গলদঘর্ম হয়ে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম আমি, এটা জুলাই মাসের উনিশ, বিশ, একুশ বা বাইশ তারিখ! চারটা দিনের হিসাব মেলাতে আমি স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ একুশ তারিখ। জুলাই সাতাশ আমার জন্মদিন। জন্মদিনে অন্য সবার চেয়ে আলাদা এক উন্মাদনা আমার মাঝে। কোনো উদযাপন নয়, পরিবার, বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো নয়, সেদিন সারাটাদিন আমি নিজেকে সময় দেই। চুপ করে বসে থাকতাম, আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম, আর অধিকাংশ সময়, বিছানায় সটান শুয়ে থেকে আমার জন্মের দিনটির কথা মনে করতাম। আমাকে যখন প্রথম দেখেছিলো সবাই, তাদের প্রত্যেকের তখনকার অনুভূতি কল্পনা করার চেষ্টা করি। ভাবতাম আমাকে কত মানুষ নিস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তাদের কি আমি ঠিক অতটাই ভালোবাসি? প্রায় সবসময় উত্তর হতো, না! তখন ভাবতাম, আজকের পর থেকে আমি পালটে ফেলবো নিজেকে, সবার সাথে ভদ্র, বিনয়ী আচরণ করবো! যাদের কথা খুব বেশী মনে পড়তো, তাদের সাথে কথা বলতাম। আবার পরদিন সেই যা তা হয়ে যেতাম, রুক্ষ, একরোখা, নির্মম, দায়িত্বহীন, নির্বোধ।

আমার বাইশতম জন্মদিনের দুইদিন আগে, অন্তত আমার তাই ধারনা, জ্বরটা আসি আসি করেও আসছে না, অথচ আমাকে দুর্বল করে রাখলো, আর আমি আলতাই পর্বতমালার সবচেয়ে উচু চুড়া, সুতাই পর্বতের উপকণ্ঠে তাবু ফেললাম। আগামী দুটি দিন চুড়ান্ত বিশ্রাম। শুধু নিজের কথা ভাববো, এবং শুধু অতীতের কথা, ভবিষ্যতের একটা মুহুর্ত আগে আমার মনটাকে যেতে দেবোনা। ভীষণ, ভীষণ শীতল সেই উপত্যকা, নেকড়ের দলও এত উপরে ওঠেনা। আমি যেনো মেরুভালুক হয়ে উঠলাম নিমেষে! সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার দুইশ মিটার উচ্চতার সুতাই আমার সামনে সোজা উঠে গেছে আকাশ ছুতে, আমারও অনেক নীচের সোনারঙ্গা সমতলভুমিতে বহু, বহু মাইল দূরে চলে যায় দৃষ্টি। সারাদিন অলস বসে বই পড়লাম, চা পান করলাম। গান শুনতে খুব ইচ্ছা করলেও, কোনো উপায় ছিলোনা। দ্বিতীয়দিন মাঝরাতে বিনা কারনে ঘুম ভেঙে গেলো আমার। কিন্ত ওট আমার জন্য অস্বাভাবিক। উঠে কিছুক্ষন চুপ করে চারিপাশের শব্দ শুনলাম। তাবু থেকে এখন বের হলে শরীর ফের গরম হতে বহুসময় লাগবে! একপাশের ঝাপি খুলে বাইরেটা দেখে নিলাম। সামান্য একটা অগ্নিকুন্ড জ্বালিয়েছিলাম, অনেক আগেই নিভে গেছে তা। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণেও অস্বাভাবিক কিছু না পেয়ে শুয়ে পড়েছি মাত্র, তখনই আমার কানে এলো অস্পষ্ট গর্জনের মত একটা শব্দ, অনেকটা রাগী মানুষের তর্জনের মত, কিছুটা প্রলম্বিত কান্নার শব্দের মত! আগে কখনো অমন শব্দ না শুনলেও আমি নিমেষে বুঝে গেলাম ওটা কি। তুষারচিতা সম্পর্কে যতকিছু জানি, সবকিছু খেলে গেলো মনের পর্দায়। নিজের আয়ত্বের মাঝে যেকোনো গৃহপালিত পশু হত্যা করতে পারে বড় বিড়ালদের মাঝে অন্যতম বিপন্ন এই প্রাণিটি। কিন্তু কখনো কোনো মানুষকে আক্রমণ করেছে বলে শোনা যায়নি। “শোনা যায়নি”, ব্যাপারটাই কখনোই বিশ্বাসী না আমি, সুতরাং, সামান্য ঘাবড়ে গেলাম বটে। বের হয়ে কিছু একটা করে ওকে চমকে দেয়া উচিত হবে, নাকি এখানে শুয়ে থাকা উচিত হবে, এ নিয়ে বেশীক্ষণ ভাবলাম না। ঠান্ডার তোয়াক্কা না করে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। এক টুকরো কাগজ বের করে হাতে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাড়ালাম। একসাথে করতে হবে অনেকগুলো কাজ। পরের তিন সেকেন্ডের মাঝে আমি তাবুর ঝাপিটা খুলে দেয়ার আগ মুহুর্তে ফত করে ম্যাচের কাঠি ধরিয়ে কাগজটা জ্বালিয়ে দিলাম, একইসাথে গলায় যত জোর আছে, তা দিয়ে চিৎকার করে লাফিয়ে বের হলাম সামনে যে-ই আছে, তার সামনে। চোখে পড়লোনা কিছুই, কিন্তু ছুটন্ত পদক্ষেপের শব্দ শুনে বুঝলাম, ব্যাটা ভেগেছে। বেশ কিছুদুর এগিয়ে চারিদিকটা দেখে নিয়ে নিশ্চিত হলাম ব্যাপারটা। এরপর হঠাত করে যখন ঠান্ডা জাকিয়ে ধরলো, অথচ এতক্ষন তা টেরই পাইনি, তখন টের পেলাম কতটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম!

আকাশে শতকোটি উজ্জ্বল তারা, ক্ষনিকের উত্তেজনায় ঘুমটাও কেটে গেছে, আর আমি চাইলেও এখন ভিতরে যেয়ে ঘুমাতে পারবোনা। আমার জীবনের বাইশতম বছরের প্রথম প্রহরটাতে খোলা আকাশের নীচে মিল্কিওয়ের আলোটুকুকে আরও উজ্জ্বল করতে বড়সড় একটা অগ্নিকুন্ড বানালাম। তাতে গরম পানি চড়িয়ে দাদুর কিনে আনা কফির ভান্ডার থেকে আমাকে দেয়া এক প্যাকেট কফি খুজে বের করতে ব্যাগ হাতড়াচ্ছি, তখন ছোট চকোলেট বারের মত, ধাতব একটা বস্তু হাতে ঠেকলো। খানিকটা বিরক্ত হয়ে ওটা একপাশে ঠেলে সরাতে গিয়ে বিদ্যুতচমকের মত মাথায় খেলে গেলো কথাটা! কাপা হাতে বের করে এনে চোখের সামনে ফেলেও যেনো বিশ্বাস হলোনা, আমার হাতে মার্গারিতার হারমোনিকা!

আমার প্যানিয়ারে ওটা কিভাবে এসেছিলো, তা আমি কখনোই জানতে পারিনি। কিন্তু মার্গারিতা যে টের পেয়েছিলো আমি চলে যাচ্ছি, সেকথা নিশ্চিত। কিজানি কোন সুযোগে আমার জীবনের সবচেয়ে দামী উপহারটি আমারই অজান্তে আমাকে দিয়ে রেখেছিলো অদ্ভুত মেয়েটা! সেকথা মনে করে বিষণ্ণ হতে হলো, কতখানি দুঃখই না পেয়েছে মেয়েটা আমি এভাবে চলে আসায়! কতগুলো রাত কেদে বুক ভাসিয়েছে, দাদু ওকে কিভাবে সামলেছে? ফের একবার তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা ইচ্ছের স্রোতেদের আমি উল্টোদিকে ফিরিয়ে দিলাম, যারা কায়মানোবাক্যে আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায় স্বর্গীয় সেই উপত্যকায়! কফির পাত্রটা চড়িয়ে দিয়ে আমি হারমোনিকাটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম, কতক্ষণ যে চেয়ে চেয়ে দেখলাম শুধু! ওটার ধাতব দেহে যেনো প্রতিফলিত হচ্ছিলো মার্গারিতার মিষ্টি মুখটা! আমার দিকে চেয়ে হাসছে সে, একইসাথে একরাশ অভিযোগ তার চোখে! আমি হারমোনিকা বাজাতে জানিনা। বাজাতে জানলেও আমি কখনোই ওটা ব্যাবহার করতাম না! মার্গারিতা আল্ভারেজ বাজাতো এটা, ওর ঠোটের ছোয়া লেগে আছে তার প্রতিটি রন্ধ্রে! আমি স্পর্শ করলেই যে চলে যাবে তা, আজীবনের জন্য। ঘন্টার পর ঘন্টা আমি চেয়ে থাকতে পারি কাঠের তৈরী বস্তুটার দিকে, একের পর এক মনে করতে পারি মেয়েটার সাথে আমার প্রতিটি স্মৃতি! আমি যখন পরম যত্নে একটা রুমালে পেঁচিয়ে প্যানিয়ারের সবচেয়ে নিরাপদ স্থানটিতে হারমোনিকাটা রেখে দিলাম, কফির পাত্রের তলানীতেও সামান্যতম পানি অবশিষ্ট নেই, সবটা উবে গেছে! মুচকি হেসে ফের একবার কফি বানালাম! অ্যালান কোয়াটারমেইনের একটা উপন্যাস বের করে নাচতে থাকা আগুনের আলোয় চোখ বুলাতে লাগলাম, মাটিতে লেটিয়ে বসে নিজের অজান্তেই রুক্ষ কন্ঠে গেয়ে উঠলাম- ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে...!’

সকাল হতেই সেই উপত্যকা ত্যাগ করলাম আমি। বিরাট এক ডাউনহিল বেয়ে নেমে এলাম বায়ান-ওলগিয়াই প্রদেশে, মঙ্গোলিয়ার সর্বপশ্চিমের বিভাগ। শ্বেতশুভ্র আর সোনালি এই অঞ্চলে এদেশের সবচেয়ে বড় মুসলিম বসতি, যারা আদতে প্রকৃতিগতভাবে কাজাখ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন রাশিয়ানরা চাষবাসের ভালো জমি খুজে পেতে দক্ষিণে আসতে শুরু করলো, এবং কিছুবছরের মধ্যেই পুরো এলাকাকে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ বলে দাবী করলো, তৎকালীন বিভিন্ন কাজাখ গোত্রের প্রায় ১৪০০ পরিবার মংগোলিয়ান অঞ্চলে এসে বসতি শুরু করেছিলো। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের পর কাজাখস্তান যখন উনিশ’শ একানব্বইতে স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, আর সেই একই সময়ে মঙ্গোলিয়া ধীরে ধীরে কমিউনিজম থেকে গনতন্ত্রে আসতে হতে শুরু করলো, বহু মংগোলিয়ান-কাজাখ নিজ দেশে ফিরে যেতে শুরু করলেও, এক লক্ষেরও বেশি মানুষ রয়ে গেলো তাদের বাপ-দাদার ভিটেতে। সেই অষ্টম শতাব্দী থেকে তারা ইসলাম ধর্ম পালন করে, যখন আরবরা প্রভাবিত করেছিলো মধ্য এশিয়ার রীতিনীতি, ধর্মবিশ্বাস এবং জীবনযাপন এবং কাঠামোর ধরন।

তেমনই এক পরিবারের ছেলে আমিরখান ওমারভ। ওর মত অমায়িক কিশোর আমি সারাজীবনে খুব কমই দেখেছি। ও যখন আমাকে প্রথম দেখে, আমি তখন বিকেলের পড়ন্ত আলোয় তাবু খাটানোর কাজে গলদঘর্ম, শুধু জানতাম না আমি রয়েছি এলাকায় ত্রাস সৃস্টিকারী একদল নেকড়ের আস্তানার খুব কাছে। হঠাত হট্টগোলের শব্দ শুনে উপরে তাকিয়ে পিলে চমকে গেলো আমার! চোখের নিকটবিন্দু থেকে খুব বেশী দূরে নয়, দুইপাশে প্রায় আট ফুট লম্বা বিরাট ডানা ছড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখ, চোখা, লম্বা নাকের ভয়ংকর এক শিকারী ধেয়ে আসছে আমার কাছে, আরো কাছে, কতগুলো হৃদস্পন্দন হারিয়ে ফেললাম আমি, কি ওটা! চিউউউ করে তীক্ষ্ণ এক চিৎকার ছেড়ে আমার মাথার ফুটখানেক পাশ দিয়ে উড়ে গেলো বিরাট এক ঈগল! হতভম্ব হয়ে চেয়ে দেখলাম ওটা ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়লো প্রমান আকারের একটা কুকুরের ওপর! না না, ওটা কুকুর নয়! প্রলম্বিত যন্ত্রনাকাতর চিৎকার ছেড়ে ওটা ছুটতেই নেকড়েটাকে চিনতে পারলাম। একইসাথে অচেনা ভাষায় কোত্থেকে এক চিৎকার ভেসে এলো, এবার মানুষের! নজরেও এলো সেই মানুষ! পনেরো-ষোল বছর বয়েসী এক স্থানীয় কিশোর, উদ্ভ্রান্তের ভংগিতে ছুটে আসছে, আর চিৎকার করে দুর্বোধ্য বুলি ছাড়ছে। ভাষাটা কাজাখ। আমার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সম্ভবত রাশিয়ান, এরপর ইংরেজী বললো ছেলেটা।

‘তুমি কি করছো এখানে? জানোনা এখানে নেকড়ের গুহা? তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো?’

‘পারছি, পারছি! কিন্তু তুমি আমার পিলে চমকে দিয়েছো। শুধু নেকড়ে না, এখানে একটা ভয়ংকর ঈগল ও আছে, ধেয়ে এসেছে’ এদিকওদিক তাকিয়ে খুজতে লাগলাম আমি পাখিটাকে।

‘ওটা মোটেও কোনো ভয়ংকর ঈগল না’ শান্ত ভংগিতে বললো ছেলেটা ‘ওটা লারিসা, আমার পোষা ঈগল’

‘পোষা কি! মশকরা করছো আমার সাথে?’

‘তোমার তাই মনে হচ্ছে?’ চ্যালেঞ্জের সুরে বলে উঠলো সে। এরপর উপরে তাকিয়ে খুজেপেতে ঈগলটাকে দেখে শিস বাজালো সে ‘লারিসা, এদিকে আয়!’

আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে সত্যি সত্যি সেই ভয়ানক পাখিটা বজ্রের গতিতে উড়ে এসে বসে গেলো ছোকরার কাধে! গর্বিত হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকালো কাজাখ কিশোর।

‘আমি ট্যান’ হাত বাড়িয়ে দিলাম ‘ তোমার সাথে পরিচিত হয়ে মুগ্ধ হলাম, আর আমার জীবন বাচানোর জন্য ধন্যবাদ…’

‘আমিরখান ওমারভ’ মিষ্টি করে হাসলো কিশোরটিও ‘তুমি কোত্থেকে আসছো?’

‘খুভশগুল’

‘কিন্তু…’ দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে বললো আমির ‘তোমাকে দেখে মনে হয় বিদেশী’

‘তা ঠিক বলেছো। জন্মগতভাবে আমি বাংলাদেশী। দক্ষিন এশিয়ায় থাকে পরিবার। আমি থাকি সারা পৃথিবীজুড়ে’

‘বলো কি!’ গোলগোল বড় চোখগুলো আরও বড় হয়ে গেলো ওমারভের!

'তুমি করছো কি এখানে? আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি দেখছিনা!'

'আমি এসেছি অনেক দূর থেকে মিস্টার। লারিসাকে নিয়ে শিকারে বেরিয়েছি, এখনো একটা খরগোশ ও ধরতে পারিনি। নীচে থেকে ধোয়া দেখে ছুটে এসেছি নেকড়ের দল কাকে শিকার করতে চলেছে দেখতে!'

'ঈগলটা...মানে তুমি একদম ঠিক সমতে এসেছিলে! ধন্যবাদ ভাই!' 'সে পরে দিও, আগে তোমার ক্যাম্প ওঠাও'

'তা নিশ্চই' আমি ব্যাস্তহাতে তাবুটা গোটাতে শুরু করলাম, কিন্তু ছেলেটা তখনো বিদায় নেয়নি 'তোমার শিকারে দেরী হয়ে যাবেনা?'

'নাহ! আমার কাছে পৃথিবীর সব সময় আছে। তোমার কাজ দেখতে ভাল্লাগছে!'

'হাহ হা'!

'তোমাকে ইন্টারেস্টিং ও মনে হচ্ছে। নিশ্চই অনেক গল্প আছে তোমার?'

'গল্প? তা আছে। শুনতে চাও?'

'আগে ভাগি এখান থেকে, চলো'

'তিনটা মিনিট সময় দাও আমাকে'

'সমস্যা নেই!' কৌতুহল নিয়ে চারিপাশে ছিটানো আমার সংসার দেখতে লাগলো আমিরখান। কিন্তু ও আমার সাইকেল দেখেনি তখনো! বেশ খানিকটা দূরে একটা গাছতলায় রেখেছি।

'তোমার ঘোড়া কোথায়?' প্রশ্ন এলো!

'আমার ঘোড়া নেই। যা আছে, চমকে যাবে দেখলে। প্রস্তুত?'

'প্রস্তুত!' বিস্ময় খেলে গেলো সুদর্শন কিশোরের চোখে, কন্ঠে!

আমার কমলা-কালো ছিমছাম মাউন্টেইন বাইক দেখে ভিড়মি খেলো না আমিরখান, বরং চিল-চিতকার দিয়ে উঠলো! আজীবন শুনে এসেছে সে দুইচাকার আজব এই বাহনের কথা, নিজের সামনে তাই পেয়ে মিনিট তিনেক শুধু এটা ওটা ধরে দেখলো।

'তুমি এটা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এলে কিভাবে মিস্টার ট্যান?'

'এটা নিয়ে আমি আসিনি, আমির, ওটাই আমাকে নিয়ে এসেছে'

'মানে তুমি বলছো…..!'

'হ্যা!'

'যাহ!' বোকা হয়ে গেলো সে।

মুচকি হেসে সরালাম ওকে সাইকেলের উপর থেকে। সংবিত ফিরে পেলো মুগ্ধ কিশোর। আধঘন্টা পর একটা বড়সড় এক চড়াই পেরিয়ে এসেছি যখন, দেখা গেলো আমার সাইকেলের পাশেপাশে নিজের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে সে, আর আমাকে টেপ রেকর্ডারের হারে প্রশ্ন করে যাচ্ছে! আমিও ক্লান্তিহীন উত্তর দিয়ে গেলাম তাকে। অন্য অনেকের মত, সেও মুগ্ধ হলো আমার লম্বা যাত্রা, আর তার উদ্দেশ্যের কথা শুনে। জানা গেলো, সামনের পাহাড়ি ঢালটা পাড়ি দিলেই সাগান-গোল নামে একটা গ্রামে পৌছবো আমরা। ওখানেই আমিরখান ওমারভের বাড়ি। যেহেতু তার ঈগলের উপর আমি আগ্রহ প্রকাশ করেছি, এবং আমার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনতে চায় সে, তাই আমার অবশ্যই ওদের গ্রামে একটা সপ্তাহ থেকে যাওয়া উচিত বলে মনে করে আমির। নিমরাজী আমি খানিকক্ষণ হেয়ালি করে যখন দূর থেকে ওদের গ্রামটা দেখলাম, খুশীমনে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে ফেললাম। সাগান-গোলের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে আকাবাকা এক হাটুপানির খাল। জনাবিশেক মুসলিম কাজাখ পরিবার মিলে গড়ে তুলেছে সেই গ্রামের ছোট্ট অর্থনীতি, অবশ্যই র‍্যাঞ্চিংই তার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে। বহুদিন বাদে গার, এবং তার গোলাকার আকৃতিবিহীন বাড়ী চোখে পড়লো আমার। মংগোলিয়াতে থেকেও আমি যেনো চলে গেছি অন্য দুনিয়ায়, কাজাখ-মঙ্গোলরা মংগোলিয়ানদের থেকে আদতেই ভিন্নধর্মী জীবনযাপন করে! যাযাবর মঙ্গোলদের থেকে তাদের জীবন আহামরি ভিন্ন না হলেও, কিযেনো একটা আধুনিক ভাব চোখে পড়েছে আমার। আলতাই পর্বতের এই সোনালী উপত্যকায় রয়েছে একটা মসজিদ, একটা দোকান, আর, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য-একটা ভোজনশালা। আমির বললো, সন্ধ্যার পর ওখানে মিসেস আইশার তৈরী গ্রামসেরা ডামপ্লিং আর শরবত পান করা ছাড়া নাকি পুরো বসতির ছেলেপেলেরা রাতে ঘুমাতে পারেনা। খানিক বাদেই সন্ধ্যা ঘনাবে, তোমাকে দেখাবো দেখো মিস্টার ট্যান, বললো আমির!

পরিবারের একমাত্র ছেলে আমিরখান। তিন তিনটি বড়বোনের অনেক আদরের ছোটভাই। খালের সবচেয়ে কাছাকাছি ঘরটা ওদের। আমিরের বাবার সাথে আমাদের দেখা হলো গ্রামে ঢোকার আগেই। মিস্টার আলিখান আমিরের মতই হাসোজ্যল, মিষ্টভাষী। আমাকে দেখে খুব খুশী হলেন, এতই, যে তিনি মাছ ধরা বন্ধ করে আমাদের সাথে চলে এলেন তার বাড়িতে। আমিরদের কাঠের তৈরী ঘরটা গ্রামের অন্য সবগুলোর মতই রঙিন। আমার সাইকেলটা ওদের বার্নে রেখে এলাম, মিসেস খান এবং তার মেয়েরা রাতের খাবার তৈরী করছিলেন তখন। আমির অবশ্য বলেছে আজ আমাকে নিয়ে মিসেস আইশার ওখানে খেয়ে নেবে! জানিনা এমনিতে কি হতো, কিন্তু আমার সামনে পার পেয়ে গেলো সে এতে! প্রায় টেনে নিয়ে চললো সে আমাকে গ্রাম দেখাতে। পুরো গ্রামের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কতশত ঘোড়া, তা আমি ধারনাও করতে পারলাম না! সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে, সবাই নিজেদের ঘোড়া জড়ো করছে। আমিরদের ঘোড়াগুলো আমিরের সাহায্য ছাড়াই তার বোনেদের স্টেবল করতে হয়েছে সেদিন। এরপর গ্রামের একদম মাঝে অবস্থিত মসজিদে আমরা একসাথে মাগরীবের নামাজ আদায় করলাম। আমি সেদিনের আগে শেষ কবে মসজিদ দেখেছি, তা একদমই মনে নেই। এখনো মনে পড়ে মঙ্গোলিয়ার স্বর্গীয় আবহাওয়ায় মসজিদের ভিতরের অপার্থিব পরিবেশের কথা, ভেসে বেড়ানো সুবাসের কথা।

পাহাড়ি খাড়াই ঘেঁষা মিসেস আইশার রান্নাঘর আরেক চমৎকার ব্যাপার! আমরা যখন সেখানে পৌছলাম, তখন চারিপাশে জাকিয়ে বসা অন্ধকারের মাঝে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট একটা অগ্নিকুণ্ড ঘিরে থাকা উঠানমত খোলা জায়গাটা। গোলাকার টেবিল পেতে রাখা আছে এখানে সেখানে, আমি আর আমির গিয়ে তাদেরই একটা দখলে নিলাম। কুপিবাতির আলোছায়াতে শরীর পেতে দিয়ে বসলাম আমি যখন, কেমন উদাস হয়ে গেলাম। শরীরটাকে মনে হচ্ছিলো পাখির পালকের মত হালকা, যেনো আমি হাত পা ছেড়ে দিলে উড়ে চলে যাবো বিদিক হয়ে। আমিরের সঙ্গে ভীষণভাবে অবগাঢ হয়ে কতকি কথাই না বলে গেলাম, শুনে গেলাম। আমাদের পাশের টেবিলে দুজন তরুণী খোলাকন্ঠে, দরিয়া গলায় দুর্বোধ্য ভাষায় গান ধরেছে। অথচ তারা যতটা না গাইছে, তারচেয়ে বেশী খিলখিল করে হাসছে। দুইজনে সম্ভবত প্রাণের বান্ধবী, মনে খুবই আনন্দ। ওদের হাসি দেখে কেনো যেনো আমারও খুব হাসি পেলো! টেবিলে দুই হাত রেখে তার মাঝে মাথাটা গুজে দিয়ে আমি নিঃশব্দে হাসলাম। অনেকক্ষণ হাসলাম। হাসিটা যখন থামলো, চোখের মনি টলমল করছে আমার। আমির গিয়েছিলো আমাদের প্লেটজোড়া নিয়ে আসতে, ও ফিরে এসে আমাকে ওভাবে দেখে হাসলো, তালে তালে মাথা নাড়ছে, কাজাখ ভাষায় হাক ছেড়ে প্রশংসা করলো মেয়েদুটোর! প্লেটে করে ঘোড়ার মাংসের ডামপ্লিং, যকে কাজাখরা বলে মানতি, গরুর কাবাব, আর হরশুর নিয়ে এসেছে আমির। ঘোড়ার মাংস কাজাখদের খুবই প্রিয়। আর আমার ওই প্রথম ঘোড়ার মাংস খাওয়া। অভিজ্ঞতাটা যতটা অদ্ভুতরকম নতুন হবে ভেবেছিলাম, হলো ঠিক তার উল্টোরকম আনকোরা নতুন। গরুর মাংসের মতই রসালো, কিন্তু আরও খানিকটা মিষ্টি ভাব আছে ওর মাঝে! তফাত যেটা আছে তা হলো- ঘোড়ার মাংস আরও পাতলা, আধাকাচা রান্নাও ছিড়ে চিবাতে বেগ পেতে হয়না। মিসেস আইশার রান্নার হাতও দারুন। এইতো এখান থেকে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটা খুপরি, ওটাই রান্নাঘর। ভিতরে দারুন উষ্ণ। ধবধবে সাদা চুলের এক বৃদ্ধা কয়লার চুলোয় জ্বালানী চালানে ব্যাস্ত, আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না ওটাই তার সত্যিকারের চুলের রঙ কিনা। তাকে ঘিরে আছে ভক্তের দল, এটা ওটা চাইছে, কেউ কেউ সাহায্যও করছে।

‘আচ্ছা আমির, রহস্যটা কি? মিসেস আইশা কেনো এত জনপ্রিয়?’

‘আসলে’ ভীষণ ব্যাস্ত আমির খেতে ‘এত মজার খাবার! আর উনি

অনেক গল্প জানেন। পুরো উত্তর মঙ্গোলিয়ার প্রতিটা উপত্যকা তার নখদর্পনে। তার বাবা ছিলেন যাযাবর, ঘুরে বেড়াতেন সবখানে’

‘বাহ। মনে হচ্ছে আমার মনের মত মানুষ, গল্পের ভান্ডার আছে যার!’

‘মিস্টার ট্যান…’

‘ধুর! মিস্টার ফিস্টার বাদ দাওনা দয়া করে। ট্যান বলো’

‘আরে বলে কি! তুমি আমার কত বড় না, নাম ধরে ডাকা যাবেনা গুরু!’

‘গুরু হলাম কবে আবার! আচ্ছা লোক তুমি আমিরখান ওমারভ! ঠিকাছে, ট্যান ভাই বলো। এর মানে জানো? ব্রাদার ট্যান। কিন্তু ব্রাদার ট্যান শুনলে আমাকে গির্জার পাদ্রী বলে মনে হবে। ভাই একটা বাংলা শব্দ। এই সম্বোধনে ডাকলে তাকে খুব আপন মনে হয়, মনে হয় যেনো, এর জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারবো। সামান্যতম জড়তাও থাকেনা তার সাথে কথা বলার সময়’

‘আচ্ছা ট্যান ভাই! তুমি এত সুন্দর করে কথা বলা কোত্থেকে শিখেছো?’

‘পথ থেকে, আমির। আকাশ থেকে, পাহাড় থেকে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধুলো থেকে, মাটিতে বিছিয়ে থাকা কাদা থেকে, বৃস্টির ফোটা থেকে, মরুভুমির বালু থেকে, আর শিখেছি চাঁদের আলো থেকে, বর্ষার বাতাস থেকে, সমুদ্রের ঢেউ থেকে, বিরাট বিশাল মহীরুহদের থেকে, নদীদের দুরন্ত পথচলা থেকে, কখনো খাটি বন্ধুত্বের মহত্ব থেকে, অশীতিপর বৃদ্ধের চোখ থেকে, শিশুর হাসি থেকে! পৃথিবীতে যা-কিছু আছে, সবার আমি ছাত্র।‘

‘তুমি দারুন লোক ট্যান ভাই! আমার যদি তোমার মত একটা ভাই থাকতো, দারুন হতো না বলো?’

‘উঁহু’ মুচকি হাসলাম আমি ‘আমার মত ভাই থাকলে সে তোমার কাধে পুরোটা ওজন ছেড়ে নিজে সটকে পড়তো, প্রতিবার, এবং শেষবারও।‘

‘তুমি যখন বলছো, আর প্রতিবাদ করবোনা যাও’

‘তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করেনা?’ নিমেষে আমিরের অপ্রিয় বিষয় টেনে এনেছি আমি। ‘

ওকথা বোলোনা তো, ধুর’ দুই হাত নেড়ে আমাকে একদম উড়িয়ে দিলো যেনো সে! ‘তুমি জানো, কি ভয়ানক ব্যাপার ওটা? সকাল বেলা ওখানে গেলে দুপুরের আগে আর ফিরতে দেয় না! প্রতিদিন! আমার শহরের কাজিন চিঠি দেয় বছরে দুইবার, ও মুরুনের স্কুলে পড়ে। জঘন্য লোক। কিন্তু তুমিও নিশ্চই স্কুল পছন্দ করোনা ট্যান ভাই?’

‘পছন্দ করি কিনা সেটা শুনে কাজ নেই তোমার! কিন্তু জেনো, আমি বড়দের স্কুল-যাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলে-ছেড়ে পালিয়ে এসেছি’

‘তাই-তো তোমার সাথে আমার এত যায়! হই হই! দাড়াও, আরও এক বাটি কাবাব চেয়ে আসি…’

আমি কিছু বলার আগেই এক ছুটে মিসেস আইশার রান্নাঘরে চলে গেলো কাজাখ কিশোর! ফিরে এলো আরও এক প্লেট হরশুর নিয়ে।

‘ট্যান ভাই, সকালে জলদি উঠতে পারো যদি, তাহলে কাল চলো আমার সাথে, ঈগল দিয়ে কিভাবে খরগোশ শিকার করি, দেখাবো! যাবে?’

‘নিশ্চই যাবো। কিন্তু...আমার তো ঘোড়া…’

‘আরে, আমার নিজেরই দশটা ঘোড়া আছে, তুমি বেছে নিও। যাবে বলছো! আগামীকাল’ চিৎকার করে উঠলো আমির ‘দারুন দিন হবে!’






ট্যাগ: